সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দেন্দা

 “খ্র্যা-আ-আ-” ঘাড় ঘুরিয়েই নিচু স্বরে গর্জন করে উঠলো শিম্পাঞ্জিটা!

রনদীপ পেশাদার খুনে, কিন্তু এরকম আচমকা প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরী ছিল না সে| চমকে গেলেও এক মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলো সে| আর তাছাড়া তাদের অনুসরণকারী জীবটি যে মনুষ্যেতর, সেটা জানতে পেরেও তার স্বস্তি হলো অনেকখানি|

শিম্পাঞ্জিটা লম্বায় ফুটচারেক, সাধারনের থেকে উচ্চতা সামান্য একটু বেশিই, সেকারণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তাকে মানুষ বলেই প্রায় ভুল করেছিলো সে| তার জন্যেই হাতের কম্যান্ডো নাইফটা এখনো তাক করা আছে তার দিকেই|

শিম্পাঞ্জিটার নজর দ্রুত রনদীপের চোখ আর তার হাতের ছুরির দিকে যাতায়াত করতে করতে কি একটা হিসাব করছিলো|

“শ্র্সস-ক্রর-র-র” ওয়াকিটকির ইয়ারফোনটা সরব হয়ে উঠলো, “ক্বয়ান টু রান্ডি, ক্বয়ান টু রান্ডি, ডু ইউ কপি? তোমার লোকেশন বলো, ওভার|”

রনদীপ খানিক সময় দলছাড়া, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলেছে যে কিছু একটা তাদের দলটাকে শেষ আধ ঘন্টা ধরে অনুসরণ করছে, কাজেই ঘুরপথে এসে সে আপাতত সেই অনুসরণকারীর সামনাসামনি| কিন্তু তার অনুপস্থিতি তার দল টের পাওয়ার কারণে টিম লিডার ক্বয়ান জিমের সাথে ওয়াকিটকিতে এর মধ্যে তার বেশ কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে|

শিম্পাঞ্জিটা একবার চাপা গর্জন করেই চুপ হয়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু তার শিশুসুলভ মুখের গোলাপী হাঁ থেকে এখনো তার দাঁতগুলো বেরিয়ে আছে| বড় বড় দু’চোখের চাউনিতে নৃসংশতা না হিংস্রতা – কোনটা বেশি প্রকট বুঝতে পারছিলো না রনদীপ|

“ক্বয়ান টু রান্ডি … লোকেশন, ওভার|”

রণদীপের ডানহাত এখনো ছোরা বাগিয়ে সামনে এগুনো, বাঁহহাতের উল্টোদিক দিয়ে সে শিম্পাঞ্জিটাকে তাড়ানোর ইশারা করে|

“হুশ!”

কিন্তু জন্তুটার ভিতর কোনো বৈকল্য দেখা যায় না|

এই বনের জীবজন্তুদের মানুষের সাথে পরিচয় নেই বললেই চলে| রনদীপ যেখানে আছে সেখান থেকে সব থেকে কাছের বুনোবস্তি অন্তত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূর| হয়তো সেকারণেই …

পশু ও মানুষ দুজন দুজনের দিকে চরম সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকে বেশ কয়েক সেকেন্ড| তারপর রনদীপ পজিশন ছেড়ে রিল্যাক্স হতে গেলেই শিম্পাঞ্জিটা চকিতে ধেয়ে আসে তার দিকে|

-*-

“গোল্ড, ইউরেনিয়াম হোয়াটেভার ইট মে বি – আমাদের শুধু ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার নিয়েই কনসার্ন| উই’ল জাস্ট সিকীওর দা পেরিমিটার, ইন্টিমেট দা অথরিটি, আর তারপর সার্ভেয়ার, কন্ট্র্যকটর যা খুশি করবে – ব্যাস – উই আর লিস্ট বোদারড|”

“দ্যাট’স ওকে, বাট …”

“নো মোর কোশ্চেনস নাথান, কিন্তু রান্ডি গেলো কোথায়? কোনো সাড়া শব্দ নেই|”

“চিন্তা করো না ক্বয়ান, জানই রনদীপ ট্রেইন্ড কম্যান্ডো| যেকোনো টেরেইনেও ও স্বচ্ছন্দ| হি’ল ক্যাচ আস আপ এনি মোমেন্ট|”

“আই নো নাথান, টিম সিলেকশন যারা করেছে তারা ভালোভাবেই জানে যে জায়গা স্যাটেলাইটে আসে না সেখানে টাফেস্ট মানুষই পাঠানোর রীতি| দেন্দা ফরেস্ট সেরকমই জায়গা …”

“হ্যা, দুদিনের ট্রেকে পুরো উপলব্ধি হয়েছে| পুরো অভিশপ্ত!”

“কিন্তু কিছু একটা নিশ্চই আছে যা কন্ট্র্যাকটরের মাথার উপর যারা আছে, সেই কর্পোরেটের ইন্টারেস্টের কারণ! নয়তো এই নো-ম্যানস-ল্যান্ডে আমাদের সিক্রেট এক্সপিডিশনে পাঠানোর প্রয়োজন ছিল কি?”

“তাও এতো বড় ইন্সীয়রেন্সের বদলে – হা হা হা!”

“ইয়েস! দ্যাট’স হোয়াট ইন্টারেস্টস আস! নয়তো দুনিয়া ঝেঁটিয়ে আমাদের এই ডেজারটেড ল্যান্ডে এসে জড়ো হওয়ার কারণ কি?”

“উই আর টিম, ব্রাদার| লাইক ইন বতসোয়ানা, লাইক ইন মায়ানমার|”

“কন্ট্র্যাকটরও আমাদের এই স্পিরিটটা জানে, সেকারণেই … একটু ব্রেক নেবে নাকি? জিপিএস বলছে আমরা টার্গেট থেকে এখনো এরাউন্ড কিলোমিটার পাঁচেক দুরে|”

“সিওর, লেট’স ওয়েইট আ হোয়াইল ফর রান্ডি|”

দেন্দা ফরেস্টের ঘন জঙ্গলে ফাঁকা বা সমতল জায়গা কিছু নেই, জমি এবড়ো-খেবড়ো, ঝরা-পচা পাতার আস্তরণের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বরবরও পাথর গুলোর আয়তন অনুমান করা গেলেও কোথায় গর্ত বা খাদ লুকিয়ে আছে সেটা বোঝা দুষ্কর| প্রকৃতি নিজেই ফাঁদ বিছিয়ে রেখেছে বহির্বাসীর কাজ থেকে নিজের নিরাপত্তার জন্যে|

দেন্দা ফরেস্টের কোনো দাবিদার নেই| স্লোভাক রিপাবলিক, পোল্যান্ড আর ইউক্রেনের মাঝের এই জায়গাটার কোনো খনিজ গুরুত্ব নেই আর তার সাথে দুর্গম| ছন্নছাড়া এই ভুখন্ডে একমাত্র বন্য কিছু সাদা মানুষের বসতি আছে, বলা হয় এরা প্রাচীন বোয়ী জাতির বংশধর| আধুনিক সভ্যতার সাথে এরা পরিচিত থাকলেও এরা বন্য জীবনেই বেশি স্বচ্ছন্দ|

দ্রাহমির দেন্দা ফরেস্টের শেষ বুনোবস্তির বাসিন্দা, এদের দলের সাথে নিজে থেকেই এসেছে| বোঝা কম, তাই কুলি দরকার নেই| জিপিএসের সাহায্যে রাস্তা খুঁজে নেওয়া সহজ, তাই গাইডেরও কোনো প্রয়োজন নেই| কিন্তু দ্রাহমির লোকটি শক্তসমর্থ আর নিজে থেকে কোনো বিনিময়েরও দাবি করে নি – এদের সাথে এমনিই বনের ভিতর যেতে চাইলে সেকারণে নাথানের সামান্য আপত্তি ছাড়া আর কোনো অসুবিধা হয় নি|

সমস্যা একটাই, দ্রাহমির প্রাচীন স্লোভাক ছাড়া আর কোনো ভাষা বোঝে না, কিন্তু লোকটি’র অকপট ব্যবহার আর ইশারা ইঙ্গিতে হৃদ্যতা না হোক, আলাপটা হয়ে গেছে একরকম| ক্বয়ান আর নাথান তাদের ব্যাকপ্যাক রেখে একটা চেতলো পাথরের উপরে বসলে গাছের ফাঁক থেকে দ্রাহমিরও বেরিয়ে এসে হাজির হলো|

“কি খবর দ্রাহমির?”

“নাধের্নি লেইস,” একগাল হেসে দুহাত ছড়িয়ে উত্তর দেয় দ্রাহমির, “বা-আ-য়ে-ঝচ্নি!”

সে  কিছু একটার কারণে খুব খুশি, কিন্তু সেটা কি তা ভাষার অন্তরায়ের কারণে কেউ বুঝতে পারে না|

-*-


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পিতার আশির্বাদ

ফেলুদা নিয়ে ইদানিং কিসব ঝঞ্ঝাট হচ্ছে দেখলাম, ‘কিউ-কিউ’ খিস্তিও করেছে বলে বাজার বেশ গরম|

কিছু কিছু দেখা

আমি বেশি কিছু দেখিনি, কিন্তু কিছু কিছু দেখেছি - খুব ভালো লাগে| সে অনেক দিন আগের কথা ... উহু রুপকথা নয়, আমি তখন তিন চার বছর - কোলাঘাটে থাকি| আমার বাবা বাইকের ডায়নামো ডিসএসেম্বেল করছিলো - ওয়ারিং মনে রাখতে একটা কাগজে এঁকেও রাখছিলো সাথে সাথে| আমিও বাবার দেখা দেখি আরেকটা কাগজে সেই রকম আঁকিবুঁকি করতে শুরু করলাম| বাবা আমার বাহাদুরি দেখে পরের মাসেই আঁকার স্কুলে ভর্তি করে দিলো| সেই স্কুলে কিরকম কি দেখেছি, বেশিরভাগই ভুলে গেছি| তবে আমায় প্রথমেই একটা ইঁদুর আঁকতে দিয়েছিলো সেটা মনে আছে - আর সেটা 'কেন করবো' মনে করে নকল করতে করতে দেখছিলাম পাশে আর একটা বড় ছেলে 'ঘরের মধ্যে পড়তে বসেছে, এরকম একটা ছেলের লাল জামার নিচে সাদা প্যান্টে' আচ্ছা করে সাদা প্যাস্টেলই ঘসছে| আমি বোকার মতো জিজ্ঞাস করলাম 'কাগজেই তো সাদা আছে!' সে আমার বোকামি শুধরে দিলো - 'উহু আরও সাদা করতে হবে|' কিন্তু সেই ছবিতে কমলা ছাদ, খয়েরি বাক্স আর বাইরের কচি-কলাপাতা-সবুজ মাঠের ওপারে গাড় সবুজ ঝোপঝাড় দেখে খুব সুন্দর লেগেছিলো - মনে আছে| তারপর কি হলো জানিনা - মনে নেই আমার - পাঁচ বছর বয়সে বসিরহাট এলাম| ভাড়াব...

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...