সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কেন বন্ধুকৃত্য ভয়ঙ্কর

অনেককাল পরে কদিন আগে আমার এক পুরনো বন্ধু ফোন করলো| সেদিন সকালেই শুনেছিলাম যে তার বাবা মারা গিয়েছেন, তার ফোন পেয়ে প্রথমেই তাকে সমবেদনা জানালাম - আর তার সাথে আশ্চর্য্যও হলাম যে সে এতদিন বাদে এরকম এক পরিস্থিতিতে কেন আমাকে যোগাযোগ করলো|

কুশল বিনিময়ের পরে জানতে পারলাম যে যেহেতু তাকে এই পরিস্থিতিতে বসিরহাটে চলে আসতে হয়েছে, আর সে যে মিডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করে, সেখানে তার অবর্তমানে পুলিশের একটি অনুষ্টানে একটি ৩০ সেকেন্ড ইনফোগ্রাফিকের জন্যে তার আমার সাহায্যের প্রয়োজন| আমার বন্ধু ভিডিও এডিটর, কিন্তু যেহেতু ওটা আমার কাজের বিষয় নয়, তাই আমি তাকে বললাম যে সে যেকোনো সময়ে আমার বাড়ি এসে আমার ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট কানেকশন কাজে লাগিয়ে তার কার্যোদ্ধার করতে পারে| যদি বেচারার দু:সময়ে আমি তাকে কোনভাবে সহায়তা করতে পারি তাহলে তো কোনো ক্ষতি নেই আমার!

বিকাল নাগাদ বন্ধুর অফিস থেকে ফোন এলো - এক অমায়িক ভদ্রলোক বললেন যে আমার বন্ধু আমাকে সহায়তা করবে, সে থাকবে, কিন্তু আসল কাজটা হয়তো আমাকেই করতে হতে পারে| প্রথমত, আমি এককালে কিছু এনিমেশন ও কম্পোজিট-এর চেষ্টা চরিত্র করলেও বর্তমানে পেশাগত স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে ভিডিও, এডিটিং বা এনিমেশন বিষয়ক কোনো কাজ করিনা - দ্বিতীয়ত, জাতি-বিদ্বেষ নয়, পেশাদারী মানসিকতার পার্থক্যের কারণে আমি বাঙালিদের সাথে কাজের ক্ষেত্রে সেরকম স্বচ্ছন্দ নই| তবে ভদ্রলোক পিড়াপিড়ি করতে থাকেন যে যেহেতু এটি পুলিশের কাজ তাতে সময়মতো এটা শেষ না করা গেলে নানারকম সমস্যা দেখা দেবে| তাদের অসুবিধা আমার দেখবার কোনো প্রয়োজন না হলেও, অতীতে দুয়েক-বার দু-হাত-ফেরতা সরকারী কাজের অভিজ্ঞতা ভালো না থাকলেও এবং বর্তমান কর্মব্যস্ততা থাকা সত্বেও বন্ধুর মুখ চেয়ে আমি তাতে সম্মত হই |

ফোন শেষ করার আগে ভদ্রলোক বিনয়ের অবতার হয়ে আমাকে আমার সহায়তা মজুরি একটি অঙ্কের কথা বলেন আর তার সাথে এটাও যোগ করেন যে বাজেট সীমিত কাজেই এই স্বল্প অঙ্কটি তারা আমাকে দয়া করে দিতে পারছেন| যেহেতু এক্ষেত্রে পয়সা নয়, সদ্য পিতৃহীন বন্ধুর হিতাকান্ক্ষাই আমার উদ্দেশ্য ছিল, তাই আমি তাকে বলি যে টাকা-পয়সা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো|

এই ফোন কলের আগে বা পরে বন্ধুর অফিস থেকে সম্ভবত তাদের মালকিনও আমাকে ফোন করেন - বন্ধুর দুশ্চিন্তা আমার দুশ্চিন্তা জেনে উনিও সাধুবাদ জানান|

সন্ধায় বন্ধু আমাদের বাড়ি এসে পৌছয় - তাকে অশৌচ বেশে দেখে আমি ও আমার পরিবার সকলেই সমবেদনা জানাই| তারা একসময়ে আমাদের প্রতিবেশী হওয়া সত্বেও বর্তমানে তাদের পরিবার অন্যত্র থাকে এবং যেহেতু বন্ধু কলকাতায় চাকরিরত কাজেই তার সাথে হয়তো বুছর দুয়েক পরে এইবার দেখা হলো| বন্ধু বয়সে ছোট - এতদিন পরে তাকে দেখে স্নেহ আর শোক দুটোই অনুভব করলাম|

আমি তাকে আমার চেয়ার ছেড়ে দিতে গেলে তার বদলে বন্ধু আমাকে কটি ইউটিউব লিঙ্ক আর একটি ছবি হোয়াটসআপে ট্রান্সফার করলো, যেহেতু হাতে সময় বেশি নেই তাই বেশি কথা বলবারও প্রয়োজন নেই, স্ক্রিপ্ট, স্টোরিবোর্ড এসবও হয়তো সেরকম জরুরি নয় - তবে একটু বিস্ময় জাগলো যখন দেখলাম যে একটা গল্পের বদলে ৬টা বিষয়ের লিস্টি লিখতে হলো আমাকে| আমি বুঝতে পারলাম না যে ৫ সেকেন্ডে মানুষকে কিই বা দেখানো যেতে পারে| এরপরে সে পুরো ব্যাপারটি আমার উপর ছেড়ে দিলো| যাই হোক বন্ধুর মানসিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বেশি বৃত্যান্তে না গিয়ে তাকে বললাম যে আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি আমি| বন্ধুটিও জানায় যে সে তার অফিসে আমার বাঙালিদের সাথে কাজ করবার মানসিক অস্বাচ্চন্দের কথা ইতোমধ্যেই জানিয়ে রেখেছে – তাদের দিক থেকে আমাকে আমার মতো করে কাজটি করতে পারার পূর্ণ আশ্বাস দেয় সে|

সময় সীমিত, আমি ইতোমধ্যে আমার ক্ষমতা ও বিবেচনা অনুযায়ী কাজ শুরু করেছি| সম্ভবত রাত্রে আমাকে তাদের মালকিন আবার ফোন করলেন – যে বিষয় কিছু বেড়েছে| এইসময়ে আমি উপলব্ধি করা শুরু করি যে আসলে কাজ একটা নয় – একাধিক, এবং সহায়তা নয়, পুরো কাজটিই আমাকেই করতে হবে এবং সেটাও বন্ধুর অফিস থেকে বলা সেই স্বল্প অঙ্ক ও সীমিত সময়েই |

যাই হোক বন্ধুর সন্মান ও তার কর্মক্ষেত্রের মুখরখ্যার্থে আমি কিছু একটা বানাবার চেষ্টা করি – যাতে করে সেগুলো একই মানে ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌছিয়ে দেওয়া যেতে পারে| স্বীকার করবেন অবশ্যই যে স্বল্প সময়ে স্বল্প খরচে বাড়ি বানাতে চাইলে সেটা আদপে ঝোপড়াই হবে – অট্টালিকার আশা করা এক্ষেত্রে অলীক – তাই না? যেকারণে আমার বাঙালি মানুষদের সাথে ব্যবসা করার কোনো মানসিকতা অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো দেখা গেলো সেটাই এখানে আবার পুনারাবৃত্ত হলো - সত্যজিত রায় বলে গেছেন যে ‘দেয়ার ইস অলওয়েস স্কোপ ফর ইম্প্রভায়জেষণ|’ সাধারণ ইন্ফগ্রাফিকের বদলে এখানে তারা যেটা আশা করছেন সেটা দাড়ালো ঠিকঠাক টুডি এনিমেশন! যারা বোঝেন না তাদের সুবিধার্থে তুলনা করি – কাগজ ছিঁড়ে বানানো টুকটাক কাটুম-কুটুম আর ক্যানভাসে পেন্টিংএ যা সময় আর সামর্থের পার্থক্য – ব্যাপারটা সেরকমই|

একটায় নয় – যদি ইম্প্রভায়জ করতে হয়, তাহলে এই পরিস্থিতে আমাকে বাকি কাজ গুলিতেও একই মান বজায় রাখতে হবে, যা এই সময়ের ভিতরে করা কখনই সম্ভব নয়| বন্ধুকে বিরক্ত না করে আমি তাদের অফিসে জানাতে বাধ্য হই যে এই স্বল্প সময়ে আকাঙ্খিত মানের এবং দৈর্ঘ্যের সমস্ত কাজ নামিয়ে দেওয়া আমার ক্ষমতার বাইরে - কাজেই আমি এর থেকে অব্যাহতি চাইছি| পরবর্তিতে বন্ধুকে ও তাদের অফিসে সোর্স ফাইল পাঠিয়ে দিই, যাতে তারা সময় থাকতে থাকতে অন্য কোনো স্টুডিও বা কোনো টিমের সাহায্য তাদের প্রত্যাশা মতো কাজটি সম্পূর্ণ করতে পারে| প্রথমতো যেহেতু এই কাজটি থেকে আমার অর্থলাভের প্রত্যাশা ছিল না আর দ্বিতীয়ত যেহেতু কাজটি তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমি শেষ করতেও সমর্থ হইনি, তাই কোনরকম অর্থনৈতিক লেনদেন ছাড়াই আমি সোর্স ফাইল তাদের হস্তান্তর করি|

এসময়ে বন্ধু এবং তাদের অফিস আমাকে বারবার ফোনে অনুরোধ জানাতে থাকে যাতে আমি পুরো কাজগুলি শেষ করি| প্রয়োজন পড়লে আমাকে কিছু বেশি পাইয়ে দেওয়া যেতে পারে! আমি তাদের আবার জানাই – এটা পয়সার কারণে নয় – আমি আমার বন্ধুকে অসময়ে সাহায্য করার জন্যেই করতে মনস্থ করেছিলাম| পরিস্থিতির কারণে আমার বন্ধুর প্রতি সমবেদনা থাকা সত্বেও আমি যেহেতু আমার নিজের ক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আর তার সাথে সাথে তাদের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সন্দিহান, তাই আমার যুক্তিতে অনড় থাকতে চেষ্টা করি|

পিড়াপিড়ির এক পর্যায়ে আমি তাকে জিজ্ঞাস করতে বাধ্য হই যে আমার বন্ধু ভিডিও এডিটর বা কম্পোজিটর, আর এককালে অভিজ্ঞতা থাকলেও আমি ভিডিওর ক্ষেত্রে পেশাদার নই, – কাজেই আমাদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা| এমনটা হওয়া সম্ভব নয় যে আমি যেটা করতে চাইছি সেটা বন্ধু যদি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে থাকতো, তবে সেটা সে করতে পারতো, তারা যদি তাদের লোকবল ছাড়াই কোনো কাজের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন তবে তার দায় কেন আমি বহন করতে যাবো? অনুরোধ ছাড়া আর কোনো যুক্তি তার কাছে খুঁজে পাই নি|

বন্ধুর অফিস থেকে আমাকে এটাও জানানো হয় যে যদি কাজটা সম্পূর্ণ না হয়, তাহলে আমার বন্ধুর চাকরি চলে যাওয়ারও সম্ভাবনা আছে, আর যেহেতু এটি পুলিশের কাজ তাই অফিস শুদ্ধু সবাই গ্রেফতারও হয়ে যেতে পারেন! আমি সহাস্যে তাকে জানাই যে একজন কর্মীর দু:সময়ে অপারকতার কারণে তাকে বরখাস্ত করাটা খুবই উচ্চ মানের কর্মী নীতির পরিচয়|

দুপুরে বন্ধু হোয়াটসআপে যোগাযোগ করলে, আমি তাকে এই কাজে আমার সীমিত ক্ষমতার কথা জানাই| আমি তাকে বারবার অনুরোধ করি যাতে এই কাজ থেকে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয় - কিন্তু সে জেদ ধরে যে সে আমাদের বাড়ি এসে কাজটি সম্পূর্ণ করতে চায়| আমি তাকে সাদরে আহ্বান জানাই – পুর্বপ্রস্তাব মতো তাকে বলি যে সে আমার ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে যা খুশি করতে পারে| তবে স্বাভাবিকভাবেই সে এনিমেশন সম্পর্কে তার অক্ষমতার কথা প্রকাশ করে – তাকে আমি বলি যেহেতু সে ভিডিও এডিটর, কাজেই তার দক্ষতা প্রয়োগ করে কাজটি শেষ করতে কিন্তু সে বার বার দাবি জানাতে থাকে যে ভাবেই হোক যেন কাজটি নামিয়ে দেওয়া যায়|

সন্ধ্যায় একজন আমাকে ফোন করে – তার ধারণা, যেহেতু সে আমায় ইম্প্রোভাইজেসনের লিস্টি ধরিয়েছিলো, আমি সম্ভবত তার উপর বিদ্বেষের কারণে কাজটি করতে চাই নি| আমার বন্ধুর কর্মস্থলের কেউই আমার পূর্বপরিচিত নন – সম্ভবত ফোনের ওপারের মানুষটি বয়কনিষ্ট, কাজেই এরকম একটি অস্বাভবিক প্রশ্নে আমি সামান্য মজা পাই – এবং তাকে আমি উপদেশ দিই যে এরকম পরিস্থিতিতে পুরো কাজটি ঠিকঠাক সময়ে সম্পূর্ণ করতে গেলে দুপক্ষরই একটি মাঝামাঝি জায়গায় আসা প্রয়োজন| সে আমাকে জানায়, যেহেতু এটি পুলিশের কাজ, তাই তাদের সাথে আলোচনা করে একটা মধ্যবস্থা স্থির করতে সে অপারগ ও আতঙ্কিত| আমি তাকে উপদেশ দিই যে তারা কাজ করছে মক্কেলের, মক্কেলের পেশা বা সামাজিক অবস্থান যে কিছুই হতে পারে, কিন্তু আতঙ্কিত না হয়ে আলোচনায় সব কিছুই সমাধান সম্ভব| তাকে আমি আমার কর্মদক্ষতা ও ক্ষমতার সীমা সম্পর্কেও জানাই যার কারণে আমি এই কাজ থেকে অব্যাহতি চাইছি – সে আমার পূর্ব পরিচিত নয়, কাজেই তার উপরে আমার দ্বেষ-ক্ষোভ কোনো কিছুই থাকবার কথা নয়| তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবে কথা বলবার সময়ে কিছু বিবেচনার পরে ঠিক হয় যে সব গুলি নয়, যে কাজটি তাদের পৌঁছে দিয়েছি, সেটিকেই যেন সম্পূর্ণ করে আমি পাঠিয়ে দিই|

মধ্যরাত্রে ছেলেটি আমায় ফোন করে – এক্ষেত্রে সে আমার মতামত জানতে চায় যে এই কাজে পূর্ববর্তী গল্পের পরিবর্তে আরেকটি প্রস্তাবিত গল্প, যা তাদের অফিসে কিছু সময় আগে আলোচনায় স্থির করা হয়েছে, সেটা যদি বানানো যায় তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাড় করানো যেতে পারে| ছেলেটির প্রতি স্নেহবশত এবং আমার পুনর্পুনো বোকামির কারণে আমি তাতেও সম্মত হই| ছেলেটি আমাকে প্রশ্ন করে তার তরফ থেকে আমার কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন আছে কিনা, আমি তাকে দুটি জায়গার রেফারেন্স পাঠাতে বলি – কিন্তু সে বলে যে তার কোনো প্রয়োজন নেই, আমি যেন আমার মতো করে ব্যাপারটা বানিয়ে নিই|

সম্ভবত এর মধ্যে আমাকে মালকিন হোয়াটসআপ মেসেজ করেন, তিনি আমাকে জানান যে তিনিও তার কর্মীর মতই তার মক্কেল, যিনি পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী, তার সাথে ঝগড়া করতে নাচার| তার মেসেজ পড়ে বুঝতে পারি না আলোচনা আর ঝগড়ার মধ্যে পার্থক্য তিনি জানেন কিনা|

তিনি আমাকে আরও প্রলোভন দেখান যে পরবর্তিতে আরো নানা কাজের জন্যে আমাকে বিবেচনা করা হতেই পারে| প্রলোভনে নয়, একজন বয়স্কা মহিলার অনুরোধ এবং ফোন করা ছেলেটির প্রতি স্নেহবশত এবং সর্বোপরি আমার বন্ধুর প্রতি করুনা বশত আমি আবার আগের দিনের সমান পরিশ্রম করে এনিমেশনটির পুনর্নির্মাণ করবার চেষ্টা করি এবং আবার নতুন সোর্স ফাইলটি তাদের পাঠিয়ে দিই|

এবং মালকিনকে জানাই যে বাঙালিদের সাথে আমার কাজ করার কোনদিনই কোনো আগ্রহ নেই, কাজেই তার প্রলোভন আমার কাছে নিরর্থক|

দুপুরে বন্ধু আমাকে ফোন করে বলে যে তাদের অফিসে মক্কেলের জনৈক প্রতিনিধি এসেছেন – প্রদর্শনীর কাজ চলছে – কিন্তু আমার পাঠানো সোর্স ফাইলটি তারা তখনো খুলে উঠতে পারেন নি! লোডশেডিংএর কারণে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ও আমার ল্যাপটপ ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলেও তাদের সমস্যা অনুধাবন করে আমি বৃষ্টির মধ্যে আমার ল্যাপটপ বয়ে নিয়ে আর এক প্রতিবেশী বন্ধুর সরনাপন্ন হই যাতে তাদের প্রদর্শনীর কোনো সমস্যা না হয়|

হোয়াটসআপ চ্যাট চলাকালীন আমার প্রশ্নে সে বলে যে তাকে এই অবস্থাতেও অফিসে আসতে হয়েছে| আগের দিন সে বলেছিলো যে এমন পরিস্থিতিতেও যে সে কাজ করছে তার জন্যে তার কোম্পানির কাছ থেকে তারিফ পাচ্ছে| আমি তার কর্তব্যপরায়নতার আর তার কোম্পানির মহানুভবতার প্রশংসা করেছিলাম| তবে তার সাথে এটা ভেবেও আনন্দ পাচ্ছিলাম যে বেচারার চাকরিটি এখনো টিঁকে আছে|

চমকিত হই যখন শুনি যে মক্কেলের গতদিনের ছেলেটির বলা গল্পের পরিবর্তে আমর পূর্ববর্তী কাজটিই ঠিক লেগেছে, এবং যে জায়গা গুলির রেফারেন্স আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু ছেলেটির অবহেলার কারণে আমি আমার মতো করে সেগুলির কাল্পনিক পুনর্নির্মাণ করতে বাধ্য হই – ঠিক সেগুলিই তাদের বাস্তবসম্মত ভাবে প্রয়োজন| তার কাছে আমি জানতে চাই তাহলে আমার গতকালের পন্ডশ্রমের কি প্রয়োজন ছিল? এর পরে আমার সাথে ছেলেটির আর আমার বন্ধুর কনফারেন্স হয় – সেখানে আরো বিস্ময়ের সঙ্গে শুনি যে আমাকে আর কটি কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ পাঠানো হচ্ছে| আমি যখন প্রশ্ন করি আমাদের আগের কথামতো এগুলি করার দায়িত্ব থেকে আমি ইতোমধ্যেই অব্যাহতি পেয়েছি, তখন তারা সে প্রশ্ন এড়িয়ে বার বার আমাকে অনুরোধ করতে থাকে যাতে আমি সেই কাজগুলিও কোনভাবে করে দিই|

যারা টুডি এনিমেশন নিয়ে কাজ করেছেন, তারা আশা করি জানেন যে এটি একটি টিম ওয়ার্ক, প্রতিটি জিনিষ এখানে আলাদা করে আঁকতে হয় – যারা জানেন না তাদের হয়তো ধারণা আছে যে কম্পিউটারে সবই হয়| সবই হয় ঠিকই কিন্তু যা আপনারা টিভির পর্দায় দেখছেন তার জন্যে কিছু মানুষের পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও অধ্যাবসায় সব সময়ে কাজ করে চলেছে| একটা মানুষের পক্ষেও হয়তো জিনিসটাকে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু উপযুক্ত পরিকল্পনা না থাকলে সাফল্যের দিকে এগোতে থাকা কাজও ব্যর্থ হতে বাধ্য|

কাজের মূল্যায়ন যাই হোক না কেন, যেকোনো কাজেরই গুরুত্ব আছে মানি আমি – তবে এক প্রবাদ মতো পরিকল্পনা করতে ভুল করা মানেই হলো ভুলের জন্যে পরিকল্পনা করা| সেইমতো স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে, সঠিক কাজ নামাতে গেলে যে কঠিন পরিকল্পনা করা দরকার সেটা না করা একটা ভয়ঙ্কর ত্রুটি| আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায় সব মক্কেলের যে কাজ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকবে সেটা আশা করি না কখনই, তবে সব সময়েই চেষ্টাটা থাকে যাতে মক্কেলকে সময় ও খরচের অনুপাতে তার চাহিদা আর বাস্তবতার তুলনামূলক ধারণা দেওয়া যায়| তার পরিবর্তে কেবলমাত্র পেশাগত অবস্থানের আতঙ্কে মক্কেলের সাথে কোনো আলোচনায় না গিয়ে কর্মীদের সাথে কোনো পরামর্শ ছাড়া কেবল চাপ সৃষ্টি করে কাজ করানোর চেষ্টা করাটা সুস্থ মানসিকতা বা মানবিকতার লক্ষণ কখনই নয়| অনিচ্ছুক বা অপারগ মানুষকে অনুরোধে বা ভয় দেখিয়ে চার-পা হয়তো হাঁটানো যায়, কিন্তু তাকে চার মাইল দৌড় করানো কখনই সম্ভব নয়|

প্রতিটি মানুষের ধৈর্য় ও বদান্যতার একটা সীমা আছে – আমিও ব্যতিক্রমী নই| যেহেতু আমার বন্ধু ও তার অফিস আমাকে হয়তো আমার বন্ধুর দুর্দশার কারণে আমার সহমর্মিতার সুযোগ নিয়ে ক্রমাগত একটা অবিশ্বাস্য কাজ করার জন্যে বারংবার অনুরোধ করতে থাকেন – আমার পরিস্থিতি, সীমিত ক্ষমতা ও দক্ষতা সম্পর্কে তারা আমার কোনো বক্তব্যই শুনতে চান না, সেকারণে আমি তাদের সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করি| আমার বন্ধু ও তার সংস্থার প্রতি পূর্ণ সমবেদনা থাকা সত্বেও তাদের কর্ম-সংস্কৃতি ও পেশাদারী দক্ষতা বিষয়ে বিরক্ত হয়ে তাদের সাথে ইমেল, ফেসবুক, হোয়াটসআপ সহ সমস্ত ই-মাধ্যমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হই|

যেহেতু বন্ধুর অফিসের সাথে আমার এই প্রয়াসে কোনো অর্থনৈতিক লেনদেন বা কোনো প্রথাগত চুক্তি হয় নি বা এই কাজে বন্ধুর অফিস থেকে কোনোরকম বৌদ্ধিক বা ডিজিটাল সহায়তা বা উপকরণ পাইনি বা ব্যবহৃত হয় নি এবং সর্বোপরি যেহেতু এই কাজের ধারণা মৌলিক নয়, বরং বহুল প্রচলিত সেকারণে এই দুটি বাতিল ও অসম্পূর্ণ কাজের সম্পূর্ণ সত্বাধিকার স্বাভাবিক ভাবেই আমার| এছাড়া বন্ধুর অফিসের সাথে কোনো গোপনীয়তা চুক্তি না থাকার কারণে ও এই কাজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা গোপনীয় সরকারী, প্রশাসনিক বা সামরিক তথ্য না থাকার কারণে পরবর্তিতে আমি বাতিল কাজ দুটি সাধারণের জন্যে আমার পোর্টফলীয়তে প্রকাশ করি|

এর পরপরই বন্ধুর কোম্পানির তরফ থেকে কেউ একজন আমার পোর্টফোলিওতে কমেন্ট করেন – যেহেতু আমি কাজটি তাদের আদেশানুযায়ী সম্পূর্ণ করতে অস্বীকার করেছি কাজেই তারা আমার ধৃষ্টতায় ক্ষুব্ধ| তারা তাদের ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রয়োগ করতে চলেছেন – তাদের বক্তব্য অনুযায়ী আমি ব্যক্তিগত ভাবে পুলিশকে প্রতারণা করেছি তাই পুলিশের তরফ থেকেও আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যে তারা যথেষ্ট সুপারিশ করবেন|

আমি এটা ভেবে বিস্মিত হই যে কলকাতার মতো এতো বড় শহরে এনিমেটর বা মোশন গ্রাফিক্স আর্টিস্টের কি এতই অভাব ঘটলো যে এতো বড় ও প্রভাবশালী মিডিয়া কোম্পানির আমার মতো নগন্য মফস্বলবাসী অদক্ষ কারিগরের সহায়তা এতই অনিবার্য হয়ে উঠলো যে প্রয়োজনে বলপূর্বক কাজ করানোর জন্যে প্রয়োজনে তারা পুলিশি সহায়তা নিতেও পিছপা হবেন না? এটাও ঠিক বুঝতে পারছি না যে এতো বড় একটা কোম্পানী তাদের তরফ থেকে প্রচুর কর্মী আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন বা করবার চেষ্টা করেছেন – আমার বন্ধুই কি তাদের ভিতর একমাত্র কর্মী যে ভিডিও সম্পর্কিত কাজ করেন? যে কোম্পানী এতো বড় বড় সরকারী প্রজেক্টে কাজ কর্ম করে থাকেন – তারা ব্যাকাপ বা অল্টারনেটিভ কর্মী রাখবার কি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি কোনো দিন? আমি এটা বিশ্বাস করি না যে আমার বন্ধু কোনো ভাবে আমার সাথে শত্রুতা করার কারণে আমাকে এই পরিস্তিতিতে জড়িয়েছে, তবে আমি যদি পেশাদারী নৈতিকতা দুরে সরিয়ে তাকে তার দু:সময়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসি, তারও কি আমার অপারগতা বুঝে বিকল্প বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করা উচিত নয়?

আমার এই জীবনে আমি আমার আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, সহকর্মী নানা বৃত্তে নানা রকমের মানুষ দেখেছি| পেশাগত দিক থেকে বাঙালিদের সাথে আমার মতভেদ থাকলেও বন্ধু হিসাবে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার| গতবছর আমার এক খুব কাছের বন্ধু আমাকে সারাজীবন মনে রাখবার মতো একটি শিক্ষা দিয়েছেন – যারা আমার বন্ধু সকলেই আশা করি কম বেশি সেই ঘটনা জানেন বা শুনেছেন| মানুষ নানা রকমের হন সত্যিই, ভালো খারাপ মিশিয়ে সমাজ – কাজেই প্রতিদিনই নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় সবাইকেই| আর সহমর্মিতা বশত এবার আরেক বন্ধুকৃত্যের প্রতিদান পেলাম – আমার অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকের কাছেই শিক্ষনীয় হতে পারে|

আমার বন্ধু ও তার অফিসের মানুষ ও মালকিনের সন্মান রক্ষার্থে তাদের নাম উল্লেখ থেকে বিরত থাকা হলো|

মন্তব্যসমূহ

  1. Durdanto laglo pore. Ami shobe matro bebsai nemechi ebong apni upore ja ja poristhitir kotha bolechen seigulor sonmukhin hote hocche, apnar obhigotta ta pore khub e bhalo laglo.

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্যলোকের মেসেজ

 ১ “নমস্কার, মোবিকমে আপনাকে স্বাগত| আমি শুভ্রা – আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” “নমস্কার নমস্কার – আমার নাম দেবাংশু লাহিড়ি, আমার নম্বর … মানে এটাই, যেটা থেকে আপনাকে কল করছি|” “হ্যা বলুন …” “দেখুন, আমার সমস্যা হলো – কদিন থেকে আমার মোবাইলে অনবরত মেসেজ ঢুকছে|” “আচ্ছা?” “হ্যা – মানে কোনো মাথামুন্ডু নেই – যতসব হিজিবিজি|” “আচ্ছা? কোনো বিশেষ নম্বর থেকে, নাকি …?” “না, নম্বর বা সেরকম কিছু নয়” “আচ্ছা, বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনাল মেসেজ যেরকম? মানে মেসেজে কি থাকছে আমাকে জানাতে পারেন কি? তাহলে …” “না না, কোম্পানির মেসেজ যেমন কোনো লেখা থেকে আসে, নম্বর থেকে নয় – সেরকমও না কিন্তু| মানে পুরোটাই হিজিবিজি ধরনের – এ বি সি ডি এক দুই তিন চার – এরকম …” “আচ্ছা?” “ … ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে, মানে আপনাকে বোঝাতে পারছি না – যখন মেসেজ ঢোকা শুরু হচ্ছে তখন পাগল হয়ে যাওয়ার দশা!” “আচ্ছা? স্যার – আপনি একটু হোল্ড করবেন প্লিজ? তাহলে আমি আমাদের সিস্টেমে চেক করে আপনাকে জানাতে পারতাম আপনার নাম্বারে কোনো ভ্যাস এক্টিভেটেড আছে কিনা?” “সিওর সিওর – আমি ধরছি|” মোবাইলের ওপারে গান বাজনার আওয়াজ শুনতে শুনতে দেবাংশুবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যাল...

দেন্দা

 “খ্র্যা-আ-আ-” ঘাড় ঘুরিয়েই নিচু স্বরে গর্জন করে উঠলো শিম্পাঞ্জিটা! রনদীপ পেশাদার খুনে, কিন্তু এরকম আচমকা প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরী ছিল না সে| চমকে গেলেও এক মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলো সে| আর তাছাড়া তাদের অনুসরণকারী জীবটি যে মনুষ্যেতর, সেটা জানতে পেরেও তার স্বস্তি হলো অনেকখানি| শিম্পাঞ্জিটা লম্বায় ফুটচারেক, সাধারনের থেকে উচ্চতা সামান্য একটু বেশিই, সেকারণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তাকে মানুষ বলেই প্রায় ভুল করেছিলো সে| তার জন্যেই হাতের কম্যান্ডো নাইফটা এখনো তাক করা আছে তার দিকেই| শিম্পাঞ্জিটার নজর দ্রুত রনদীপের চোখ আর তার হাতের ছুরির দিকে যাতায়াত করতে করতে কি একটা হিসাব করছিলো| “শ্র্সস-ক্রর-র-র” ওয়াকিটকির ইয়ারফোনটা সরব হয়ে উঠলো, “ক্বয়ান টু রান্ডি, ক্বয়ান টু রান্ডি, ডু ইউ কপি? তোমার লোকেশন বলো, ওভার|” রনদীপ খানিক সময় দলছাড়া, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলেছে যে কিছু একটা তাদের দলটাকে শেষ আধ ঘন্টা ধরে অনুসরণ করছে, কাজেই ঘুরপথে এসে সে আপাতত সেই অনুসরণকারীর সামনাসামনি| কিন্তু তার অনুপস্থিতি তার দল টের পাওয়ার কারণে টিম লিডার ক্বয়ান জিমের সাথে ওয়াকিটকিতে এর মধ্যে তার বেশ কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে| শিম্পাঞ্জিট...

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...