সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমার পড়া প্রথম ইন্দ্রজাল কমিকস

আমি অনেক ছোটবেলায় লিখতে পড়তে শিখি - যখন আমার চার-পাঁচ বছর বয়স সে সময়ে আমি নিজের চেষ্টা আর ইচ্ছেতেই একাএকাই আমার পরিচিত শিশুপাঠ্য বইপত্তর পড়তে পারতাম এবং সবথেকে বড় কথা হলো ব্যাট-বলের বদলে সেই বই গুলিই আমার কাছে অনেক প্রিয় ছিল| বাবা'র বদলি'র চাকরি ছিল, কাজেই ছ'বছর বয়সে যখন আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই, থিতু হওয়ার প্রয়োজনে আমি আর আমার মা তখন আমাদের এই শহরেই পাকাপাকি ভাবে বাস করতে শুরু করি| বাবা থাকতেন দুরে - বিহারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাঁধ-বাঁধা'র দায়িত্বে| বাড়ি ফিরতেন পনেরো দিনে বা মাসে একবার করে| অন্যান্য শিশুদের মতন আমার বাবা ফেরার সময়ে কোনো উপহারের চাহিদা থাকতো না - বাবা নিজে যে সশরীরে আমাদের কাছে আসছেন - সেটারই গুরুত্ব ছিল সবথেকে বেশি|
সেইরকম একবার যখন বাবা বাড়ি ফিরলেন, সেবার আমার জন্যে দুটি ইন্দ্রজাল কমিকস এনেছিলেন - একটি বেতালের 'রানী শিবা'র কন্ঠহার' আর দ্বিতীয়টি ম্যানড্রেকের 'ডাইনি'র বাঁশি' - ছবিতে গল্প পড়েছিলাম নাকি গল্পের ছবি দেখেছিলাম সে অভিজ্ঞতা কালের নিয়মে ঝাপসা, কিন্তু অনুভুতি এখনো মনে করিয়ে দেয় যে সেইসময়ে আমি একটি অন্য দুনিয়া'র রাস্তা খুঁজে পেয়েছিলাম| দেখেছিলাম একজন মুখোশ-ধারী কিভাবে অমিত বাহুবলে আর এক জাদুকর কিভাবে তার চমকপ্রদ সম্মোহনের মায়াজালে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করছে|

সেটা ছিল ১৯৮৪ - স্বাভাবিক ভাবেই আজকের ই-মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত তখন অলীক কল্পনা| বাড়িতে একটি টেলিভিশন ছিল বটে, কিন্তু আমার শিশুমনে তার প্রতি কোনো আকর্ষণ আমার ছিল না| দিল্লি দূরদর্শনের সম্প্রচারে 'টম এন্ড জেরি' দুরের কথা 'জনি সকো'ও দেখেছিলাম তার দুয়েক বছর পরে| টিভিতে তখন ছবি 'ফুরিয়ে' যেত| কিন্তু ঐ দুটি বই আমি বহুবার পড়েছি - সে এমনি এক মাধ্যম যার 'একশন রিপ্লে' সম্ভব| যে প্যানেল ভালো লাগলো তাকে অনেক্ষণ ধরে দেখা যায়, যেটা ভাল্লাগছেনা, সেটা থেকে চোখ সরিয়ে তার পরের জায়গায় যাওয়া যায়| কাজেই পাতলা দুটি বই সেদুটি আমার কাছে সব থেকে প্রিয় হয়ে দাড়ালো|

আমার পড়া প্রথম কমিকস ইন্দ্রজাল কমিকস নয় - সেটি ছিল কোনো এক অমর চিত্রকথা - রুপকথা'র কমিকস, এক রাজা রানী আর এক টিয়াপাখি'র গল্প ছিল তাতে - বইটির নাম আমার মনে নেই আমার প্রথম পড়তে শেখা উপলক্ষ্যে আমার মা আমাকে কিনে দিয়েছিলেন আমার পাঁচ বছর বয়সের জন্মদিনে| তবে তখন আমার কাছে সেটি 'কিরকম যেনো একটা' ছিল - আলাদা করে ভালো লাগতো না, বার বার পড়তে টানত না - বা বালিশের পাশে নিয়ে ঘুমুতেও ইচ্ছা করতো না| কিন্তু এখন অনুভব করি ডাইনি'র বাঁশি বা রানী শিবা'র কন্ঠহার তার গল্প ও ছবিতে যা মশলা ছিল টা আমার শিশুমনকে প্রচুর আকৃষ্ট করেছিলো| কোথায় গতদিন যেনো পড়লাম যে শিশু'রা না বুঝেই অনেক নিষ্ঠুর হয় - বিভত্সতা না থাকলেও বেতালের গল্পের মারামারি'র ছবি বা ম্যানড্রেকের জাদুর পাশাপাশি নার্দার স্বল্পবাস অনেক বেশি আকৃষ্ট করতো আমাকে| আমি জীবনে প্রথম বিকিনি পড়া মহিলা বলতে নর্দা আর কার্মাকেই অনেক সংকোচ ভরে দেখেছি|

সব থেকে দু:খের বিষয় 'রানী শিবা'র কন্ঠহার' আর 'ডাইনি'র বাঁশি' এ দুটিই দুই সংখ্যায় সমাপ্য বইয়ের প্রথম পর্ব গুলি ছিল, কাজেই পরবর্তী পক্ষকালে বাবা অনুপস্থিত থাকতে মাকেই আমার আবদার মেটাতে হয়| আমার বাবার পড়ার নেশা ছিল সাংঘাতিক - মায়ের আগে সুযোগ না থাকলেও বাবা'র থেকে এ নেশা মায়েরঅ সংক্রমিত হয়ে পরে - স্বাভাবিক ভাবে জিনগত কারণে আমিও এর থেকে নিস্তার পাইনি - এর পরে পরেই আমার জন্যে মাসিক শুকতারার বন্দোবস্ত হয় এবং যেহেতু তখন আমাদের কাগজ সরবরাহকারী'র কাছে ইন্দ্রজাল কমিকসের বিপননের ব্যবস্থা ছিল না কাজেই সে দায়ত্ব বাবাই পক্ষান্তে বা মাসান্তে নিয়ে নেন| ইন্দ্রজাল কমিকস আমি প্রায় ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত নিয়েছি আর পরবর্তী কালে ৮৪'র আগের অনেক ইসু পুরনো বইএর দোকান এমনকি ঠোঙ্গা-ওয়ালার কাছ থেকেও সংগ্রহ করেছি| বন্ধুদের কল্যানে সেই সংগ্রহ আজ তলানিতে এসে থেকেছে|

অধুনা মুনস্টোন বা ডিনামাইট-এর অরন্যদেব পড়েছি, ইন্টারনেটের বদান্যতায় আর আমার পেশা'র কল্যানে ফান্তমের কমিকস আঁকতেন বা আঁকেন এমন কজন শিল্পী'র সাথেও আমার আলাপের সৌভাগ্য ঘটেছে - কিন্তু ছেলেবেলা'র সেই সোনালী দুপুরে ছাদের কনে বসে কমিকস পড়া'র উত্তেজনা এখন বয়সের কারণে স্বাভাবিক ভাবেই পাইনা| নতুন গল্প সেই পুরনো আমলের স্বাদ দিতে পারে না - যেটা অনেকটা কল্পনা'র রাজত্ব ছিল সেখানে টেকনোলজি'র দাপাদাপিতে মনে হয় 'এমন না হওয়াটাই অস্বাভাবিক'|

তবুও যদি বইয়ের তাক ঝাড়-পঞ্ছ করতে গিয়ে একটা ছেঁড়া মলাটের কনা বেরিয়ে আসে একটি কুকুর বলে ভ্রম করা নেকড়ে'র মুখের খানি অংশ দেখা যাচ্ছে, বা একটা পিছনের মলাট যেখানে কোনো অনাস্বাদিত হয়তো-বা-দেবভোগ্য বাবল-গামের বিজ্ঞাপন আছে - মনটা সেই ফেলে আসা দিনগুলির জন্যে হাহাকার করে ওঠে| তাক হাতড়ে বের করে ফেলি একটা ইন্দ্রজাল কমিকসের বাঁধানো গোছা - একটা দুটো গল্প শেষ হয় - তারপরে লেখা থাকে 'পরবর্তী সংখ্যায় অমুকের অমুক গল্প' বা '২য পর্ব আগামী সংখ্যায়' - ভাবি যে কেন বড় হলাম|

...

এই লেখাটি বাংলায় ইন্দ্রজাল কমিকস পাওয়া যায় এমন একটি ব্লগের কমেন্ট হিসাবে লেখা| দুখের বিষয় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বশত ওখানে এটি পোস্ট করা সম্ভব হয় নি, কাজেই প্রথমে এটি ফেসবুকে নোট হিসাবে পোস্ট করেছিলাম - ফেসবুকের বন্ধুদের বাইরেও আমার ছোটবেলার প্রথম ইন্দ্রজাল কমিকস পড়া'র অনুভুতি আমার মতো অনেক মানুষের সাথেই মেলে - কাজেই আশা করি সমবয়স্ক ও সমমনস্ক অনেকেই এই লেখাটি উপভোগ করবেন|

মন্তব্যসমূহ

  1. অনেকটাই মিলে গেছে।
    পুনরাব্রিত্তিঃ ১৯৭৭ -১৯৮০। পাঁচ পয়সা - দশ পয়সা করে জমাতাম। এক টাকা জমাতে পারলেই নতুন ইন্দ্রজাল কমিকস কিনতে ছুটতাম। পঞ্চাশ পয়সায় পেতাম পুরনো কমক্স। দিশি - বিদেশি অনেক কমিক্স জমিয়েছিলাম।
    অধিকাংশই বড় একটা ট্রাঙ্কে রাখা ছিল। বাবার ট্রান্সফারের চাকরি ছিল। শিফটিঙ্গের সময় হারিয়ে যায় আমার গুপ্ত ধন। কিছু আমার সাথে থাকায় বেঁচে যায়। এখনো আছে। আমি ৫৭ পার করেছি। এখনো আমি কমিক্স কালেশন করি এবং পড়ি, তবে বেশিটাই সফট ফর্মে। আপনার কাজ এবং পোস্ট গুলো আমার অত্যন্ত প্রিয়। পুরনো স্ম্রিতি মনে করিয়ে দিলেন। মন্টা কিছুটা ভারাক্রান্ত হলেও ভাল লাগে যখন দেখি আপনাদের কাজ গুলো। মন খারাপ লাগলেই ঢুকে পরি আপনার মত অনেকের টাইম লাইনেে। আপনারাই আমার ভাল থাকার, ভাল সম্য কাটানোর মাধ্যম।
    আবারও বলি, ভাল থাবেন বন্ধু। আরও অনেক ভাল ভাল কাজ করে যান। ভাল থাকবেন শুভেচ্ছা রইল। ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্যলোকের মেসেজ

 ১ “নমস্কার, মোবিকমে আপনাকে স্বাগত| আমি শুভ্রা – আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” “নমস্কার নমস্কার – আমার নাম দেবাংশু লাহিড়ি, আমার নম্বর … মানে এটাই, যেটা থেকে আপনাকে কল করছি|” “হ্যা বলুন …” “দেখুন, আমার সমস্যা হলো – কদিন থেকে আমার মোবাইলে অনবরত মেসেজ ঢুকছে|” “আচ্ছা?” “হ্যা – মানে কোনো মাথামুন্ডু নেই – যতসব হিজিবিজি|” “আচ্ছা? কোনো বিশেষ নম্বর থেকে, নাকি …?” “না, নম্বর বা সেরকম কিছু নয়” “আচ্ছা, বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনাল মেসেজ যেরকম? মানে মেসেজে কি থাকছে আমাকে জানাতে পারেন কি? তাহলে …” “না না, কোম্পানির মেসেজ যেমন কোনো লেখা থেকে আসে, নম্বর থেকে নয় – সেরকমও না কিন্তু| মানে পুরোটাই হিজিবিজি ধরনের – এ বি সি ডি এক দুই তিন চার – এরকম …” “আচ্ছা?” “ … ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে, মানে আপনাকে বোঝাতে পারছি না – যখন মেসেজ ঢোকা শুরু হচ্ছে তখন পাগল হয়ে যাওয়ার দশা!” “আচ্ছা? স্যার – আপনি একটু হোল্ড করবেন প্লিজ? তাহলে আমি আমাদের সিস্টেমে চেক করে আপনাকে জানাতে পারতাম আপনার নাম্বারে কোনো ভ্যাস এক্টিভেটেড আছে কিনা?” “সিওর সিওর – আমি ধরছি|” মোবাইলের ওপারে গান বাজনার আওয়াজ শুনতে শুনতে দেবাংশুবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যাল...

দেন্দা

 “খ্র্যা-আ-আ-” ঘাড় ঘুরিয়েই নিচু স্বরে গর্জন করে উঠলো শিম্পাঞ্জিটা! রনদীপ পেশাদার খুনে, কিন্তু এরকম আচমকা প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরী ছিল না সে| চমকে গেলেও এক মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলো সে| আর তাছাড়া তাদের অনুসরণকারী জীবটি যে মনুষ্যেতর, সেটা জানতে পেরেও তার স্বস্তি হলো অনেকখানি| শিম্পাঞ্জিটা লম্বায় ফুটচারেক, সাধারনের থেকে উচ্চতা সামান্য একটু বেশিই, সেকারণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তাকে মানুষ বলেই প্রায় ভুল করেছিলো সে| তার জন্যেই হাতের কম্যান্ডো নাইফটা এখনো তাক করা আছে তার দিকেই| শিম্পাঞ্জিটার নজর দ্রুত রনদীপের চোখ আর তার হাতের ছুরির দিকে যাতায়াত করতে করতে কি একটা হিসাব করছিলো| “শ্র্সস-ক্রর-র-র” ওয়াকিটকির ইয়ারফোনটা সরব হয়ে উঠলো, “ক্বয়ান টু রান্ডি, ক্বয়ান টু রান্ডি, ডু ইউ কপি? তোমার লোকেশন বলো, ওভার|” রনদীপ খানিক সময় দলছাড়া, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলেছে যে কিছু একটা তাদের দলটাকে শেষ আধ ঘন্টা ধরে অনুসরণ করছে, কাজেই ঘুরপথে এসে সে আপাতত সেই অনুসরণকারীর সামনাসামনি| কিন্তু তার অনুপস্থিতি তার দল টের পাওয়ার কারণে টিম লিডার ক্বয়ান জিমের সাথে ওয়াকিটকিতে এর মধ্যে তার বেশ কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে| শিম্পাঞ্জিট...

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...