“হেল্লো-ও-ও-ও!”
অনেক সময় অপেক্ষা করলো লোকটা, দূর থেকে যা দেখে মনে হচ্ছে সামনের ঝুপড়িটায় কেউ বা কারা বাস করে| সারা উপত্যকা ঘুরে আগন্তুকের চিত্কার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফের তার কাছেই ফিরে এলো| কিন্তু ঝুপড়িটার ভিতর থেকে কোনো সাড়া এলো না|
২০৩২এ মানুষ খুঁজে পাওয়া সেরকম সহজ কাজ নয়, ২০২৭এর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে মানব সভ্যতা তো বটেই, তার সাথে সমস্ত প্রাণীজগতই একরকম বিলুপ্তপ্রায়| যুদ্ধের প্রাবল্যে এবং তার দরুন উত্পন্ন কৃত্রিম প্রাকৃতিক দুর্যোগে পৃথিবীর পরিবেশের ও প্রকৃতির নানা অদলবদল ঘটেছে| মানুষ যে নেই তা বলা চলে না, ঘটনাক্রমে তেজস্ক্রিয়তা এড়িয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য যাদের ঘটেছে, তারা এখনো টিঁকে আছে কোথাও কোথাও|
এলুমিনিয়ামের পাইপ, টারপোলিন, পিভিসি বোর্ড আর এটাসেটা নানা হাবিজাবি জিনিষ দিয়ে বানানো ঝুপড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছে এটা যুদ্ধপরবর্তী কালে সেরকমই কোনো টিকে থাকা মানুষের বাসস্থান|
লোকটা আবার হাঁক দিলে, “কেউ আছেন?”
এবারও কোনো উত্তর এলো না|
লোকটা খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঝুপড়িটা ও তার চারদিক দেখছিলো| একটা টিলা মতো জায়গায়, মাটি থেকে প্রায় দোতলা উঁচুতে এক ঘরের মতো একটা ব্যবস্থা, টিলার সামনেটা প্রায় খাঁড়া উঠে গেছে, উপরে উঠবার রাস্তাটা আছে একপাশ দিয়ে| হঠাৎ করে দেখলে জায়গাটা মানুষের বাসস্থান বলে মনে হয় না কোনভাবেই, কিন্তু লোকটার অভিজ্ঞ চোখে যা ধরা পড়ছে তাতে করে রড-প্লাস্টিক-পলিথিনের এই স্তুপটা মানুষের তৈরী না হয়ে যায় না| নিশ্চই কেউ এটা বানিয়েছে – এবং সেটা এমনি এমনি না|
কাঁধের থলেটা ঝাকিয়ে একটু সুবিধা মতো অবস্থানে নিয়ে সামান্য দোনামনা করে পাশের ঢালু রাস্তাটা ধরলো লোকটা|
প্রায় ঝুপড়িটার কাছাকাছি চলে এসেছে সে এমন সময়ে হঠাৎ তার পায়ের সামনে মাটিতে একটা তীর এসে বিঁধলো| কোন দেখলে বোঝা যায় সেটা ঝুপড়ি থেকে নয়, টিলার উপরের ডানদিকের একটা গাছ থেকে কেউ ছুঁড়েছে|
এরকম পরিস্থিতির সাথে লোকটার পরিচয় আছে, সে দুহাত উপরে তুলে বললো, “বন্ধু|”
প্রায় আধমিনিট পরে গাছের ডালে আর পাতায় সামান্য আলোড়ন শোনা গেলো| সময়টুকু ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলো সে, কারণ সে জানে যে এসময়ে তার সামান্য নড়াচড়া তার জীবনের বিপক্ষে যেতে পারে|
পায়ের শব্দটা কাছাকাছি আসতে সে আবার দুহাত উচু করে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বললো, “রোকখে! বন্ধু|”
“থলেটা মাটিতে রেখে এপাশে সরিয়ে দিন|”
নির্দেশমতো লোকটা তাই করলো|
“অস্ত্রগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখুন|”
একটা ছোট্ট নিঃস্বাস ফেলে লোকটা তার জামার পিছন থেকে একটা লোহার পাতি ঘষে বানানো ভোজালি বের করে তার পায়ের কাছে মাটিতে নামিয়ে রাখলো, তারপরে বাঁ পায়ের ছোট্ট লাথিতে সেটা তার ডানদিকে সরিয়ে দিলো|
এইবার সামনে এলো সেই মানুষটি| খুব ধীরে সুস্থে দুজন দুজনকে মেপে নিলো কিছু সময়| আগন্তুক বাতাসে কিসের একটা গন্ধ পেলো|
“আমি পরেশ, পরেশ সরকার … পুবদিক থেকে আসছি| যুদ্ধের আগে একটা গাড়ির কোম্পানিতে চাকরি করতাম, ফাইনান্সের কাজ|”
“এদিকে কেন?”
“জানেনই তো| ওদিকে কিছুই নেই আর, তাই ভাবলাম যদি …”
“যুদ্ধ থেকে বাঁচলেন কি করে?”
“বোম পড়ার সময় ছিলাম না তখন, যখন ফিরলাম …” একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেললো লোকটা| “আপনি?”
“অতনু হালদার|”
“এখানকারই?”
“একরকম|” উত্তর একটু এড়িয়ে গেলো দ্বিতীয়জন|
ঝুপড়ির সামনে তারা দুজনে মাটিতে বসে কথা বলছিলো| পরেশের ঝোলা আর ভোজালিটা অতনুর কাছাকাছি রাখা আছে| ধনুকটা এখন অতনুর কোলে শুয়ে থাকলেও একটা তীর ছিলায় লাগানো|
“তা এদিকে কি মনে করে?”
“ঘুরতে ঘুরতে,” সামান্য হাসলো পরেশ, “পেটের দায়ে বলতে পারেন| ওদিকে তো আর কিছুই নেই|”
“গাছপালা? খাবার দাবার?”
“নাঃ – সব শেষ! মাটির অবস্থা খারাপ, মনে হয়না আর কোনদিন ওদিকে একটা ঘাস অব্দি গজাবে|”
“এতদিন কি করে চালালেন?”
“খুঁটে খেয়ে|” হাসলো পরেশ, “ওদিকে আর কিছু নেই, তাই বেরিয়ে পড়লাম| আপনি একাই থাকেন?”
“হু” সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় অতনু, কিন্তু উত্তর দেওয়ার সময়ে তার দৃষ্টি একবার ঝুপড়ির দিকে চলে যায়|
সেটা নজর এড়ায় না পরেশের, তার নাকের পাটা একবার ফুলে ওঠে – বাতাসে কিসের একটা গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করে সে|
“খাবার-দাবার?”
“চলে যায়| শাকপাতা, মাঝে মাঝে ইঁদুর|”
লোভে চকচক করে ওঠে পরেশের চোখ, “জন্তু জানোয়ার আছে এখনো?”
“পাওয়া যায় মাঝে মাঝে|” বেশি উত্সাহ দেখায় না অতনু, “তা … যাবেন কোনদিকে?”
“ঠিক নেই – চলতে চলতে এখানে তো চলে এলাম, এদিকেই যদি …” আনমনে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ছোট পাথর নিয়ে নাড়াচাড়া করে পরেশ|
“এগিয়ে যান, আরো পশ্চিমে ভালো জায়গা পেয়ে যেতে পারেন|” কথার সুরে বোঝা যায়, এখানে থানা গাড়তে পারবে না সে|
“আচ্ছা? তো আপনি … আপনি?”
“আমি এখানেই ঠিক আছি| চলে যাচ্ছে কোনভাবে – ঠিক আছে?”
“হুম, বেশ – একটু জল খাওয়াতে পারেন? আছে?”
“ওদিকে একটা নালা আছে – ওখান থেকেই খেতে হবে, আমিও ওখানেই যাই তেষ্টা পেলে|” হাতের তীর-ধনুক উঁচু করে পশ্চিম দিকে দেখালো অতনু|
“আচ্ছা আচ্ছা| আর ঝুপড়িতে কি আছে?” হঠাৎ প্রশ্ন করে পরেশ|
“যান – উঠুন!” একরকম ধমকে পরেশের দিকে তীর বাগাতে যায় অতনু, কিন্তু তার আগেই পরেশ তার হাতের পাথরটা ছুঁড়ে মারে তার দিকে|
রগে আচমকা চোট পেয়ে অতনু একপাশে টলে পড়ে, লাফিয়ে উঠে এক লাথিতে তার হাত থেকে ধনুকটা ফেলে দেয় পরেশ| তারপর ঘাড়ের পাশে একটা রদ্দা মারতেই অতনু জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে|
পরেশ হাতের ভোজালিটা নিয়ে সংজ্ঞাহীন অতনুকে দেখছিলো| ‘শত্রুর শেষ রাখতে নেই!’ কিন্তু তার মন পড়ে আছে অতনুর ঝুপড়ির দিকে| কোন কাজটা আগে করবে সে?
দোনামনা করতে সামান্য একটু দেরি হয়েছিল, তার মধ্যেই প্রথম তীরটা তার ডানকাঁধ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো| চকিতে ঝুপড়ির দরজার দিকে ঘুরতেই দ্বিতীয় তীর এসে বিঁধলো তার বুকের মাঝখানে|
এর মধ্যেই জ্ঞান ফিরে পেয়েছে অতনু| ঘাড়ের পিছনে অতনুর হাতে ধরে থাকা তীরটা পুঁতে গেলো, চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগে সে দেখলো যে ঝুপড়ির দরজায় ঝুলে থাকা পর্দাটা নড়ে উঠলো – আর তার সাথে সেই গন্ধটা আরেকবার ঝলকে উঠলো তার নাকে| মেয়েলি ফেরোমন, অনেকদিন যে গন্ধ পায়নি পরেশ|
“একাই মনে হচ্ছে - না?” মেয়েটা কাঁপছিলো তখনো|
“হুম, তবে বলা যায় না … পুব দিক থেকে আসছে বলছিলো, ওদিকে আরো মানুষ আছে কি না কে জানে|” পরেশের লাশটাকে টানতে টানতে ঝুপড়ির ভিতর ঢোকালো অতনু, “ভয়ের কি আছে?”
“না, ভয় পাইনি| তবে তোমায় যখন মারলো …”
“আচমকা – আমিও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম|”
লাশটাকে মেঝেতে নামিয়ে ঝুপড়ির পিছনের দেওয়ালে একটা দরজা খোলে অতনু| মেয়েটা পরেশের থলেটা খুলে কৌতহল ভরে দেখতে থাকে|
“আরে – রাখোনা! ওগুলো পালিয়ে যাচ্ছে না, এটার ব্যবস্থা করতে হবে আগে|” ধমকে ওঠে অতনু|
থলেটা ফেলে এবার মেয়েটা অতনুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে| তারা দুজনে পরেশের লাশটাকে ধরাধরি করে ঐ দরজার পিছনের একটা সিঁড়ি দিয়ে নামায়| নিচে নিকষ কালো অন্ধকার, তার ভিতরে অভ্যস্ত পদক্ষেপে নামতে থাকে তারা|
তিনতলা নামবার পরে থামে তারা| লাশটাকে মাটিতে নামিয়ে দুজনেই হাঁফাতে থাকে| মেয়েটির নিঃস্বাস অতনুর থেকেও কাতর|
“কষ্ট হচ্ছে সোনা?”
“না – তোমার?”
“ঠিক আছি| কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?”
“ধ্যাত! সবে তো দু-মাস! এর মধ্যে?” অন্ধকারে দেখা না গেলেও বোঝা যায় সোনার গাল লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে|
“ওঠবার সময়ে অসুবিধা হবে না তো?”
“না না – ভেবো না| আলোটা জ্বালবো?”
“এই না! একদম না, ব্যাটারি শেষ করতে চাও, নাকি?”
অতনু এবার পরেশের মৃতদেহ থেকে তার পোশাক-আশাক খুলে নিয়ে সোনার হাতে দেয়| সোনা সেগুলো যত্ন করে ভাঁজ করে পাশে একটা বড় বাক্সের ভিতরে রাখে|
“জুতোটা ভালো, কিন্তু আমার পায়ে বড় হবে|” খুঁতখুঁত করে অতনু|
ঘরটার ভিতরে আর একটা দরজা খোলে সে, ‘ঘটাং’ করে একটা ধাতব শব্দ হয় আর তার সাথে এক ঝলক হিমেল ঝাপটা এসে পড়ে তাদের গায়ে| অতনু আর সোনা এবার পরেশের লাশটাকে টেনে সেই ছোট ঘরটার ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়|
“আমি কিছু খাবার আনি?” দরজা খোলা ফ্রিজটাকে সবসময়ে এড়িয়ে যেতে চায় সোনা|
“আটটা হলো, তবে পুবদিক থেকে এই প্রথম|” খুব যত্ন করে টিনের খাবার খাচ্ছিল তারা|
দোতলায় অন্ধকার অনেকটা কম, এখন সুপারমার্কেটের লম্বা শেলফগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে|
“যা আছে বছর পাঁচেক চলে যাবে|” সেদিকে তাকিয়ে বললো সোনা| “ভাগ্যিস জায়গাটা খুঁজে পেয়েছিলে!”
“তার মধ্যে আমাদের অভ্যেস করে নিতে হবে| বাচ্চাটাকেও …”
অনেক সময় অপেক্ষা করলো লোকটা, দূর থেকে যা দেখে মনে হচ্ছে সামনের ঝুপড়িটায় কেউ বা কারা বাস করে| সারা উপত্যকা ঘুরে আগন্তুকের চিত্কার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফের তার কাছেই ফিরে এলো| কিন্তু ঝুপড়িটার ভিতর থেকে কোনো সাড়া এলো না|
২০৩২এ মানুষ খুঁজে পাওয়া সেরকম সহজ কাজ নয়, ২০২৭এর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে মানব সভ্যতা তো বটেই, তার সাথে সমস্ত প্রাণীজগতই একরকম বিলুপ্তপ্রায়| যুদ্ধের প্রাবল্যে এবং তার দরুন উত্পন্ন কৃত্রিম প্রাকৃতিক দুর্যোগে পৃথিবীর পরিবেশের ও প্রকৃতির নানা অদলবদল ঘটেছে| মানুষ যে নেই তা বলা চলে না, ঘটনাক্রমে তেজস্ক্রিয়তা এড়িয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য যাদের ঘটেছে, তারা এখনো টিঁকে আছে কোথাও কোথাও|
এলুমিনিয়ামের পাইপ, টারপোলিন, পিভিসি বোর্ড আর এটাসেটা নানা হাবিজাবি জিনিষ দিয়ে বানানো ঝুপড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছে এটা যুদ্ধপরবর্তী কালে সেরকমই কোনো টিকে থাকা মানুষের বাসস্থান|
লোকটা আবার হাঁক দিলে, “কেউ আছেন?”
এবারও কোনো উত্তর এলো না|
লোকটা খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঝুপড়িটা ও তার চারদিক দেখছিলো| একটা টিলা মতো জায়গায়, মাটি থেকে প্রায় দোতলা উঁচুতে এক ঘরের মতো একটা ব্যবস্থা, টিলার সামনেটা প্রায় খাঁড়া উঠে গেছে, উপরে উঠবার রাস্তাটা আছে একপাশ দিয়ে| হঠাৎ করে দেখলে জায়গাটা মানুষের বাসস্থান বলে মনে হয় না কোনভাবেই, কিন্তু লোকটার অভিজ্ঞ চোখে যা ধরা পড়ছে তাতে করে রড-প্লাস্টিক-পলিথিনের এই স্তুপটা মানুষের তৈরী না হয়ে যায় না| নিশ্চই কেউ এটা বানিয়েছে – এবং সেটা এমনি এমনি না|
কাঁধের থলেটা ঝাকিয়ে একটু সুবিধা মতো অবস্থানে নিয়ে সামান্য দোনামনা করে পাশের ঢালু রাস্তাটা ধরলো লোকটা|
প্রায় ঝুপড়িটার কাছাকাছি চলে এসেছে সে এমন সময়ে হঠাৎ তার পায়ের সামনে মাটিতে একটা তীর এসে বিঁধলো| কোন দেখলে বোঝা যায় সেটা ঝুপড়ি থেকে নয়, টিলার উপরের ডানদিকের একটা গাছ থেকে কেউ ছুঁড়েছে|
এরকম পরিস্থিতির সাথে লোকটার পরিচয় আছে, সে দুহাত উপরে তুলে বললো, “বন্ধু|”
প্রায় আধমিনিট পরে গাছের ডালে আর পাতায় সামান্য আলোড়ন শোনা গেলো| সময়টুকু ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলো সে, কারণ সে জানে যে এসময়ে তার সামান্য নড়াচড়া তার জীবনের বিপক্ষে যেতে পারে|
পায়ের শব্দটা কাছাকাছি আসতে সে আবার দুহাত উচু করে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বললো, “রোকখে! বন্ধু|”
“থলেটা মাটিতে রেখে এপাশে সরিয়ে দিন|”
নির্দেশমতো লোকটা তাই করলো|
“অস্ত্রগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখুন|”
একটা ছোট্ট নিঃস্বাস ফেলে লোকটা তার জামার পিছন থেকে একটা লোহার পাতি ঘষে বানানো ভোজালি বের করে তার পায়ের কাছে মাটিতে নামিয়ে রাখলো, তারপরে বাঁ পায়ের ছোট্ট লাথিতে সেটা তার ডানদিকে সরিয়ে দিলো|
এইবার সামনে এলো সেই মানুষটি| খুব ধীরে সুস্থে দুজন দুজনকে মেপে নিলো কিছু সময়| আগন্তুক বাতাসে কিসের একটা গন্ধ পেলো|
“আমি পরেশ, পরেশ সরকার … পুবদিক থেকে আসছি| যুদ্ধের আগে একটা গাড়ির কোম্পানিতে চাকরি করতাম, ফাইনান্সের কাজ|”
“এদিকে কেন?”
“জানেনই তো| ওদিকে কিছুই নেই আর, তাই ভাবলাম যদি …”
“যুদ্ধ থেকে বাঁচলেন কি করে?”
“বোম পড়ার সময় ছিলাম না তখন, যখন ফিরলাম …” একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেললো লোকটা| “আপনি?”
“অতনু হালদার|”
“এখানকারই?”
“একরকম|” উত্তর একটু এড়িয়ে গেলো দ্বিতীয়জন|
ঝুপড়ির সামনে তারা দুজনে মাটিতে বসে কথা বলছিলো| পরেশের ঝোলা আর ভোজালিটা অতনুর কাছাকাছি রাখা আছে| ধনুকটা এখন অতনুর কোলে শুয়ে থাকলেও একটা তীর ছিলায় লাগানো|
“তা এদিকে কি মনে করে?”
“ঘুরতে ঘুরতে,” সামান্য হাসলো পরেশ, “পেটের দায়ে বলতে পারেন| ওদিকে তো আর কিছুই নেই|”
“গাছপালা? খাবার দাবার?”
“নাঃ – সব শেষ! মাটির অবস্থা খারাপ, মনে হয়না আর কোনদিন ওদিকে একটা ঘাস অব্দি গজাবে|”
“এতদিন কি করে চালালেন?”
“খুঁটে খেয়ে|” হাসলো পরেশ, “ওদিকে আর কিছু নেই, তাই বেরিয়ে পড়লাম| আপনি একাই থাকেন?”
“হু” সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় অতনু, কিন্তু উত্তর দেওয়ার সময়ে তার দৃষ্টি একবার ঝুপড়ির দিকে চলে যায়|
সেটা নজর এড়ায় না পরেশের, তার নাকের পাটা একবার ফুলে ওঠে – বাতাসে কিসের একটা গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করে সে|
“খাবার-দাবার?”
“চলে যায়| শাকপাতা, মাঝে মাঝে ইঁদুর|”
লোভে চকচক করে ওঠে পরেশের চোখ, “জন্তু জানোয়ার আছে এখনো?”
“পাওয়া যায় মাঝে মাঝে|” বেশি উত্সাহ দেখায় না অতনু, “তা … যাবেন কোনদিকে?”
“ঠিক নেই – চলতে চলতে এখানে তো চলে এলাম, এদিকেই যদি …” আনমনে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ছোট পাথর নিয়ে নাড়াচাড়া করে পরেশ|
“এগিয়ে যান, আরো পশ্চিমে ভালো জায়গা পেয়ে যেতে পারেন|” কথার সুরে বোঝা যায়, এখানে থানা গাড়তে পারবে না সে|
“আচ্ছা? তো আপনি … আপনি?”
“আমি এখানেই ঠিক আছি| চলে যাচ্ছে কোনভাবে – ঠিক আছে?”
“হুম, বেশ – একটু জল খাওয়াতে পারেন? আছে?”
“ওদিকে একটা নালা আছে – ওখান থেকেই খেতে হবে, আমিও ওখানেই যাই তেষ্টা পেলে|” হাতের তীর-ধনুক উঁচু করে পশ্চিম দিকে দেখালো অতনু|
“আচ্ছা আচ্ছা| আর ঝুপড়িতে কি আছে?” হঠাৎ প্রশ্ন করে পরেশ|
“যান – উঠুন!” একরকম ধমকে পরেশের দিকে তীর বাগাতে যায় অতনু, কিন্তু তার আগেই পরেশ তার হাতের পাথরটা ছুঁড়ে মারে তার দিকে|
রগে আচমকা চোট পেয়ে অতনু একপাশে টলে পড়ে, লাফিয়ে উঠে এক লাথিতে তার হাত থেকে ধনুকটা ফেলে দেয় পরেশ| তারপর ঘাড়ের পাশে একটা রদ্দা মারতেই অতনু জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে|
পরেশ হাতের ভোজালিটা নিয়ে সংজ্ঞাহীন অতনুকে দেখছিলো| ‘শত্রুর শেষ রাখতে নেই!’ কিন্তু তার মন পড়ে আছে অতনুর ঝুপড়ির দিকে| কোন কাজটা আগে করবে সে?
দোনামনা করতে সামান্য একটু দেরি হয়েছিল, তার মধ্যেই প্রথম তীরটা তার ডানকাঁধ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো| চকিতে ঝুপড়ির দরজার দিকে ঘুরতেই দ্বিতীয় তীর এসে বিঁধলো তার বুকের মাঝখানে|
এর মধ্যেই জ্ঞান ফিরে পেয়েছে অতনু| ঘাড়ের পিছনে অতনুর হাতে ধরে থাকা তীরটা পুঁতে গেলো, চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগে সে দেখলো যে ঝুপড়ির দরজায় ঝুলে থাকা পর্দাটা নড়ে উঠলো – আর তার সাথে সেই গন্ধটা আরেকবার ঝলকে উঠলো তার নাকে| মেয়েলি ফেরোমন, অনেকদিন যে গন্ধ পায়নি পরেশ|
“একাই মনে হচ্ছে - না?” মেয়েটা কাঁপছিলো তখনো|
“হুম, তবে বলা যায় না … পুব দিক থেকে আসছে বলছিলো, ওদিকে আরো মানুষ আছে কি না কে জানে|” পরেশের লাশটাকে টানতে টানতে ঝুপড়ির ভিতর ঢোকালো অতনু, “ভয়ের কি আছে?”
“না, ভয় পাইনি| তবে তোমায় যখন মারলো …”
“আচমকা – আমিও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম|”
লাশটাকে মেঝেতে নামিয়ে ঝুপড়ির পিছনের দেওয়ালে একটা দরজা খোলে অতনু| মেয়েটা পরেশের থলেটা খুলে কৌতহল ভরে দেখতে থাকে|
“আরে – রাখোনা! ওগুলো পালিয়ে যাচ্ছে না, এটার ব্যবস্থা করতে হবে আগে|” ধমকে ওঠে অতনু|
থলেটা ফেলে এবার মেয়েটা অতনুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে| তারা দুজনে পরেশের লাশটাকে ধরাধরি করে ঐ দরজার পিছনের একটা সিঁড়ি দিয়ে নামায়| নিচে নিকষ কালো অন্ধকার, তার ভিতরে অভ্যস্ত পদক্ষেপে নামতে থাকে তারা|
তিনতলা নামবার পরে থামে তারা| লাশটাকে মাটিতে নামিয়ে দুজনেই হাঁফাতে থাকে| মেয়েটির নিঃস্বাস অতনুর থেকেও কাতর|
“কষ্ট হচ্ছে সোনা?”
“না – তোমার?”
“ঠিক আছি| কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?”
“ধ্যাত! সবে তো দু-মাস! এর মধ্যে?” অন্ধকারে দেখা না গেলেও বোঝা যায় সোনার গাল লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে|
“ওঠবার সময়ে অসুবিধা হবে না তো?”
“না না – ভেবো না| আলোটা জ্বালবো?”
“এই না! একদম না, ব্যাটারি শেষ করতে চাও, নাকি?”
অতনু এবার পরেশের মৃতদেহ থেকে তার পোশাক-আশাক খুলে নিয়ে সোনার হাতে দেয়| সোনা সেগুলো যত্ন করে ভাঁজ করে পাশে একটা বড় বাক্সের ভিতরে রাখে|
“জুতোটা ভালো, কিন্তু আমার পায়ে বড় হবে|” খুঁতখুঁত করে অতনু|
ঘরটার ভিতরে আর একটা দরজা খোলে সে, ‘ঘটাং’ করে একটা ধাতব শব্দ হয় আর তার সাথে এক ঝলক হিমেল ঝাপটা এসে পড়ে তাদের গায়ে| অতনু আর সোনা এবার পরেশের লাশটাকে টেনে সেই ছোট ঘরটার ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়|
“আমি কিছু খাবার আনি?” দরজা খোলা ফ্রিজটাকে সবসময়ে এড়িয়ে যেতে চায় সোনা|
“আটটা হলো, তবে পুবদিক থেকে এই প্রথম|” খুব যত্ন করে টিনের খাবার খাচ্ছিল তারা|
দোতলায় অন্ধকার অনেকটা কম, এখন সুপারমার্কেটের লম্বা শেলফগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে|
“যা আছে বছর পাঁচেক চলে যাবে|” সেদিকে তাকিয়ে বললো সোনা| “ভাগ্যিস জায়গাটা খুঁজে পেয়েছিলে!”
“তার মধ্যে আমাদের অভ্যেস করে নিতে হবে| বাচ্চাটাকেও …”
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন