ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে|
তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে|
জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে|
খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভাব কেটে গিয়ে সে এবার পূর্ণ সচেতনতা ফিরে পেয়েছে| হাত-পায়ের দড়ির বাঁধনগুলো যে এইভাবে খোলা সম্ভব নয়, সেটা বুঝে রণব্রত নিজেকে শিথিল করে ভাবতে লাগলো যে সে এখানে এই পরিস্থিতিতে পড়ল কিভাবে|
“শেষ কোথায় ছিলাম? কি করছিলাম?” মনে মনে ভাবতে লাগলো সে|
মাথার ভিতরটা এখনো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, আর তার উপরে এই পরিস্থিতিতে তাড়াতাড়ি মগজ কাজ করতেও চাইছে না, কাজেই স্মৃতি ঘাঁটতে একটু সময় লাগলো তার|
“স্কুল!” হ্যাঁ – স্কুল থেকে ফিরছিলো তারা| নিজের পরনের পোশাকের দিকে চাইলো সে| আস্তে আস্তে অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে – আবছা যা বোঝা যায়, তার গায়ে এখনো সাদা সার্ট, মানে তার স্কুলের ইউনিফর্মই রয়েছে|
“স্কুল থেকে কোথায়?” ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল সে আর তার বন্ধু সমীরণ প্রতিদিনের মতই স্কুল ছুটির পর পালপাড়ার রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরছিলো| তিনমাথার মোড় থেকে সমীরণ চলে গেলো আর সে তাদের বাড়ির দিকের রাস্তা ধরলো, তারপর তারপর …
তারপরে কি হয়েছিল আর মনে করতে পারছে না রণব্রত|
“ছেলেধরা?” প্রবল আতঙ্ক আরেকবার পাক দিয়ে উঠলো তার মস্তিষ্কে| প্রায়ই তো টিভিতে দেখা যায় যে স্কুলের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ছেলেধরারা কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়, তারপরে বাড়িতে মুক্তিপন চেয়ে ফোন করে| টাকা না পেলে … আর ভাবতে পারে না রণব্রত! ফোঁপাতে থাকে সে| তার গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়তে থাকে|
অনেকক্ষণ পিছমোড়া হয়ে বাঁধা থাকার কারণে তার হাত-পা অসাড় হয়ে আছে| পায়ের পাতা বাঁকিয়ে আর হাতের আঙ্গুল খোলা বন্ধ করতে করতে সাড় ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করতে থাকলো সে| হাতের আঙ্গুল নাড়াচাড়া করতে গিয়ে একসময়ে বাঁহাতে দড়ির একটা মুখের স্পর্শ পেলো রণব্রত|
আতঙ্কে মস্তিস্ক কাজ করছিলো না এতক্ষণ, কিন্তু এইবার আঙ্গুল দিয়ে অনুভব করলো যে তার হাত আর পা সম্ভবত পাটের দড়ি বা সেই জাতীয় কিছু দিয়ে বাঁধা আছে| দড়ির মুখটা তাকে নতুন উত্সাহ জোগালো| অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সে গিঁট আর ফাঁস খুঁজতে লাগলো|
এবং কয়েক মিনিটের ভিতরেই সে তার হাত, পা আর মুখের বাঁধন খুলে উঠে বসলো| তাকে যারা ধরে এনেছে তারা হয়তো তাকে বাচ্চা ছেলে ভেবেই সেভাবে কষে বাঁধেনি|
বন্ধনমুক্ত হওয়ার পরে রণব্রত এবার কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলো| হাজার হোক ক্লাস এইটে পড়া ছেলে, নিয়মিত না হলেও মাঝে মাঝে খেলাধুলো করার অভ্যেসের কারণে শারীরিক ভাবে একেবারে কমজোরিও নয় সে| হাত-পা খোলা থাকলে কিছু একটা করে নিতে পারবে সে|
অন্ধকারটা এবার অনেক কম লাগছে যেন| চোখ সয়ে এসেছে? নাকি বাইরে আলোর জোর বাড়ছে? দ্বিতীয় সম্ভাবনা কম – কারণ সে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরবার পথে কিডন্যাপ হয়েছিল ধরে নিলে এতক্ষণে নিশ্চই রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে – এতটা সময় কেটে যায় নি এর মধ্যে| তাহলে তার পেটের ঘড়ি এই সময়টার একটা হিসাব রাখতো|
যে ঘরটার মধ্যে রয়েছে সে এবার চটজলদি সেটাকে জরিপ করতে লাগলো সে| ছোট একটা স্টোর রুম ধরনের ঘর| সিমেন্টের মেঝে| একদিকের দেওয়াল জুড়ে কাঠের পাটাতনের তাক| তাতে কিছু পুরনো কৌট, প্যাকিং বাক্স, হাবিজাবি নানা জিনিষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা| একদিকে দুটো বড় জং-ধরা টিনের ড্রাম দাঁড়িয়ে আছে মেঝের উপর| আলোর উত্স খুঁজতে গিয়ে সে দেখতে পেলো যে দেওয়ালে তাকগুলো সাজানো আছে তার মাথার উপরে ছাদের কাছে একটা ছোট ঘুলঘুলি আছে| পাশের দেওয়ালে একটা কাঠের দু-পাল্লার দরজা|স্বাভাবিক ভাবেই সেটা বন্ধ| বাদবাকি দেওয়াল দুটোই খালি – সেদিকে আর কিছু নেই|
কাঁপা কাঁপা হাতে আসতে করে বন্ধ দরজটা ঠেলল রণব্রত, এবং যা ভেবেছিলো তাই – দরজার একটা পাল্লা একটু সরে কিসে যেন আটকে গেলো| অন্য পাল্লাটা সরানোই গেলো না কোনমতে|
“বাইরে থেকে লক করে রেখেছে শয়তানগুলো!” ভাবলো সে, “গুলো? কজন আছে ওদিকে? নাকি একটাই ছেলেধরা|”
দরজাটা আলতো করে আবার টেনে দিলো সে| তারপরে খুব সাবধানে কান পাতলো দরজার পাল্লায়, যদি বাইরের কোনো শব্দ শোনা যায়| আগে জানতে হবে কারা তাকে কিডন্যাপ করেছে, সে কোথায় আছে এখন| সব কিছু ঠিকঠাক না জেনে আগে থেকে চিত্কার চেঁচামেচি করলে তার বিপদ বাড়বে ছাড়া কমবে না|
কিন্তু খুব মন দিয়ে শুনলে চেষ্টা করলেও দরজার ওপাশের কোনো কিছুই শুনতে পেলোনা সে|
“মনে হয় কেউ নেই বাইরে|” একটু দোনামনা করে এবার দরজায় একটু জোরেই চাপ দিলো রণব্রত – যদি সেটা এমনিই আটকানো থাকে সেই আশায়|
কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখলো যে একটু আগেও যে পাল্লাটা খানিকটা খুলে গিয়েছিলো, সেটা এখন অন্য পাল্লাটার মতই নিরেট দাঁড়িয়ে আছে – সেটাকে একচুলও সরানো গেলো না এবার!
ধাক্কাধাক্কি করতে সাহস পেলো না সে, যদি সেই শব্দে বাইরে যদি দুষ্কৃতিরা থেকে থাকে, তারা যাতে সজাগ না হয়ে যায়| কিন্তু গায়ের জোরে সে চাপ বাড়াতে লাগলো দরজাটার উপর| কিন্তু তাতেও কোনো ফল হলো না| পাল্লাটা চৌকাঠের গায়ে যেন পেরেক দিয়ে সেঁটে রাখা আছে|
হতাশ হয়ে পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা ড্রামের গায়ে হেলান দিতে গেলো সে – আর সেসময়ে একটা প্রবল ঝটকা বয়ে গেলো তার শরীরের মধ্যে দিয়ে!
“শক!” আতঙ্কে শিউরে উঠে ড্রামটার দিকে দেখতে থাকলো রণব্রত| তারপরে অভ্যেসমত বুঝতে গেলো যে সেটার গায়ে কোনো ইলেকট্রিকের তার লাগানো আছে কিনা! প্রথমবার সে যখন ঘরটাকে ভালো ভাবে খুঁটিয়ে দেখেছিলো সেসময়ে সে কোনো ইলেকট্রিক ওয়ারিংএর চিহ্ন দেখেনি এখানে| যেভাবে নজর চালানো সম্ভব ভালো করে খুঁটিয়ে দেখেও ড্রামের গায়ে বা আসেপাশে কোথাও কোনো তার বা সে জাতীয় কিছুই দেখা গেলো না|
“তাহলে কি এটার ভিতরেই কোনো ব্যাটারি বা জেনারেটর জাতীয় কিছু বসানো আছে?” যুক্তি দিয়ে বুঝতে গেলো সে|
জেনারেটর নয়, কেননা তাহলে শব্দ হতই| কিন্তু জ্ঞান ফেরা অব্দি সে এই ঘরে বা বাইরে কোনো শব্দই শুনতে পায়নি| এতো নিস্তব্ধতা তাদের শহরে কখনো অনুভবই করেনি সে|
“… তবে কি আমি বাইরে কোথাও? আমাকে বাইরে কোথাও পাচার করে এনেছে বদমাশগুলো?” ভাবতে গিয়ে এবার আরেকবার হতাশার মধ্যে পড়ল রণব্রত|
“কিন্তু কিছু তো একটা করতে হবেই! এভাবে সময় কেটে যাচ্ছে – শয়তানগুলো আসবার আগেই এখান থেকে পালাতে হবে|” আরেকবার পালাবার তাগিদ এলো তার মধ্যে|
খুব সাবধানে ড্রামটার স্পর্শ বাঁচিয়ে সে আবার দরজার দুই পাল্লায় চাপ দিলো দুই হাতে| এবং এবার তাকে অবাক করে দিয়ে প্রথমে আটকে থাকা পাল্লাটা পুরো খুলো গেলো| অন্য যেটা সামান্য খুলছিলো সেটা দ্বিতীয়বারের মতই কঠিনভাবে আটকে থাকলো চৌকাঠের উপর|
খোলা পাল্লার ওপারে নিকষ কালো অন্ধকার|
দরজা খুলে যেতেই রণব্রতর মন আশায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো| বাইরে অন্ধকার, কাজেই আলোর জন্যে কিছু একটা দরকার| দেশলাই, মোমবাতি, লাইটার, টর্চ – কিছু একটা| নয়তো অন্ধকারে কোথায় যাবে সে?
ড্রামটার দিকে আরেকবার দেখলো সে, কারেন্ট যখন আছে কাজেই আলোর ব্যবস্থাও নিশ্চই কিছু একটা থাকবে| কিন্তু ড্রামটাকে দ্বিতীয়বার ছোঁওয়ার সাহস নেই তার| বরং দেওয়ালের তাকের বাক্সগুলো যদি খুঁজে দেখা যায় তবে নিশ্চই কিছু একটা পাওয়া যেতে পারে|
তাকের দিকে দেখতে গিয়ে তার মনে একটু খটকা আসলো, “ঘুলঘুলিটা এই দেওয়ালেই ছিল না?” উল্টো দিকের দেওয়ালের মাথার উপরে ঘুলঘুলি থেকে আলো আসতে দেখে ভাবলো সে, “কি জানি কি দেখতে কি দেখেছি! মাথা কাজ করছে না হয়তো|”
বাইরে যা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে সেখানে কাজের কোনো কিছুই নেই| কটা পুরনো ডায়েরি ধরনের বাঁধানো খাতা, ছেঁড়া চটের থলে, টুকরো দড়ি, একটা মাদুর, তোবড়ানো এলুমিনিয়ামের বাসন – ইত্যাদি|
তাকের প্যাকিং বাক্সগুলো সাবধানে হাঁটকাতে লাগে সে এবার| সাবধানে কোনো যতদুর সম্ভব আওয়াজ না করে সেগুলো খুলে খুলে দেখতে গিয়ে আসতে আসতে হতাশ হচ্ছিলো সে| বাসন-পত্তর, কাপড়-চোপড়, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো, খেলনা – প্রায় প্রতিটা বাক্সই এসব আবর্জনা দিয়ে ঠাসা|
একবারের উপরের তাকটা তার হাতের নাগালের বাইরে| কিন্তু ওখানে যদি কিছু না কিছু পাওয়া যায় এই আশায় ধীরে ধীরে নিচের তাকের উপরে পায়ের ভর দিয়ে উপরে উঠতে গিয়ে পায়ের নিচে মচমচ শব্দ এবার তার চারপাশের নীরবতাকে ভঙ্গ করতে শুরু করলো| প্রমাদ গুনলো রণব্রত|
কাঠের পাটাতন ভেঙ্গে সবকিছু শুদ্ধু হুড়মুড় করে পড়ে যেতে যেতে রণব্রতর আতঙ্ক চরমে উঠলো|
“এবার আমি শেষ! এবার আমি শেষ! এবার আমি শেষ! এবার আমি শেষ!” ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো মস্তিষ্কে একটানা একটাই কথা ঘুরে যাচ্ছিলো বারবার| তার মাথার ভিতরে ঘুরে যাওয়া কথাগুলোর মতই ঘরের ভিতরের জিনিসপত্র পড়ে যাওয়ার মিশ্র শব্দগুলোও যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে বারে বারে|
নিঃস্বাস বন্ধ করে অনুরণন শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলো সে| তার অপলক চোখ খোলা দরজার ওপারে অন্ধকারের দিকে| মনে মনে একটাই প্রার্থনা করছিলো সে যাতে এই ঘরের আওয়াজ বাইরে না বেরোয়| কান খাঁড়া করে বাইরের দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে প্রতিধ্বনিত গুঞ্জনের মধ্যেই সে যেন হঠাৎ অন্য কোনো শব্দ শুনতে পেলো|
কেউ কি কথা বলছে বাইরে?
অবাক হয়ে রণব্রত শুনলো, “ছোটকা বাড়ি আসেনি এখনো?” কাছেই একটা বাচ্ছা মেয়ে বলে উঠলো কোথাও!
সাহসে ভর করে আস্তে আস্তে খোলা পাল্লা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে মুখ বাড়ালো রণব্রত| আর তার সাথেই সে খেয়াল করলো সে তার বাঁহাতে ড্রামটার উপরে ভর দিয়ে আছে!
অন্ধকারে সামনে দুহাত বাড়িয়ে খুব সাবধানে ধীরে ধীরে পা মেপে মেপে এগোচ্ছে রণব্রত| এই ঘরের ভিতরে নিকষ কালো অন্ধকার, সামনে কি আছে দেখবার কোনো উপায় নেই|
দরজা থেকে বেরিয়ে দুপাশের দেওয়াল হাতড়ে দেখেছিলো কোনদিকেই কোনো সুইচবোর্ড বা সেরকম কিছুর চিহ্ন দেখেনি সে| সে যখন স্টোররুমের ভিতরে পড়ে গিয়েছিলো, সেসময়ে শব্দ যেভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো, তাতে করে মনে হয় এটা হলঘর ধরনের কোনো বড় ঘর হবে| হাতড়ে হাতড়ে এগুনোর সময়ে দেওয়ালের আশেপাশে কোনো আসবাব বা কোনো জিনিষপত্রের স্পর্শ পায়নি সে|
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন