সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পিতার আশির্বাদ

ফেলুদা নিয়ে ইদানিং কিসব ঝঞ্ঝাট হচ্ছে দেখলাম, ‘কিউ-কিউ’ খিস্তিও করেছে বলে বাজার বেশ গরম|

তো যেটা ঘটনা - অ-নে-ক কাল আগে, তখন আমাদের বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটি আসে নি, কাদের একটা বাড়িতে এক সন্ধ্যেবেলায় বেড়াতে গিয়ে দেখলাম টিভিতে কি একটা দারুন সিনেমা হচ্ছে - সবাই বেশ উত্তেজিত| আমি তখন বেজায় ছোট, ফেলুদা'র গপ্পো পড়েছি কিছু কিছু - তো সিনেমায় দেখলাম গল্পের সেই নামের লোকেরাই বেশ দারুন দারুন সব ঘটনা ঘটাচ্ছে| আমি সে বাড়ির একজনকে জিজ্ঞাস করলাম যে জিনিসটা কি? সে বললো 'সোনার কেল্লা' - ফেলুদা'র সিনেমা|

আমি তো চমত্কৃত! এবং তখন থেকেই জানলাম যে জিনিষ বইতে পড়া যায়, সে জিনিষ নিয়ে সিনেমাও হতে পারে দিব্যি - এবং গপ্পো'র গুনে এবং নড়ন্ত-ছবির ম্যাজিকে সেটা আরো দারুন হয়|

যাই হোক তার বেশ অ-নে-ক বছর পরে (মানে ছেলেবেলায় বছর গুলো অনেক লম্বা হত কিনা) আবার সেরকম চমক লাগলো 'জয় বাবা ফেলুনাথ' দেখে| ওটার গপ্পটা আগেই পড়া ছিল, কাজেই মিলিয়ে মিলিয়ে দেখলাম - হ্যাঁ, দিব্যি পড়ে পড়ে যেরকমটা মনে মনে ভেবেছিলাম - একদম সেরকমটাই হয়েছে তো বটেই আর তার সাথে যেগুলো কল্পনাতে আসেনি সেগুলোও কি সুন্দর দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে! মুগ্ধতার চূড়ান্ত!

বই থেকে সত্যজিত রায় নামটা জানা ছিল| পরে আরও জানলাম যে ঐ ভদ্রলোক কেবল গপ্পো লেখেন তা নয়, তার সাথে আরও অনেক কিছুই করেন – যেমন বেজায় ভালো ছবি আঁকেন, আর সিনেমা – সেতো বিরাট ব্যাপার! এমনি সিনেমা তো অনেক দেখা হয়, তো তার পরে ঠিক করে ফেললাম সত্যজিত রায়ের যা যা সিনেমা আছে সব দখে ফেলা দরকার| তো সেই মতো সেসময়ে টিভিতে শনিবারে যা ছবি দেখাতো তার আগে জেনে নিতাম ওটা সত্যজিত রায় বানিয়েছেন কিনা|
সেরকম একদিন জানা গেলো যে ‘পথের পাঁচালি’ হবে কোনো একদিন – আগ্রহ নিয়ে বসে দেখতে লাগলাম – ম্যাজিক হবে কখন! তবে খানিক দেখেই বুঝলাম এ জিনিষ উনি যেকারণেই বানান না কেন অন্তত আমার জন্যে বানান নি – কাজেই হাফ-টাইমের আগেই সেটা বাদ দেওয়া গেলো|

আচ্ছা এর মাঝে বলে নিই – যেহেতু আমার সাধারণ জ্ঞান খুব খু-উ-ব কম কাজেই আমি অনেক পরে ওনার সাথে সুকুমার রায় আর উপেন্দ্রকিশোর রাচৌধুরীর সম্পর্ক গুলো জানতে পেরেছি – এবং বিশ্বাস করুন সত্যজিত রায়কে কখনো সুকুমার রায়ের ছেলে হিসাবে আমার কাছে পরিচয় দিতে হয় নি – যেরকম সুকুমার রায়ের বাবার নাম না জানলেও ওনার লেখা বা আঁকা আমায় যথেষ্ট মজা – বলতে গেলে পুরোপুরি মজাই দিয়েছে|

আমার ছেলেবেলায় বই পড়তে বেজায় আনন্দ হত বলে বাবা-মায়ের থেকে পুজো বা জন্মদিনে বই ছাড়া আর সেরকম কিছুর আবদার থাকতো না| এইবার খানিক দিন পরে কি উপলক্ষ্যে বাবার সাথে দোকানে গেলাম - ফেলুদার বই চাই| ততদিনে হালকা চোখ পেকেছে – কোনটা কার আঁকা দেখলে মোটামুটি নাম বলতে পারি| তো সেরকম কি একটা বই কেনা হলো যার মলাট দেখে বুঝলাম যে সেটা সত্যজিত রায়েরই আঁকা হলেও যেন একটু ‘কেমন কেমন|’ মানে সবাই তাদের নিজের নিজের মতো আঁকলেও এটা যেন ঠিক সত্যজিত-সত্যজিত নয় – কিরকম যেন একটা|

বাড়ি এসে ভিতরের পাতায় দেখলাম লেখা আছে ‘প্রচ্ছদ – সন্দীপ রায়|’ সত্যজিত রায়ের গল্পের বইতে উপরি পাওনা ওনার দারুন দারুন ছবি| তো যাইহোক একটু লোকসান লোকসান মতো লাগলেও –সব সময় তো সব কিছু মনের মতো হয় না| সেই মতো মেনে নেওয়া গেলো ব্যাপারটা| তার সাথে এটাও মনে হলো যে এই লোকটা কে? সত্যজিতের বইতে ওনার ‘মতো করে’ ছবি এঁকেছেন – কাজেই কেউকেটা তো কেউ একজন হবেন বটেই| জানা গেলো যে ও ভদ্দরলোক সত্যজিত রায়ের ছেলে – আরে বাহ!

যেটা সমস্যা, সেটা হলো সুকুমারকে উপেন্দ্রকিশোরের ছেলে বলে আলাদা করে মনে করতে হয় নি, সত্যজিতের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেরকমই – কিন্তু এই ফোর্থ জেনেরেশনটিকে নিয়ে সামান্য সন্দিহান হলাম – নিজের মতো করে নি কেন? কেন বাবার নকল করে জিনিসটা চালাতে চাইছেন তিনি? আমার তত্কালীন ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বুঝলাম যে হয়তো উনিও আমার মতই ছোটমানুষ – বড় হলে আরও অনেক অ-নে-ক ভালো ভালো জিনিষ বানাবেন উনি!

এইবার তার কিছুদিন পরে একটা দারুন সিনেমা এলো যেটা নাকি সত্যজিতের গল্প থেকে সন্দীপ রায় বানিয়েছেন! কাজেই সে জিনিস না দেখে থাকা যায় কি? ‘আহা কি আনন্দ|’ সপরিবারে সিনেমাটি দেখা হলো – তবে একটু যেন খচখচ করছিলো মনের ভিতর – এতো সেই একই জিনিষ! যেটা আগে সাদাকালোয় দেখেছিলাম – সেটা রঙিনে একটু দেখতে ভালো লাগলেও ... সেইরকমই তো, নতুন কি আছে আর?

ছেলেবেলার গল্প বললে সুখস্মৃতি – বাবার সাথে কথাবার্তা মনে পড়ে যায় অবশ্যই| আমি ছেলেবেলায় ছবি-তবি আঁকতে দারুন ভালোবাসতাম আর আমার বাবা আমাকে দারুন ভাবে উত্সাহ দিতেন| শুকতারা, আনন্দমেলা, ইন্দ্রজাল কমিকস, বাংলায় রাশিয়ান বই – সংগ্রহে যা ছিল তার থেকেও কপি করতাম হদ্দমুদ্দ| একদিন সন্ধ্যেবেলায় মনে আছে আমি আর বাবা বারান্দায় বসে গল্প করছি| বাবাকে জিজ্ঞাস করলাম আমি যদি বড় হয়ে বইতে ছবি আঁকতে পাই তো কার মতো করে আঁকবো? বিমল দাস? নারায়ন দেবনাথ? সরোজ সরকার? সমীর সরকার? সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়? ... সত্যজিত রায়? কার মতো করে আঁকলে ভালো হবে? সেইমতো করে নিচে একটা সই মকশোও তো করা দরকার কিনা সময় থাকতে থাকতে! ফট করে এর মধ্যে বড় হয়ে গেলে যদি সব কিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে রাখবার সময় না পাওয়া যায়?

বড় হতে হতে দেখেছি যে বড় বেলায় বছরগুলো কেমন করে যেন ছোট হয়ে যায় – এই দেখা গেলো আজ পঁচিশ তো কালকেই হুট করে আটাশ হয়ে গেলাম – কি জ্বালা! বড় হওয়ার সময়ে ফেলুদা দেখেছি একটাই যেটা সত্যজিত রায়ের ‘নয়’| জীবনের অভিজ্ঞতা আমায় বুঝিয়েছে যে সবাই সবকিছু পারে না| এক এক মানুষের সক্ষমতা এক এক রকম - হয়তো যাদের সক্ষমতার অভাব, তাদের অন্যের জুতোর প্রয়োজন পড়ে| সবাই একরকম হয় না কোনভাবেই|

বুড়ো হওয়ার রাস্তায় ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’ দেখেছি, ‘শার্লক’ দেখেছি – অনেক পুরনো জিনিসকে নতুন ভাবে ফিরে আসতে দেখেছি – এবং ‘আমার’ কাছে – যেটা দেখবার আগে ভাবছিলাম, কি আর দেখবো? সবই তো আগে পড়া, সবই তো আগে দেখা! নতুন করে কি দেখবার আছে এতে আর? কিন্তু দিব্যি গেলে বলছি – বিশ্বাস করুন, আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় আমার যা প্রত্যাশা ছিল তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি – যারা এই সবের পিছনে আছেন, তারা যেন আমার কথা ভেবেই, আমার জন্যেই বানিয়েছেন এসব – আহা!

আমি পর্দায় ফেলুদা দেখছি ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে|’ তাও বন্ধুদের সাথে, বলতে গেলে জাস্ট টাইম পাস করতে – আগ্রহ ভরে কেবল দেখবার জন্যে দেখতে নয়| যদি নিতান্তই কোনদিন ফেলুদা দেখতেই হয়, তবে একটা ‘সোনার কেল্লা’ আর একটা ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ই যথেষ্ট আমার জন্যে – নয়তো চলন্ত ছবি পেতে চাইলে সত্যজিত রায়ের আসল গল্পগুলোই অনেক অ-নে-ক বেশি হয়ে যায়| তার জন্যে পয়সা খরচ করে ‘আসল’ গপ্পের উপর বানানো ‘মতো’ লোকেশন, ‘মতো’ হিরো – একদমই দরকার পড়ে না|

নিজের মতো করে কিছু করতে সেভাবে সক্ষম না হলে, পিতৃপুরুষের আমানত ভাঙিয়ে খাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই হয়তো - কে জানে! এমনিতেও প্রবাদ আছে যে বাঙালির ব্যবসা তিনপুরুষের বেশি দেখে না| বলা যায় না - বংশ কৌলিন্যের দায় না থাকলে হয়তো মানুষ নিজের মতো করে, নিজের কাজ করলে আরো ভালো - আরো অন্যকিছু করবার সাহস পান|

ছবি-টবি আঁকছি ধরে নিন বুড়ো বয়সে এসে, বাবার সাথে আলোচনা মতো চট করে বড় হয়েই ছবি আঁকা শুরু করতে পারিনি – এদিক ওদিক নানা ঘাট-টাট ঘুরে-টুরে এসে আপাতত ঐ করেই খাচ্ছি আপাতত| যাই হোক সেদিন সেই সন্ধ্যেবেলায় বাবার বলা কথাটা মনে পড়ল আরেকবার – “অন্যের মতো কেন? নিজের মতো করে আঁকবে|”

ভাগ্যিস বাবা প্রতিভাবান কেউ ছিলেন না, তাই হয়তো আমায় সোজা রাস্তাটা দেখাতে পেরেছিলেন তিনি|

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমার পড়া প্রথম ইন্দ্রজাল কমিকস

আমি অনেক ছোটবেলায় লিখতে পড়তে শিখি - যখন আমার চার-পাঁচ বছর বয়স সে সময়ে আমি নিজের চেষ্টা আর ইচ্ছেতেই একাএকাই আমার পরিচিত শিশুপাঠ্য বইপত্তর পড়তে পারতাম এবং সবথেকে বড় কথা হলো ব্যাট-বলের বদলে সেই বই গুলিই আমার কাছে অনেক প্রিয় ছিল| বাবা'র বদলি'র চাকরি ছিল, কাজেই ছ'বছর বয়সে যখন আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই, থিতু হওয়ার প্রয়োজনে আমি আর আমার মা তখন আমাদের এই শহরেই পাকাপাকি ভাবে বাস করতে শুরু করি| বাবা থাকতেন দুরে - বিহারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাঁধ-বাঁধা'র দায়িত্বে| বাড়ি ফিরতেন পনেরো দিনে বা মাসে একবার করে| অন্যান্য শিশুদের মতন আমার বাবা ফেরার সময়ে কোনো উপহারের চাহিদা থাকতো না - বাবা নিজে যে সশরীরে আমাদের কাছে আসছেন - সেটারই গুরুত্ব ছিল সবথেকে বেশি|

উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্য পুরস্কার

একটু নয়, প্রচুর দেরি করেই – ইয়ে কি বলে আবার একটু ঢাক পেটাপিটি করি| তবে সেদিক থেকে ধরতে গেলে ভবিষ্যতে আমার ডিজে হওয়ার রাস্তাও খুলছে হয়তো পরোক্ষ ভাবে| আসল সাফাই হলো ‘আমার মতো’ যারা কাজ করেন, তারা হয়তো উপলব্ধি করেছেন যে এপ্রিল মে থেকে কাজের স্বাভাবিক চাপ শুরু হয় আর তা বাদে যেহেতু ব্যক্তিগত ভাবে আমার পুরস্কার-টুরস্কার পাওয়ার সেরকম অভ্যাস নেই, সেই দিক থেকে - তবে ঘটনা, একবছরে পরপর দুবার পুরস্কার প্রাপ্তি আর তার সাথে ইদানীন গপ্পো লেখারও ঝোঁক বেড়েছে খানিক, কাজেই সবে মিলে ... যাকগে! জ্ঞানীগুনী যারাই আছেন তাদের কাছে ব্যাখ্যা করার দরকার না হলেও, সাধারণ মানুষ হয়তো কৌতুহলী হবেন যে এই উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্যের ব্যাপারটা কি! দেখুন, মানুষ একটি অদ্ভুত জন্তু – সেভাবে বলতে গেলে এদের রাম-টু-রম রেশিও অন্যান্য জন্তুর তুলনায় অনেক বেশি মানে একোয়ারড মেমরির থেকে প্রিন্টেড মেমরি অনেক কম| জীবন বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা খুবই কম, তাও আমার সেকেন্ডারি ব্রেন, মানে ইন্টারনেট থেকে যা জানা, মানব মস্তিষ্কের ডানদিক আমাদের সাথে বেজায় মজার মজার খেলা খেলে! কল্পনা, সৃজনশীলতা – এগুলি অন্য জন্তুদের ভিতর সেভাবে প্রকট কি? হয়ত...

জাতিস্বর

জাতিস্বর দেখলাম - আশ্চর্যের বিষয় যে স্কিপ করে করে না দেখে একটানা প্রথম থেকে শেষ অব্দি দেখলাম|