সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অন্যলোকের মেসেজ

 ১

“নমস্কার, মোবিকমে আপনাকে স্বাগত| আমি শুভ্রা – আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“নমস্কার নমস্কার – আমার নাম দেবাংশু লাহিড়ি, আমার নম্বর … মানে এটাই, যেটা থেকে আপনাকে কল করছি|”

“হ্যা বলুন …”

“দেখুন, আমার সমস্যা হলো – কদিন থেকে আমার মোবাইলে অনবরত মেসেজ ঢুকছে|”

“আচ্ছা?”

“হ্যা – মানে কোনো মাথামুন্ডু নেই – যতসব হিজিবিজি|”

“আচ্ছা? কোনো বিশেষ নম্বর থেকে, নাকি …?”

“না, নম্বর বা সেরকম কিছু নয়”

“আচ্ছা, বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনাল মেসেজ যেরকম? মানে মেসেজে কি থাকছে আমাকে জানাতে পারেন কি? তাহলে …”

“না না, কোম্পানির মেসেজ যেমন কোনো লেখা থেকে আসে, নম্বর থেকে নয় – সেরকমও না কিন্তু| মানে পুরোটাই হিজিবিজি ধরনের – এ বি সি ডি এক দুই তিন চার – এরকম …”

“আচ্ছা?”

“ … ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে, মানে আপনাকে বোঝাতে পারছি না – যখন মেসেজ ঢোকা শুরু হচ্ছে তখন পাগল হয়ে যাওয়ার দশা!”

“আচ্ছা? স্যার – আপনি একটু হোল্ড করবেন প্লিজ? তাহলে আমি আমাদের সিস্টেমে চেক করে আপনাকে জানাতে পারতাম আপনার নাম্বারে কোনো ভ্যাস এক্টিভেটেড আছে কিনা?”

“সিওর সিওর – আমি ধরছি|”

মোবাইলের ওপারে গান বাজনার আওয়াজ শুনতে শুনতে দেবাংশুবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে চলে এলেন|

ছাতনাহাটের সব থেকে পুরনো পারার পুরনো দিনের বাসিন্দা তারা, তার ঠাকুরদার বানানো এই বাড়ি তার বাবা-কাকার আমলে কলেবরে কিছুটা বাড়লেও সেটা এখন হয়তো আর তাদের জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইদের বিশাল পরিবারকে একসাথে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়| ঘেষাঘেষি ঘর আর ঘরের মধ্যে পার্টিশন – এর ভিতরে এই শরতের বিকেলেও হাওয়া বাতাস খেলে খুবই কষ্ট করে|

তবে দেবাংশু বাবুর সৌভাগ্য যে তার ভাগের দুটি ঘরের লাগোয়া একটা ব্যালকনি বানিয়ে নেওয়ার মতো জায়গা তার বাবা করে রেখে যেতে পেরেছিলেন|

“নমস্কার স্যার – লাইনে আছেন কি?”

“হ্যা – আছি আছি, বলুন বলুন|”

“ধন্যবাদ স্যার, আমি আমাদের সিস্টেমে চেক করে দেখছিলাম – আপনার নম্বরে, মানে যে নম্বর থেকে আপনি কল করছেন, এতে কিন্তু কোনো ভ্যালু এডেড সার্ভিস এক্টিভেটেড নেই|”

“আচ্ছা! তাহলে মেসেজ গুলো … মানে যত রাজ্যের গাদাগুচ্ছের হিজিবিজি …”

“সম্ভবত আপনার কোনো কন্ট্যাক্টই আপনাকে মেসেজ করেছেন, আর কোনো কারণে …”

দেবাংশুবাবুর হাতের মধ্যেই ফোনটা কেঁপে উঠলো একবার, আবার শুরু হলো মনে হচ্ছে – মেসেজের উত্পাতে বিরক্ত হয়ে গতকালই ছেলে মেসেজ টোন বদল করে দিয়েছিলো, তারপর থেকে মেসেজ এলেই ফোন ভাইব্রেট হয়|

দেবাংশু বাবু বুঝতে পারলেন এবার তিনি বিরক্ত হওয়া শুরু করেছেন|

“এখনকার দিনে কার খেয়েদেয়ে কাজ আছে বলুন তো যে সময় নষ্ট করে বসে বসে কাঁড়ি কাঁড়ি হিজিবিজি লিখে মেসেজ করে পাঠাবে?”

ওপাশে শুভ্রা নামের মেয়েটা থমকে গেলো একটু|

“আর তা বাদে বলছি তো মেসেজের কোনো মানেই নেই … যত্তসব ভুলভাল!”

শুভ্রা দেবাংশু বাবুর বিরক্তি আর মেজাজ হারানো আন্দাজ করতে পেরে একটু সময় নিলো|

“স্যার – যদি আপনি চান তাহলে আমি আরেকবার সিস্টেম চেক করে … ”

“হ্যা করুন … প্লিজ! এট লিস্ট এটা কিভাবে বন্ধ করা যায়, তার একটা উপায় …”

“অবশ্যই স্যার – কাইন্ডলি একটু লাইনে থাকবেন প্লিজ …”

“আচ্ছা আচ্ছা – আছি!”

ঘুরে ব্যালকনির রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন দেবাংশু বাবু, তারপর ফোনটাকে কান থেকে নামিয়ে দেখলেন – উপরের কুইক-নোটিফিকেশনে মেসেজের সিম্বল দেখাচ্ছে|

“যত্তসব!” স্ক্রিনের উপর বিরক্তি উগরে দিয়ে আবার ফোন কানে তুললেন উনি – ওদিকে সেই একই গান-বাজনা হয়ে চলেছে এখনো| দেবাংশু বাবু উদাস চোখে ব্যালকনির নিচে দিয়ে চলে যাওয়া গলিপথ যেখানে বড়রাস্তায় মিলেছে, সেখানকার ব্যস্ততা দেখতে লাগলেন|

“স্যার – শুভ্রা বলছিলাম, লাইনে আছেন কি?”

“হ্যা হ্যা – আছি, বলুন|”

“স্যার, আপনি সিওর যে আপনি মেসেজ – মানে এসএমএসই পাচ্ছেন? মানে বলতে চাইছি যে মেসেঞ্জার বা হোয়াটসআপ, এর থেকে …”

“দেখুন ম্যাডাম – আপনাদের ডেটাবেসে দেখবেন আমি একটু পুরনো দিনের মানুষ, মানে এখনকার টেকনোলজি সম্পর্কে আমি সেরকম না জানলেও, এটলিস্ট এটা জানি যে ফেসবুক বা হোয়াটসআপ করতে গেলে ফোনে নেট লাগে – নাকি?”

“অবশ্যই স্যার|”

“আর চেক করলে দেখতে পাবেন যে আমি কোনদিনই আমার ফোনে – হ্যা আমার স্মার্টফোন বটে, কিন্তু ফোনে আমি এযাবত কোনদিনই মোবাইল ডাটা অন করিনি – বা কোনদিনই কোনো নেট প্যাক লাগাই নি| এমনকি আমার ফোনে কোনো সোসাল নেটওয়ার্ক আপও লাগানো নেই!”

“হ্যা স্যার – আপনার জাস্ট নরমাল রিচার্জ ছাড়া ইভেন কোনো প্রমোও এক্টিভেটেড নেই দেখলাম| কিন্তু …”

“তো এইবার বলুন – এই সিচুয়েশনে কি করা সম্ভব? … আর শুনুন যখন আপনি সিস্টেম চেক করার জন্যে হোল্ড করিয়ে রেখেছিলেন তখনো কিন্তু – জানি না কটা, কিন্তু তখোনো বেশ কয়েকটা মেসেজ ঢুকেছে!”

“স্যার আপনার সমস্যাটা বুঝতে পারছি – কিন্তু স্যার, আমাদের সিস্টেমে দেখলাম আপনার নম্বরে শেষ মেসেজ ঢুকেছে – এক সেকেন্ড স্যার, হ্যা – গত মাসের ছাব্বিশ তারিখে|”

“ছাব্বিশ – মানে হলো গিয়ে, আজ তো এগারো-বারো মনে হয় – মানে বলতে চাইছেন দিন পনেরো আগে?”

“হ্যা স্যার|”

“কি যাতা বলছেন?”

“হ্যা স্যার – আমরা সেন্ডারের নম্বর বা মেসেজ কন্টেন্ট বলতে পারি না – কিন্তু স্যার, এটা সিওর যে আপনি লাস্ট এসএমএস পেয়েছেন ছাব্বিশ নয়ে|”

“ধুউর শা – সরি! আপনাদের সিস্টেমটাই ভুলভাল – কি যে বলবো আপনাকে| নেহাত মেয়ে – যাকগে! বলছি শুনুন আপনাদের এন্ডে কিছু কি করতে পারবেন যাতে – মানে, যেখান থেকে যাই হোক না কেন, এরকম উত্পাত বন্ধ করা যায়?”

“স্যার আপনি চাইলে আপনার মোবাইলে কল এন্ড এসএমএস ফিল্টারে গিয়ে যে নম্বর থেকে মেসেজগুলো আসছে …”

“আরে! বললাম না আপনাকে – কোনো নির্দিষ্ট নম্বর থেকে নারে বাবা! একেক সময়ে একেক রকম … আচ্ছা চাইলে আপনাকে ফরোয়ার্ড করে, আপনি যদি আমাকে আপনার বা কোম্পানির নম্বর দেন কোনো, তাহলে …”

“দুঃখিত স্যার, আমরা কাস্টমারকে আমাদের নম্বর দিতে পারি না|”

“আচ্ছা আচ্ছা – তাহলে যদি আপনাদের কোম্পানির কোনো নম্বরে|”

“স্যার চাইলে আমাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে, ওখানে আমাদের ইমেল আড্রেস পেয়ে যাবেন, সেখানে আপনার মেসেজ ডিটেলস পোস্ট করে আমাদের পাঠাতে পারেন, তাহলে …”

“হুমম – তাহলে আপনারা কিছুই করতে পারবেন না?”

“দুঃখিত স্যার| আমাদের সিস্টেম থেকে এর বেশি আর কিছু করার …”

“বাদ দিন, দেখা যাক …”

“যদি আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়ে থাকে তো অনুগ্রহ করে পরের কাস্টমারের জন্যে লাইনটা ছেড়ে দেবেন স্যার?”

কোনো কথা না বলে কলটা কেটে দিলেন দেবাংশু বাবু|

খানিক আগে ওপাশের ঘর থেকে শাঁখের আওয়াজ শুনেছিলেন – এখন খেয়াল করলেন যে রাস্তার আলো গুলো জ্বলে উঠেছে| কথা বলতে বলতেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলো|

একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে ঘরের ভিতরে চলে এলেন দেবাংশু বাবু|

“শোভন-দা …”

“কটা? চারটে তো?”

“আমায় লিকার দিও শোভনদা, গ্যাস হচ্ছে খুব|”

“আরে খা খা – দুধ চায়ে আবার গ্যাস!”

“কি যে বলো না বাপিদা! তুমি হলে আমাদের সয়ার্জেনেগার! তোমার আবার দুধ চা খেলে গ্যাস – হা হা!”

“এই শোন বাপি, সয়ার্জেনেগারের কথায় মনে পড়ে গেলো … কাল ‘উইয়ার্ড ওয়েবসাইটস’ দিয়ে খুঁজছিলাম – একটা বেড়ে সাইট পেলাম! ‘আর্নল্ড সয়ার্জেনেগার ফ্যান সাইট’!”

“তো?”

“আরে – মানে, যেমন ভাবছিস তেমন না – মানে না দেখলে বুঝতে পারবি না| এই বজা – তোর ফোনে নেট আছে?”

“হ্যা, বলো না রনি’দা, লাগবে? শেয়ার করে দেবো?”

“না – তোর ফোনেই লাগা – গুগল খোল|”

“ওরে চা নে তোরা|”

“আহমেদ – শোভনদা’র থেকে চা গুলো নিয়ে পাস কর তো| লেখ – আমার আড্রেস মনে নেই – এমনিই ‘উইয়ার্ড ওয়েবসাইটস’ লিখে সার্চ কর, ডব্লু-ই-আই … ”

“জানি, এসে গেছে - কোনটা?”

“দেখি এক সেকেন্ড … হু – এইটা, ক্রিপিপাস্তা’র লিঙ্কটায় যা, ওখানে …”

“কই দেখি!”

“আরে এখনো আসেনি বাপিদা – গুরুকে দেখবার জন্যে এতো উতলা হচ্ছ কেন?”


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যুদ্দুউউউ

জনগণ, অন্যভাবে নেবেন না, অনেক দিন আগের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই| তখন আমি বেসব্রিজে চাকরি করি, দমদমে ভাড়ায় থাকি - একদিন শেয়ালদা হয়ে ফেরবার পথে মহা শোরগোল! সাবওয়েতে আগুন!! মুভিখোর সাধারণ বাঙালির মতোই আমারও হিরোয়িক অবসেশন ছেলেবেলা থেকেই - ব্যাংকে গেলে ভাবি ডাকাত পড়লে বেশ হয় - সবাইকে বাঁচিয়ে বুকে গুলি খেয়ে হাসতে হাসতে মরবো - সবাই হাত তালি দেবে| ট্রেনে উঠলে ভাবি এক্সিডেন্ট হলে বেশ হয় - সবাইকে বাঁচিয়ে বুকে রড ঢুকে হাসতে হাসতে মরবো - সবাই হাত তালি দেবে| এমনকি স্কুলে ঢুকলেও ভাবি একটা ভূমিকম্প হলে বেশ হয় - সবাইকে বাঁচিয়ে মাথায় চাংগরের বাড়ি খেয়ে হাসতে হাসতে মরবো - সবাই হাত তালি দেবে| এবং পরদিন খবরের কাগজে নাম উঠবে - ব্যাস মানব জনম সার্থক| কিন্তু এমনই কপাল যে পুকুরের পাশ দিয়ে গেলেও একটা ছোটখাট ছেলে পিলে ডুবতে দেখি না যে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচাবো - কি দুক্কু! আবার ওদিকে যেসব জিনিস সামনেই দেখি সেসব করতেও ইতস্তত করি! আমার এক বন্ধুর অনুরোধে একটি মেয়েকে একটি রাতের জন্যে আমাদের বাড়ি আশ্রয় দিতে পারি নি, মাঝরাতে বাইরে তার করুন আবেদন বালিশে আড়াল করার চেষ্টা করেছি - জানি না সে কি ছিল...

সি৯এইচ১৩এন ও৩

- এভরিথিং ইস ওকে, বাট আই আফ্রেড দেয়ার ইজ সামথিং মিসিং| - মিসিং হোয়াট? ক্যান ইউ এক্সপ্লেন? - ওয়েল, আই থিংক দা কভার ল্যাকস দা প্যাশন ইট ডিমান্ডেড – ইউ নো হোয়াট আই মিন| - হুমম| আই আন্ডারস্ট্যান্ড| - সো উইল ইউ প্লিজ রিভিউ দিস ওয়ান্স? - ওকে, লেট মে ট্রাই| - থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ – এন্ড সো সরি ফর বিয়িং সো চুজি| - নো প্রবলেম এট অল| - থ্যাঙ্কস| বাই| - বাই – টক টু ইউ সুন :)

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...