সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নারায়ন দেবনাথ পুরস্কার ২০১৮

আমার মতো একটু যারা 'মধ্যবয়স্ক' তাদের হয়তো মনে আছে পশ্চিমবঙ্গের কোথাও অনেককাল আগে একবার একটা ছোট প্লেন ভেঙ্গে পড়েছিল| মাঠের মাঝের ঘটনা - সেখানে দুই ভাই - মানে জন-মজুর ধরনের লোক আর কি, কাজ করছিলো| বিনা মেঘে বজ্রপাত দেখে তারা সটান গিয়ে প্লেনের দরজা-মরজা খুলে পাইলটকে জলজ্যান্ত উদ্ধার করে| সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে সাহসিকতার জন্যে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে সন্মানিত করা হয়|

যাকগে - অধম ধরাধামে অবতীর্ণ হওয়ার বছর চার-পাঁচ বাদে 'শুকতারা' নামক একটি বেজায় মজার বই হাতে পায় - তার প্রথম পাতায় বেদম রঙিন মারদাঙ্গা, মলাট ওল্টাতেই সাদা কালো আর গোলাপীতে দারুন শক্তিশালী মজা! তার আগে অধম দেওয়ালে নানা শিল্পকর্ম করে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেছে| এবার অক্ষর জ্ঞান হওয়ার থেকে শুকতারা, অমর চিত্র কথা, ইন্দ্রজাল কমিক্স মারফত অধমের কল্পনা আর ইচ্ছা ব্যাপক হারে বিকশিত হয়, তার থেকে পরে পরে ... সে অন্য গল্প|

এইবার আসল কথা - শুকতারা বা কিশোর ভারতীতে কৌশিক, বাঁটুল ডি গ্রেট, হাঁদা ভোদা, বাহাদুর বেড়াল, নন্টে ফন্টের নামের নিচে নারায়ন দেবনাথ বলে একজনের নাম থাকতো| সেসব আবার পাতলা বই হিসাবেও কিনতে পাওয়া যেত, সেখানেও নিচে লেখা নারায়ন দেবনাথ|

আপামর মফস্বলবাসী বাঙালি ছোঁড়ার মতো যেটা ধারণা ছিল ওটা একটা 'কিছু'র নাম - মানে সে ভদ্রলোককে সেভাবে সাধারণ মানুষ বলে ভাবার দু:সাহস দেখাইনি কোনদিন| যেমন ভাবে ময়ুখ চৌধুরী, দিলীপ দাস এবং অবশ্যই বিমল দাস - ব্যক্তি হিসাবে এনাদের কল্পনা করাটাই অধমের নিজের কাছেই ধৃষ্টতার আরেক সংজ্ঞা|

তবে শিল্পী দূরতম স্থানে থাকলেও তার শিল্প কপি করতে বা তার থেকে উদ্বুদ্ধ-উত্সাহিত হতে তো কোনো বাধা নেই| সুতরাং অধমের বাপ-মার কল্যানে আঁকার ইস্কুলে যাওয়ার সৌভাগ্য হলেও 'আসল' ছবি বলতে ঐ পাতলা বইগুলির চমত্কার চমত্কার জিনিষ গুলো দেখতে, সাদাকালো গুলোকে রং করতে, কার্বন মারতে বা এমনি এমনি খাতায় আঁকতে বেজায় ভালো লাগতো - একদম|

পাকে চক্রে যা দাঁড়ালো এঁকে যুকে করে কম্মে খেতে এখানে বসে তেমন জুত হয় না - আবার মাস্টার হিসাবেও আমি যথেষ্ট খারাপ, কাজেই চ্যাটাই-এর ব্যবসাও তেমন সুবিধা মনে হয় না| সুতরাং কি করে খুঁটে খাওয়া যায় - কি থেকে চাট্টি পহা আসে সেই চিন্তায় আঁকাজোকা থেকে লাগাও কাল্টি| সত্যি বলছি নানা জায়গায় নানারকম চাকরি বাকরি করে দেখেছি কোথাও সেরকম সুবিধা করে উঠতে পারি নি - মাইরি|

তবে কম্বল ছাড়ানো তেমন সহজ নয়! লাস্ট যখন চাকরি করতাম সেখানেও ফাঁকা সময়ে জেরক্সের উল্টো দিকে হিজিবিজি কাটতাম মনের আনন্দে|

এবার যেটা হলো একটা ফাইন জিনিসের সাথে মোলাকাত হলো - ইন্টারনেট| আর সেখানে নানারকম লোক জনের সাথেও পরিচয় হলো - অবশ্যই ভিনদেশী মানুষ তারা| তাদের কাছে কৃতজ্ঞ যে তারা সন্মান নয়, মজুরি তে বিশ্বাসী - এবং আমি যা করতে ভালবাসি তার জন্যে তারা ন্যায্য মজুরিও জিজ্ঞাস করে নেন! তাদের ভরসাতে আবার ছেলেবেলার ভালো লাগার জিনিষ করতে উদ্বুদ্ধ হই এবং বলতে গেলে তাদের পুরোপুরি উপর নির্ভর করেই নিজের কাছেই অস্বস্তিকর - পাকাপাকি ভাবে চাকরি জীবন ছাড়তে সাহস পাই|

বলে রাখা ভালো যে ডেভিয়ান্ট আর্টের সুত্রে বেশ কিছু 'মানুষে'র আঁকা কমিক্সের পাতা দেখেছি - তাদেরকে নোট পাঠালে অবাক হয়েছি যে তারা তার উত্তর ও দিয়েছেন! কমিক্স আঁকবার প্রবল বাসনা ছিল হয়তো অবচেতনে - জানি না, মুর্খ লোক, তাই হয়তো লেখালিখির থেকে আঁকাজোকাই বেশি ভালো লাগে দেখতে - তবে সেইসব মানুষ গুলি যারা নোট ও মেলের উত্তর দিয়েছিলেন - তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতেই হয়, কমিক্স মানুষেই লেখে আর মানুষেই আঁকে এই জিনিসটা বোঝানোর জন্যে|

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য বাংলার পত্রিকা-প্রকাশকরা ব্যতিক্রমী - ওয়েবসাইট খুঁজে মেল জোগার করে সাধুবাদ জানালেও তার কোনো উত্তর কেউ কোনদিন দেন নি| লেখক-শিল্পীদের সাথে যোগাযোগ করবার ইচ্ছা থাকলেও সে উপায় হতে আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে - যতদিন না ‘এখানকার’ মানুষ ইন্টারনেট বলতে একমাত্র ফেসবুক বা হোয়াটসএপ বুঝতে শিখছেন|

খবরের কাগজে পড়েছিলাম বিমল দাস মারা গেছেন - তখন বুঝেছিলাম যে উনিও একজন মানুষ| একসময়ে ফেসবুকের দৌলতে আলাপ হলো শান্তনু ঘোষের সাথে| তার থেকেই জানা গেলো যে আরেকজন গুরুদেব - 'নারায়ন দেবনাথ' - তিনিও মানুষ আর বহাল তবিয়তে বিরাজমান| শান্তনুরই বদৌলত কথা বলবার সৌভাগ্য হয়েছিল ওনার সাথে - স্বর্গীয় অনুভুতি!

ফেসবুকের কল্যানেই আবার আলাপ হলো কজন মানুষের সাথে – ভিনদেশী অবশ্যই, তাদের গল্পে, উত্সাহে এবং অবশ্যই পারিশ্রমিকে ছবিতে গল্প আঁকবারও শখ পূরণ হলো| সব থেকে মজাদার জিনিষ : দেশীয় উত্সাহী যারা আছেন তারা কেবল শখেই পত্রিকা বানান, কমিক্স করবার কথা ভাবেন – বাজার ও পাঠকের মানসিকতাই এর একমাত্র কারণ হয়তো – কিন্তু ভিনদেশীরা পুরো ব্যাপারটাকেই বানিজ্যিক ভাবে দেখেন| যেকারণে স্বাবলম্বী কারিগর হওয়ার দরুন পুরো ব্যাপারটাই অনেক বেশি ভরসাপ্রদ|

গুরুদেবের অন্যতম চ্যালা শান্তনু’র সাথে খানিক আগেই কথা হচ্ছিলো : আমি এ পুরস্কারের যোগ্য একদমই নই – কারণ যে বইয়ের কারণে এই প্রাপ্তি, সেটি আমার আঁকা প্রথম – এবং হয়তো বা শেষ বাংলা গ্রাফিক নভেল| আমি সাধারণ মজদুর মানুষ, সন্মানিত হওয়ার স্বপ্নও বিলাসিতা, উত্সাহিত হওয়াটাও অধমের কাছে বাহুল্য|

স্বনিয়োজিত হওয়ার দরুন কারিগরিই আমার একমাত্র দিনাতিপাতের ভরসা, বলতে নেই এই কমিক্সের লেখক সত্ ভাবেই তার সামর্থ্য অনুযায়ী আমায় উপার্জনের দিকটাও দেখবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু যদি সময় ও প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে পারিশ্রমিক হিসাব করা যায়, সেটা দুমাসের পরিবর্ত্তে মাত্র দশ-পনেরো দিনে ‘স্বাভাবিক ভাবে’ই অধম করতে সক্ষম| যেহেতু এ ছাড়া আমার আর কোনো পেশা – অর্থাগমের আর কোনো উপায় নেই নেই, সুতরাং একজন স্বপার্জনশীল কারিগর হিসাবে বহুভাষিক একটি রাষ্ট্রের একটি আঞ্চলিক ভাষায় কমিক্স বা গ্রাফিক নভেল বানানোর আবেগ পোষণ করাটা হয়তো আমার কাছে আত্মহত্যারই নামান্তর হবে|

তবে তাও – যে মানুষগুলির জন্যে হয়তো বা আমার কারিগরির ইচ্ছেটা শিশুকাল থেকেই সজীব আছে – তাদেরকে অস্বীকার করা মানে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা| কাজেই আমি কৃতজ্ঞ স্বয়ং নারায়ন দেবনাথের কাছে| ধন্যবাদ দিই বুক্ফার্ম, শান্তনু ঘোষ, সুমিত সেনগুপ্ত, কৌশিক দত্ত এবং নারায়ন দেবনাথ পুরস্কারের সাথে জড়িত সকল মানুষকে|

এই পুরস্কারের আরেকটি গুরুত্ব আছে আমার কাছে – ব্যক্তি নারায়ন দেবনাথ, প্রতুল ব্যানার্জি, বিমল দাস, ময়ুখ চৌধুরী বা ‘সেই সময়ে’র আরও যারা অলঙ্করণ শিল্পী ছিলেন, নিজের সাথে মিলিয়ে দেখলে বর্তমানে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের রাস্তায় পা সৌভাগ্য হয়েছে আমার| তারা ভাগ্যবান তারা মুদ্রণ-মাধ্যমের স্বর্ণযুগে পেশাদার প্রকাশক ও সম্পাদকদের সাথে কাজ করবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন| স্থান, কাল ও মাধ্যম ভিন্ন হলেও আমার একটি ফেসবুক ‘অনুরোধ’ উদ্ধৃত করে বলতে পারি – আমার শখ পূরণ করার জন্যে অন্য কোনো পেশার অবলম্বন প্রয়োজন হয় নি|

সেই নিরিখেও আমি এ পুরস্কারে যথেষ্ট সন্মানিত!

তবে হয়তো এই উদ্যোগে অন্য অনেক মানুষই, অনেক কারিগরই কমিক্স ও অলঙ্করণ সম্পর্কিত পেশায় আগ্রহী হবেন| অনতিবিলম্বে মাতৃভাষায় আরো কিছু ভালো কমিক্স পড়তে পারবো – পেশাদার হিসাবে নয়, একজন পাঠক হিসাবে সেটাও আমার পরম প্রাপ্তি হবে|

গেঁয়ো মজুর হিসাবে মঞ্চ ও মাইক সম্পর্কে অধমের প্রচুর ভীতি আছে – সুতরাং এটিকেই পুরস্কার প্রদানের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ধরে নেওয়ার জন্যে জনগনকে প্রচুর ধন্যবাদ জানাই|

প্রথমে যে দু ভাইয়ের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, পুরস্কার-টুরস্কার তো ভালই ছিল, কিন্তু গন্ডগোল বাধলো পরে! পুরস্কারপ্রাপ্ত লোক, তাদের তো আর হুট বলতেই মাঠের কাজে ডাকা যায় না - সুতরাং পরবর্তী খবর অনুযায়ী সে বেচারারা না খেতে পেয়ে মরতে বসেছিলো শুনেছিলাম|

খ্যাতির বিড়ম্বনা যাকে বলে এক কথায়!

শান্তনু’র পুরস্কার-সম্পর্কিত পোস্ট থেকেই হয়তো, ইদানিং প্রচুর মানুষের বন্ধুত্ব লাভে অভিভূত| তবে তার সাথে নতুন বন্ধুদের নানা অদ্ভুত ‘নিঃস্বার্থ’ অনুরোধেও অধম খানিকটা আতঙ্কিতও – ঐ দুই ভাইয়ের মতই|

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমার পড়া প্রথম ইন্দ্রজাল কমিকস

আমি অনেক ছোটবেলায় লিখতে পড়তে শিখি - যখন আমার চার-পাঁচ বছর বয়স সে সময়ে আমি নিজের চেষ্টা আর ইচ্ছেতেই একাএকাই আমার পরিচিত শিশুপাঠ্য বইপত্তর পড়তে পারতাম এবং সবথেকে বড় কথা হলো ব্যাট-বলের বদলে সেই বই গুলিই আমার কাছে অনেক প্রিয় ছিল| বাবা'র বদলি'র চাকরি ছিল, কাজেই ছ'বছর বয়সে যখন আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই, থিতু হওয়ার প্রয়োজনে আমি আর আমার মা তখন আমাদের এই শহরেই পাকাপাকি ভাবে বাস করতে শুরু করি| বাবা থাকতেন দুরে - বিহারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাঁধ-বাঁধা'র দায়িত্বে| বাড়ি ফিরতেন পনেরো দিনে বা মাসে একবার করে| অন্যান্য শিশুদের মতন আমার বাবা ফেরার সময়ে কোনো উপহারের চাহিদা থাকতো না - বাবা নিজে যে সশরীরে আমাদের কাছে আসছেন - সেটারই গুরুত্ব ছিল সবথেকে বেশি|

উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্য পুরস্কার

একটু নয়, প্রচুর দেরি করেই – ইয়ে কি বলে আবার একটু ঢাক পেটাপিটি করি| তবে সেদিক থেকে ধরতে গেলে ভবিষ্যতে আমার ডিজে হওয়ার রাস্তাও খুলছে হয়তো পরোক্ষ ভাবে| আসল সাফাই হলো ‘আমার মতো’ যারা কাজ করেন, তারা হয়তো উপলব্ধি করেছেন যে এপ্রিল মে থেকে কাজের স্বাভাবিক চাপ শুরু হয় আর তা বাদে যেহেতু ব্যক্তিগত ভাবে আমার পুরস্কার-টুরস্কার পাওয়ার সেরকম অভ্যাস নেই, সেই দিক থেকে - তবে ঘটনা, একবছরে পরপর দুবার পুরস্কার প্রাপ্তি আর তার সাথে ইদানীন গপ্পো লেখারও ঝোঁক বেড়েছে খানিক, কাজেই সবে মিলে ... যাকগে! জ্ঞানীগুনী যারাই আছেন তাদের কাছে ব্যাখ্যা করার দরকার না হলেও, সাধারণ মানুষ হয়তো কৌতুহলী হবেন যে এই উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্যের ব্যাপারটা কি! দেখুন, মানুষ একটি অদ্ভুত জন্তু – সেভাবে বলতে গেলে এদের রাম-টু-রম রেশিও অন্যান্য জন্তুর তুলনায় অনেক বেশি মানে একোয়ারড মেমরির থেকে প্রিন্টেড মেমরি অনেক কম| জীবন বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা খুবই কম, তাও আমার সেকেন্ডারি ব্রেন, মানে ইন্টারনেট থেকে যা জানা, মানব মস্তিষ্কের ডানদিক আমাদের সাথে বেজায় মজার মজার খেলা খেলে! কল্পনা, সৃজনশীলতা – এগুলি অন্য জন্তুদের ভিতর সেভাবে প্রকট কি? হয়ত...

জাতিস্বর

জাতিস্বর দেখলাম - আশ্চর্যের বিষয় যে স্কিপ করে করে না দেখে একটানা প্রথম থেকে শেষ অব্দি দেখলাম|