সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মেঘ্সফর

"কোথায় যাচ্ছ বাবা?"

বিকালের রং আস্তে আস্তে সন্ধ্যায় মলিন হচ্ছে - নাম না জানা কোন গ্রামের মেঠো রাস্তা দিয়ে বাবা'র প্রিয় 'জাওয়া' মোটরবাইক ছুটে চলেছে আর তার সাথে আমার 'একটিভা'র পাল্লা দিতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছি আমি| পাছে বাবা আবার আগের মতো হারিয়ে যায় তাই 'জাওয়া'র সাড়ে তিনশ সিসির ইঞ্জিনের গুরুগম্ভীর গর্জন ছাপিয়ে চিত্কার করে জিজ্ঞাস করলাম আমি|

বাবা'র বাইকের গতি কিছুটা কমলো, আমি অনভ্যস্ত প্রতিবর্তে আমার স্কুটারের খুদে চাকাদুটোকে প্রানপন গতিময় করতে চাইলাম - বাবার সাথে সাথে না হোক অন্তত বাবার পিছন-পিছন যেতে চাই আমি| ধুলো'র মেঘ ঝাপসা হয়ে এলে পিছন থেকে বাবাকে দেখতে পেলাম আমি, সেই দীর্ঘ্য বলিষ্ঠ চেহারা, সোজা মেরুদন্ড, দৃপ্ত বসবার ভঙ্গিমা|

মায়ের কাছে জেনেছিলাম আমার বাবা খুব দুর্দান্ত মানুষ ছিলেন, চাকরি সুত্রে সারা দক্ষিন ভারত পুরো চষে ফিরেছিলেন, বাংলা-ইংরাজি-হিন্দি ছাড়াও দক্ষিন ভারতের পাঁচ-ছ'টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন| বাঁধ-বাঁধা'র কাজে এমন কোনো আদিম উপত্যকা ছিল না যেখানে বাবা যাননি| বাইকে দীর্ঘ্য ভ্রমণ পথে চম্বলের ডাকাতের কবলে পড়েছেন| দক্ষিনের কোন নাম-না-জানা গহন অরণ্যে দেখা পেয়েছিলেন ভারতের আদিমতম মানবজাতির|

আমি স্বভাবে বাবা'র বিপরীত, সারা ভারত যেরকম বাবার ঘর ছিল, আমার ক্ষেত্রে আমাদের বাড়িই আমার পৃথিবী| বাবা'র কোনো গুনই আমি পাইনি প্রায়, মায়ের দিকের জিনের প্রভাবে আমি ঘরকুনো বাঙালি|

"আরো একটু যাই|" - ঘাড় না ঘুরিয়েই বললেন বাবা|
"কোথায়? সন্ধ্যে হয়ে আসছে| আকাশে মেঘ করেছে|"
"চলো না, রাস্তার কি শেষ আছে কোনো?"
"তা তো বটেই" মনে মনে বাবাকে সমর্থন করলাম আমি, "তুমি তো চলতেই ভালোবাসতে|"

বাবা'র কোনো দিন কোনো স্থায়ী ঠিকানার ইচ্ছা ছিল না| কোডাইকানালে একটা জমি কিনেছিলেন একসময়ে, কিন্তু সেখানেও বাড়ি করা হলো না| শুনেছিলাম পন্ডিচেরিতে অরবিন্দ আশ্রমে ঠিক-ঠাক করে রেখেছিলেন যে চাকরি ছেড়েই সন্যাসী হবেন| বাধ সাধলেন আমার ঠাকুরদা| পারিবারিক বিসম্বাদে অবশেষে গৃহস্থ হলেন| তারপরেও চেয়েছিলেন যে কোনো স্থায়ী ঠিকানা না রেখে সপরিবারে ঘুরে বেড়াবেন সারা ভারত - যখন যেখানে ইচ্ছে, যখন যেখানে ভালো লাগে| কিন্তু এবারে বাধা পড়তে হলো মায়ের আব্দারে, নিজের বাড়ি ছাড়া কি হয় কখনো? বারাসাতে জমি কেনা হলো, কিন্তু আত্মীয় স্বজন তো সব এই বসিরহাটে, অতদূর থেকে কি করে যোগাযোগ করা যাবে? কাজেই শেষমেষ আমাদের বসিরহাটেই পাঠালেন বিধাতা|

"তুমি তো ছুটেই চলেছে! কোথায় যাচ্ছে বলবে তো?"
"বকবক না করে চালাও আমার সাথে সাথে|"
ধমক নয়, স্নেহের শাসন|

"কে বেশি ভালোবাসে - বাবা না মা?" ছেলেবেলায় এরকম প্রশ্ন শুনলেই কোনো কিছু না ভেবেচিন্তেই উত্তর দিতাম "বাবা|"

বাবা ছাড়া আর কে বেশি ভালবাসবে? পরিবারে একজনের শাসনে ও আরেকজনের স্নেহেই বাচ্ছারা বেড়ে ওঠে - একেবারে ছোট্টটি ছিলাম যখন, তখন দুজনেই আমার পাসে ছিলেন, কিন্তু একটু বড় হয়ে উঠতেই আমার পড়াশুনো'র জন্যে আমি আর মা রয়ে গেলাম বসিরহাটে আর বাবা চাকরি সুত্রে বিহারের চান্দিলে| কাজেই ভাগ-বাটোয়ারা হলো এরকম যে মাসের মধ্যে সাতাশ-আঠাশ দিন মায়ের শাসন-ধমকে জুজু হয়ে থাকা আর বাবা এলেই বাকি দুতিনদিন হাতির পাঁচ-পা দেখা| সুতরাং শাসন কর্তার ভুমিকায় বাবাকে দেখিনি কোনদিন|

বাবার সাথে গতি মিলিয়ে চলতে চলতে দেখছি চারিদিক - এই রাস্তায় এসেছি কি কোনোদিন? হয়তো এসেছি| পিচের নয়, মাটি'র রাস্তা| দুদিকে কখনো মাঠ, চাষের ক্ষেত, বট-অশ্বথ ঘেরা একটা-দুটো গ্রামও পেরিয়ে এলাম মনে হয়| একটা জঙ্গল মতো কি যেন দেখা যাচ্ছে একটু দুরে রাস্তার বাদিকে| তার ওপাশে চকচক করছে কি ওটা? আমার ছেলেবেলায় আঁকার খাতায় যে নদীটাকে কল্পনায় এঁকেছিলাম সেটা কি? হতেও পারে| একটা পুকুর দেখলাম - একদল মহিষের নাক-চোখ-সিং ভাসছে তাতে, আমি তো এরকম কোনো জায়গা দেখিনি আগে| কি জানি বাবার কাছে শোনা গল্প থেকেই তারা হয়তো আমাদের যাত্রাপথে সামিল হয়েছে|

সতেরো-আঠেরো বছর বয়সে মাতৃহীন হন আমার বাবা| তখন থেকেই বাবার পথচলা শুরু| বিশ্বকর্মার বংশধর আমরা, তাই যেখানেই প্রযুক্তিগত কলাকৌশল প্রয়োগ করার সুযোগ ছিল সেখানেই বাবা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন প্রবল উদ্যমে| রেললাইন পাতা থেকে আর্থ-মুভার তদারকি, বিমান মেরামতি থেকে বাঁধ-বাঁধা - তিরিশ-পইতিরিশ বছরের চাকরি জীবনে এমন কোনো কাজ নেই যে করেন নি বাবা| অশোক-লেল্যান্ড, হিন্দুস্তান কনস্ট্রাকসন এরকম গোটা বারো-তেরো কোম্পানী'র সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল বাবার| কিজানি বাবার এই চরৈবতীইই হয়তো আমার অস্থিরমতির কারণ| সারাজীবন বাড়ি-অফিস-অফিস-বাড়ি এরকম একটা যাওয়া-আসার বৃত্তে আটকে পড়ে থাকবো ভাবতেই গায়ে জ্বর আসতো আমার|

মেঘ কিনা কে জানে, আকাশের রং গাড় হয়ে আসছে| দেখতে পাচ্ছি 'জাওয়া'র হেড-লাইট, টেল-লাইট জ্বলে উঠলো| রক্তাভ আলোয় জ্বলজ্বল করছে নাম্বার-প্লেটের 'টি এন ইউ ৩১৬'| 'একটিভা'র আলো জ্বালায় কোথা থেকে? ডানহাতে সুইচ নাকি বাঁহাতে? রাস্তায় চোখ রেখে অনভ্যস্ত হাতে এটা-ওটা টেপা-টিপি করতে গিয়ে হঠাৎ হর্নের আওয়াজে চমকে উঠলাম, তারপরেই আমার সামনের রাস্তা দৃশ্যমান হলো| যাক অবশেষে সাফল্য| এখনো প্রতিদিন দিনের বেলা বেরুলেই কেউ না কেউ বলে দেয় যে সামনের আলো জ্বলছে| বাবা কেবল 'জাওয়া'রই সোয়ারী করেছিলেন প্রায় বারো বছর, ওটা তার চার কি পাঁচ নম্বর বাহন| আমার জন্মানোর আগে চার সিলিন্ডারের রাক্ষুসে যন্ত্রবাহনও তার পোষ মেনেছিলো| তবে বাবার সখের 'টুনু' শেষ পর্যন্ত তামিলনাডু থেকে পশ্চিমবঙ্গের এই ছোট্ট শহর পর্যন্ত এসেছিলো|

একটা তেরছা ব্যাঁক কাটিয়ে রাস্তাটা সরু হয়ে এলো| দুদিকে দোকানপাট দেখা যাচ্ছে| হ্যাঁ - এই জায়গাটা চেনা মনে হচ্ছে যেন|একটা টিনের চাল-ওয়ালা দোকানের সামনে বাবা বাইক দাঁড় করলেন| এইবার চিনেছি দোকানটাকে| তবে এটা এই জায়গায় থাকবার কথা নয়| এইরকম এক দোকানে এক বৃষ্টির সন্ধায় আমি মা আর বাবা দাড়িয়েছিলাম - কোথা থেকে আসছিলাম যেন মনে নেই| মনে আছে দোকানের সামনের চালার নিচে বাবার বাইক দাঁড় করানো আর বাবা সেই দোকানের মালিক, জিনি কিনা আমার বাবার বাল্য বন্ধু তার সাথে গল্পে মশগুল| আমি আনমনে বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়া দেখছি| এটা সেই দোকানটাই হতে পারে হয়তো| তবে সেটা এ রাস্তায় ছিল না|

আমি ডাবল-স্ট্যান্ডে স্কুটার দাঁড় করানোর জন্যে হ্যাঁচকা-হেঁচকি করছি, বাবা আমার পাশ কাটিয়ে দোকানের ভিতরে ঢুকে একটা বেঞ্চিতে পা ছড়িয়ে বসলেন|

"বসো|"
বাবার পাশে বসলাম, ছেলেবেলা থেকে বড় সাধ ছিল যদি বাবার মতো চেহারা পাই - কিন্তু আমার পইতিরিশ বছর বয়সেও বাবার পাশে কিরকম যেন শিশু-শিশু লাগছে| একযুগ আগে বাবা যেরকম ছিলেন এখনো সেরকমই আছেন উনি| একদম শিশুকালে গোলগোবিন্দ চেহারা থাকলেও আমার দু-তিন বছর বয়সে নানা ব্যাধি-ব্যয়রামের পাল্লায় প্যাকটি হয়ে যাই| যখন এইট-নাইন-টেনে পরি সেসময় বাবার কাছ থেকে খালি হাতে বায়াম ছাড়াও নানা যোগাসন ও প্রাণায়াম শিখি| দিব্যি শরীর মন্দির তৈরী হচ্ছিলো, কিন্তু মাধ্যমিকের পরেই মতিভ্রম - বিকেলে ব্যায়ামের পরিবর্তে বায়ুসেবন এবং ধুম্রপান স্বাস্থ্যকর না হলেও মনোরঞ্জক তো বটেই|

"বাবা - বাড়ি যাবে না?"
"কেন? বেড়ানো'র সাধ মিটে গেছে?"
"না - তা না, আসলে সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আর তা বাদে আকাশে মেঘ-মেঘ করছে|"
"তাতে কি হয়েছে? এরকম সাহস নিয়ে আদ্ভেন্চার করবে?"

আমি হাসলাম - আদ্ভেন্চার? আমি? কি জানি! ছেলেবেলায় স্কুলে এক স্যারের কাছে রামনাথ বিশ্বাস নামে এক ভ্রমনকারীর কথা শুনেছিলাম - উনি প্রথম ভারতীয় যিনি সাইকেলে সারা বিশ্ব ঘুরেছিলেন| স্কুল থেকে বাড়ি এসে বাবাকে এই তাক লাগানো তথ্য জানিয়ে চমকে দেবো বলে ভেবেছিলাম, কিন্তু শুনলাম বাবার সংগ্রহে ওনার দু-তিনটি বই ছিল| বাবা রাস্তায় নেমে রাস্তা চিনেছেন, কিন্তু আমার ভরসা তো বইয়ের অক্ষর| প্রথম সাইকেল চালাতে শিখে অজেয় রায়ের দেবু আর শিবের সাইকেল ভ্রমণের উপন্যাস পড়ে ভেবেছিলাম যে হ্যাঁ, ওরকম রাস্তায় নামতে হবে একসময়ে| কিন্তু বসিরহাট থেকে কালিনগর, মাত্র সাতাশ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েই যখন হাত-পা খুলে আসবার জোগার হলো তখন বুঝলাম ও আমার দ্বারা সম্ভব নয়| বসিরহাট হাইস্কুলের ল্যাব-এসিস্ট্যান্ট দেবাশীষ-বাবু'র সাইকেলে সাটা নানা তকমা দেখে শিহরিত হতাম| আমার প্রথম কম্পিউটার শিক্ষক পরিমল'স্যারের সাইকেলে দার্জিলিং অভিযানের বৃত্যান্ত উদগ্রীব হয়ে শুনতে চেয়েছিলাম| কিন্তু বাস্তবিক আমার মতো ঘরকুনো মানুষের কাচ্ছে হিমালয় ভ্রমণ বরেন গঙ্গোপাধ্যায় বা রাহুল মজুমদারের লেখায়| সত্যি পথে নামবার সাহস কি আছে আমার?

"যদি বৃষ্টি নামে?"
"ভালই হবে - যা গরম পড়েছে!"

আমি বলতে পারছি না যে আমায় বাড়ি টানছে, সেখানে মা আছে, অর্পিতা আছে| এই সন্ধ্যেবেলা নিজের চেয়ারে বসে অর্পিত'র হাতের সদ্য বানানো ধুমায়িত চা সহযোগে ধুম্রপান, ইমেলে কাজকম্মের তত্বতালাস, ফেসবুকবাজি আর তার সাথে মায়ের ঘরের টিভি থেকে ভেসে আসা 'বাহামনি'র হাহাকার' এই চেনা ছকের জীবনের বাইরে বেরুতেই ভরসা হয় না এখন|

চায়ের কথা মনে আসতেই দেখলাম কোথা থেকে কে একটা যেন দুটি বড় গ্লাস ভর্তি চা দিয়ে গেলো আমাদের| গন্ধেই বুঝতে পারছি এটা আমাদের বাঙালি চা নয়, বিহারী মোষের দুধের মালাই-মার্কা চা কি? তা ছাড়া আর কি হতে পারে! যে লোকটি চা দিয়ে গেলো তার চেহারাও যেন চিনি চিনি করে চিনতে পারলাম না - কোথায় দেখেছি তাকে? কোলাঘাটের রাস্তার ধারের যে দোকানটা থেকে আমরা চিংড়ির চপ খেতাম, তার পাশে যে চায়ের দোকানটি ছিল এ সেখান থেকে আসেনিতো?

"বলো কিরকম লাগছে?"
"কি?"
"এই যে এখন আমরা একসাথে চলেছি|"
"একসাথে কোথায়? আমি তো তোমার রাস্তা ধরে চলছি শুধু - তোমার গতি'র সাথে আমি পাল্লা দিয়ে চলতে পারি তাই?"
"কেন পারো না?"
"জানই তো, আমি তোমার মতো ডেয়ার-ডেভিল নই বাবা|"

বাবা হাসলেন - বিদ্রুপ নয়, ঔদাসীন্য|

"এবার জন্মদিনে কি হলো?"
"কি আবার হবে" হাসলাম আমি "এখন কি আর জন্মদিনের করার মতো বয়স আছে আমার?"
"নেই বা কেন? আগে ছেলেবেলায় বই-বই করে মাথা খারাপ করে দিতে মনে আছে?"
"তা থাকবে না আবার? আমি তো সেই সব গল্প প্রায়ই করি 'অপু'র সাথে|"
"এবারে কোনো বই কিনলে না?"
"নাঃ!"

বাবা আর আমি দুজনে চায়ে চুমুক দিতে থাকি| আমাদের এই কথোপকথনের মাঝেই বাইরে কখন সন্ধ্যার অন্ধকার গাড় হয়েছে খেয়াল করি নি| যেখানে আমরা বসে আছি সেই দোকানে দিব্যি হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে, কিন্তু রাস্তার ওপাশের অন্য কোনো ঘর-বাড়িতে আলোর দিশ্মাত্র নেই|

"বই কিছুই কি কেন নি এবার?"
"নাগো - কি বলবো, আর ভালো লাগে না"
"বই ভালো লাগে না?" যেন চমকে উঠলেন বাবা|
"না না, তা বলতে চাই নি! আসলে কি বলত, সেই বয়সটা নেই আর - ছেলেবেলায় নতুন বই কিনলেই প্রথমে মাঝখান থেকে খুলে লম্বা নিশ্বাস নিয়ে পাতার গন্ধ শুঁকতম| এখন তো সেই গন্ধ আর পাই না বাবা| যখন তোমরা লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতে তখন চেনা লেখকের অচেনা বই দেখলেই যেরকম আনন্দ হত - এখন তারাই তো আর নেই, আর সেরকম বই দেখলেও মনে হয় সবই তো পড়া|"
"তা অবশ্য|"
"ছোটবেলায় পুজোতে বই বই করে এতো আবদার করতাম যে মা বলত 'এবার কোনো জামাকাপড় নয়, কেবল বই পরেই রাস্তায় ঘুরতে হবে' - মনে আছে তোমার?"
"তা থাকবে না?"
"ছাপানো কাগজ এখন আস্তে আস্তে নস্টালজিয়া হয়ে যাচ্ছে বাবা - আমারও বয়স হচ্ছে|"
"কিন্তু তুমি তো বই পড় এখনো|"
"পরি বলতে ইন্টারনেটে পুরনো বই জোগার করি, যে বইয়ের কথা মনে পড়ে খুঁজে দেখি কেউ কোথাও তুলে রেখেছে কিনা - চকচকে ভালো কাগজে ছাপানো নতুন বইয়ের বদলে হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজের স্ক্যান থেকে বানানো পিডিএফ বেশি ভালো লাগে| মনে আছে আগে স্কুল থেকে ফেরার সময়ে হাটের ভিতরে একটা কাগজের দোকান হাঁটকে গুচ্ছের পুরনো বই নিয়ে আসতাম?"
"হ্যাঁ - তুমি আর শামিম তোমরা দুজনে ওখান থেকে অনেক বই জোগার করেছিলে|"
"সেরকম এখনো ইন্টারনেটে খুজি কোথায় কার কাছে আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া বইগুলো লুকিয়ে আছে|"

কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক ছিলাম তাই মনে হয় নি, কিন্তু কথা থামতেই মনে হলো এবার ফেরা দরকার| বাবা সেভাবেই পা ছড়িয়ে বসে পরম নিশ্চিন্তে চা শেষ করছেন| বাবার পায়ের দিকে তাকাতেই মনে পরে গেলো কত দুর্ঘটনার চিহ্ন ঐ দুটি পায়ে চিহ্নিত আছে| অন্ধ্র, তামিলনাডু, কোচিনের রাস্তার ছোটখাটো বা বড়সড় অনেক আঘাত-জখমের নিদর্শন দেখেছিলাম বাবার পায়ে| অবশেষে - যাক সেকথা এখন মনে না করলেই আমরা ভালো থাকবো|

"জানো তো বাবা - আর একটা সমস্যা আছে, বই কিনলেই হারিয়ে যায়| আমার খুব প্রিয় একটা বই ছিল 'দুই ইয়ারের যত কান্ড' -"
"বইমেলা থেকে কিনেছিলে, সম্ভবত একানব্বুই বা বিরানব্বুই সালে|"
"হ্যা - ঐ বইটা আমার এতো প্রিয় ছিল যে নিজে একা পড়েই ভালো লাগতো না, সবাইকে পরাতে ইচ্ছা করতো, কিন্তু একবার কাকে একটা দিলাম, তারপরে আর মনে নেই - সেও ফেরত দিলো না - কোথায় হারিয়ে গেলো|"
"হুম, আমাদের সময়ে একটা প্রবাদ চালু ছিল - 'বই আর বউ, একবার হাতছাড়া হলে আর সহজে ফেরে না|'"
"হা হা - একদম তাই|"
"কি বলত, জাগতিক জিনিসের ওটাই একটা বড় সমস্যা| নষ্ঠ হবে, হারিয়ে যাবে|"
"সেটাই - এখন কিছু পেলেই সেটা হারানো'র ভয় পাই| সেকারণে ডিজিটাল ছাড়া ভরসা পাই না কিছুতে|"
"আমি যদিও কিছু বুঝি না ও ব্যাপারে, তবুও ডিজিটাল বই বলো, সিনেমা বলো তার তো কোনো স্টোরেজ মিডিয়াম থাকছেই, নাকি?"
"হ্যাঁ - আমি আমার ল্যাপটপের হার্ডডিস্কে রেখে দিই, তাছাড়া আরেকটা বড় হার্ডডিস্ক আছে - সেখানেও থাকে|"
"তারও তো একটা লংজিভিটি আছে?"
"সেও তো আছে|"
"একদিন তো ঐসব ডিস্কেরও আয়ু ফুরোবে - তখন?"

আমি চুপ করে থাকি - কি বলি, একসময়ে শুনেছিলাম যে সিডি বা ডিভিডি'র আয়ু শতখানেক বছর| কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আগাছা জন্মে নষ্ট হয়েছে প্রচুর অপটিকাল ডিস্ক - হারিয়ে গেছে কত প্রিয় সিনেমা, কত ছবি, ছোট-খাটো কত গেমস| সিডি বা ডিভিডির ভরসা ছেড়ে তারপরে হার্ড-ডিস্কে সম্পত্তি জমাতে থাকি - চল্লিশ, আশি, একশোশাট, তিনশকুড়ি, পাঁচশ, টেরাবাইট কত রকমের কত হার্ড ডিস্কে জমে আছে কত সিনেমা, গল্প, কত পুরনো দিনের কাজকম্মো| তারাও বা ঠিক আছে কি এখনো?

নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করতে থাকি - কোনো কিছুই কি চিরন্তন নয়?

"আমার কথা তোমার মনে আছে?" বাবা জিজ্ঞাস করেন|
"মানে?" আমি অবাক হয়ে বলি|
"আমি চলে যাওয়ার পরে তুমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে আমাকে তুমি কোনদিন ভুলবে না - মনে পড়ে সে কথা?"

আমি নিরুত্তর - সত্যিই আমি কি আমার সে প্রতিজ্ঞা রাখতে পেরেছি? তুমি তো আমার কাছে আমার আঁকা শেষ বড় ছবি - তার বাইরে কি তোমার জন্যে আলাদা করে এই বারো বছরে ভেবেছি?

"তোমার কি মনে হয় আমি হারিয়ে গেছি তোমাদের কাছ থেকে?"
"না বাবা - কখনই নয়!"
"তাহলে?"

বাবা কি বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি আমি|

"আমরা এই যে এতটা রাস্তা এলাম - এটা তুমি চিনতে?"
"চিনতাম মানে - এরকম ভাবে নয়| আমার যেটা মনে হচ্ছে তোমার আর আমার স্মৃতি আর কল্পনার টুকরোটাকরা জুড়ে এটা তৈরী হয়েছে|"
"ঠিক তাই! দেখো, যেটা তোমার ভালো লাগে সেটাকে যদি সব থেকে যত্নে কোথাও গুছিয়ে রাখতে হয় তাহলে সব থেকে ভালো জায়গা হলো তোমার স্মৃতি - তার থেকে নিরাপদ জায়গা আর কোথাও হতে পারে না!"

সেতো বটেই, বইগুলো হারিয়ে গেছে - কিন্তু তাদের গল্প তো এখনো মনে আছে আমার| ছেলেবেলার অনেক বন্ধুর সাথেই এখন যোগাযোগ নেই - কিন্তু তাদের সান্নিধ্যের স্মৃতি তো এখনো অমলিন|

"কিন্তু বাবা - যদি স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করে? যদি ভুলে যাই একদিন সবকিছু?"
"যখন সময় হবে তখন সবই আবার একে একে ফিরে আসবে|" মুচকি হেসে বললেন বাবা|

সত্যিই তো! বাবার ছবি চোখের সামনে থাকলেও নিয়মিত চোখে পরে না| বিশেষ বিশেষ দিনে নিয়মরক্ষার জন্যে সেটায় প্রনাম ঠুকি| কিন্তু আমার সাধারণ জীবনের অনুল্লেখযোগ্য ছোটখাটো নানা সাফল্যে বাবা কি আমার স্মৃতিতে ফিরে আসেন না? যেদিন প্রথম আকাশ সফর করলাম, যেদিন প্রথম বেতন পাঁচঅঙ্কের সংখ্যায় পৌঁছুলো, যেদিন প্রথম নিজের ব্যবসা শুরু করলাম, দাম্পত্য জীবনে শুরু হলো - এমন কোনো দিন কি আছে যেদিন মনে হয় নি বাবা আজ থাকলে কি আনন্দই না পেতেন? আবার আমার জীবনের সংগ্রামের দিনগুলিতেও - যেমন, চাকরি না পাওয়ার দিনে ট্রেন স্টেশনে দাড়িয়ে থাকবার সময়ে, চাকরি হারানোর দিনে বাড়ি ফেরার সময়ে, ব্যবসায়ে ঠকবার সময়ে, মক্কেলের সাথে ঝগড়া করবার সময়ে, কখনো কি মনে হয় নি যে - ইস বাবা যদি এখন আমার পাশে থাকতেন তবে এসব সমস্যার কি সুন্দর সমাধান করে দিতে পারতেন?

জাগতিক অস্তিত হারিয়ে বাবা কি আমার স্মৃতিতে আছেন? নাকি অবচেতনে?

"এবার এস|" বাবা উঠলেন বেঞ্চি থেকে|

এখন পারিস্পার্শ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত| আমাদের বসে থাকা সেই দোকানের অস্তিত্ব নেই| এখন জায়গাটাকে দেখে মনে হচ্ছে গঙ্গার পাশে একটা বাঁধানো ঘাট - এরকম একটা জায়গায় বাবাকে শেষ দেখেছিলাম আমি| বাবাকে নয় - বাবা'র শেষ বাস্তব চিহ্ন, বাবার অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে ফিরে এসেছিলাম|

"সাবধানে ফির, তোমার মা, অর্পিতা ওরা সবাই অপেক্ষা করছেন|" বাবা বললেন|

আমি স্মৃতি ও বাস্তবতার টানাপড়েনে নির্বাক, মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্কুটারে চাবি লাগানোর চেষ্টা করছি| বাবার 'জাওয়া'র ইঞ্জিন জেগে উঠলো, গিয়ার বদলানো'র যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পেলাম, এক্সিলারেটরের সামান্য আকর্ষণে চাকা গতিময় হয়ে উঠলো| বাবার সফর আবার চালু হলো|

"তুমিও সাবধানে যেও বাবা - যেখানেই থাকো ভালো থাকো|"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্যলোকের মেসেজ

 ১ “নমস্কার, মোবিকমে আপনাকে স্বাগত| আমি শুভ্রা – আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” “নমস্কার নমস্কার – আমার নাম দেবাংশু লাহিড়ি, আমার নম্বর … মানে এটাই, যেটা থেকে আপনাকে কল করছি|” “হ্যা বলুন …” “দেখুন, আমার সমস্যা হলো – কদিন থেকে আমার মোবাইলে অনবরত মেসেজ ঢুকছে|” “আচ্ছা?” “হ্যা – মানে কোনো মাথামুন্ডু নেই – যতসব হিজিবিজি|” “আচ্ছা? কোনো বিশেষ নম্বর থেকে, নাকি …?” “না, নম্বর বা সেরকম কিছু নয়” “আচ্ছা, বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনাল মেসেজ যেরকম? মানে মেসেজে কি থাকছে আমাকে জানাতে পারেন কি? তাহলে …” “না না, কোম্পানির মেসেজ যেমন কোনো লেখা থেকে আসে, নম্বর থেকে নয় – সেরকমও না কিন্তু| মানে পুরোটাই হিজিবিজি ধরনের – এ বি সি ডি এক দুই তিন চার – এরকম …” “আচ্ছা?” “ … ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে, মানে আপনাকে বোঝাতে পারছি না – যখন মেসেজ ঢোকা শুরু হচ্ছে তখন পাগল হয়ে যাওয়ার দশা!” “আচ্ছা? স্যার – আপনি একটু হোল্ড করবেন প্লিজ? তাহলে আমি আমাদের সিস্টেমে চেক করে আপনাকে জানাতে পারতাম আপনার নাম্বারে কোনো ভ্যাস এক্টিভেটেড আছে কিনা?” “সিওর সিওর – আমি ধরছি|” মোবাইলের ওপারে গান বাজনার আওয়াজ শুনতে শুনতে দেবাংশুবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যাল...

দেন্দা

 “খ্র্যা-আ-আ-” ঘাড় ঘুরিয়েই নিচু স্বরে গর্জন করে উঠলো শিম্পাঞ্জিটা! রনদীপ পেশাদার খুনে, কিন্তু এরকম আচমকা প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরী ছিল না সে| চমকে গেলেও এক মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলো সে| আর তাছাড়া তাদের অনুসরণকারী জীবটি যে মনুষ্যেতর, সেটা জানতে পেরেও তার স্বস্তি হলো অনেকখানি| শিম্পাঞ্জিটা লম্বায় ফুটচারেক, সাধারনের থেকে উচ্চতা সামান্য একটু বেশিই, সেকারণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তাকে মানুষ বলেই প্রায় ভুল করেছিলো সে| তার জন্যেই হাতের কম্যান্ডো নাইফটা এখনো তাক করা আছে তার দিকেই| শিম্পাঞ্জিটার নজর দ্রুত রনদীপের চোখ আর তার হাতের ছুরির দিকে যাতায়াত করতে করতে কি একটা হিসাব করছিলো| “শ্র্সস-ক্রর-র-র” ওয়াকিটকির ইয়ারফোনটা সরব হয়ে উঠলো, “ক্বয়ান টু রান্ডি, ক্বয়ান টু রান্ডি, ডু ইউ কপি? তোমার লোকেশন বলো, ওভার|” রনদীপ খানিক সময় দলছাড়া, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলেছে যে কিছু একটা তাদের দলটাকে শেষ আধ ঘন্টা ধরে অনুসরণ করছে, কাজেই ঘুরপথে এসে সে আপাতত সেই অনুসরণকারীর সামনাসামনি| কিন্তু তার অনুপস্থিতি তার দল টের পাওয়ার কারণে টিম লিডার ক্বয়ান জিমের সাথে ওয়াকিটকিতে এর মধ্যে তার বেশ কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে| শিম্পাঞ্জিট...

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...