সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সভা-শিল্পী

একটা মজার কথা বলি, ধরে নিন আমি প্রতিদিন স্কুটারে কোনো এক জায়গায় যাই| ঐ পথে আরো একজন লোক যায় - হেঁটে বা রিক্সায় বা যেকোনো ভাবেই| এবার যেহেতু আমার যাতায়াতের পথেই ঐ লোকটির গন্তব্য - কাজেই তাকে আমি লিফট দিতেই পারি - নাকি?

এবার উল্টো দিক দিয়ে সেই লোকটির কথা ভাবা যাক - প্রাত্যহিক লিফটের কারণে তার যাতায়াতের দরুন কিছু টাকা বাঁচছে, কাজেই সে তা জমিয়ে একসময়ে সাইকেল কিনে নিতে পারে - ঠিক কিনা? নাকি তার আমার বদান্যতার নিদর্শনকে আমাকে তার ড্রাইভার হিসাবে ভেবে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিতে পারে?

ঘটনা : জনগণ জানেন নিশ্চই আমি সামান্য কারিগর মানুষ - টুকটাক ছবিটবি এঁকে আয়-ইনকাম করবার চেষ্টা করে থাকি| ফেসবুক মারফত আমার সাথে ভিনদেশী এক লেখক-সম্পাদকের আলাপ হয়েছিলো, তার এবং আমার ভাষা আর এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট একই হওয়ার কারণে তার কর্মকান্ডে কৌতুহল হয়|

আয়-ইনকামের ব্যাপারে আমার দর্শন - শিকারী নয়, বলা যেতে পারে খানিক চাষার মতো| মানে আমি মানুষকে উপার্জনের বন্দোবস্ত করে দিয়ে নিজের উপার্জন নিশ্চিত করি| আরো সরল ভাবে বললে বলা যায়, ধরে নিন আমি যদি কোনো বই অলঙ্করণ করি, তবে সেটা লেখকের জন্যে নয় - তা পাঠকের কথা মাথায় রেখেই করে থাকি -যাতে পাঠক বইটা অন্তত 'তুলে নেয়', লেখক-প্রকাশকের দু-পয়সা আসে আর পরবর্তি প্রজেক্টে ঠিকঠাক ভাবে গড়গড়িয়ে চলতে পারে|

যেহেতু পাঠক হিসাবে ঐ পত্রিকার জনর আমার প্রিয় এবং ওনার প্রয়াসকে মানসিক ভাবে সমর্থন করি, তাই ঐ সম্পাদক মহাশয়ের ক্ষেত্রেও আমি সেই পন্থাই নিই - যাতে পত্রিকা জনপ্রিয় হয়, বাংলা-বাজারে যদি কিছু ল্যান্ডমার্ক বানানো যায়, আমার ফাঁকা সময় দিয়ে তার প্রয়াসকে আমি সমর্থন করতে থাকি| পারিশ্রমিকের প্রসঙ্গে তাকে এটাও জানাই যে আপাতত আমাকে নিয়ে তার আলাদা করে দুশ্চিন্তা করবার কোনো প্রয়োজন নেই - বরং পত্রিকা যাতে ঠিকঠাক ব্যবসা করতে পারে সেইদিকেই তিনি মনোনিবেশ করলে আখেরে সকলেরই লাভ|

যে পত্রিকার কথা বলছি সেটি প্রিন্ট-অন-ডিম্যান্ড সার্ভিসে চলবার দরুন মুদ্রনের জন্যে যে লগ্নি দরকার তার এক্ষেত্রে কোনো প্রয়োজন নেই - এবার ভেবে দেখুন, কোনো পত্রিকা কেবল শুধু কন্টেন্টের উপর চলে না - তার সাথে বিজ্ঞাপন, বিপণন, পরিবেশন সমস্ত কিছুই যা একজন প্রকাশকের দায়িত্ব - তাকে এড়িয়ে কোনো কোনো পত্রিকাই স্বাবলম্বী হতে পারে না| কিন্তু আমি জানি না এই সম্পাদক মশাই এক্ষেত্রে কতটা উদ্যোগী ছিলেন - পত্রিকা প্রকাশ তো অনিয়মিতই, সম্মানী 'বৃদ্ধি'র পরিমান আন্দাজে পত্রিকার ব্যাপ্তি বা বিপণন কেমন ছিল সে নিয়েও সন্দিহান হতে শুরু করি|

যেরকম স্কুটার-কাহিনী বলছিলাম : নিজে সাইকেল কেনবার বদলে আমাকেই ড্রাইভার ভেবে নেওয়া ওনার কাছে মনে হয় সহজতর উপায় বলে মনে হলো - তার ফলে একসময়ে উনি আমাকে ওনার সভা-শিল্পী ভেবে নিয়ে পত্রিকার বদলে ওনার নিজের এবং নিজের পরিচিত লেখকদের বইপত্র অলঙ্করণ করবার শখ-পূরণ করতে চাইলেন| পারিশ্রমিকের বদলে সম্মানী জিনিসটা অনেক মজার - তবে মজার কথা হলো উনি এটা ভেবে নিয়েছিলেন যে বিখ্যাত লেখক-সম্পাদকের বইতে অলঙ্করণ করবার সুবর্ণ-সুযোগ যে আমি পাচ্ছি - সেটা 'অমূল্য'! কাজেই 'সম্মানী' তো দূর অস্ত আমাকে শেষমেস উনি শিল্পী-কপি পাঠিয়েও বিব্রত করতে চাইতেন না তেমন|

কাজেই আমার চাষা-মানসিকতা আমায় সাবধান করলো যে 'এবার থাক, এ জমিতে কিছু হওয়ার নয়' - তো সেইমতো অনেক দিন পড়ে আবার ভদ্রলোকের যখন পত্রিকা-পত্রিকা খেলবার শখ হলো, তখন তাকে আমায় নির্বৃত্ত করতেই হলো| আগের মতো আমি পুরো দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী জেনে তিনি তেমন একটা খুশি হলেন বলে মনে হলো না|

খানিক আগে দেখলাম ফেসবুকে আমি ওনার বন্ধুতালিকা থেকে আমার স্থান হারিয়েছি| যথার্থই করেছেন - যেখানে আর স্বার্থ নেই সেই বন্ধুত্ব রাখবারও কোনো প্রয়োজন ওনার কাছে নেই দেখে চরম পুলকিত হয়ে ওনাকে মেসেজে ধন্যবাদ জানালাম|

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্যলোকের মেসেজ

 ১ “নমস্কার, মোবিকমে আপনাকে স্বাগত| আমি শুভ্রা – আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” “নমস্কার নমস্কার – আমার নাম দেবাংশু লাহিড়ি, আমার নম্বর … মানে এটাই, যেটা থেকে আপনাকে কল করছি|” “হ্যা বলুন …” “দেখুন, আমার সমস্যা হলো – কদিন থেকে আমার মোবাইলে অনবরত মেসেজ ঢুকছে|” “আচ্ছা?” “হ্যা – মানে কোনো মাথামুন্ডু নেই – যতসব হিজিবিজি|” “আচ্ছা? কোনো বিশেষ নম্বর থেকে, নাকি …?” “না, নম্বর বা সেরকম কিছু নয়” “আচ্ছা, বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনাল মেসেজ যেরকম? মানে মেসেজে কি থাকছে আমাকে জানাতে পারেন কি? তাহলে …” “না না, কোম্পানির মেসেজ যেমন কোনো লেখা থেকে আসে, নম্বর থেকে নয় – সেরকমও না কিন্তু| মানে পুরোটাই হিজিবিজি ধরনের – এ বি সি ডি এক দুই তিন চার – এরকম …” “আচ্ছা?” “ … ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে, মানে আপনাকে বোঝাতে পারছি না – যখন মেসেজ ঢোকা শুরু হচ্ছে তখন পাগল হয়ে যাওয়ার দশা!” “আচ্ছা? স্যার – আপনি একটু হোল্ড করবেন প্লিজ? তাহলে আমি আমাদের সিস্টেমে চেক করে আপনাকে জানাতে পারতাম আপনার নাম্বারে কোনো ভ্যাস এক্টিভেটেড আছে কিনা?” “সিওর সিওর – আমি ধরছি|” মোবাইলের ওপারে গান বাজনার আওয়াজ শুনতে শুনতে দেবাংশুবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যাল...

দেন্দা

 “খ্র্যা-আ-আ-” ঘাড় ঘুরিয়েই নিচু স্বরে গর্জন করে উঠলো শিম্পাঞ্জিটা! রনদীপ পেশাদার খুনে, কিন্তু এরকম আচমকা প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরী ছিল না সে| চমকে গেলেও এক মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলো সে| আর তাছাড়া তাদের অনুসরণকারী জীবটি যে মনুষ্যেতর, সেটা জানতে পেরেও তার স্বস্তি হলো অনেকখানি| শিম্পাঞ্জিটা লম্বায় ফুটচারেক, সাধারনের থেকে উচ্চতা সামান্য একটু বেশিই, সেকারণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তাকে মানুষ বলেই প্রায় ভুল করেছিলো সে| তার জন্যেই হাতের কম্যান্ডো নাইফটা এখনো তাক করা আছে তার দিকেই| শিম্পাঞ্জিটার নজর দ্রুত রনদীপের চোখ আর তার হাতের ছুরির দিকে যাতায়াত করতে করতে কি একটা হিসাব করছিলো| “শ্র্সস-ক্রর-র-র” ওয়াকিটকির ইয়ারফোনটা সরব হয়ে উঠলো, “ক্বয়ান টু রান্ডি, ক্বয়ান টু রান্ডি, ডু ইউ কপি? তোমার লোকেশন বলো, ওভার|” রনদীপ খানিক সময় দলছাড়া, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলেছে যে কিছু একটা তাদের দলটাকে শেষ আধ ঘন্টা ধরে অনুসরণ করছে, কাজেই ঘুরপথে এসে সে আপাতত সেই অনুসরণকারীর সামনাসামনি| কিন্তু তার অনুপস্থিতি তার দল টের পাওয়ার কারণে টিম লিডার ক্বয়ান জিমের সাথে ওয়াকিটকিতে এর মধ্যে তার বেশ কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে| শিম্পাঞ্জিট...

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...