সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অন্য মান্হা


মহিষের মতো দেখতে টিলাটার পিছনের শুকনো গাছগুলোতে লাল-সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে আর দেখতে না দেখতে সেগুলো কালো হয়ে কুঁচকে দুমড়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে| লাল-সাপগুলোর ‘হিস হিস’ শব্দ এতো দূর থেকেও শুনতে পাচ্ছে খিয়ং, তার সাথে গাছগুলোর একেবারে মরে যাওয়ার ‘ফট ফট’ আওয়াজও|

বড়রা বার বার বারণ করে দিয়েছে খিয়ং আর তার বয়েসী ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের লাল-সাপ এড়িয়ে চলতে| বারণ আছে আরও অনেক কিছুতেই – যেমন মা-হাতি-ছানা-হাতি পাথরের ওদিকে যাওয়া বারণ, গুঁড়ি সাপের চোখের দিকে তাকানো বারণ, সদর উপর লাল ফুটকি গোল গোল চ্যাপ্টাগুলো খাওয়া বারণ| তাদের গুহার কাছে তেমন দেখা না গেলেও, লাল সাপের নাচ দেখার মধ্যে আলাদা একটা উত্তেজনা আছে| মাঝে মাঝেই পাহাড়ের অন্য দিক বেয়ে লম্বা লাল-সাপেরা গড়াতে গড়াতে নেমে আসে – সামনে যা পায় তাতেই ছোট ছোট লাল-সাপ গজিয়ে ওঠে| বড়দের একজনকে একবার লাল-সাপ জড়িয়ে ধরেছিলো, সেকথা ভাবলে এখনো আঁতকে ওঠে খিয়ং! ছোট কালো সাপ তাদের অনেককেই কামড়ায়, কিন্তু যাকে লাল-সাপ কামড়েছিল তার চিত্কার এখনো শুনতে পায় সে|

শুকনো গাছগুলোও সেই লোকটার মতই ক্ষয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে|

এক মনে লাল-সাপের নাচ দেখছিলো বলে খিয়ং খেয়াল করে নি কখন তার পাশে পুন্নি আর স্কিউং এসে দাঁড়িয়েছে| তাদের বাবা-মায়েরাও তাদের লাল-সাপ থেকে দুরে থাকতে বারণ করেছিলো, সেজন্যে খিয়ংকে একমনে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাদেরও ইচ্ছে হচ্ছিলো ওর মতো ওদিকে দেখতে|

এখন লাল-সাপগুলো আগের থেকে অনেকটাই নেতিয়ে পড়েছে, তাদের ধড় সরু সরু হয়ে গিয়েছে, বদলে কালো কালো ফনা গুলো লম্বা হতে হতে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে|

“ও-ও-ও-ও!” পুন্নি আর স্কিউং একসাথে আওয়াজ করে ওঠে| তারাও খিয়ঙের মতো খুব আনন্দ পেয়েছে| ওদের গলার আওয়াজে খিয়ং চমকে ওঠে ওদের দিকে তাকায়|

বড়দের আরেকটা বারণ : ছোটরা যদি কখনো গুহার বাইরে যায়, তাহলে যেন কখনই একা না বেরোয়| সেই জন্যেই বড়রা শিকারে যাওয়ার পর খিয়ং, পুন্নি, স্কিউং আর ওদের মতো ছোটরা বেশ কটা দলে ভাগ হয়ে বেরিয়েছিলো ফল আর গোল-গোল-চ্যাপ্টা গুলো কুড়োতে| ওদের ভিতর যারা একটু বড় তাদের কাছে লম্বা-পাথর আছে – যদি জঙ্গল থেকে লম্বা-দাঁত বেরিয়ে আসে তাহলে তার মোকাবিলা করতে পারবে| কিন্তু খিয়ঙের মতো ছোট যারা তাদের হাতে লম্বা-পাথর দেওয়া বারণ, তাই তাদের মা-হাতি-ছানা-হাতি পাহাড় পেরিয়ে যেখানে জঙ্গলের শুরু, সেদিকে যাওয়াও বারণ|

তবে ঐদিকেই বেশি গোল-গোল-চ্যাপ্টা পাওয়া যায় – আর ওগুলো খেতেও বেশ ভালো, কাজেই খিয়ংরা মাঝে মাঝে সেই বারণটা ভুলে যায়|

যদিও আজ ওরা ওদের পাহাড়ের সীমানার মধ্যেই আছে, তাহলেও পাহাড়ের এদিকটায় এর আগে ওরা আসেনি কখনো|

“খিয়ং আহ!” স্কিউং ডাকলো খিয়ংকে, অনেক সময় দাঁড়িয়ে আছে ওরা|

পুন্নি এখনো একমনে লাল-সাপের নাচ দেখে চলেছে| স্কিউঙের ডাকে তারও সম্বিত ফেরে, তিনজনে অন্যদিকে চলতে শুরু করে একসাথে|

--X--

লম্বা হলুদ ফলগুলো কিছুদিন পরে খুব মিষ্টি হবে, এখন কেমন কষ-কষ খেতে| একদম ছোট পুন্নি একটা লম্বা হলুদ ছিঁড়তে গেলে স্কিউং তাকে বারণ করে|

কিন্তু পুন্নির খিদে পেয়েছে, খিয়ং পাশের ঝোপ থেকে টপাটপ ছোট ছোট লাল ফল তুলছিলো, স্কিউঙের কথা শুনে সে কটা ফল পুন্নির দিকে এগিয়ে দেয়, “এহ পুন্নি, লি - কচম|”

পুন্নি ছোট ছোট লাল ফলও ভালোবাসে খুব, সে কটা হাতে নিয়ে খেতে থাকে আর খিয়ং আর স্কিউং বড় বড় পাতার উপর লাল গুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে জড়ো করতে থাকে – গুহায় আরও ছোটদের জন্যে নিয়ে যেতে হবে|

ঝোপের আরও ভিতরে বেশ কটা বড় বড় লাল দেখা যাচ্ছে – স্কিউং ঘষটাতে ঘষটাতে সেদিকে এগোলে সেই সময় খিয়ং সেই গন্ধটা পেলো যেটা তাদের গুহার নিচে, যেখানে খাওয়া হয়ে যাওয়া হাড়গোড় ফেলা হয়, সেই জায়গাতে পাওয়া যায়| বড় দাঁত কোনো মহিষ মেরে রেখে গিয়েছে নাকি? স্কিউংও মনে হয় সেই গন্ধটা পেয়েছে – সে একটু থমকে গেলো মনে হলো|

--X--

জন্না, থুয়াং আর নামিজামের ভিতর জন্না সবার বড়, কাজেই তার হাতে লম্বা পাথর আছে| থুয়াং জন্নার থেকে একটু ছোট, ঘুরতে ঘুরতে সে মাঝে মাঝেই আগ্রহ করে সেদিকে দেখছিলো| লম্বা পাথরটা বড়দের কাছে যেমন থাকে তত বড় না হলেও ওটা দিয়ে খুব সহজেই লম্বা-কান মারা যায়| লম্বা-কান খুব জোরে ছোটে, দৌড়ে তাদের ধরা যায় না, কিন্তু জন্না এর মধ্যেই তার লম্বা পাথর ছুঁড়ে কতগুলো মেরেছে| লম্বা-কানের মাংস খুব ভালো খেতে আর তাদের চামড়াও খুব নরম|

বড়দের বারণ থাকায় থুয়াং কোনো লম্বা পাথরে হাত দেয় না| কিছু পাথর খুব ধারালো, হাতের চামড়া কেটে যেতে পারে|

জন্না তার লম্বা পাথরটা হাতে ধরে ঘোরাচ্ছিল – আসে পাশে কোনো ছোট জন্তু নেই, তাই এখন শিকার হবে না| থুয়াং আর নামিজাম ছোট ছোট পাথর উল্টে ছোট ছোট সাদা-সাদা খুঁজতে খুঁজতে জন্নার হাতের দিকে দেখছিলো|

জন্না একবার উপরে দেখলো, হলদে-গোলা সাদা গুঁড়ি গাছের মাথায় আসতে এখনো অনেক বাকি| এখনো যদি ঝোপঝাড়ের ভিতর থেকে লম্বা-কান বেরিয়ে আসে তাহলে ছোটগুলোকে দেখানো যায় কি করে শিকার করতে হয়|

জন্না কান খাঁড়া করলো, যদি কোথাও কোনো আওয়াজ পাওয়া যায় – লম্বা-কান, খুদে দাঁত, কোনকিছু| কিন্তু কোনো খসখস বা ঘশঘশ – কিছুই শোনা যাচ্ছে না| নাকেও কোনো গন্ধ আসছে না|

কিন্তু অনেক দুরে কারা যেন চিত্কার করে উঠলো এইসময়ে|

--X--

স্কিউং প্রথম খেয়াল করে ঝোপের ওপাশে পাতা নড়ছে – বাজে গন্ধটাও আসতে আসতে বাড়ছে যেন| লম্বা-দাঁত যে মহিষ মারে সেটা আর ওঠে না – দেখেছে ওরা| কাজেই এমন হতে পারে যে স্বয়ং লম্বা দাঁত ঝোপের ওপাশে রয়েছে!

ঝোপের ভিতর খিয়ং লাল ফল ছিঁড়তে ঢুকেছে – এর পর কি হতে পারে ভেবে চাপা গলায় চিত্কার করে ওঠে স্কিউং|

“আলি-লি-লি-লি-ই-ই-”

স্কিউঙের চিত্কার শুনে আঁতকে ওঠে পুন্নি, “ভু স্কিউং? ভু ভু?”

“হিসসসস!” ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে পুন্নিকে শব্দ করতে বারণ করে স্কিউং, “তপ তপ|”

ঝোপের ভিতর দুদিক থেকেই কোনো নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না আপাতত, স্কিউঙের চিত্কার শুনে ওদিকের সেই অজানা জন্তুটা সতর্ক হয়ে গেছে হয়তো আর এদিকে খিয়ংও মনে হচ্ছে আতঙ্কে জমে গেছে|

“খিয়ং – খি-ই-য়ং! গতো – আহ আহ!” চাপা গলায় খিয়ংকে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসতে বলে স্কিউং|
কিন্তু খিয়ঙের কোনো সাড়া মেলে না|

--X--

“গের্গেবাত – আহু-উ-উ-উ!”

জন্নার আচমকা নির্দেশে থুয়াং আর নামিজাম পাথর ওল্টানো ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো| ততক্ষণে জন্ন তার হাতের লম্বা পাথরটা বাগিয়ে ধরে চিত্কার যেদিক থেকে আসছিলো সেদিকে ছুটে চলেছে| জন্না তাদের লুকোতে বলেছে – কিন্তু ব্যাপারটা কি হচ্ছে সেটা জানবার উত্তেজনায় ওরা কি করবে ভেবে পাচ্ছে না!

“নামিজাম, গের্গেবাত – আহি?”

“গন গন|” মাথা নাড়ে নামিজাম, তার লুকোনোর ইচ্ছা নেই, “আহ থুয়াং – ভুকিলি|”

হালকা পায়ে দৌড়তে শুরু করে নামিজাম, অনিচ্ছা সত্বেও তাকে অনুসরণ করে থুয়াং|

--X--

গোনান্হা ভিং নিরাপদ দুরত্বে থেকে অনেকক্ষণ ধরেই ছোট ছোট মান্হাদের কাজ কর্ম দেখছিলো| মান্হারা গোনান্হাদের মতই দুপায়ে হাঁটে, কিন্তু থাকে পাহাড়ের গুহায় – তাদের মতো গাছের উপরে নয়|

মান্হাদের আরেকটা জিনিষ তার ভালো লাগে, গোনান্হাদের মতো সব সময় নিজেদের মধ্যে মারামারি না করে তারা একসাথে মিলেমিশে থাকে| শিকারও করে একসাথে – লম্বা পাথর দিয়ে|

কেবল একবার ছাড়া কোনো মান্হাকে অন্য কোনো মান্হা শিকার করতে দেখে নি সে| তবে তাহলেও সেই শুয়ে-থাকা মান্হাটাকে অন্য মানহা খেয়ে নেয় নি, কোথায় একটা লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলো সেটা এখন আর ভিঙের মনে পড়ছে না|

তবে এই ছোট ছোট মান্হাদের ছোটাছুটি দেখতে খুবই ভালো লাগছে তার| কিছু আগেই একগাদা একগাদা শুঁড়-লতা খেয়েছে ভিং, টিলার উপর একটা গাছের নিচু ডালে বসে সে এবার সে ছোট মান্হাদের খেলা দেখতে লাগলো|

--X--

হলুদ গোলা সাদা গুঁড়ি গাছের মাথায় আসতে এখনো খানিকটা সময় নেবে| তার মধ্যেই ছোটদের গুহায় ফিরতে হবে| তার আরও কিছু পরে বড়রা শিকার সেরে ফিরে আসবে|

থুয়াং আর নামিজাম তার পিছন পিছন আসছে বুঝতে পারছিলো জন্না| তার কান খুব ভালো – অনেক দুরের আর অনেক রকম শব্দ শুনতে পায় সে| ছোটদের লুকোতে বললে তারা লুকোয় না – সে নিজেও এরকমই ছিল একসময়ে|

মহিষের মতো টিলাটার পিছনের গাছ গুলোয় এখন মাত্র কটা লাল-সাপ ঘুরছে, আর কালো কালো গাছগুলোর গায়ে আর নিচে লাল ফুল ফুটে আছে|

ওরা সবাই জানে যে লাল সাপ আর লাল ফুল – দুটোই খুব ভয়ানক| ওতে হাত দিলেই খুব ব্যথা হয়|

হাতের লম্বা পাথরটা শক্ত করে ধরে গাছের ফাঁক দিয়ে চিত্কারের উত্স খুঁজতে লাগলো জন্না|

খিয়ং আর পুন্নির হাত ধরে লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে জঙ্গল পেরচ্ছিলো স্কিউং| লাল ফল আর গোল-গোল চ্যাপ্টাগুলো যা জড়ো করেছিলো ওরা সেসব আর কুড়িয়ে নেওয়ার সময় বা সাহস হয়নি|

ঝোপের ওদিকে কি ছিল কে জানে – কিন্তু যাই থাকুক না কেন, খিয়ং খুব ভয় পেয়েছে|

“কির্ক কির্ক কির্ক কির্ক …” ছুটতে ছুটতে খিয়ং একটানা বলে যাচ্ছিলো –তাড়াতাড়ি পালাতে হবে!

সামনেই শোয়া পাথর দেখা যাচ্ছে – সেটা পার হলেই সরু গাছের মধ্যে দিয়ে আর একটু এগুলেই তাদের গুহার খাঁড়াই|

--X--

কয়েক পা যেতেই গাছের আড়াল থেকে কারা বেরিয়ে এলো, ধাক্কা লেগে ছিটকে গেলো সবাই|

আরেকবার চিত্কার শুনলো জন্না – একজন নয়, একসাথে অনেকজন চিত্কার করলো| ব্যথা লাগার একটানা চিত্কার| তবে কি লম্বা-দাঁত এসেছে? ঘাড়ের কাছের লোম খাঁড়া হয়ে গেলো তার| একটু শিউরে উঠে হাতের লম্বা পাথরটাকে আরও শক্ত করে ধরে সেদিকে এগুতে লাগলো সে|

গাছের ডালে বসে শিউরে উঠলো ভিংও|

দেখা যায় না এমন কোনো জন্তু যখন ধারে কাছে থাকে, তখন তার এরকম মনে হয়| নাক উঁচু করে বাতাস শুঁকলো সে – দেখা যায় এমন জন্তুর গন্ধ সে পায়, কিন্তু যাদের দেখা যায় না তাদের গন্ধও পাওয়া যায় না|

শিরশিরণী কমলে ছোট্ট ছোট্ট লাফে তার গাছের উপরের দিকের ডাল উঠে গেলো ভিং| এখান থেকে শোয়া পাথরের পাশে ছোট মান্হাদের দেখা যাচ্ছে| কি মনে করে গাছের ডালে ডালে ঝুলতে ঝুলতে নিঃশব্দে সেদিকে এগিয়ে গেলো সে|

কিন্তু অন্যদিকে গাছের আড়ালে আড়ালে আরেকটা জন্তুও যে সেদিকে এগোচ্ছে সেটা ভিঙ্গের নজর এড়িয়ে গেলো|

--X--

“হ্যাক হ্যাক হ্যাক হ্যাক!” সবাই একটানা হেসে যাচ্ছিলো|

আচমকা দু দলের ধাক্কা লেগে যাবে ওরা কেউই বুঝতে পারে নি| স্কিউং, পুন্নি, নামিজাম সবাই হাসছিলো| থুয়াং ভয় পেয়ে থাকলেও সেও হাসছিলো|

মান্হাদের এই ভাষাটা বোঝে না ভিং| শোয়া পাথরের পাশেই একটা গাছের উপরের দিকে ডালে বসে এক মনে নিচে দেখছিলো সে|

তখনই তার চোখে পড়ল মান্হাদের মতো দেখতে অথচ মানহা নয় এমন একটা জন্তুও তার মতই আড়ালে লুকিয়ে ছোট মান্হাদের দেখছে|

তার শিরশিরানি ফিরে এলো আবার| এরকম জন্তুর গন্ধ পায় না সে|

--X--

সাদা গুঁড়ি গাছ পেরিয়ে গেছে হলুদ গোলা| কিন্তু জন্নার এখন সেদিকে খেয়াল নেই| তারা যখন লাল ফল, গোল চ্যাপ্টা আর ছোট সাদা গুলো ফের কুড়িয়ে নিয়ে একসাথে গুহার দিকে চলেছে ঠিক সেসময়েই অচেনা মানুষটা পুন্নিকে ওদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেলো|

দোষটা দলের বড় হিসাবে জন্নারই, পুন্নি আর নামিজাম একেবারে ছোট বলে ওদের সারির মাঝে রাখা উচিত ছিল, কিন্তু সেটা সে খেয়াল করে নি|

“স্কিউং-ঙ-ঙ!” থুয়াঙর চিত্কারে তারা সবাই দেখলো যে পুন্নি নেই আর তাদের দলে – একটু দুরে একটা মানুষ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে|

লম্বা পাথর ছুঁড়ে মারতে গিয়েও থমকে গেলো সে, যদি পুন্নির গায়ে লাগে|

“খিয়ং, থুয়াং – আহ| স্কিউং, গের্গেবাত নামিজাম| নুর্জঞানী গ্লেবাত|”

স্কিউং আর নামিজাম যেতে চাইলেও তাদের ভয়ও করছিলো খুব – মানুষটা ঠিক তাদের মতো নয় – গাছপালা ভেদ করে উড়ে উড়ে যাচ্ছিলো যেন সে, গাছে ধাক্কা লেগে লেগে পুন্নির চিত্কার শোনা যাচ্ছে যেন এখনো| তাহলেও অন্যদের খবর দেওয়ার দরকার – তাই দুজনে হাত ধরে ছুট লাগলো গুহার দিকে|

--X--

লাল ফলের ঝোপের থেকে কিছুটা দুরে লোকটাকে আর পুন্নিকে দেখা গেলো|

“আলি-লিলি-লি-লি-ই-ই!” বড়দের মতো করে চিত্কার করলো জন্না|

তার চিত্কারে খিয়ং আর থুয়ান্গের মনে ভরসা এলো – মানুষটাকে দেখে দুজনেরই আতঙ্কে বুকের মধ্যে দম দম করে শব্দ হচ্ছে| খিয়ং বোঝবার চেষ্টা করছে ঝোপের মধ্যেই একেই দেখেছিলো কিনা|

“পুন্নি আহ!”

কিন্তু পুন্নি কোনো উত্তর দিলো না| সে একই ভাবে শুয়ে আছে, আর তার উপর ঝুঁকে তাকে দেখছে লোকটা|

“পুন্নি–ই-ই-ই!” আবার চিত্কার করলো জন্না|

জন্নার চিত্কারে লোকটা বিরক্ত হয়ে ওদের দিকে ফিরলো| এবার খিয়ং বুঝতে পারলো যে ঝোপের ভিতর একেই দেখেছিলো!

জন্না লম্বা পাথর বাগিয়ে সাবধানে সেদিকে এগোলো|

“হনররর” গলার ভিতর থেকে আওয়াজ করে লোকটা এবার উঠে দাঁড়ালো|

তখনই তীরের মতো তার দিকে ধেয়ে গেলো জন্না|

--X--

রুদ্ধশ্বাসে জন্না আর সেই অদ্ভুত লোকটার মারামারি দেখছিলো খিয়ং আর থুয়াং| মারামারি বললে ভুল হবে, যতবারই লম্বা পাথর দিয়ে লোকটাকে আঘাত করছে জন্না, ততবারই কেমন অদ্ভুত ভাবে শরীরটাকে আঁকিয়ে-বাঁকিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে সে| কিন্তু বদলে কোনরকম আঘাত করছে না সে জন্নাকে|

কতক্ষণ এই লড়াই চলছিলো বুঝতে পারে না তারা, কিন্তু একসময় দেখা গেলো জন্না ক্লান্ত হয়ে পড়ছে| লম্বা পাথরটা ছুঁড়ে লোকটাকে আহত করবার মতো চেষ্টা করাটা বোকামি হয়ে যাবে| আর তা ছাড়া সত্যিই লোকটাকে আঘাত করা যায় কিনা সেটাও চিন্তার ব্যাপার, কারণ পাতার ফাঁক দিয়ে আসা হলুদ গোলার আলোয় তারা সবাই দেখতে পাচ্ছে যে লোকটার বুকে একটা মস্ত ফুটোও আছে আগের থেকেই – যেমন শিকার করা পশুদের বুকে বা পেটে থাকে|

--X--

জ্ঞান ফিরে পেয়ে পুন্নি দেখছিলো জঙ্গলের ভিতর দিয়ে একটা আবছা লাল গোলা এগিয়ে আসছে আর তাকে ঘিরে কারা যেন বেদম লড়াই করছে|

“পুন্নি!” খিয়ং আর থুয়ান্গের গলার আওয়াজ পেলো সে, তাকে ডাকছে তারা|

লড়াইয়ের মধ্যে উঠে বসতে গিয়েই সে দেখলো জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে আসা লাল গোলাটা কাছে এসে উজ্বল হলুদ হয়ে গেলো, সেই আলোয় দেখা গেলো একটা লোমশমানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের দিকে আর লড়াই করা লোকদুটোর বড়জনের বুক থেকে অজস্র হলুদ ফুলকি ঝরে পড়তে থাকলো| আঁতকে উঠে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলো সে|

“পপপু-উ-র-র-ন-ন-নি-ই-ই–র-র-ই …”

লুটিয়ে পড়বার আগে পুন্নি শুনতে পেলো বিকৃত স্বরে কে তাকে ডেকে উঠলো – না সেটা খিয়ং, থুয়াং বা জন্নার গলা নয়|

--X--

হলুদ গোলা তাদের পাহাড় পেরিয়ে গেছে – এখন আকাশ কমলা কমলা, অন্ধকার| খিয়ং ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো পিছনে জঙ্গলের ভিতর লাল লাল দেখা যাচ্ছে এখনো – ওটা সেই অদ্ভুত লোকটা, তাকে লাল সাপ খেয়ে ফেলছে – ক্ষয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে সে| স্কিউং আর নামিজামের কাছ থেকে খবর পেয়ে বাকিরা জঙ্গলের ভিতর মাঝ পথেই ওদের দেখতে পায়| পুন্নি এখন ঘুমোচ্ছে, জন্নার কাঁধে|

উপরের দিকে তাকালো খিয়ং – সেই লোমশমানুষটা এখনো গাছের উপরে আছে কি? লড়াইয়ের মাঝে সে না কালো ডালে লাল ফুল না নিয়ে এলে লড়াই থামতই না হয়তো|

ভিং এবার সেই অদ্ভুত মান্হাটাকে চিনতে পেরেছে – একেই একজন মানহা শিকার করেছিলো অনেকদিন আগে, তারপর তার সাথের ছোট মান্হাটাকে নিয়ে এসেছিলো – যাকে এরা এখন পুন্নি বলে ডাকে|

যেসব গোনান্হারা অন্য গোনান্হাদের সাথে লড়াই করতে গিয়ে মরে যায়, তাদের গরম লাল ডোবায় ফেলে দিতে হয়, নয়তো অনেক দিন পর তারা আবার জেগে ওঠে – মান্হারা এটা মনে হয় জানে না|

প্রকাশিত : ওরা আসছে (ভৌতিক গল্প সংকলন) ২০১৮

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমার পড়া প্রথম ইন্দ্রজাল কমিকস

আমি অনেক ছোটবেলায় লিখতে পড়তে শিখি - যখন আমার চার-পাঁচ বছর বয়স সে সময়ে আমি নিজের চেষ্টা আর ইচ্ছেতেই একাএকাই আমার পরিচিত শিশুপাঠ্য বইপত্তর পড়তে পারতাম এবং সবথেকে বড় কথা হলো ব্যাট-বলের বদলে সেই বই গুলিই আমার কাছে অনেক প্রিয় ছিল| বাবা'র বদলি'র চাকরি ছিল, কাজেই ছ'বছর বয়সে যখন আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই, থিতু হওয়ার প্রয়োজনে আমি আর আমার মা তখন আমাদের এই শহরেই পাকাপাকি ভাবে বাস করতে শুরু করি| বাবা থাকতেন দুরে - বিহারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাঁধ-বাঁধা'র দায়িত্বে| বাড়ি ফিরতেন পনেরো দিনে বা মাসে একবার করে| অন্যান্য শিশুদের মতন আমার বাবা ফেরার সময়ে কোনো উপহারের চাহিদা থাকতো না - বাবা নিজে যে সশরীরে আমাদের কাছে আসছেন - সেটারই গুরুত্ব ছিল সবথেকে বেশি|

উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্য পুরস্কার

একটু নয়, প্রচুর দেরি করেই – ইয়ে কি বলে আবার একটু ঢাক পেটাপিটি করি| তবে সেদিক থেকে ধরতে গেলে ভবিষ্যতে আমার ডিজে হওয়ার রাস্তাও খুলছে হয়তো পরোক্ষ ভাবে| আসল সাফাই হলো ‘আমার মতো’ যারা কাজ করেন, তারা হয়তো উপলব্ধি করেছেন যে এপ্রিল মে থেকে কাজের স্বাভাবিক চাপ শুরু হয় আর তা বাদে যেহেতু ব্যক্তিগত ভাবে আমার পুরস্কার-টুরস্কার পাওয়ার সেরকম অভ্যাস নেই, সেই দিক থেকে - তবে ঘটনা, একবছরে পরপর দুবার পুরস্কার প্রাপ্তি আর তার সাথে ইদানীন গপ্পো লেখারও ঝোঁক বেড়েছে খানিক, কাজেই সবে মিলে ... যাকগে! জ্ঞানীগুনী যারাই আছেন তাদের কাছে ব্যাখ্যা করার দরকার না হলেও, সাধারণ মানুষ হয়তো কৌতুহলী হবেন যে এই উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্যের ব্যাপারটা কি! দেখুন, মানুষ একটি অদ্ভুত জন্তু – সেভাবে বলতে গেলে এদের রাম-টু-রম রেশিও অন্যান্য জন্তুর তুলনায় অনেক বেশি মানে একোয়ারড মেমরির থেকে প্রিন্টেড মেমরি অনেক কম| জীবন বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা খুবই কম, তাও আমার সেকেন্ডারি ব্রেন, মানে ইন্টারনেট থেকে যা জানা, মানব মস্তিষ্কের ডানদিক আমাদের সাথে বেজায় মজার মজার খেলা খেলে! কল্পনা, সৃজনশীলতা – এগুলি অন্য জন্তুদের ভিতর সেভাবে প্রকট কি? হয়ত...

জাতিস্বর

জাতিস্বর দেখলাম - আশ্চর্যের বিষয় যে স্কিপ করে করে না দেখে একটানা প্রথম থেকে শেষ অব্দি দেখলাম|