সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সরেজমিন

যেতে যেতে হেড কনস্টেবল রমেশ হঠাৎ ডান হাতটা তুললো| থামবার সংকেত| বাকি দল সেই নির্দেশে নিঃশব্দে যন্ত্রের মতো দাড়িয়ে পড়ল| রমেশের পিছনে ছিল সোমনাথ, আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ায় মনে হলো হঠাৎ করে ঠান্ডাটা যেন বেড়ে গেছে – সে রাইফেলটা ডানহাতে চেপে ধরে মাঙ্কি টুপির গলাটা আলতো ভাবে ঠিক করে নিলো|

“কি?” সোমনাথের পিছন থেকে প্রবাল ফিসফিস করে প্রশ্ন করলো|

সোমনাথ বুঝতে পারছিলো না কেন রমেশ এই টিমটাকে এখানে থামতে বললো| ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে পায়ে চলা সরু দাগের পথটা এড়িয়ে এগিয়ে চলেছে ওরা| আন্দাজ রাত সাড়ে বারোটা, চাঁদ একদম মাথার উপরে আর লম্বা লম্বা গাছগুলোর ডাল-পালা আর পাতার ফাঁক দিয়ে পিছলে এসে কুয়াশায় গলে গিয়ে মাটির উপর ঝরা পাতা আর আগাছার উপরে নানা অদ্ভুত নকশা তৈরী করেছে|

কান খাঁড়া করলো সোমনাথ – রমেশ সামনে সেই একই ভাবে হাত তুলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সে বুঝতে চেষ্টা করলো সামনে কোনো কিছুর আভাস পেয়েছে কিনা সে|

সোমনাথ কাঁধ ঝাঁকালো – আলো আঁধারে প্রবাল তার ইঙ্গিত বুঝতে পারবে কিনা সেটা না বুঝেই|

শীতের রাত এমনিই নিঝুম – কিন্তু কিসের আতঙ্কে যেন গোটা বনটাই পুরো নিস্তব্ধ হয়ে আছে| গোটা দলের পাঁচজন মানুষের নিঃশ্বাসের আওয়াজ আর মাঝে মাঝে ওয়াকিটকিতে ভেসে আশা ঘসঘসে স্ট্যাটিক ছাড়া আর কোথাও কিছুর শব্দ নেই|

আবার কান খাঁড়া করলো সোমনাথ – আরও তিনটে টিম এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে তাদের সমান্তরালেই সামনের দিকে এগুচ্ছে, কিন্তু তাদের গতিবিধি এদের থেকেও যেন আরও বেশি সন্তর্পণ| আওয়াজে কোনো কিছু আন্দাজ না করা গেলেও সে দেখবার চেষ্টা করলো যদি কুয়াশা ভেদ করে ঝোপঝাড় আর গাছপালার আড়ালে বাকিদের দেখা যায়|

প্রবাল ছেলেটা নতুন, ট্রেনিং শেষ করে প্রথম পোস্টিং এই থানাতেই| এর আগে কোনো ‘সত্যি’ এসাইনমেনটে যায়নি সে, কাজেই উত্তেজনার সাথে তার ভিতরে যে ভয় বা আতঙ্কও কাজ করছে সেটা তার উশখুশ থেকে উপলব্ধি করতে পারলো সোমনাথ|

এরকম পরিস্থিতিতে একেকেটা সেকেন্ডকে একেক ঘন্টা বলে মনে হয়, সোমনাথও এবার কোনো কিছু বুঝতে না পেরে অস্বস্তিতে পড়ল কিছুটা – সামনে রমেশ একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, সে কি কিছু দেখেছে?

প্রবালের অস্বস্তিটা এবার তার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, মুখে কথা না বলে রাইফেলটা হাত বদলে রমেশের কাঁধে হাত দেয় সে, আর তারপরে তাকে হতবুদ্ধি করে রমেশের ডানহাতটা কনুইয়ের কাছ থেকে পিছলে মাটিতে পড়ে যায়!

ধপ করে আওয়াজটা প্রবালের মনোযোগ আকর্ষণ করে, সে সোমনাথের পাশ থেকে নজর চালিয়ে দেখে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই হেড কনস্টেবল রমেশের শরীর থেকে ভলকে ভলকে রক্ত বেরিয়ে আসছে আর ডান কনুই, কাঁধ, মাথা, দেহের নানা অংশ খন্ড খন্ড হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে যেন!

“ই-ই-ই-ই-ই-”

ওয়াকিটকি আর প্রবাল দুজনেই একসাথে চিত্কার করে উঠলো আর তাতেই সম্বিত ফিরে এলো সোমনাথের! রমেশকে টুকরো-টুকরো করলো কে? তড়িতবেগে রাইফেলটা শক্ত করে ধরে পজিশন নেয় সে| ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে-উপরে রাইফেলের মাছির নজরে সবদিক একবার চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে বাঁ দিকে ঘন ঝোপের দিকে সরে যেতে থাকে আর তার সাথে বোঝবার চেষ্টা করে পিছনের বাকিদের অবস্থা সম্পর্কে| এই মুহুর্তে সবাই যদি এলোপাথারি গুলি চালাতে শুরু করে তাহলে সেটা অন্য টিমগুলোর জন্যে মঙ্গলজনক নাও হতে পারে|

কিন্তু প্রবাল ছাড়া আর কারু সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না| ওয়াকিটকির ওপাশের চিত্কারটাও বন্ধ হয়ে গেছে কোনো কারণে| সেটা এখন রমেশের দেহখন্ডের স্তুপের উপর তার কোমরের একটা কাটা অংশে আটকে মাটিতে পড়ে আছে|

একটা গাছের আড়ালে নিরাপদ জায়গা খুঁজে নিতে নিতে সোমনাথ দেখলো যে তাদের টিমের ভিতর একমাত্র প্রবালই অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে আছে – তার পিছনে আর যে দুজন কনস্টেবল, কালাম আর নিতাই, তাদের কোথাও কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না!

“আই!” স্বর যতটা নিচু করা যায়, প্রবালকে ধমকে ডাকলো সে|

কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে প্রবাল তার স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে| সোমনাথের ডাকে তার কোনো ভাবান্তর ঘটলো না|

‘স্নি-ই-ই-ই-ন-ন-ন-ন-নননন্ন!’

কিসের একটা তীক্ষ্ম শব্দ ধীরে ধীরে তীব্র হতে লাগলো, সোমনাথ আবার তার অভ্যাস মতো চারিদিক রাইফেল বুলিয়ে দেখে নিলো|

প্রবালের দিকে রাইফেল তাক করার সময় সে দেখলো তার চিত্কার বন্ধ হয়ে তার মুখ থেকে একটা হেঁচকি তোলার মতো শব্দ বেরুনো শুরু হয়েছে|

তীক্ষ্ম শব্দটা হঠাতই যেন একেবারে কাছে এসে পড়ে আচমকা বন্ধ হয়ে গেলো| এবার সোমনাথ শুধু তার হৃদস্পন্দনের শুনতে পারছে খালি| সারা শরীরে কেমন একটা গুলিয়ে ওঠা ব্যথা শুরু হলো! ডান পাটা থাইয়ের কাছ থেকে অবশ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে|

দেহের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে শুরু করলে সোমনাথ আস্তে আস্তে টলে পড়ে যেতে শুরু করলো| একটা অস্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সে দেখলো প্রবালের দেহটাও রমেশের মতই ধীরে ধীরে খন্ডে খন্ডে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে|

সে যে জমিতে শুয়ে আছে সেটা যেন প্রবালের দেহের টুকরো মাটিতে খসে পড়ার ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছে|

সোমনাথের বুঝতে পারছে তার চোখা খোলা থাকলেও তাতে যেন আলো কমে আসছে ধীরে ধীরে| মাটিটা কাঁপছে অন্য কোনো কারণে – ওয়াকিটকিটাও আগের মতই নিস্তব্ধ যদিও, রাইফেলের ট্রিগারে আঙ্গুল আছে - একবার টিপে দিতে পারলে অন্য টিমেদের কাছে সতর্ক বাণী পৌছবে হয়তো| কিন্তু তার আঙ্গুল দুরের কথা, হাতেরই অস্তিত্ব টের পেলো না সে|

সোমনাথ আবছা বুঝতে পারলো কোনো বিকট অপার্থিব মূর্তি তার পাশে এসে দাঁড়ালো এবার| মাঙ্কি ক্যাপ শুদ্ধু চুলের মুঠি ধরে তুলে নেওয়ার সময় এক অদ্ভুত ভারশুন্যতা অনুভব করতে করতে তার দৃষ্টি অন্ধকার হয়ে গেলো পুরো|

ভূতভুতুম ফেসবুক গ্রুপের জন্যে লেখা|

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্যলোকের মেসেজ

 ১ “নমস্কার, মোবিকমে আপনাকে স্বাগত| আমি শুভ্রা – আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” “নমস্কার নমস্কার – আমার নাম দেবাংশু লাহিড়ি, আমার নম্বর … মানে এটাই, যেটা থেকে আপনাকে কল করছি|” “হ্যা বলুন …” “দেখুন, আমার সমস্যা হলো – কদিন থেকে আমার মোবাইলে অনবরত মেসেজ ঢুকছে|” “আচ্ছা?” “হ্যা – মানে কোনো মাথামুন্ডু নেই – যতসব হিজিবিজি|” “আচ্ছা? কোনো বিশেষ নম্বর থেকে, নাকি …?” “না, নম্বর বা সেরকম কিছু নয়” “আচ্ছা, বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনাল মেসেজ যেরকম? মানে মেসেজে কি থাকছে আমাকে জানাতে পারেন কি? তাহলে …” “না না, কোম্পানির মেসেজ যেমন কোনো লেখা থেকে আসে, নম্বর থেকে নয় – সেরকমও না কিন্তু| মানে পুরোটাই হিজিবিজি ধরনের – এ বি সি ডি এক দুই তিন চার – এরকম …” “আচ্ছা?” “ … ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে, মানে আপনাকে বোঝাতে পারছি না – যখন মেসেজ ঢোকা শুরু হচ্ছে তখন পাগল হয়ে যাওয়ার দশা!” “আচ্ছা? স্যার – আপনি একটু হোল্ড করবেন প্লিজ? তাহলে আমি আমাদের সিস্টেমে চেক করে আপনাকে জানাতে পারতাম আপনার নাম্বারে কোনো ভ্যাস এক্টিভেটেড আছে কিনা?” “সিওর সিওর – আমি ধরছি|” মোবাইলের ওপারে গান বাজনার আওয়াজ শুনতে শুনতে দেবাংশুবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যাল...

দেন্দা

 “খ্র্যা-আ-আ-” ঘাড় ঘুরিয়েই নিচু স্বরে গর্জন করে উঠলো শিম্পাঞ্জিটা! রনদীপ পেশাদার খুনে, কিন্তু এরকম আচমকা প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরী ছিল না সে| চমকে গেলেও এক মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলো সে| আর তাছাড়া তাদের অনুসরণকারী জীবটি যে মনুষ্যেতর, সেটা জানতে পেরেও তার স্বস্তি হলো অনেকখানি| শিম্পাঞ্জিটা লম্বায় ফুটচারেক, সাধারনের থেকে উচ্চতা সামান্য একটু বেশিই, সেকারণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তাকে মানুষ বলেই প্রায় ভুল করেছিলো সে| তার জন্যেই হাতের কম্যান্ডো নাইফটা এখনো তাক করা আছে তার দিকেই| শিম্পাঞ্জিটার নজর দ্রুত রনদীপের চোখ আর তার হাতের ছুরির দিকে যাতায়াত করতে করতে কি একটা হিসাব করছিলো| “শ্র্সস-ক্রর-র-র” ওয়াকিটকির ইয়ারফোনটা সরব হয়ে উঠলো, “ক্বয়ান টু রান্ডি, ক্বয়ান টু রান্ডি, ডু ইউ কপি? তোমার লোকেশন বলো, ওভার|” রনদীপ খানিক সময় দলছাড়া, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলেছে যে কিছু একটা তাদের দলটাকে শেষ আধ ঘন্টা ধরে অনুসরণ করছে, কাজেই ঘুরপথে এসে সে আপাতত সেই অনুসরণকারীর সামনাসামনি| কিন্তু তার অনুপস্থিতি তার দল টের পাওয়ার কারণে টিম লিডার ক্বয়ান জিমের সাথে ওয়াকিটকিতে এর মধ্যে তার বেশ কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে| শিম্পাঞ্জিট...

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...