সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নোটাপন্থা ও নাস্তিকতা

যখন কলেজে পড়তাম, সেসময়ে কিছু বন্ধুবান্ধব ও কিছু সিনিয়রদের যোগাযোগে আমার একটি রাজনৈতিক দলের সাথে ঘনিষ্টতা ছিল| প্রথমদিকে গ্রাজুয়েশনের সময়ে আগ্রহ না থাকলেও পরবর্তিতে ফিজিক্সে স্পেশাল অনার্স পড়াকালীন দাদাদের অনুরোধে আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে সি.আর. ইলেকশনে দাঁড়াই|

আমাদের কলেজে বিশেষ করে ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রীরই রাজনীতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা না থাকবার কারণে ইলেকশনের দিন দেখা গেলো আমি আর বিরোধী দলের ক্যান্ডিডেট কেবল উপস্থিত আছি| আরেকজনের উপর ভরসা, আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু - সেও অনুপস্থিত!

যদি সেই বন্ধু ভোট দিতে আসতো তবে ২-১-এ আমার বেরিয়ে যাওয়া নিশ্চিত, কিন্তু যা পরিথিতি, তাতে টাই ছাড়া আর কিছু সম্ভব নয়! কাজেই আমার ভোটখানি দেওয়ার পরে বাইরে বসে দুশ্চিন্তা করা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই|

এমন সময়ে আমার কজন রাজনৈতিক দাদা আমায় বললেন যে যেহেতু টাই হবে, কাজেই এর পরে টস করে সি.আর কে হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে - কাজেই, 'যতক্ষণ না জিতবি - বলবি ঠিকঠাক টস হয় নি|' নেতা হতে গেলে মত এবং আদর্শ দুটোই লাগে বলে জানতাম - কিন্তু আদর্শের এইদিকটি জানা না থাকার দরুন ঘাবড়ে গেলাম বেজায়! দাদারা আমায় আশ্বস্ত করে বললেন যে বাকিট ওনারাই সামলে নেবেন|

এটা ঠিক হবে কি হবে না - এটা নিয়ে নিজের মত আর আদর্শেস্র ভিতরে যখন টস করছি, সেসময়ে আমার বিরোধী দলের বন্ধু এসে আমায় জানালো যে আমার চিন্তার কিছু নেই - সে তার ভোটতাও আমাকে দিয়ে দিয়েছে - কাজেই সর্বসম্মত ভাবে আমিই সি.আর. হচ্ছি!
আমি জানি না সে ভয়ে না ভালোবাসায় আমাকে তার ভোটটা দিয়েছিলো - কিন্তু আমার রাজনৈতিক দাদারা আর আমার বন্ধু সেদিন আমায় পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলো যে এ জিনিষ আমার জন্যে নয়|

আগের পরিস্থিতি একরকম - এখন নির্বাচন কমিশনের শেষ বোতামের কল্যানে আমি পুরোপুরি অরাজনৈতিক হতে পেরেছি|
ধর্ম ও রাজনীতি - আমার কাছে 'বর্জ্যে'র এপিঠ আর ওপিঠ| কোনো মানুষ যদি তার মত আর আদর্শ তার নিজের কাছে রাখে তাহলে টস করাকরির দরকার পরে না| কিন্তু সেটা যদি জনগনের ভিতরে চাউর করবার 'বিশেষ' প্রয়োজন পড়ে, তাহলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বেই - ভোগান্তি সাধারণ মানুষের|

আমার সেরাবন্ধু - না - আমার ভাই - তার সাথে আমার বন্ধুত্ব আমার স্কুলে ভর্তি হওয়ার দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন থেকে| সে ভদ্রলোকের সাথে আমার সখ্যতা এখন এই মধ্যবযসেও অটুট| আমি এই বন্ধুত্ব থেকে দুইভাবে লাভবান : প্রথমত তার ও আমার মিলিত কমিকস প্রীতি আমাকে সমৃদ্ধ করেছে, আর দ্বিতীয়ত ছেলেবেলায় যেটা আমাদের কারুরই জানা ছিল না - আমরা ভিন্ন ধর্মাবলোম্বী, তার কারণে অধার্মিক হতে পেরেছি তা নয় - বলা যেতে পারে আমরা নিজেদেরকে ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করতে পেরেছি|

আজকে আমাদের প্রিয় শহর এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে - কিন্তু ভরসা পাই তখনই যখন সকালবেলায় সে ফোন করে আমাদের খোঁজ নেয, আর জানতে পারি যে তারাও নিরাপদ|
'কি'র থেকে 'কেন' প্রশ্ন গুলি আমাকে ভাবে বেশি - যুক্তিবাদের কারণে রাজনৈতিক ভাবে নোটাপন্থীর মতই হয়তো খানিক নাস্তিক হয়েছি| কিন্তু এটা অবশ্য করে বলবো - দাঙ্গাবাজদের কোনো ধর্ম নেই, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আক্রোশ চরিত্রার্থ করাটাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য - তা ছাড়া বলতে গেলে কোনো 'ঈশ্বরে'র প্রতি কোনো শ্রদ্ধা'র বিন্দুমাত্র যদি তাদের ভিতর থাকতো, তাহলে অন্যধর্মের মানুষের রক্ত মেখে উল্লাস করবার বা সাধারণ মানুষের সম্পত্তি লুঠপাঠের মানসিকতা তাদের থাকতো না|

ধর্মীয় ভাবাবেগ বা ধর্মাচরণ প্রজন্মের পর প্রজন্মে আমাদের জিনে ছড়িয়ে গেছে - হিংসা হয় ধর্মহীন পশুদের দেখলে - ঈশ্বরহীন হওয়ার কল্যানে তাদের ভিতর একমাত্র খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া রক্তপাত নেই| কিন্তু ধর্ম ও রাজনীতির এই বিষ থেকে 'ঈশরে'র সেরা সৃষ্ঠি মানুষ কবে মুক্তি পাবে - বা আদৌ মুক্তি পাবে কিনা - সে প্রশ্নের উত্তর মনে হয় কোনো 'ঈশ্বর'ই দিতে পারবে না|
যারা পাশে আছেন তাদের প্রতি - মহাত্মা গান্ধী'র কথায় চোখের বদলে চোখ - এই নীতিতে সারা দুনিয়া একসময়ে অন্ধ হয়ে যেত! কিন্তু বর্তমান ধর্মান্ধতার এই অন্ধকারে সবার কাছে অনুরোধ - দয়া করে সহিষ্ণু হন আর আপনার পাশের সবাইকে একই অনুরোধ জানান| তাহলে আশা করা যায় হয়তো কিছু ধর্মান্ধকারের ভিতরে মানবতার আলোর দিশা দেখা গেলেও দেখা যেতে পারে| ধর্ম মানুষের সৃষ্টি - মানুষের জন্যেই সৃষ্টি - কিন্তু তাকে যদি মানবতার বিরুদ্ধে ক্কাজে লাগান, তাহলে তার পরিনাম - মানবতার মৃত্যু|

যুক্তিবাদী হন - মানুষের জন্যে অনুশাসন, তা সে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় যাই হোক না কেন - অনুশাসনের জন্যে মানুষ নয় কখনই|

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম - আমাদের কলেজের সেই রাজনৈতিক দাদাদের নাম দুরে থাক - তাদের চেহারা অব্দি আমার মনে নেই - কিন্তু আমার বিরোধী দলের সেই ছাত্রটি, তার কথা আমার চিরকাল মনে থাকবে - বন্ধু হিসাবেই - কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নয়|
রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখবেন - পন্থা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই - কিন্তু সমস্যা পন্থীদের নিয়েই, সেরকম ভাবে সব ধর্মই উদারতার কথা সম্প্রীতির কথা বলে - কিন্তু ধর্মাচারী - বিভেদেই তাদের লাভ!
কাজেই দয়া করে ধার্মিক না হয়ে বিভেদের পথ না বেছে, আসুন যুক্তিবাদী হয়ে সম্প্রীতির পথেই হাঁটি সবাই - যেমন বন্ধুত্ব ছিল তেমনটাই বজায় থাকুক|

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সি৯এইচ১৩এন ও৩

- এভরিথিং ইস ওকে, বাট আই আফ্রেড দেয়ার ইজ সামথিং মিসিং| - মিসিং হোয়াট? ক্যান ইউ এক্সপ্লেন? - ওয়েল, আই থিংক দা কভার ল্যাকস দা প্যাশন ইট ডিমান্ডেড – ইউ নো হোয়াট আই মিন| - হুমম| আই আন্ডারস্ট্যান্ড| - সো উইল ইউ প্লিজ রিভিউ দিস ওয়ান্স? - ওকে, লেট মে ট্রাই| - থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ – এন্ড সো সরি ফর বিয়িং সো চুজি| - নো প্রবলেম এট অল| - থ্যাঙ্কস| বাই| - বাই – টক টু ইউ সুন :)

যুদ্দুউউউ

জনগণ, অন্যভাবে নেবেন না, অনেক দিন আগের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই| তখন আমি বেসব্রিজে চাকরি করি, দমদমে ভাড়ায় থাকি - একদিন শেয়ালদা হয়ে ফেরবার পথে মহা শোরগোল! সাবওয়েতে আগুন!! মুভিখোর সাধারণ বাঙালির মতোই আমারও হিরোয়িক অবসেশন ছেলেবেলা থেকেই - ব্যাংকে গেলে ভাবি ডাকাত পড়লে বেশ হয় - সবাইকে বাঁচিয়ে বুকে গুলি খেয়ে হাসতে হাসতে মরবো - সবাই হাত তালি দেবে| ট্রেনে উঠলে ভাবি এক্সিডেন্ট হলে বেশ হয় - সবাইকে বাঁচিয়ে বুকে রড ঢুকে হাসতে হাসতে মরবো - সবাই হাত তালি দেবে| এমনকি স্কুলে ঢুকলেও ভাবি একটা ভূমিকম্প হলে বেশ হয় - সবাইকে বাঁচিয়ে মাথায় চাংগরের বাড়ি খেয়ে হাসতে হাসতে মরবো - সবাই হাত তালি দেবে| এবং পরদিন খবরের কাগজে নাম উঠবে - ব্যাস মানব জনম সার্থক| কিন্তু এমনই কপাল যে পুকুরের পাশ দিয়ে গেলেও একটা ছোটখাট ছেলে পিলে ডুবতে দেখি না যে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচাবো - কি দুক্কু! আবার ওদিকে যেসব জিনিস সামনেই দেখি সেসব করতেও ইতস্তত করি! আমার এক বন্ধুর অনুরোধে একটি মেয়েকে একটি রাতের জন্যে আমাদের বাড়ি আশ্রয় দিতে পারি নি, মাঝরাতে বাইরে তার করুন আবেদন বালিশে আড়াল করার চেষ্টা করেছি - জানি না সে কি ছিল...

বন্দী

ঝিঁ-ই-ই-ই আওয়াজ করে কোথাও একটা ঝিঁঝিপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে| প্রথমে আওয়াজটা সেরকম প্রকট না হলেও আস্তে আস্তে সেটার তীব্রতা বিরক্তিকর হয়ে উঠলে রণব্রত চোখ খুললো| চোখ খুলেও সে আলো-আঁধারির পার্থক্য বুঝতে পারলো না| কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বোঝবার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে| তার মুখের উপর কাপড় জাতীয় কিছু লেপ্টে আছে – যেটার কারণে তার নিঃস্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে| ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে সেটা ফেলে দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝিঁঝি পোকাটা আরো জোরে ডেকে উঠলো| রণব্রত বুঝলো যে আসলে ঝিঁঝিপোকাটা আর কোথাও না, তার মাথার ভিতরেই বসে আছে| জ্ঞান ফেরার পরে এবার আস্তে আস্তে তার স্বাভাবিক বোধ ফিরে আসছে| তার হাত পায়ের সাড় ফিরলে সে অনুভব করলো যে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে| এরপরেই তাকে প্রবল আতঙ্ক চেপে ধরলো| চিত্কার করতে গিয়ে বুঝলো যে তার মুখ বাঁধা, তার আর্তনাদ গলার ভিতরেই গুঙিয়ে পাক খেতে লাগলো| বোবা গলায় গোঙাতে গোঙাতে হাত-পায়ে ঝাঁক দিতে দিতে সে বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো| আর তার সাথে সাথেই সে আবিষ্কার করলো যে তার মাথার ভিতরের ঝিঁ-ঝিঁ শব্দটা এবার বন্ধ হয়ে গেছে| খানিক নিস্ফল চেষ্টার পরে এবার সে শান্ত হলো| শারীরিক মেহনতের ফলে তার ঝিম ধরা ভা...