খানিক আগেও এই দরজাটা এই দেওয়ালে ছিল কিনা ঠিক খেয়াল করতে পারলো না বুচুন| পুরো বাড়িটাই কেমন যেন গোলকধাঁধা ধরনের| অথচ বাইরে থেকে দেখলে মনেই হয় না যে এর ভিতরে এতো ঘর, এতো করিডোর, এতগুলো সিঁড়ি আছে|
সাহসে ভর করে দরজার পাল্লায় আলতো করে চাপ দিলো সে| পরিত্যক্ত বাড়ি, কেউ থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই| কিন্তু তাও দরজাটা খোলবার সময়ে সামান্য অস্বস্তি হলো| তার হাতের চাপে নয়, যেন নিজের ইচ্ছাতেই দরজার পাল্লাদুটো দুদিকে সরে গিয়ে তাকে ভিতরে আসবার জন্যে নিমন্ত্রণ জানালো|
ঘরের ভিতর পা বাড়ালো সে|
“কেন যে মরতে এখানে ঢুকেছিলাম!” বুচুন মনে মনে ভাবলো|
পিসতুতো দিদির বাড়ি বাড়ি বেড়াতে এসেছে সে| দিদির নতুন বিয়ে হয়েছে, বিয়ের সময়ে বুচুনের এনুয়াল পরীক্ষা ছিল, সেকারণে তার কনেযাত্রী আসা সম্ভব হয় নি| এখন ছুটি শুরু হয়ে যাওয়ার পর খানিক বুচুনের আবদার আর কিছু দিদির তাগিদে তার বাবা মা রাজি হয়েছিলেন এখানে বুচুনকে পাঠাতে|
রেজাল্ট আউট হলে তার এবার ক্লাস এইট হবে – কাজেই একেবারে ছোটটি সে নয়| তাই তাকে এবার থেকে একা ছাড়া যেতেই পারে| এবং সেইমতো দিদির বাড়ি এসে দিদির ননদের লেডিস সাইকেলটা নিয়ে একা একা বেশ মজাসে চক্কর মারছিলো চারিদিকে|
সমস্যা ঘটলো যখন এক দুপুরে সে ‘মলয় ভবন’এ এডভেঞ্চারের খোঁজে ঢুকলো|
বাড়িটা বাইরে থেকে যেরকম দেখা যায় – ছোটখাটো, দোতলা আর সামনের একচিলতে ফাঁকা জায়গা আগাছায় ভর্তি| পাশের একটা দরজাট হাট করে খোলা, ভিতরে আবছা অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না যে সেখানে কি আছে| তবে সামনের দরজা আর যতগুলো জানালা দেখা যায় সবকটাই বন্ধ|
সাধারণত মানুষ না থাকলে যেরকম হয় – দরজা জানালার পাল্লা খসে পড়ছে, দেওয়ালের প্লাস্টার চটে ইট বেরিয়ে থাকা, দেওয়ালের গা বেয়ে লতানে গাছ বা শিকড়-বাকড় বেরিয়ে থাকা – এই বাড়িতে সেরকম কোনো চিহ্ন নেই কিন্তু| বাড়িটাকে প্রথম দেখে বুচুন মনে করেছিলো যে এখানে যারা থাকতো তারা এমনিই কোথাও চলে-টলে গেছে হয়তো; কদিন পরে আবার তারা ফিরে এসে দিব্যি সাফসুতরো করে, আগাছা কেটে, চুনকাম করিয়ে আবার থাকা শুরু করবে|
তবে জামাইবাবুর কাছে শুনেছিলো বাড়িটা নাকি ‘ভালো না’| এর বেশি আর কিছু বুচুনকে কেউ বলে নি| তবে জামাইবাবুর কথা শুনে তার মনে কৌতুহলটা দিব্যি বেড়ে উঠেছিলো একরকম|
এবং ফলত এক দুপুরে ‘মলয় ভবন’ অভিযান|
এর মধ্যে সে যত গুলো বাঁক ঘুরেছে, যত গুলো সিঁড়ি টপকিয়েছে আর যতগুলো দরজা খুলেছে, তাতে হিসাবমত বাড়িটা অন্তত চারতলা উঁচু| প্রতি তলায় অন্তত খান পনেরো ঘর আছে| কিন্তু সে যখন ‘মলয় ভবনে’র পাশে এক ঝোপের মধ্যে দিদির ননদের সাইকেলটা তালা মেরে লুকিয়ে রাখছিলো, তখনো সামনে আর পাশ থেকে দেখে মনেই হয়নি যে এর ভিতর এতো ভুলভুলাইয়া!
কি আর করা যাবে| ঘুরতে ঘুরতে একসময়ে ঠিক বাইরে বেরুনোর একটা রাস্তা পাওয়া যাবে! কাজেই এই নতুন ঘরটার ভিতরে ঢুকে বুচুন চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো|
এই ঘরে আসবাব বলতে একটা ছোট পিঁড়ি ধরনে টুল ছাড়া আর কিছু নেই| এরকম একটা টুল সে নিচের কোনো একটা ঘরে দেখেছিলো – মনে হয় সেটা রান্নাঘর ধরনের কিছু ছিল| এই ঘরের ডানদিকের দেওয়ালে একটা দরজা আছে| এবার সেদিকে এগোলো সে|
এই দরজাটা খুলে বুচুন বেদম চমকে গেলো! আর চমকালো সেই ছেলেটা যে ঐ দরজার পিছনের ঘরের অন্যদিকের দেওয়ালে আরেকটা দরজার সামনে ঠেস দিয়ে বসে ছিল|
“কে?” দুজনেই একসাথে বলে উঠলো|
বুচুন ছেলেটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো| এই সময়ে তার মনে জামাইবাবুর বলা ‘ভালো না’ কথাটা বারবার ঘুরপাক দিচ্ছিলো| ছেলেটা সাধারণ গড়নের, তারই মতো বা তার থেকে আরেকটু লম্বা| পরনে লম্বা হাতা টি-শার্ট আর কার্গো প্যান্ট| বয়স খুব বেশি হলে সলো-সতেরো হবে, মানে তার থেকে বছর তিন-চারেকের বড় হয়তোবা| তবে প্রথম চমকে ওঠাটা কাটিয়ে ভালো করে দেখলে বোঝাই যায় যে এ সেই ‘ভালো না’ দলের লোক হতে পারে না| মানে অন্তত খুনী-দুষ্কৃতি বা চোর ডাকাত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম|
তবে আরেকটা সম্ভাবনা থেকে যায় – এই ছেলেটি হয়তো এই বাড়িতেই থাকে, আর সে এখানে বাইরে থেকে এসে ঢুকে পড়েছে| কাজেই তার মতো অনুপ্রবেশকারীকে চোর ডাকাত ভেবে ছেলেটি যদি বকা-ঝকা বা মার-ধর করতে শুরু করে তাহলেও ব্যাপারটা সেরকম সুবিধার হবে না|
চোর-ডাকাত – ভাবতেই মনে মনে হেসে ফেললো বুচুন| এই বাড়িতে কিই বা আছে যে চোর ডাকাত হানা দেবে| ছেলেটি দরজার সামনে থেকে উঠে দাড়িয়েছে ধীরে ধীরে, কিন্তু সে এখনো কিছু বলছে না দেখে সেই কথা বললো প্রথম|
“তুমি কে?”
বুচুনের স্বরে ছেলেটি একটু কেঁপে উঠলো যেন| “আমি … আমি?”
“হ্যাঁ – কে তুমি? এখানে …”
“জানি না!” ছেলেটির গলার স্বরে কেমন হতাশা ঝরে পড়ল| উত্তর শুনে অবাক হয়ে গেলো বুচুন|
“মানে? নাম? নাম কি তোমার? আমি বুচুন|”
“বুচুন?” তার কথা শুনে ছেলেটি মাথার চুল মুঠি করে ধরে কি ভাবতে লাগলো|
কতক্ষণ সময় কেটেছে কে জানে| বুচুন বেরুনোর সময় দিদির বাড়ি মোবাইলটা চার্জে রেখে এসেছিলো| জানতো যে সে মোটামুটি ঘন্টা খানেকের ভেতরই ফিরে আসবে, আর তার উপর তার মোবাইলে ছবি তোলা যায় না| কাজেই মোবাইল কোনো কাজে লাগবেনা ভেবেই সে আর বাড়তি বোঝা বাড়ায়নি| আর ওদিকে এখন আর চল নেই বলে হাতঘড়িও নেই তার হাতে| কাজেই এখন কটা বাজে তার কোনো আন্দাজ পাচ্ছে না সে|
ছেলেটির সাথে তার দেখা হলো হয়তো আধা-ঘন্টাটাক হবে, আর তারপর থেকে তারা একসাথে বাড়িটার মধ্যে ঘুরছে| তবে বাড়ির ভিতরের আলো কিন্তু কমে আসেনি এখনো| হয়তো সময়ের হিসাব নেই বলেই মনে হচ্ছে যে অনেকটা সময় কেটে যাচ্ছে ইতিমধ্যে|
ডাকবার সুবিধার জন্যে বুচুন ছেলেটিকে ‘দাদা’ বলছে| যতদুর বোঝা যায় তার মাথার অবস্থা হয়তো সেরকম ভালো না| এতক্ষনেও সে তার নাম-ধাম কোনো কিছুই মনে করে বলতে পারে নি|
“দাদা – তুমি সিওর তুমি এখানে থাকো না?” বুচুন আরেকবার জিজ্ঞেস করলো তাকে|
“না| আমি ভুল করে ঢুকে পড়েছি| তারপর … তারপর … তারপর …” ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো একটানা ঘ্যান ঘ্যান করতে শুরু করলো সে|
“যাকগে ছাড়ো!” ছেলেটিকে চুপ করিয়ে সামনের সিঁড়ি দিয়ে একসাথে নামতে থাকলো তারা| ‘তার-কাটা!’ মনে মনে ভাবলো সে|
“তারপর অনেকদিন এখানে ঘুরছি|” সিঁড়ির মাঝপথে আচমকাই বলে উঠলো ছেলেটা|
ছেলেটির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো বুচুন, “অনেকদিন! বলো কি? হা হা – তা এখানে খাওয়া দাওয়া জোটে কোত্থেকে?”
বুচুনের হাসিতে ছেলেটির কোনো বিকার হলো না, “খাওয়া?” আনমনে যেন নিজেকেই শোনালো সে| “খিদে পায় না!”
এবার বুচুন হাসিতে ফেটে পড়ল “দিব্যি বললে!” নিজের পেটের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখালো সে, “আমার কিন্তু এর মধ্যেই …” বলতে গিয়ে একটু আটকে গেলো বুচুন, না তার এখনো খিদে-টিদে পায় নি|
বুচুনের দিকে দেখছিলো ছেলেটা| একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো সে, “এখনো খিদে পায় নি বটে, কিন্তু আলো থাকতে থাকতে এখান থেকে বেরোতে না পারলে প্রচুর হ্যাপা আছে!”
ছেলেটি কোনো কথা না বলে আবার সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলো|
নিচের তলায় এসে আরেকবার ধন্দে পড়ল বুচুন| তার স্পষ্ট মনে আছে দু-তিন তলা ওঠবার পরে তার সাথে ছেলেটির দেখা হয়েছিল| তারপরে তারা নিচে নামা শুরু করেছে| কিন্তু নিচে নেমে তারা দেখলো যে আর সিঁড়ি নেই! মানে তারা একতলাতে দাড়িয়ে আছে এখন| সেটা কি করে সম্ভব?
মনের ভুল? হতেই পারে না! কারণ এতক্ষণ ধরে সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে তার পায়ের খিল ছাড়িয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল, কিতু এতো সহজে তারা কিভাবে একতলায় নেমে আসতে পারলো?
“অন্য কোনো সিঁড়ি হবে হয়তো!” মনের ভিতর দুশ্চিন্তা পাত্তা দিলো না সে| একতলায় যখন নামা গিয়েছে, তখন নিশ্চই বেরুনোর দরজাটা এখানেই কোথাও না কোথাও থাকবে| আশার আলো জেগে উঠলো বুচুনের মনে|
অন্য ছেলেটি সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে পড়েছে দেখে গা জ্বলে গেলো তার, “ওঠো ওঠো! এখানে বসে পড়ছ কেন? চলো বাইরে বেরুনোর রাস্তা খুঁজি গিয়ে|”
বুচুনের কথায় ছেলেটি না বসে আবার খাঁড়া হয়ে দাঁড়ালো, “বেরোনোর রাস্তা নেই!” সে ঘ্যানঘ্যানে গলায় বলে উঠলো |
“তোমার মাথা!” বুচুন রাগে ঝাঁজিয়ে উঠলো, “যত্তসব মাথা-পাগলা লোক|” আরো বকাঝকা করতে যাচ্ছিলো সে, কিন্তু ছেলেটির দিকে দেখে মায়া হলো তার, “কিছু মনে করো না দাদা – আমি ওভাবে বলতে চাই নি|”
তবে ছেলেটি কেবল তারদিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করলো না দেখে খানিকটা স্বস্তি পেলো সে|
সিঁড়ির লাগোয়া করিডোর দুদিকে চলে গেছে| বুচুন মনে করলো সে যখন একতলা থেকে উপরে ওঠা শুরু করেছিলো তখন সে ডানদিকে সিঁড়ি পেয়েছিলো, কাজেই যদি তারা বাঁদিক বরাবর এগোতে থাকে তবে হয়তো চেনা রাস্তা পাওয়া যাবে| সেইমতো সে ছেলেটিকে নিয়ে সেদিকে এগোতে লাগলো|
হাঁটতে হাঁটতে একটা দরজার সামনে ছেলেটি হঠাৎ তার গতি কমিয়ে দিলো| তার চেহারায় কিরকম ইতস্তত ভাব| সামনে আর এগোবে নাকি এগোবে না এরকম একটা দোনামনা মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকলো সে|
“আবার কি হলো?” বুচুন তার হাবভাব দেখে তাকে তাড়া দিলো|
“বুচুন|”
“হ্যাঁ? বলো|”
“আমার নাম বুচুন|”
থতমত খেয়ে গেলো বুচুন!
“আমার নাম বুচুন|” আরেকবার বললো ছেলেটি|
“তোমারও নাম বুচুন?” অবিশ্বাসের স্বরে জিজ্ঞাস করলে বুচুন|
“মনে পড়েছে – আমার নাম বুচুন|”
সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরেকবার দেখলো বুচুন| ছেলেটির চোখে মুখে হতাশা জড়িত একটা নির্বিকার ভাব লেগে থাকলেও মনে হচ্ছে না সে মিথ্যে কথা বলছে|
তাকে দেখতে দেখতে বুচুনের মাথায় হঠাৎ একটা চিন্তা খেলে গেলো| কিভাবে বলবে সেটা ঠিক করতে না পেরে একটু ইতস্তত করলো সে|
“দাদা, তোমার পকেটে খুঁজে দেখেছো কিছু আছে কিনা?”
বুচুনের প্রশ্ন শুনে তার দিকে একই ভাবে তাকিয়ে থাকলো ছেলেটি|
“মানে বলছিলাম কি, যদি কোনো আই.ডি. কার্ড, কাগজ-টাগজ, বাসের টিকিট কিছু থাকে তবে বোঝা যেত তোমার নাম কি, বা তোমার বাড়ি কোথায় – এরকম?”
এবার ছেলেটির ভিতর ভাবান্তর দেখা গেলো| সে যন্ত্রচালিতের মতো তার টিশার্টের বাঁ দিকে হাত বাড়ালো|
“ছিক! তোমার টি-শার্টে পকেট কোথায়?” হেসে ফেললো বুচুন| “প্যান্টের পকেটগুলো দেখো|”
“ওহ!” বলে এবার কার্গো প্যান্টের পাশের আর পিছনের পকেটগুলো হাতড়ে দেখতে শুরু করলো সে|
ছেলেটিকে দেখে বুচুনের মনে হিংসা হলো একটু| এরকম একটা ছয় পকেট-ওয়ালা প্যান্টের তার অনেকদিনের শখ, কিন্তু বাবার জ্বালায় … মনে মনে একটা দীর্ঘ্য-নিঃশ্বাস ফেললো সে|
প্যান্টের বাঁ পকেট থেকে একটা রুমাল বেরিয়ে এলো আর তার সাথে জড়িয়ে মড়িয়ে কটা খুচরো কয়েন মাটিতে পড়ে গেলো| সেই দেখে বুচুন ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো|
“এই যাহ! ইশ - আমি দেখছি!” বলে হন্তদন্ত হয়ে ছড়িয়ে যাওয়া কয়েনগুলো কুড়োতে বসে গেলো সে|
ছেলেটির কোনো বিকার না থাকলেও বুচুনের সাথে হাত লাগলো সেও|
একটা কয়েন গড়িয়ে সিঁড়ির দিকে চলে গিয়েছিলো, সেটাকে কুড়িয়ে ছেলেটির দিকে আসতে গিয়ে আরেকবার চমকে উঠলো বুচুন|
তারা যে দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটা এখন খুলে আছে - আর তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একটা ছোট্ট ছেলে!
“কে?”
ছোট ছেলেটির বয়স বছর ছয়-সাত মতো হবে| বেশ নিস্পাপ দেবশিশু ধরনের গড়ন| তার পরনে হাফ-শার্ট আর হাফ-প্যান্ট| সেগুলোর রং খানিকটা সে ছোটবেলায় যে প্রাইমারি ইস্কুলে পড়ত, তার ইউনিফর্মের মতো|
দু-মিনিট কথা বলতেই বুচুন বুঝলো এই নতুন ছেলেটির অবস্থাও আগের ছেলেটির মতো| তার মতো এও কিছুই মনে করতে পারছে না| নাম, বাবার নাম, ঠিকানা – কিছুই না!
এবার বুচুনের মনে হালকা আতঙ্ক জাগলো| এই বাড়িতে এমন কিছু নেই তো যাতে এখানে যারাই ঢোকে তাদের স্মৃতি লোপ পায়? সে চট করে একবার সব কিছু ঝালিয়ে নিলো, নাম, ঠিকানা থেকে শুরু করে ক্লাস সেভেনের পরীক্ষায় কি কি প্রশ্ন ছিল – সব কিছু| না, সে তো সব কিছুই মনে করতে পারছে| তাহলে এই দুটো ছেলের বেলায় এরকম কেন হলো?
তাদের দিকে আরেকবার নজর বুলোলো বুচুন| তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় নির্বিকার ভাবে| আগের ছেলেটির চেহারায় কোনো বিস্ময়, কোনো প্রশ্ন, কিছুই নেই| নতুন ছোট ছেলেটির উপস্থিতি নিয়ে যেন তার কোনো হেলদোল নেই|
“কি হলো বলত দাদা?” আগের ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করলো সে| “এই – এরও তো তোমার মতো অবস্থা দেখছি! চলো আগে বেরোনোর রাস্তাটা খোঁজা যাক, তারপরে না হয় তোমাদের নাম-ঠিকানা বার করে একটা কিছু করলে হবে|”
“আচ্ছা” প্রায় একই সাথে জবাব দিলো দুটি ছেলেই|
“বেরোনো যায় না|” ছোট ছেলেটির কথায় বুচুনের কেমন অস্বস্তি শুরু হলো|
একরকম তাড়া করেই সে ছেলেদুটিকে নিয়ে চললো করিডোর ধরে| ডানদিক বাঁ দিকে খানিক বাদে বাদেই দরজা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে| কিন্তু কোনো আঁক-বাঁক না নিয়ে সোজাই এগোতে থাকলো সে|
বুচুনের মনে আতঙ্ক কাজ করছিলো যে হয়তো যেকোনো সময়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে পড়তে পারে| কিন্তু করিডোরের শেষে বন্ধ দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে যখন সে হাঁফাতে লাগলো, খেয়াল করলো যে দরজার ফাঁক ফোকর দিয়ে বিকেলের আলো দিব্যি ভিতরে আসছে তখনো|
দরজার ওপাশে যখন আলো আছে, তাহলে আন্দাজ করাই যায় এটাই তাদের বেরোনোর রাস্তা| হাসি হাসি মুখে তার সঙ্গীদের দেখলো সে, তারা তখনো ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে|
দরজার এদিকে কোনো শিকল বা ছিটকিনি কিছু নেই| বুচুন একটা পাল্লার আড়-কাঠ ধরে টান দিলো ভিতরে| দরজাটা যেন এই বাড়ির অন্য সব দরজার মতোই নিজের ইচ্ছায় খুলে গেলো| একরাশ আলো ঝলসে উঠলো তার চোখের উপর|
খুব সাবধানে আলোর ভিতরে পা বাড়ালো বুচুন| চোখ সয়ে আসতে সে অবাক হয়ে দেখলো বাইরের দিকে নয়, দরজার দিকে মুখ করে সে দাঁড়িয়ে আছে!
“এই বুচুন? কোথায় যে হুটপাট চলে যাস - শিগগির ভেতরে আয়! মামী ফোন করেছিলো খানিক আগে, তুই মোবাইল রেখে চলে গেছিস|” বুচুন বাড়ি ফিরতেই বারান্দা থেকে ঝাঁজিয়ে উঠলো দিদি| “আগে কথা বল!”
সাইকেলটা সিঁড়ির পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে বুচুন ধীরে ধীরে ভিতরে এলো| বসবার ঘরে একপাশে তার ফোনটা চার্জে রাখা ছিল| সেটা সেভাবেই সেখানে রাখা আছে| ‘মলয় ভবন’ থেকে ফিরে আসার পথে তার মনে কিছু সন্দেহ জন্মাচ্ছিলো|
“এরকম যদি সারাদিন টইটই করবি, তাহলে … মামীকে বলতেই হবে!” দিদি তখনো রাগে গজরাচ্ছিলো!
দরজা অব্দি তার সাথে দুটি ছেলেই ছিল, কিন্তু তারা কেন তার সাথে বেরুলো না?
“কি রে? ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকলি কেন?”
দরজা খোলার সময়ে বুচুনের মনে হচ্ছিলো যেন তারা তিনজন নয় – আরো কারা তাদের পিছনে পিছনে আসছিলো|
“ফোনটা করলি নাকি?”
মোবাইলটা তুলে লকস্ক্রিনে দেখলো তখন তিনটে পঁচিশ| সে তিনটে নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো| দিদির বাড়ি থেকে ‘মলয় ভবন’ যেতে মিনিট দশ-বারো মতো সময় লাগে|
“কি হলো রে? তুই না বলে কয়ে এরকম মাঝে মাঝে হারিয়ে যাস, মামী টেনশন করছে!”
বুচুনের চমক ভাঙ্গল, “চিল্লাচ্ছ কেন? এই তো, করছিতো!”
মার সাথে ফোনে কথা বলবার সময়ে বুচুন খেয়াল করলো সে তার বাঁ-হাতে আনমনে একটা কয়েন আঁকড়ে ধরে রয়েছে| সেই ছেলেটার কয়েনটা যেটা সে সিঁড়ির গোড়া থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিলো, কিন্তু ছোট ছেলেটিকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনা-পরম্পরায় আর ফেরত দিতে মনে ছিল না|
“আরে না না! বলছি তো … তোমরা শুধুমুদু এমন চিল্লাও না! আমি পাশেই, মানে কাছেই ছিলাম, তাই আর ফোন নিয়ে বেরুইনি| … তা বাদে ফোনে চার্জ কম ছিল …”
কথা বলতে বলতে বাঁ-হাতে কয়েনটা ঘুরিয়ে দেখছিলো বুচুন| একটা নতুন চকচকে দুটাকার কয়েন| একদম আর পাঁচটা কয়েনের মতোই,– কেবল ছাপানো সালটা আজ থেকে তিন বছর পরের|
প্রকাশিত : ইস্টিকুটুম ২০১৬
সাহসে ভর করে দরজার পাল্লায় আলতো করে চাপ দিলো সে| পরিত্যক্ত বাড়ি, কেউ থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই| কিন্তু তাও দরজাটা খোলবার সময়ে সামান্য অস্বস্তি হলো| তার হাতের চাপে নয়, যেন নিজের ইচ্ছাতেই দরজার পাল্লাদুটো দুদিকে সরে গিয়ে তাকে ভিতরে আসবার জন্যে নিমন্ত্রণ জানালো|
ঘরের ভিতর পা বাড়ালো সে|
“কেন যে মরতে এখানে ঢুকেছিলাম!” বুচুন মনে মনে ভাবলো|
পিসতুতো দিদির বাড়ি বাড়ি বেড়াতে এসেছে সে| দিদির নতুন বিয়ে হয়েছে, বিয়ের সময়ে বুচুনের এনুয়াল পরীক্ষা ছিল, সেকারণে তার কনেযাত্রী আসা সম্ভব হয় নি| এখন ছুটি শুরু হয়ে যাওয়ার পর খানিক বুচুনের আবদার আর কিছু দিদির তাগিদে তার বাবা মা রাজি হয়েছিলেন এখানে বুচুনকে পাঠাতে|
রেজাল্ট আউট হলে তার এবার ক্লাস এইট হবে – কাজেই একেবারে ছোটটি সে নয়| তাই তাকে এবার থেকে একা ছাড়া যেতেই পারে| এবং সেইমতো দিদির বাড়ি এসে দিদির ননদের লেডিস সাইকেলটা নিয়ে একা একা বেশ মজাসে চক্কর মারছিলো চারিদিকে|
সমস্যা ঘটলো যখন এক দুপুরে সে ‘মলয় ভবন’এ এডভেঞ্চারের খোঁজে ঢুকলো|
বাড়িটা বাইরে থেকে যেরকম দেখা যায় – ছোটখাটো, দোতলা আর সামনের একচিলতে ফাঁকা জায়গা আগাছায় ভর্তি| পাশের একটা দরজাট হাট করে খোলা, ভিতরে আবছা অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না যে সেখানে কি আছে| তবে সামনের দরজা আর যতগুলো জানালা দেখা যায় সবকটাই বন্ধ|
সাধারণত মানুষ না থাকলে যেরকম হয় – দরজা জানালার পাল্লা খসে পড়ছে, দেওয়ালের প্লাস্টার চটে ইট বেরিয়ে থাকা, দেওয়ালের গা বেয়ে লতানে গাছ বা শিকড়-বাকড় বেরিয়ে থাকা – এই বাড়িতে সেরকম কোনো চিহ্ন নেই কিন্তু| বাড়িটাকে প্রথম দেখে বুচুন মনে করেছিলো যে এখানে যারা থাকতো তারা এমনিই কোথাও চলে-টলে গেছে হয়তো; কদিন পরে আবার তারা ফিরে এসে দিব্যি সাফসুতরো করে, আগাছা কেটে, চুনকাম করিয়ে আবার থাকা শুরু করবে|
তবে জামাইবাবুর কাছে শুনেছিলো বাড়িটা নাকি ‘ভালো না’| এর বেশি আর কিছু বুচুনকে কেউ বলে নি| তবে জামাইবাবুর কথা শুনে তার মনে কৌতুহলটা দিব্যি বেড়ে উঠেছিলো একরকম|
এবং ফলত এক দুপুরে ‘মলয় ভবন’ অভিযান|
এর মধ্যে সে যত গুলো বাঁক ঘুরেছে, যত গুলো সিঁড়ি টপকিয়েছে আর যতগুলো দরজা খুলেছে, তাতে হিসাবমত বাড়িটা অন্তত চারতলা উঁচু| প্রতি তলায় অন্তত খান পনেরো ঘর আছে| কিন্তু সে যখন ‘মলয় ভবনে’র পাশে এক ঝোপের মধ্যে দিদির ননদের সাইকেলটা তালা মেরে লুকিয়ে রাখছিলো, তখনো সামনে আর পাশ থেকে দেখে মনেই হয়নি যে এর ভিতর এতো ভুলভুলাইয়া!
কি আর করা যাবে| ঘুরতে ঘুরতে একসময়ে ঠিক বাইরে বেরুনোর একটা রাস্তা পাওয়া যাবে! কাজেই এই নতুন ঘরটার ভিতরে ঢুকে বুচুন চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো|
এই ঘরে আসবাব বলতে একটা ছোট পিঁড়ি ধরনে টুল ছাড়া আর কিছু নেই| এরকম একটা টুল সে নিচের কোনো একটা ঘরে দেখেছিলো – মনে হয় সেটা রান্নাঘর ধরনের কিছু ছিল| এই ঘরের ডানদিকের দেওয়ালে একটা দরজা আছে| এবার সেদিকে এগোলো সে|
এই দরজাটা খুলে বুচুন বেদম চমকে গেলো! আর চমকালো সেই ছেলেটা যে ঐ দরজার পিছনের ঘরের অন্যদিকের দেওয়ালে আরেকটা দরজার সামনে ঠেস দিয়ে বসে ছিল|
“কে?” দুজনেই একসাথে বলে উঠলো|
বুচুন ছেলেটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো| এই সময়ে তার মনে জামাইবাবুর বলা ‘ভালো না’ কথাটা বারবার ঘুরপাক দিচ্ছিলো| ছেলেটা সাধারণ গড়নের, তারই মতো বা তার থেকে আরেকটু লম্বা| পরনে লম্বা হাতা টি-শার্ট আর কার্গো প্যান্ট| বয়স খুব বেশি হলে সলো-সতেরো হবে, মানে তার থেকে বছর তিন-চারেকের বড় হয়তোবা| তবে প্রথম চমকে ওঠাটা কাটিয়ে ভালো করে দেখলে বোঝাই যায় যে এ সেই ‘ভালো না’ দলের লোক হতে পারে না| মানে অন্তত খুনী-দুষ্কৃতি বা চোর ডাকাত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম|
তবে আরেকটা সম্ভাবনা থেকে যায় – এই ছেলেটি হয়তো এই বাড়িতেই থাকে, আর সে এখানে বাইরে থেকে এসে ঢুকে পড়েছে| কাজেই তার মতো অনুপ্রবেশকারীকে চোর ডাকাত ভেবে ছেলেটি যদি বকা-ঝকা বা মার-ধর করতে শুরু করে তাহলেও ব্যাপারটা সেরকম সুবিধার হবে না|
চোর-ডাকাত – ভাবতেই মনে মনে হেসে ফেললো বুচুন| এই বাড়িতে কিই বা আছে যে চোর ডাকাত হানা দেবে| ছেলেটি দরজার সামনে থেকে উঠে দাড়িয়েছে ধীরে ধীরে, কিন্তু সে এখনো কিছু বলছে না দেখে সেই কথা বললো প্রথম|
“তুমি কে?”
বুচুনের স্বরে ছেলেটি একটু কেঁপে উঠলো যেন| “আমি … আমি?”
“হ্যাঁ – কে তুমি? এখানে …”
“জানি না!” ছেলেটির গলার স্বরে কেমন হতাশা ঝরে পড়ল| উত্তর শুনে অবাক হয়ে গেলো বুচুন|
“মানে? নাম? নাম কি তোমার? আমি বুচুন|”
“বুচুন?” তার কথা শুনে ছেলেটি মাথার চুল মুঠি করে ধরে কি ভাবতে লাগলো|
কতক্ষণ সময় কেটেছে কে জানে| বুচুন বেরুনোর সময় দিদির বাড়ি মোবাইলটা চার্জে রেখে এসেছিলো| জানতো যে সে মোটামুটি ঘন্টা খানেকের ভেতরই ফিরে আসবে, আর তার উপর তার মোবাইলে ছবি তোলা যায় না| কাজেই মোবাইল কোনো কাজে লাগবেনা ভেবেই সে আর বাড়তি বোঝা বাড়ায়নি| আর ওদিকে এখন আর চল নেই বলে হাতঘড়িও নেই তার হাতে| কাজেই এখন কটা বাজে তার কোনো আন্দাজ পাচ্ছে না সে|
ছেলেটির সাথে তার দেখা হলো হয়তো আধা-ঘন্টাটাক হবে, আর তারপর থেকে তারা একসাথে বাড়িটার মধ্যে ঘুরছে| তবে বাড়ির ভিতরের আলো কিন্তু কমে আসেনি এখনো| হয়তো সময়ের হিসাব নেই বলেই মনে হচ্ছে যে অনেকটা সময় কেটে যাচ্ছে ইতিমধ্যে|
ডাকবার সুবিধার জন্যে বুচুন ছেলেটিকে ‘দাদা’ বলছে| যতদুর বোঝা যায় তার মাথার অবস্থা হয়তো সেরকম ভালো না| এতক্ষনেও সে তার নাম-ধাম কোনো কিছুই মনে করে বলতে পারে নি|
“দাদা – তুমি সিওর তুমি এখানে থাকো না?” বুচুন আরেকবার জিজ্ঞেস করলো তাকে|
“না| আমি ভুল করে ঢুকে পড়েছি| তারপর … তারপর … তারপর …” ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো একটানা ঘ্যান ঘ্যান করতে শুরু করলো সে|
“যাকগে ছাড়ো!” ছেলেটিকে চুপ করিয়ে সামনের সিঁড়ি দিয়ে একসাথে নামতে থাকলো তারা| ‘তার-কাটা!’ মনে মনে ভাবলো সে|
“তারপর অনেকদিন এখানে ঘুরছি|” সিঁড়ির মাঝপথে আচমকাই বলে উঠলো ছেলেটা|
ছেলেটির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো বুচুন, “অনেকদিন! বলো কি? হা হা – তা এখানে খাওয়া দাওয়া জোটে কোত্থেকে?”
বুচুনের হাসিতে ছেলেটির কোনো বিকার হলো না, “খাওয়া?” আনমনে যেন নিজেকেই শোনালো সে| “খিদে পায় না!”
এবার বুচুন হাসিতে ফেটে পড়ল “দিব্যি বললে!” নিজের পেটের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখালো সে, “আমার কিন্তু এর মধ্যেই …” বলতে গিয়ে একটু আটকে গেলো বুচুন, না তার এখনো খিদে-টিদে পায় নি|
বুচুনের দিকে দেখছিলো ছেলেটা| একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো সে, “এখনো খিদে পায় নি বটে, কিন্তু আলো থাকতে থাকতে এখান থেকে বেরোতে না পারলে প্রচুর হ্যাপা আছে!”
ছেলেটি কোনো কথা না বলে আবার সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলো|
নিচের তলায় এসে আরেকবার ধন্দে পড়ল বুচুন| তার স্পষ্ট মনে আছে দু-তিন তলা ওঠবার পরে তার সাথে ছেলেটির দেখা হয়েছিল| তারপরে তারা নিচে নামা শুরু করেছে| কিন্তু নিচে নেমে তারা দেখলো যে আর সিঁড়ি নেই! মানে তারা একতলাতে দাড়িয়ে আছে এখন| সেটা কি করে সম্ভব?
মনের ভুল? হতেই পারে না! কারণ এতক্ষণ ধরে সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে তার পায়ের খিল ছাড়িয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল, কিতু এতো সহজে তারা কিভাবে একতলায় নেমে আসতে পারলো?
“অন্য কোনো সিঁড়ি হবে হয়তো!” মনের ভিতর দুশ্চিন্তা পাত্তা দিলো না সে| একতলায় যখন নামা গিয়েছে, তখন নিশ্চই বেরুনোর দরজাটা এখানেই কোথাও না কোথাও থাকবে| আশার আলো জেগে উঠলো বুচুনের মনে|
অন্য ছেলেটি সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে পড়েছে দেখে গা জ্বলে গেলো তার, “ওঠো ওঠো! এখানে বসে পড়ছ কেন? চলো বাইরে বেরুনোর রাস্তা খুঁজি গিয়ে|”
বুচুনের কথায় ছেলেটি না বসে আবার খাঁড়া হয়ে দাঁড়ালো, “বেরোনোর রাস্তা নেই!” সে ঘ্যানঘ্যানে গলায় বলে উঠলো |
“তোমার মাথা!” বুচুন রাগে ঝাঁজিয়ে উঠলো, “যত্তসব মাথা-পাগলা লোক|” আরো বকাঝকা করতে যাচ্ছিলো সে, কিন্তু ছেলেটির দিকে দেখে মায়া হলো তার, “কিছু মনে করো না দাদা – আমি ওভাবে বলতে চাই নি|”
তবে ছেলেটি কেবল তারদিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করলো না দেখে খানিকটা স্বস্তি পেলো সে|
সিঁড়ির লাগোয়া করিডোর দুদিকে চলে গেছে| বুচুন মনে করলো সে যখন একতলা থেকে উপরে ওঠা শুরু করেছিলো তখন সে ডানদিকে সিঁড়ি পেয়েছিলো, কাজেই যদি তারা বাঁদিক বরাবর এগোতে থাকে তবে হয়তো চেনা রাস্তা পাওয়া যাবে| সেইমতো সে ছেলেটিকে নিয়ে সেদিকে এগোতে লাগলো|
হাঁটতে হাঁটতে একটা দরজার সামনে ছেলেটি হঠাৎ তার গতি কমিয়ে দিলো| তার চেহারায় কিরকম ইতস্তত ভাব| সামনে আর এগোবে নাকি এগোবে না এরকম একটা দোনামনা মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকলো সে|
“আবার কি হলো?” বুচুন তার হাবভাব দেখে তাকে তাড়া দিলো|
“বুচুন|”
“হ্যাঁ? বলো|”
“আমার নাম বুচুন|”
থতমত খেয়ে গেলো বুচুন!
“আমার নাম বুচুন|” আরেকবার বললো ছেলেটি|
“তোমারও নাম বুচুন?” অবিশ্বাসের স্বরে জিজ্ঞাস করলে বুচুন|
“মনে পড়েছে – আমার নাম বুচুন|”
সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরেকবার দেখলো বুচুন| ছেলেটির চোখে মুখে হতাশা জড়িত একটা নির্বিকার ভাব লেগে থাকলেও মনে হচ্ছে না সে মিথ্যে কথা বলছে|
তাকে দেখতে দেখতে বুচুনের মাথায় হঠাৎ একটা চিন্তা খেলে গেলো| কিভাবে বলবে সেটা ঠিক করতে না পেরে একটু ইতস্তত করলো সে|
“দাদা, তোমার পকেটে খুঁজে দেখেছো কিছু আছে কিনা?”
বুচুনের প্রশ্ন শুনে তার দিকে একই ভাবে তাকিয়ে থাকলো ছেলেটি|
“মানে বলছিলাম কি, যদি কোনো আই.ডি. কার্ড, কাগজ-টাগজ, বাসের টিকিট কিছু থাকে তবে বোঝা যেত তোমার নাম কি, বা তোমার বাড়ি কোথায় – এরকম?”
এবার ছেলেটির ভিতর ভাবান্তর দেখা গেলো| সে যন্ত্রচালিতের মতো তার টিশার্টের বাঁ দিকে হাত বাড়ালো|
“ছিক! তোমার টি-শার্টে পকেট কোথায়?” হেসে ফেললো বুচুন| “প্যান্টের পকেটগুলো দেখো|”
“ওহ!” বলে এবার কার্গো প্যান্টের পাশের আর পিছনের পকেটগুলো হাতড়ে দেখতে শুরু করলো সে|
ছেলেটিকে দেখে বুচুনের মনে হিংসা হলো একটু| এরকম একটা ছয় পকেট-ওয়ালা প্যান্টের তার অনেকদিনের শখ, কিন্তু বাবার জ্বালায় … মনে মনে একটা দীর্ঘ্য-নিঃশ্বাস ফেললো সে|
প্যান্টের বাঁ পকেট থেকে একটা রুমাল বেরিয়ে এলো আর তার সাথে জড়িয়ে মড়িয়ে কটা খুচরো কয়েন মাটিতে পড়ে গেলো| সেই দেখে বুচুন ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো|
“এই যাহ! ইশ - আমি দেখছি!” বলে হন্তদন্ত হয়ে ছড়িয়ে যাওয়া কয়েনগুলো কুড়োতে বসে গেলো সে|
ছেলেটির কোনো বিকার না থাকলেও বুচুনের সাথে হাত লাগলো সেও|
একটা কয়েন গড়িয়ে সিঁড়ির দিকে চলে গিয়েছিলো, সেটাকে কুড়িয়ে ছেলেটির দিকে আসতে গিয়ে আরেকবার চমকে উঠলো বুচুন|
তারা যে দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটা এখন খুলে আছে - আর তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একটা ছোট্ট ছেলে!
“কে?”
ছোট ছেলেটির বয়স বছর ছয়-সাত মতো হবে| বেশ নিস্পাপ দেবশিশু ধরনের গড়ন| তার পরনে হাফ-শার্ট আর হাফ-প্যান্ট| সেগুলোর রং খানিকটা সে ছোটবেলায় যে প্রাইমারি ইস্কুলে পড়ত, তার ইউনিফর্মের মতো|
দু-মিনিট কথা বলতেই বুচুন বুঝলো এই নতুন ছেলেটির অবস্থাও আগের ছেলেটির মতো| তার মতো এও কিছুই মনে করতে পারছে না| নাম, বাবার নাম, ঠিকানা – কিছুই না!
এবার বুচুনের মনে হালকা আতঙ্ক জাগলো| এই বাড়িতে এমন কিছু নেই তো যাতে এখানে যারাই ঢোকে তাদের স্মৃতি লোপ পায়? সে চট করে একবার সব কিছু ঝালিয়ে নিলো, নাম, ঠিকানা থেকে শুরু করে ক্লাস সেভেনের পরীক্ষায় কি কি প্রশ্ন ছিল – সব কিছু| না, সে তো সব কিছুই মনে করতে পারছে| তাহলে এই দুটো ছেলের বেলায় এরকম কেন হলো?
তাদের দিকে আরেকবার নজর বুলোলো বুচুন| তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় নির্বিকার ভাবে| আগের ছেলেটির চেহারায় কোনো বিস্ময়, কোনো প্রশ্ন, কিছুই নেই| নতুন ছোট ছেলেটির উপস্থিতি নিয়ে যেন তার কোনো হেলদোল নেই|
“কি হলো বলত দাদা?” আগের ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করলো সে| “এই – এরও তো তোমার মতো অবস্থা দেখছি! চলো আগে বেরোনোর রাস্তাটা খোঁজা যাক, তারপরে না হয় তোমাদের নাম-ঠিকানা বার করে একটা কিছু করলে হবে|”
“আচ্ছা” প্রায় একই সাথে জবাব দিলো দুটি ছেলেই|
“বেরোনো যায় না|” ছোট ছেলেটির কথায় বুচুনের কেমন অস্বস্তি শুরু হলো|
একরকম তাড়া করেই সে ছেলেদুটিকে নিয়ে চললো করিডোর ধরে| ডানদিক বাঁ দিকে খানিক বাদে বাদেই দরজা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে| কিন্তু কোনো আঁক-বাঁক না নিয়ে সোজাই এগোতে থাকলো সে|
বুচুনের মনে আতঙ্ক কাজ করছিলো যে হয়তো যেকোনো সময়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে পড়তে পারে| কিন্তু করিডোরের শেষে বন্ধ দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে যখন সে হাঁফাতে লাগলো, খেয়াল করলো যে দরজার ফাঁক ফোকর দিয়ে বিকেলের আলো দিব্যি ভিতরে আসছে তখনো|
দরজার ওপাশে যখন আলো আছে, তাহলে আন্দাজ করাই যায় এটাই তাদের বেরোনোর রাস্তা| হাসি হাসি মুখে তার সঙ্গীদের দেখলো সে, তারা তখনো ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে|
দরজার এদিকে কোনো শিকল বা ছিটকিনি কিছু নেই| বুচুন একটা পাল্লার আড়-কাঠ ধরে টান দিলো ভিতরে| দরজাটা যেন এই বাড়ির অন্য সব দরজার মতোই নিজের ইচ্ছায় খুলে গেলো| একরাশ আলো ঝলসে উঠলো তার চোখের উপর|
খুব সাবধানে আলোর ভিতরে পা বাড়ালো বুচুন| চোখ সয়ে আসতে সে অবাক হয়ে দেখলো বাইরের দিকে নয়, দরজার দিকে মুখ করে সে দাঁড়িয়ে আছে!
“এই বুচুন? কোথায় যে হুটপাট চলে যাস - শিগগির ভেতরে আয়! মামী ফোন করেছিলো খানিক আগে, তুই মোবাইল রেখে চলে গেছিস|” বুচুন বাড়ি ফিরতেই বারান্দা থেকে ঝাঁজিয়ে উঠলো দিদি| “আগে কথা বল!”
সাইকেলটা সিঁড়ির পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে বুচুন ধীরে ধীরে ভিতরে এলো| বসবার ঘরে একপাশে তার ফোনটা চার্জে রাখা ছিল| সেটা সেভাবেই সেখানে রাখা আছে| ‘মলয় ভবন’ থেকে ফিরে আসার পথে তার মনে কিছু সন্দেহ জন্মাচ্ছিলো|
“এরকম যদি সারাদিন টইটই করবি, তাহলে … মামীকে বলতেই হবে!” দিদি তখনো রাগে গজরাচ্ছিলো!
দরজা অব্দি তার সাথে দুটি ছেলেই ছিল, কিন্তু তারা কেন তার সাথে বেরুলো না?
“কি রে? ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকলি কেন?”
দরজা খোলার সময়ে বুচুনের মনে হচ্ছিলো যেন তারা তিনজন নয় – আরো কারা তাদের পিছনে পিছনে আসছিলো|
“ফোনটা করলি নাকি?”
মোবাইলটা তুলে লকস্ক্রিনে দেখলো তখন তিনটে পঁচিশ| সে তিনটে নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো| দিদির বাড়ি থেকে ‘মলয় ভবন’ যেতে মিনিট দশ-বারো মতো সময় লাগে|
“কি হলো রে? তুই না বলে কয়ে এরকম মাঝে মাঝে হারিয়ে যাস, মামী টেনশন করছে!”
বুচুনের চমক ভাঙ্গল, “চিল্লাচ্ছ কেন? এই তো, করছিতো!”
মার সাথে ফোনে কথা বলবার সময়ে বুচুন খেয়াল করলো সে তার বাঁ-হাতে আনমনে একটা কয়েন আঁকড়ে ধরে রয়েছে| সেই ছেলেটার কয়েনটা যেটা সে সিঁড়ির গোড়া থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিলো, কিন্তু ছোট ছেলেটিকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনা-পরম্পরায় আর ফেরত দিতে মনে ছিল না|
“আরে না না! বলছি তো … তোমরা শুধুমুদু এমন চিল্লাও না! আমি পাশেই, মানে কাছেই ছিলাম, তাই আর ফোন নিয়ে বেরুইনি| … তা বাদে ফোনে চার্জ কম ছিল …”
কথা বলতে বলতে বাঁ-হাতে কয়েনটা ঘুরিয়ে দেখছিলো বুচুন| একটা নতুন চকচকে দুটাকার কয়েন| একদম আর পাঁচটা কয়েনের মতোই,– কেবল ছাপানো সালটা আজ থেকে তিন বছর পরের|
প্রকাশিত : ইস্টিকুটুম ২০১৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন