ভয়ে আর তেষ্টায় গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসলে রঞ্জনা উল্টোদিকের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা দেখবার চেষ্টা করলো। আন্দাজে মনে হলো দুটো কুড়ি-পঁচিশ। হাত-পা জমে কাঠ হয়ে আছে, নড়াচড়া করার কোনো প্রয়োজন নেই – কিন্তু তার থেকেও বড় কথা রঞ্জনা এখনো পুরোপুরি সাহস ফিরে পায় নি। বাইরের ঘরে এখন আর সেই ঘসটানোর মতো আওয়াজটা শোনা যাচ্ছে না।
পাশে তার স্বামী কৃষ্ণেন্দু ঘুমে অচেতন। “এই!” খুব সাবধানে ফিসফিস করে ডাকলো রঞ্জনা। ডাকতেও ভরসা হচ্ছে না, যদি কৃষ্ণেন্দু ঘুম থেকে উঠেই হাঁক-ডাক করে ফেলে! রঞ্জনার ডাকে কৃষ্ণেন্দুর কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। সে আগের মতই অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
আস্তে আস্তে সাহস ফিরতে থাকে – রঞ্জনা চুপচাপ শুয়ে অপেক্ষা করে যদি আবার সেই আওয়াজটা শোনা যায়। কি হতে পারে? ইঁদুরের উত্পাত নেই তাদের বাড়িতে। বিড়ালও হবে না – জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বিড়াল গলবার রাস্তা পায় না। কিন্তু ইঁদুর-বিড়ালও যদি হয় তবে কোন ভারী জিনিষ ঘসটিয়ে নিয়ে যাবে তারা?
সাহস ফেরবার সাথে সাথে যুক্তিও ফিরে আসতে থাকে। তাদের বাড়িতে মানুষ তারা চারজন। সে, তার স্বামী কৃষ্ণেন্দু, তাদের আড়াই বছরের ছেলে সাত্যকি, যে এখন বিছানায় রঞ্জনা ও কৃষ্ণেন্দুর মধ্যিখানে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে পড়ে আছে – আর চতুর্থজন হলো কৃষ্ণেন্দুর মাসতুতো দাদা বিনয়, যার জায়গা এখন তাদের বাড়ির বাইরের বসবার ঘরের পাশের একটা ছোট ঘরে। বাড়িতে এই মুহুর্তে জেগে রয়েছে কেবল একা রঞ্জনা। বিনয়বাবুর জেগে-থাকা ঘুমিয়ে-থাকা সমান, কারণ মাস দেড়েক আগের একটা দুর্ঘটনায় তিনি আপাতত শয্যাশায়ী।
বিনয়বাবুর কথা মাথায় আসতেই বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে গেলো রঞ্জনার।
একটা লম্বা নিঃস্বাস নিয়ে স্বাভাবিক হলো সে। এখন অন্ধকার অনেকটাই পরিষ্কার – রাস্তার প্রতিফলিত আলোয় ঘড়িতে দেখা গেলো সাড়ে তিনটে বাজে। আগেরবার ঘড়ির ছোট কাঁটাটা কোথায় ছিল ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি রঞ্জনা। জল তেষ্টা পেয়েছে, এদিকে খাটের পায়ার পাশে একটা বোতল আছে – হাত বাড়াতে গিয়ে একবার থমকালো সে। কি জানি বাবা! খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে নেই তো?
“বাবা! টিকবুক।” সাত্যকি আবদার করে।
“উহু এখন না সোনাই!” কৃষ্ণেন্দুর এখন ঘোড়া ঘোড়া খেললে চলবে না, সকালবেলা এমনিতেই তার ব্যস্ততা থাকে, তার সাথে আজ তাকে কটা প্রশেনর উত্তর পেতে হবে।
মিতা পেশাদার আয়া, বিনয়কে দিনেরবেলা দেখভাল করার জন্যে তাকে রাখা হয়েছে। কৃষ্ণেন্দু বিনয়ের ঘরে ঢুকে দেখলো বিছানার পাশে একটা টুলে বসে একটা ফিল্ম ম্যাগাজিন পড়ছে। সাতসকালে কৃষ্ণেন্দুকে ঘরে ঢুকতে দেখেই চটজলদি ম্যাগাজিনটা গুছিয়ে নিয়ে সপ্রতিভ হয়ে ওঠবার চেষ্টা করলো সে।
“ঘুমোচ্ছে?”
“না – ঘোর ঘোর মতো। ওষুধ …”
“বিনুদা – শুনছো?” বিনয়ের বিছানার কাছে গিয়ে ডাকলো কৃষ্ণেন্দু।
বিনয় আলগোছে চোখ খুললো একবার। তার দৃষ্টির কোনো ভাষা নেই। দেখেই বোঝা যায় যে কৃষ্ণেন্দুকে ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারেনি সে এখনো।
“ঘুমুচ্ছ?” আবার প্রশ্ন করলো কৃষ্ণেন্দু।
এবার গলা দিয়ে একবার ঘড়ঘড় মতো একটা শব্দ করলো বিনয়। তারপরে ক্লান্তিতে আবার তার চোখ বুজে এলো।
একটা দীর্ঘ্যনিঃস্বাস ফেললো কৃষ্ণেন্দু, এ মানুষকে দিয়ে কিছুই করার নেই। এবার মিতার দিকে ফিরলো সে।
“সকাল থেকে কথাটথা বলেছে কিছু?”
“না তো – এমনিতেইতো কথা বলার মতো নয়। পেনকিলারের একশানে সবসময়েই – এই যেরকম দেখছেন।”
“হুম! আসলে কি হয়েছে … যাকগে, শোনো যদি ওনার ঘোর কাটে, বা একটু স্বাভাবিক মতো হয়, তো তুমি একটা জিনিষ একটু জিজ্ঞেস করতো – মনে করে।”
“হ্যা বলুন” – খাটের পাশে রাখা ছোট আলমারির মাথা থেকে একটা লেখবার প্যাড আর পেন নেয় মিতা।
কৃষ্ণেন্দু হেসে ফেলে – “আরে না না। লিখতে হবে না, ছোট ব্যাপার।”
মিতা অপ্রস্তুত হয়ে প্যাড পেন ফেরত পাঠায় আগের জায়গায় – “ভেবেছিলাম ওষুধ-টষুধের কোনো …”
“ওরকম কিছু না। আসলে, কি বলবো – কাল রাতে একটা আওয়াজ হচ্ছিলো এদিকে, তাই আর কি – মানে দাদা যদি কিছু শুনেটুনে থাকে।”
“আওয়াজ মানে?”
“মানে এই – মানুষ চলাচলের মতো – এইরকম।”
এবার মিতার মুখে আতঙ্ক দেখা যায় – “বলেন কি দাদা? হ্যাঁ? কি সাংঘাতিক! আপনাদের বাড়ির ভিতরে? ঘরের মধ্যে?”
“আরে না না – তোমার বৌদি শুনেছে, ঘুমের ভিতর – ভুলও হতে পারে হয়তো, তাও …”
“না না দাদা – সাবধানের মার নেই!” এবার গলা নামিয়ে আনে মিতা – “জানেন তো এখন চারদিকের পরিস্থিতি!” প্রায় ফিসফিস করে বলতে থাকে – “বর্ডারে স্মাগলিং বন্ধ হয়ে গেছে – যারা আগে ওসব করতো তাদের তো এখন কিছু করার নেই।” এবার শোনা যায় না এমন নিচুস্বরে বলে – “তারাই এবার সব চুরি ডাকাতি করতে নেমে পড়েছে!”
মিতার হাবভাব দেখে হেসে ফেলে কৃষ্ণেন্দু – “আরে ধুর – আমাদের বাড়ি আছেটা কি যে চোর ডাকাত হানা দেবে? হা হা।”
“হাসবেন না দাদা – তা ছাড়াও ছিঁচকে-চোর, পাতাখোর-নেশাখোরের উত্পাত খুব … দাদা, দিনকাল খুউব খারাপ।”
“নারে ভাই – বললাম তো ঘুমের ঘোরে … যাকগে আমি বেরুবো এবার, শোনো তাহলে, যদি দাদা স্বাভাবিক হয় তো একটু জানতে চেষ্টা করো তাহলে – কেমন?”
“হ্যাঁ দাদা – খাওয়ানোর সময়ে আমি জেনে নেবো’ক্ষণ, মনে থাকবে – ভাববেন না।”
“বেশ।”
কৃষ্ণেন্দু অফিসে বেরিয়ে গেলে বাড়িটা আগে ফাঁকা-ফাঁকা মনে হত, সাত্যকি হওয়ার পরে তাকে নিয়ে রঞ্জনার ব্যস্ততা সেই শুন্য ভাবটা ভরাট করে ফেলেছে। ভাসুর বিনয়ের উপর রঞ্জনার বিতৃষ্ণা থাকলেও একদিক থেকে তার উপর সে কৃতজ্ঞ – উনি এখানে না আসলে মিতারও এই বাড়িতে আসাটাও সম্ভব ছিল না।
“বৌদি – শুরু হয়েছে?”
“হ্যাঁ – এইবার, এড দিচ্ছে। এসো – তোমার কাজ মিটল?”
রঞ্জনা সাত্যকিকে নিয়ে তাদের শোয়ার ঘরে খাটে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলে মিতা রঞ্জনার কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে।
হেলথড্রিংক, শাড়ির দোকান, শ্যাম্পু-সাবানের হাবিজাবি নানা বিজ্ঞাপনের পরে একসময়ে তাদের প্রতীক্ষার অবসান হলো – টিভিতে শুরু হলো ‘সাতজনমের সাথী!’ গত তিনচারদিনে ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না ‘শ্যামা’ই ‘সিমরণ’ কিনা – যতক্ষণ না সে রহস্য উদ্ঘাটন হচ্ছে ততক্ষণ অব্দি রঞ্জনা, মিতা বা তাদের মতো সিরিয়াল ভক্ত গৃহবধুদের শান্তি নেই। তবে আজকেও যে রহস্যভেদ হবে তার আশা কম – চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকের প্যাঁচে নাটকের জটিলতা কতটা বাড়ে সেটাই দেখবার বিষয়। দুজনে বাহ্যজ্ঞান ভুলে ‘সাতজনমের সাথী’ দেখতে থাকলো। এটা তাদের বিগত দেড়মাসের রুটিন।
বিজ্ঞাপন বিরতির সময়ে রঞ্জনা শুনলো বাইরের ঘর থেকে সাত্যকির হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। সাত্যকি কখন খাট থেকে নেমে বাইরে চলে গেছে সিরিয়াল দেখতে দেখতে সে খেয়াল ছিল না রঞ্জনার। সাত্যকির খিল খিল হাসির আওয়াজ শুনতে পেয়ে এবার টিভি পরিবার থেকে নিজের পরিবারের হুস ফিরলো তার।
“সোনাই – এদিকে এসো।”
ঘরের বাইরে সাত্যকিকে দেখা গেলো এবার – তার মুখ এখনো হাসি হাসি।
“সোনাই! কোথায় গিয়েছিলে? বলেছি না চুপ করে শুয়ে থাকতে?” যতটা হয় মুখ গম্ভীর করে ধমকের সুরে বলে রঞ্জনা, যদিও মায়ের ধমকে ভয় পায় না সাত্যকি।
হাসতে হাসতেই খাটের পাশে এসে দুহাত উঁচু করে তুলে দাঁড়ায় সে – “টিকবুক?”
হাত বাড়িয়ে সাত্যকিকে বিছানার উপরে তুলে আনে রঞ্জনা। “বসো এখানে। সবসময় টিকবুক না? একদম নড়বে না।” ছদ্ম গাম্ভীর্যে বলে সে, তারপরে কোলের মধ্যে ছেলেকে টেনে নেয়। “দীঘায় ঘোড়ায় চড়ে কি যে আবদার হয়েছে এখন। সবসময়ে টগবগ – হা হা।”
মিতাও সাত্যকির হাবভাব দেখে হেসে ফেলে।
বিজ্ঞাপন শেষ হয়েছে – সিরিয়াল চালু হবে, সাত্যকিকে জড়িয়ে ধরেই টিভির দিকে রঞ্জনার চোখ চলে যায়। তার কোলের মধ্যে ছটফট করে সাত্যকি – “জেনাই।” সাত্যকি বিনয়কে জেনাই বলে ডাকে – জ্যেঠাই থেকে জেনাই।
“হুউম! জেনাইয়ের অসুখ! জেনাইকে বিরক্ত করে না ছি!”
যথারীতি আজকেও ‘শ্যামা’ ‘সিমরনে’র ধন্দ কাটলো না – উপরন্তু নতুন এক রহস্য যোগ হলো, এতদিন যাকে ‘ইন্দ্রনীলে’র ভাই বলে জানা গিয়েছিলো সেই ‘সায়নে’র আসল পরিচয় সে নাকি ‘ইন্দ্রনীলে’র ছেলে!
“যাব্বাবা!” সিরিয়াল শেষ হলেও মিতার চোখ এখনো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে!
“বোঝো! কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই টেনশন ভালো লাগে?”
“সত্যি বৌদি – মাঝে মাঝে মনে হয় যে এ ঘোড়ার ডিমের সিরিয়াল আর দেখবো না, কিন্তু হি হি।”
“নেশা মতো হয়ে গেছে – না? আমারও একই দশা।”
“বৌদি, সোনাই ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে।” রঞ্জনার কোলে সাত্যাকিকে দেখে মিতা।
“এমা তাইতো!” খেয়াল হয় রঞ্জনার।
তাদের সিরিয়াল দেখার মধ্যে সাত্যকি ঘুমিয়ে কাদা হয়ে তার কোলে লেপ্টে আছে। তাকে সাবধানে বালিশে শুইয়ে দেয় সে।
“বৌদি – কাল কি হয়েছিল গো? দাদার কাছে শুনছিলাম।” রঞ্জনার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞাস করে মিতা।
“আরে – কি জানি, বুঝতে পারিনি ঠিকঠাক – কাল রাত তিনটে নাগাদ, আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো …”
গলার স্বর নিচু করে জিজ্ঞাস করে মিতা, “কারা দৌড়াদৌড়ি করছিলো নাকি?”
“না না – দৌড়াদৌড়ি না! মনে হচ্ছিলো কে যেন কি টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের বসবার ঘরের দিকে – জানো তো! এত্তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
“দরজা জানালা ঠিকঠাক বন্ধ করা ছিল তো? দেখবেন – দিনকাল খুব খারাপ, একটু সাবধান না হলেই।”
“হ্যাঁ – ও আমার ভুল হয় না। বলাই চলে গেলেই সামনে ডবল-তালা।”
“দাদা আমায় জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন – ঐ দাদা কিছু শুনেছেন-টুনেছেন কিনা, কিন্তু কি বলবো, বেচারা দিনমানেই তাই হুঁশে থাকেন না, আর তার উপর তো রাতের বেলা। আমি খাওয়ানোর সময়ে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম।”
“কথা-টথাতো কিসু বলে না – বললো কিছু?”
“না-গো বৌদি। যেরকম যেরকম চামচে করে তুলে দিলাম সেরকম সেরকম খেয়ে গেলো – ব্যাস, তাছাড়া হ্যাঁ-হু-না – কিচ্ছু না।”
খানিক সময় চুপ করে থাকে রঞ্জনা – কৃষ্ণেন্দুর হাবভাব দেখলে কিছু আন্দাজ করা যায় না, কিন্তু রঞ্জনার কাছে বিনয়বাবু একটা অবাঞ্চিত দুর্যোগ ছাড়া আর কিছুই না।
“তা বৌদি – কিছু দেখতে টেখতে পেয়েছিলেন? কোথাও কোনো চিহ্নটিহ্ন?”
“উহু – কিরকম বলত, আমি ভেবেছিলাম যে মালভর্তি বস্তা-টস্তা যেরকম করে টেনে নিয়ে যায় না? তবে দরজার তালাটালা দিব্যি ঠিকঠাক আটকানো – যেমন ছিল তেমন।”
“তাহলে রাস্তায় হবে হয়তো – কি?”
“নাগো – অতো রাতে, কে জানে! তবে আমার মনে হচ্ছিলো কিন্তু বাড়ির ভেতরেই! বাব্বা – গলাটলা শুকিয়ে কাঠ! হাত বাড়িয়ে জলের বোতল নেবো – সে অব্দি সাহসে কুলোয় না!”
“দেখবেন বৌদি সাবধানে থাকবেন – দিনকাল খুউব খুউব খারাপ! স্মাগলিং বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে … ” মিতার গলা খাদে নেমে আসে।
বিনয়বাবু আপাতত কৃষ্ণেন্দুর আশ্রিত কিন্তু পুরোপুরি নিরবলম্বন নয়। হাসপাতাল থেকে ফোন পেয়ে কৃষ্ণেন্দু ছুটে গিয়েছিলো সেখানে। চেনা পরিচিত বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কৃষ্ণেন্দু কাছাকাছি মানুষ। কৃষ্ণেন্দুকে ডেকে তার দুটো এটিএম কার্ড ধরিয়ে দিয়ে কানে-কানে পিন নম্বরগুলো বলে দিয়েছিলো বিনয়।
“কি বিনুদা? কিছু চাই?” জিজ্ঞেস করেছিলো কৃষ্ণেন্দু।
“এগুলো রাখ – হাসপাতালের খরচা।” জড়ানো গলায় বলেছিলো বিনয়।
“আরে রাখো তো – আমি তো আছি।”
বিনয় কিছু না বলে হাত নেড়ে কার্ডগুলো রাখতে বলেছিলো তাকে।
বিনয়বাবু ডিভোর্সী, নিজের লোক বলতে কেউ নেই। কৃষ্ণেন্দুর মাসিমা-মেসোমশাই মারা গিয়েছেন অনেকদিন – নিজের এক ভাই বিদেশে থাকে, কোনো যোগাযোগ রাখতে চায় নি। কাজেই আত্মীয় বলতে এখন কৃষ্ণেন্দু একা। তাই হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেবার পরে নিজের ফ্ল্যাট নয়, বিনয়বাবুর বর্তমান ঠিকানা কৃষ্ণেন্দুর বাড়ি। বিনয় একটা বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরি করতো, মোটামুটি ভালো পদে – কাজেই মনে হয় না তার দেওয়া কার্ডগুলোর ওজন তেমন খারাপ হবে। হেলথ-ইন্সুরেন্সও থাকবার কথা। তবে আপাতত তো মানুষটা সুস্থ হোক! পরে সেসব দেখা যাবে। কৃষ্ণেন্দুর নিজের রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান, রমরমা না হোক তারও অবস্থা খারাপ নয়, কাজেই দুটো এ.টি.এম কার্ড সেইভাবেই তোলা আছে।
এখানেই আপত্তি রঞ্জনার। দুর্ঘটনার পরে বিনয় ভর্তি ছিল সরকারী হাসপাতালে – সেখানে চিকিত্সার জন্যে খরচ কিছু না হলেও, পরবর্তী ওষুধ, আয়া ফিজিওথেরাপিস্ট – সবমিলিয়ে মানুষটার পিছনে টাকা চলে যাচ্ছে ঝড়ের মতো। বিনয়ের সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণেন্দু কেন নিজের কাঁধে এইসব দায় নেবে? তাছাড়া বাড়িতে একজন অসুস্থ মানুষ থাকলে পরিস্থিতিটাই অন্যরকম হয়ে যায়। রঞ্জনা সব মিলিয়ে বেসামাল!
বাইরের ঘরের দিকে রঞ্জনা যেতে চায় না পারতপক্ষে। ওষুধ, ফিনাইল, ডেটলের গন্ধ, আর তার সাথে মাঝে মাঝে ঘড়ঘড় কাতরোক্তি – এদুটো সবসময়ে বাইরের ঘরের পরিবেশটাকে ভারী করে রেখেছে। মন না চাইলেও চোখ চলে যায় দরজার পিছনের ছোট ঘরটায় বিছানার উপরে চাদর-চাপা দেওয়া শরীরটার দিকে। ওদিকে গেলেই রঞ্জনার স্নায়ুর উপর চাপ পড়ে। তাই বিকেলবেলাটা ছাদে বা পিছনের বারান্দায় কাটায় সে।
সন্ধ্যার মুখে মুখে সামনের দরজায় কলিং-বেলের আওয়াজ। আজ ছাদে পায়চারি করছিলো রঞ্জনা, সামনের গিয়ে রেলিঙের উপর দিয়ে দেখলো ফিজিওথেরাপিস্ট ছেলেটি – বলাই এসেছে।
“চলো সোনাই – নিচে যেতে হবে।” সাত্যকি আপনমনে একটা গাড়ি নিয়ে খেলা করছিলো, তাকে ডাকলো রঞ্জনা।
“আলেত্তু” সাত্যকির আবদার।
“না সোনাই, চলো – সেই কাকুটা এসেছে। এইবার পড়তে বসতে হবে, তা না হলে কাকুটা বকবে!”
রাতে শুতে যাওয়ার আগে কৃষ্ণেন্দু আরেকবার ভালো করে সামনের গেটের তালা গুলো দেখে নিলো কৃষ্ণেন্দু। তারপরে রোজকার মতই বিনয়ের ঘরের দরজার সামনে একটু দাঁড়ালো সে। ঘরের ভিতরে একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। তার স্বল্প আলোয় খুব ধীরে ধীরে বিনয়ের বুকের ওঠাপড়া দেখে বোঝা যায় যে এখনো বেঁচে আছে মানুষটা।
অভ্যেস মতো জিজ্ঞাস করলো কৃষ্ণেন্দু – “বিনুদা ঘুমিয়েছো?”
উত্তর হিসাবে একটা ঘরঘরে আওয়াজ এলো ঘরের ভিতর থেকে। দীর্ঘ্যনিঃশ্বাস ফেললো কৃষ্ণেন্দু। কি হবে মানুষটার?
“বলাইকে কিছু জিজ্ঞাস করে লাভ নেই - মিতার কাছ থেকেও সেরকম তো কিছু বুঝি না, একই রকম।”
“দেখা যাক নেস্কট বার ডাক্তার বাবু দেখে কি বলেন।”
নিজেদের শোয়ার ঘরে বসে আলোচনা করছিলো কৃষ্ণেন্দু আর রঞ্জনা। সাত্যকি ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই গলার আওয়াজ নিচু।
“হ্যাঁগো – কি করে কি হবে বলত? যদি আর কখনো …” সাত্যকির মাথায় হালকা আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে কৃষ্ণেন্দুর দিকে তাকালো রঞ্জনা।
“ছিক!” মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক আওয়াজ করলো কৃষ্ণেন্দু, “ওরকম ভাবছো কেন? হাসপাতাল থেকেই তো বললো না, যে শিরদাঁড়ায় চোট – সারতে সময় লাগবেই।”
“না – সেই – কিন্তু তাহলেও, এতদিন তো হয়ে গেলো – কিছু তো …”
“ধৈর্য্য ধরতে হবে রুনু।”
অনেক কষ্টে বিরক্তি চাপলো রঞ্জনা।
“শুয়ে পড়ি – কাল বড়হাট আছে।” একটা হাই তুলে বালিশে মাথা রাখলো কৃষ্ণেন্দু।
নানা কথা চিন্তা করতে করতে একসময়ে চোখ জুড়িয়ে এলো রঞ্জনার। সাত্যকি ঘুমের ঘরে একটু নড়ে উঠতেই প্রতিবর্তে তার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিলো। তার পরে একসময়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো সে।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিলো রঞ্জনা। স্কুলে পড়ার সময়ে তার বান্ধবীদের ভিতর একজন – শ্যামলী, হায়ার সেকেন্ডারিতে রঞ্জনা কমার্স নিয়েছিলো আর শ্যামলী চলে গিয়েছিলো আর্টসে। হায়ার সেকেন্ডারির পরে তারা আলাদা কলেজে ভর্তি হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে আর সেরকম যোগাযোগ ছিল না।
অনেক কাল পরে শ্যামলীকে স্বপ্নে দেখছিলো সে, কোনো অচেনা জায়গায় শ্যামলীর সাথে দেখা হয়েছে তার। শ্যামলীর স্বামী আর ছেলে আছে, কোনো কারণে তারা সেখানে নেই। তাদের সাথে রঞ্জনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে তারা তাদের খুঁজে চলেছে কিন্তু কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শ্যামলী সেকারণে খুব উদ্বিগ্ন। একসময়ে একটা রাস্তার ওপারে তাদের দেখা গেল, দূর থেকে তাদের চেনা যাচ্ছে না।
শ্যামলীর ডাকে তারা যখন রাস্তা পেরোচ্ছে সেসময়ে আচমকা একটা ট্রাক এসে শ্যামলীর স্বামীকে ধাক্কা মেরেই পালিয়ে গেলো। ঘুমের ভিতরেই ‘ধপ’ করে একটা ভোঁতা শব্দ শুনতে পেলো রঞ্জনা। সে আর শ্যামলী চিত্কার করতে করতে এক্সিডেন্টএর জায়গায় যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেলো শ্যামলীর স্বামী হলো বিনয়বাবু আর ছেলেটি সাত্যকি!
স্বপ্ন দেখছে এটা বিশ্বাস করলেও ঘুমের ভিতর অসম্ভব চমকে উঠলো রঞ্জনা।
ট্রাকের ধাক্কায় বিনয়বাবুর চোয়াল ভেঙ্গে গেছে, গালের বাঁ-পাশ তোবড়ানো, আর সেদিকের চোখটা পাতা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ঘুমের মধ্যেও রঞ্জনা টের পেলো তার হৃদস্পন্দন অসম্ভব বেড়ে গেছে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও সে পারছে না। সাত্যকির কোনো ক্ষতি হয় নি।
ঘুমের মধ্যে স্বামীকে খুঁজতে চেষ্টা করলো সে, কিন্তু কৃষ্ণেন্দু কোথায়?
“এই! কোথায় তুমি?” গলা ফাটিয়ে চিত্কার করতে গিয়েও কোনো স্বর বেরুলো না। রঞ্জনা বুঝতে পারলো যে তার একটা ফ্যাসফেসে আওয়াজ ছাড়া আর কিছু বেরুচ্ছে না তার গলা থেকে।
প্রবল আতঙ্কের মধ্যে সে দেখলো যে বিনয় বাবু এবার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে – একটা বীভত্স হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“এই-ই-ই! শুনছো? এই দেখো না!” আবার একবার চিত্কার করতে গেলো সে।
“কে?”
“এই, এই যে! এদিকে! এখানে!” কৃষ্ণেন্দুর গলার আওয়াজে অনেকটা সাহস ফিরে পেলো রঞ্জনা।
“কে? এই! কে? কে ওখানে?”
এবার রঞ্জনা বুঝতে পারলো যে সে কৃষ্ণেন্দুর চিত্কার স্বপ্নের ভিতরে নয়, বাস্তবেই শুনছে। ঘুম ভেঙ্গে গেলো তার।
কৃষ্ণেন্দু বিছানায় বসে আছে। তাদের ঘর অন্যান্য দিনের মতই রাস্তার লাইটপোস্ট থেকে আসা আলোর প্রতিফলনে পুরো অন্ধকার নয়। আবছা আলোয় রঞ্জনা দেখতে পেলো তাদের ঘরের দরজার পর্দাটা এখনো একটু দুলছে।
“ক্কি? হ্যাঁ? কি হয়েছে?” আচমকা ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে পারছিলো না রঞ্জনা।
“শ-শ-শ!” ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করতে বারণ করলো কৃষ্ণেন্দু।
“কিগো? কি হয়েছে?” ফিস ফিস করে রঞ্জনা জিজ্ঞেস করলো। সাত্যকি ঘুমের ভিতর আবার একটু নড়ে উঠলো। কৃষ্ণেন্দুর চিত্কারে তার ঘুম ভাঙ্গেনি।
“দরজার কাছে কে একটা দাঁড়িয়ে ছিল মনে হলো!” সেরকমই ফিসফিস করে জবাব দিলো কৃষ্ণেন্দু।
“এখানে?” আতঙ্কে রঞ্জনার গলা কেঁপে গেলো।
“মনে হলো – খানিক আগে ঘুম ভেঙ্গে গেলো! ধপাস করে একটা আওয়াজ শুনলাম, ভারী কোনো জিনিষ পড়ে যাওয়ার মতো। তারপরে মনে হলো যেন …”
“আওয়াজ?” আরেকবার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেলো রঞ্জনার, হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় সদ্য দেখা স্বপ্নের স্মৃতি এখনো টাটকা! সেও তো ঘুমের মধ্যেই ওরকম একটা শব্দ শুনেছিলো।
“দাঁড়াও! দেখি তো!” বেড সুইচ রঞ্জনার পাশে, সেদিকে হাত বাড়ালো কৃষ্ণেন্দু।
“না না! যদি চোর ডাকাত হয়? ওগো – যদি ছুরি-ছোরা থাকে!” রঞ্জনা কৃষ্ণেন্দুকে বাধা দেয়।
“ধ্যার কসুটা!” প্রবল বিরক্তিতে রঞ্জনার হাত ছাড়িয়ে বেড সুইচ টেপে কৃষ্ণেন্দু। ঘর টিউবের আলোয় ভরে যায়।
দরজার পর্দাটা এখন স্থির।
“কিছু না সোনাই – ঘুমোও ঘুমোও।” আলোয় আর বাবা-মায়ের গলার আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিলো সাত্যকির, তাকে আদর করে আবার শুইয়ে দেয় রঞ্জনা।
“জানো তো – একদম যেন পর্দা ফাঁক করে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ওখানে! স্পষ্ট মনে হলো।” কৃষ্ণেন্দু গলা নামিয়ে বললো।
বাইরের করিডোরের আলোগুলো জ্বলছে এখন। খানিক আগে কৃষ্ণেন্দু সারা বাড়ির আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। সিঁড়ির তলা থেকে শুরু করে চিলেকোঠা কোনো জায়গায় বাদ রাখেনি সে আর রঞ্জনা – তবে কোথাও সন্দেহজনক কিছু দেখা যায়নি।
রঞ্জনা দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
“কি শুরু হলো বলত? আমার কিন্তু খুব ভয় করছে!” নিচুপর্দায় বলে রঞ্জনা।
“আরে ধুর – মনে হয় ঘুমের ঘরে কি দেখতে কি দেখেছি – আসলে কি বলত, বড় রাস্তার পাশে রাত্রে ট্রাক গুলো দাঁড়ায় না? মনে হয় ডালা-ফালা ফেলবার আওয়াজ – তারপর আচমকা ঘুম ভেঙ্গে …” কৃষ্ণেন্দুর বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস পাওয়া যায় না সেরকম।
রঞ্জনাও স্বপ্নের মধ্যে শব্দটা শুনেছে, তার সাথে তার আগের রাতের অভিজ্ঞতা তাকে এখনো আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছে।
“দাদা?” ইতস্তত করে বলে সে।
রঞ্জনার দিকে চায় কৃষ্ণেন্দু।
গলা একদম খাদে নামিয়ে বলে সে, “দাদা নয়ত?”
“কি বাজে বকছো? যে মানুষটার পাশ ফিরতে লোক লাগে …” নিচু গলায় ধমকে ওঠে কৃষ্ণেন্দু।
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে রঞ্জনা, তারপর বলে, “দাদার ঘরে ভালো করে দেখেছো?”
“হ্যা – খাটের তলাফলা কিছুইতো বাদ রাখলাম না। যাকগে … এ শালার রাস্তার আলোটা, জানলা বন্ধ করলেও ঘর গুমোট হয়ে যায় – ধুউর!” হাই তুলতে তুলতে ঘড়ির দিকে দেখে কৃষ্ণেন্দু, “পৌনে চারটে, চলো শুয়ে পড়া যাক – সকালে বড়হাট, ঘুম ভাঙ্গবে কিনা কে জানে!”
আলো নেভার পরে সহজে ঘুম এলোনা রঞ্জনার, জানালার বাইরে আকাশের রং হালকা হয়ে এসেছে। সারা বাড়িতেই হালকা ওষুধ ওষুধ গন্ধ।
মিত্র ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকের ছোট মেয়ে স্বর্ণালীর সাথে গোপন সম্পর্ক আছে সায়নের – ‘সাত জনমের সাথী’র আজকের পর্ব এইমতো শেষ হলো। মিতা বিজ্ঞাপনের সময়গুলো ছাড়া একটানা হাঁ করে টিভির দিকে তাকিয়েই বসে ছিল এতক্ষণ।
“বাব্বা! কার সাথে কার কি লটঘট হচ্ছে - বোঝো!”
“এর নাম সিরিয়াল!” রঞ্জনার চোখ টিভির পর্দায় থাকলেও মন চঞ্চল, শুকনো হাসে সে।
মিতা বিনয়ের ঘরে যাওয়ার উদ্যোগ করলে রঞ্জনা তাকে আটকায়, “শোনো মিতা, আরেকটু বসো, কথা আছে।” আজ সকাল থেকে কথা হয়নি মিতার সাথে।
“কি বৌদি?”
“বলছি – একটা কথা জিজ্ঞাস করি তোমায়, কথা দাও কা-উ-কে বলবে না?”
“না না! কি যে বলেন বৌদি – বলুন না কি কথা?”
“যেটা ঘটনা – মানে তুমি ওনাকে দেখছো বলে, আর তাছাড়া তুমি মেডিকেল লাইনের লোক, তুমিই বলতে পারবে, আসলে …” ঠিকঠাক কথা গুছিয়ে বলতে পারে না রঞ্জনা, ইতস্তত করতে থাকে।
“আরে বলুন না বৌদি! মা-কালির দিব্যি, কথা লিক-আউট হবে না – হি হি।”
রঞ্জনা একটা লম্বা শ্বাস নেয় – “বিনয়দাকে কেমন মনে হচ্ছে তোমার?”
“কেমন … মানে আপনি শরীরের কথা জিজ্ঞাস করছেন?”
“না, মানে বলতে চাইছি যে আমরা ওনাকে যেরকম দেখি, মানে শরীর স্বাস্থের দিক দিয়ে – এমন হতে পারে কি যে উনি … মানে …” রঞ্জনা একটা নিঃস্বাস নেয়, “… সুস্থ, কিন্তু এরকম ভান করছেন?”
কোনো কথা না বলে রঞ্জনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মিতা।
“আপনি কিছু সন্দেহ করছেন বৌদি?”
“না – এমনি কথার কথা – এরকম হতে পারে কি? এই, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছ যে আমাদের আলোচনা কাউকে বলবে না, এমনকি তোমার দাদাকেও না। ঠিক?”
“না না! সেতো ঠিক আছে। কিন্তু কেন বলুন তো?”
“এমনিই জিজ্ঞেস করছি – এরকম হতে পারে, না পারে না? তোমার মেডিকেল বিদ্যে কি বলে?”
“বৌদি – এক্সিডেন্ট যেরকম হয়েছিল, তাতে ওনার বাঁচার সম্ভাবনই অনেক কম ছিল। সে জায়গা থেকে এখন যেরকম – মানে যেরকম দেখছেন আর কি, সে জায়গা অব্দি আসতে অনেক হাঙ্গাম হয়েছে। তবে পুরো সুস্থ – না, সেটা হতে এখনো অনেক সময় লাগবে। তাছাড়া এক্সিডেন্টএ ওনার দুটো পাই যেরকম ভাবে ভেঙ্গে গিয়েছিলো, হাড় সেট হতে হতে … বলতে নেই, আমার মনে হয় না ওনার পক্ষে নিজের পায়ে দাঁড়ানো … ভগবান ভরসা বৌদি।”
খানিকক্ষণ নিজের মনে চিন্তা করে রঞ্জনা, “মানে বলছো যে এখন, এই মুহুর্তে উনি নিজে নিজে নড়াচড়া – মানে, বিছানা থেকে নামা-ওঠা – তাও বাদ দাও, উঠে বসা – কোনভাবেই সম্ভবই না?”
“কেন বৌদি? আমাকে ছাড়াতে চাইছেন?” মিচকে হাসে মিতা।
“আরে ধুর – হা হা!” রঞ্জনা খোলা মনে হেসে ফেলে এবার, “তুমিও না! ছি ছি!”
সাত্যকি একই জায়গায় চরকি কেটে ছুটছিল, প্রতিদিন বিকাল বেলায় এটা এখন টার প্রিয় খেলা হয়েছে| ‘ঘোর না লেগে যায়’ ভেবে ওকে একটা সময় পরে থামাতে যেতেই ছাদের রেলিঙে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো| স্ক্রিনে কৃষ্ণেন্দুর নম্বর|
“তুমি কোথায় এখন?”
“এই তো ছাদে পায়চারি করছি। বড়হাটে কাজ মিটেছে?” সাত্যকিকে কাছে টেনে নিলো রঞ্জনা|
“হ্যাঁ। শোনো – একটা কথা বলো, বলাইয়ের খোঁজ কে দিয়েছিলো মনে আছে?”
“কি জানি, তোমার চেনা পরিচিত, নাকি … কেন বলত?”
“না! হুমম, মন দিয়ে শোনো – বলাই আসে নি তো এখনো? যদি আসে তাহলে ওকে আর বাড়িতে ঢুকিও না আজকে।”
“ক-কেন? কি হয়েছে বলত?”
“কিছু না, সোনাই কি করছে?”
“এই তো আমার কাছে, ছুটোছুটি করছে – বলোনো প্লিজ কি হয়েছে? আমার কিন্তু খুব টেনশন হচ্ছে!”
“আরে টেনশন করার কিছু নেই – তবে যা বললাম, ও এলে উত্তর দিও না। আমি বাড়ি এসে বলছি।”
“আচ্ছা – তবে তাড়াতাড়ি চলে এসো প্লিজ। আর কি সব হচ্ছে – আমি কিন্তু দুশ্চিন্তায় মরে যাবো!”
“ঘাবড়িও না, আমি তাড়াতাড়ি আসছি। ভালো কথা, তোমার নম্বর নেই তো ওর কাছে?”
“না না! পাগল নাকি?”
“ঠিক আছে, চুপচাপ থেকো, ডাকাডাকি করলে কোনো সাড়া দিও না – কেমন?”
“প্লিজ প্লিজ প্লিজ - তাড়াতাড়ি এসো।”
“চলে এসেছি প্রায় – বাস থেকে নামবো এবার।”
“সাবধানে এসো।”
“হ্যাঁ, ঠিক আছে। রাখছি।”
রঞ্জনা ফোনটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকে খানিকক্ষণ, ঘড়ি অনুযায়ী বলাইয়ের আসতে এখনো কিছুটা সময় আছে। কিন্তু কৃষ্ণেন্দুর ফোন তাকে রীতিমতো অসস্তিতে ফেলে দিলো।
বলাইকে কে ঠিক করেছিলো স্পষ্ট কিছু মনে পড়ছে না। বিনয়বাবুকে হাসপাতাল থেকে এই বাড়িতে নিয়ে আসবার সময়ে অনেক কিছুই যেন আপনা-আপনিই হয়ে গিয়েছে। মিতাকে হাসপাতালের সাথে কাজ করা একটা এজেন্সি ঠিক করে দিয়েছিলো এটা জানে রঞ্জনা, কারণ মিতার সাথে তার মোটামুটি ভালই গল্পগুজব হয়। বাইরের সমস্ত দায়িত্ব কৃষ্ণেন্দুর, সেদিক দিয়ে রঞ্জনার এসব ব্যাপারে মাথা ঘামানোর দরকার পড়ে না। তবে বলাইয়ের ব্যাপারে কাউকে বলতে শোনা গিয়েছিলো যে মানুষ হিসাবে ঠিকঠাক, সেকারণেই কৃষ্ণেন্দুর অনুপস্থিতিতেও তার আসা-যাওয়া নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই।
নিচে বেলটা বেজে উঠলো। রঞ্জনা চমকে উঠে সাত্যকিকে জড়িয়ে ধরলো।
রাতে ঘুমোতে প্রচুর দেরি হলো আজ। কৃষ্ণেন্দু বড়হাটে গেলে ফিরতে দেরি হয়, কিন্তু আজ সে অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে। কিন্তু রঞ্জনার সাথে কথা বলে, বেশ কয়েক জায়গায় ফোন করে, সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে তারপরে খেয়েদেয়ে শুতে শুতে অনেক দেরি হয়ে গেলো। সাত্যকিকে যদিও আগে ভাগেই খাইয়ে দিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাদের বিছানায় যেতে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেলো।
সাত্যকি ঘুমোচ্ছে শুয়ে শুয়েও দুজনে চাপা স্বরে কথা বলছিলো, ঘটনা যে এদিকে মোড় নেবে সেটা তারা ভাবতেও পারেনি।
“তাহলে বলাইয়েরই কারসাজি … তাই না?”
“তা ছাড়া আর কি? দেখো, দাদাটা মরেছে, তাই বদলা নিতে বলো বা আর কিছু, সে জন্যেই হয়তো …রুনু, খুব রক্ষে হয়েছে যাহোক।”
“আমি এখনো ভাবতে পারছি না কিছু! সোনাইকে নিয়ে একা থাকি, মিতা চলে যাওয়ার পর … উফ! চিন্তা করলেই দম বন্ধ হয়ে আসছে!”
“ওর মনে হয় আরো বড় কোনো উদ্দেশ্য ছিল … ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছে, আরে আমিও তো কল্পনা করলেই হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে! যাকগে … আজ সাড়া দাওনি, মনে হয় বুঝতে পেরেছে, মনে হয় না আর এদিকে ঘেষবে কোনদিন।”
“থানায় তো খবর দিলে - ”
“হ্যাঁ, বললো তো, যদি সেরকম হয় তাহলে হয়তো আজকেই তুলে নিতে পারে।”
“ভাবা যায়?”
“চলো ঘুম পাচ্ছে, খুব জার্নি হয়েছে আজ।”
“ঘুম কি আসবে আর?”
কৃষ্ণেন্দু ঘুমিয়ে পড়ল হয়তো, কিন্তু রঞ্জনা অন্ধকারে চোখ চেয়ে শুয়ে রইলো। সব দিক নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাত্যকি ঘুমের ঘোরে দুয়েকবার নড়াচড়া করতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সে। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মস্তিস্ক পুরোপুরি সক্রিয়। গত কয়েকরাত ঘটে চলা রহস্যের উদ্ঘাটন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু স্বস্তির বদলে উদ্বেগে ঘুম এসেও আসছে না। তবে তারা দুজনেই নিশ্চিন্ত যে আজকে রাতে এ বাড়িতে আর কোনো উত্পাত হবে না।
“জেনাই।” চোখের পাতা দুটো জুড়ে আসবার আগে রঞ্জনা সাত্যকির ঘুমজড়ানো গলা শুনতে পেলো একবার। তার হাতের নিচে সাত্যকি একটু ছটফট করে উঠলো। কৃষ্ণেন্দুর নাক ডাকার মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো রঞ্জনা।
একটানা ছেঁচড়িয়ে যাওয়ার আওয়াজ, আর তারপরে কতগুলো তীক্ষ্ম ধাতব শব্দ শুনে ঘুম খানিকটা পাতলা হলো রঞ্জনার। কৃষ্ণেন্দুর হাতের স্পর্শে এরপর ধড়মড় করে উঠে বসলো সে। স্বপ্ন না সত্যি?
“শুনলে?” চাপা গলায় জিজ্ঞাস করে কৃষ্ণেন্দু।
“হ্যাঁ” রঞ্জনার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোতে চায় না।
“দাঁড়াও – দেখি! আজ একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে!”
অন্ধকারে হাত চালিয়ে দ্রুত মোবাইলটা খুঁজে বের করে কৃষ্ণেন্দু, চট পট কল-লিস্ট থেকে থানার নম্বরটা বের করে ডায়াল চাপে। রঞ্জনা স্বাভাবিক প্রতিবর্তে সাত্যকিকে আলগোছে বুকে চেপে ধরে।
“টর্চটা কোথায়?” মোবাইল কানে ধরেই জিজ্ঞাস করে কৃষ্ণেন্দু।
“টর্চ – এই, তুমি বেরিও না প্লিজ!”
“চুপ!” ঠোঁটে আঙ্গুল তুলে বিছানা থেকে নামে কৃষ্ণেন্দু। “আরে টর্চটা কোথায় রেখেছো ঘোড়ার ডিম? ইমার্জেন্সির সময়ে যদি কিসু …” যতটা নিস্তব্ধে সম্ভব তড়িঘড়ি শেলফের উপর, ড্রেসিং টেবিল খুঁজে দেখে সে, “আরে!” একটা গালাগালি করতে গিয়েও নিজেকে সামলায়, “রিং হচ্ছে, কেউ তুলছে না!”
“যেও না! যেও না!” কৃষ্ণেন্দুকে ঘরের বাইরে বেরোতে দেখে রঞ্জনা আঁতকে ওঠে।
“চুপ!” মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে দ্রুত হাতে লক করে পরনের পায়জামার পকেটে ঢুকিয়ে নেয় কৃষ্ণেন্দু। কয়েক সেকেন্ড কান খাঁড়া করে বাইরে কোনো শব্দ হচ্ছে কিনা বুঝে নিয়ে তারপরে খুব সাবধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে।
কৃষ্ণেন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রঞ্জনা স্তম্ভিতের মতো বিছানায় সাত্যকিকে আঁকড়ে বসে থাকে। ঘড়ির দিকে চোখ যায়, তিনটে পয়ত্রিশ। ভাগ্য ভালো সাত্যকির ঘুম ভাঙ্গেনি এই পরিস্থিতিতেও।
বাইরে থেকে কৃষ্ণেন্দুর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রঞ্জনা এইবার ধীর পায়ে বিছানা থেকে নামে। আলতো পায়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করে বাইরে কিছু দেখা যায় কিনা। তারপরে সাত্যকিকে কোলে নিয়ে সেইরকমই চুপিসাড়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরোয় সে।
ঘর থেকে বেরোতেই মনে পড়ে যায় পাশেই রান্নাঘরের তাকে টর্চটা রাখা আছে, অন্ধকারে মাপা পদক্ষেপে সেদিকে গিয়ে সামান্য হাত চালাতেই সেটাকে পেয়ে যায় রঞ্জনা। সাত্যকিকে বেশ ভারী লাগছে এখন, সে ওকে একটু কোলের উপরে তুলে নিয়ে সাবধানে করিডোরের দিকে পা বাড়ালো। ঘর থেকে বেরোতেই ওষুধের গন্ধটা পাওয়া যাচ্ছিলো, সামনের দিকে এগোতে গেলে সেটা তীব্রতর হয়ে উঠল।
পায়ে নরম কি একটা কাপড় মতো ঠেকলো। টর্চ জ্বললে অন্ধকারের মুখোস খুলে যেতে পারে, সেই ভয়ে সেদিকে নজর না দিয়েই সে ছাদে ওঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। কৃষ্ণেন্দু ওদিকেই গিয়েছে আশা করা যায়। ঘুমের ভিতরে শোনা ধাতব শব্দগুলো কি তাহলে ছাদের গেট খোলার আওয়াজ ছিল?
এক হাতে সাত্যকিকে ধরে রাখতে যথেষ্ঠ অসুবিধা হচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময়ে সে একবার অসস্তিতে নড়ে উঠলো, রঞ্জনা দাঁড়িয়ে টর্চ ধরা হাতেই তাকে একবার আদর করে চুপ করিয়ে দিলো। সিঁড়ির দরজাটা খোলা মনে হচ্ছে? পাশে প্রায় দেওয়ালের মিশে দাঁড়িয়ে আছে ওটা কে? চেহারা আর পোশাকের অবয়ব দেখে রঞ্জনা নিশ্চিন্ত হলো – কৃষ্ণেন্দু।
“আমি।” রঞ্জনা এতটাই নিচুস্বরে বললো যে নিজের কথা নিজের কাছেই অস্পষ্ট শোনালো।
“শ-শ-শ!” কৃষ্ণেন্দু ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে তাকে চুপ করতে বললো। তার নজর এখনো বাইরে, ছাদের দিকে।
বাইরের আলোআঁধারির বিপরীতে কৃষ্ণেন্দুর ছায়ার হাতে একটা ছুরি দেখা যাচ্ছে। আঁতকে উঠতে গিয়েও সে বুঝতে পারলো এটা তার রান্নাঘর থেকেই এসেছে। উত্তেজনা মিশ্রিত একটা নিশ্চিন্ততা অনুভব করলো রঞ্জনা।
“কি দেখছ?” কৃষ্ণেন্দুর শরীরের ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখতে চায় সে।
“একটা লোক! ছাদে রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে আছে!” নিঃস্বাস প্রশ্বাসের সাথে বলে কৃষ্ণেন্দু।
“বলাই?”
“না। অন্য কেউ!”
“একা?”
“মনে হচ্ছে।”
“চলে এসো! চলে এসো! চলো গেট লাগিয়ে নিচে নেমে যাই!”
“শ-শ-শ!”
ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে রঞ্জনাকে চুপ করতে বলে কয়েক মুহূর্ত কৃষ্ণেন্দু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। রঞ্জনা আর সাত্যকি সঙ্গে থাকার দরুন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। লোকটিরও হাবভাব বোঝা যাচ্ছে না। সেও একই ভাবে সিঁড়ির ঘরের দরজার দিকে পিছন ফিরে ছাদের রেলিঙের ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছে জানে না, হাতের চাপে দরজা আস্তে আস্তে অনেকটাই ফাঁক হয়ে গেছে আর রঞ্জনা এখন দরজার সামনে কৃষ্ণেন্দু দাঁড়িয়ে থাকা সত্বেও তার পাশ দিয়ে ছাদের সেই রহস্যময় মূর্তিটাকে দেখতে পাচ্ছে।
“জেনাই!” আচমকা সাত্যকির গলার আওয়াজে উদ্বেগপূর্ণ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে গেলো!
রঞ্জনা সাত্যকির মুখে হাত চাপা দিতে যাওয়ার আগেই সেই লোকটি ধীরে ধীরে তাদের দিকে ঘাড় ঘোরানো শুরু করলো।
কি হচ্ছে না হচ্ছে ভাবতে যাওয়ার আগেই কৃষ্ণেন্দু আকস্মিক লাফ দিয়ে ছাদের দিকে ছুটে গেলো।
“এই! কে?” ভয় দেখাতে নাকি নিজের ভেতরের ভয়কে চাপা দিতেই ভয়ঙ্কর চিত্কার করে উঠলো সে।
কৃষ্ণেন্দুর আচমকা তেড়ে যাওয়া দেখে ভয় পেলেও রঞ্জনা সব থেকে বেশি অবাক হলো, এই পরিস্থিতিতে লোকটির কোনো হেলদোল নেই। আগের মতই সে আস্তে আস্তে তাদের দিকে ঘাড় ঘোরাতে থাকলো। কৃষ্ণেন্দুর হাতের বাগিয়ে থাকা ছুরিটা তার মাথা থেকে প্রায় একফুট দুরে এসে থামলো।
লোকটির মুখের একপাশে এবার রাস্তার আলো এসে পড়লে রঞ্জনার বিস্ময় চরমে উঠলো - সে দেখলো লোকটি সাত্যকির ‘জেনাই’, তার ভাসুর বা কৃষ্ণেন্দুর মাসতুতো দাদা বিনয় বাবু ছাড়া আর কেউ নয়। যে মানুষ শয্যাশায়ী সে এখানে এলো কি করে? কেমন করেই বা সে তার ভেঙ্গে যাওয়া পা-দুটিতে ভর দিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে?
বিনয় বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে এখন প্রায় তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। যদিও কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে মাথা ঘুরিয়ে শরীরের প্রায় পিছন দিকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়!
এই দৃশ্য দেখে কৃষ্ণেন্দু পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো, রঞ্জনা অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো সে কেন এখনো অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে না!
“বিনু’দা?” ফিসফিস করে বললো কৃষ্ণেন্দু।
বিনয় বাবুর ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি অবশ্য কৃষ্ণেন্দুকে ফুঁড়ে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা রঞ্জনার কোলের সাত্যকির দিকে নিবদ্ধ ছিল বোধহয়।
“বি-ন-য় বা-বু …” নিচে রাস্তা থেকে একটা খ্যাসখেসে ডাক ভেসে এলো কৃষ্ণেন্দুর জিজ্ঞাসায় প্রতিধ্বনিত হয়ে।
ডাকটা শোনবার সঙ্গে সঙ্গেই বিনয়বাবুর চোখের মনি উল্টে গেলো, আর কৃষ্ণেন্দু ও রঞ্জনকে পুরোপুরি চমকে দিয়ে তার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে চেয়ে থাকা শরীরটা ছাদের রেলিং টপকে সশব্দে নিচের রাস্তায় পড়ে গেলো।
“ইসসসস!” সাত্যকির চোখ ঢাকবার ছলনায় রঞ্জনা নিজেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
পরের দিন। মিতাকে পুরো ব্যাপারটা বলতে হয়েছে, কিন্তু সে বিশ্বাস করতে চায়নি। পরে যদিও সে করিডোরে ব্যান্ডেজের টুকরো আর অল্প রক্তমাখা উল্টো পায়ের ছাপগুলো দেখে আতঙ্কিত হয়েছে।
আত্মহত্যার ঘটনা শুনে পুলিস অফিসার সরেজমিন ঘুরে গেলেন। লাস চলে গেলো পোস্ট মর্টেমের জন্যে।
তার কাছ থেকেই জানা গেলো বিনয় বাবুর দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী যে ট্যাক্সিটি, তার চালক-তথা-মালিক জগাই হালদার। দুর্ঘটনার সময় ট্যাক্সিটি চালাচ্ছিলো তার ভাই - জনগনের হাতে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়। ভাইয়ের নাম বলাই হালদার যে পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ছিল।
কৃষ্ণেন্দু ভুল খবর পেয়েছিলো।
প্রকাশিত : হরর পত্রিকা
পাশে তার স্বামী কৃষ্ণেন্দু ঘুমে অচেতন। “এই!” খুব সাবধানে ফিসফিস করে ডাকলো রঞ্জনা। ডাকতেও ভরসা হচ্ছে না, যদি কৃষ্ণেন্দু ঘুম থেকে উঠেই হাঁক-ডাক করে ফেলে! রঞ্জনার ডাকে কৃষ্ণেন্দুর কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। সে আগের মতই অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
আস্তে আস্তে সাহস ফিরতে থাকে – রঞ্জনা চুপচাপ শুয়ে অপেক্ষা করে যদি আবার সেই আওয়াজটা শোনা যায়। কি হতে পারে? ইঁদুরের উত্পাত নেই তাদের বাড়িতে। বিড়ালও হবে না – জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বিড়াল গলবার রাস্তা পায় না। কিন্তু ইঁদুর-বিড়ালও যদি হয় তবে কোন ভারী জিনিষ ঘসটিয়ে নিয়ে যাবে তারা?
সাহস ফেরবার সাথে সাথে যুক্তিও ফিরে আসতে থাকে। তাদের বাড়িতে মানুষ তারা চারজন। সে, তার স্বামী কৃষ্ণেন্দু, তাদের আড়াই বছরের ছেলে সাত্যকি, যে এখন বিছানায় রঞ্জনা ও কৃষ্ণেন্দুর মধ্যিখানে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে পড়ে আছে – আর চতুর্থজন হলো কৃষ্ণেন্দুর মাসতুতো দাদা বিনয়, যার জায়গা এখন তাদের বাড়ির বাইরের বসবার ঘরের পাশের একটা ছোট ঘরে। বাড়িতে এই মুহুর্তে জেগে রয়েছে কেবল একা রঞ্জনা। বিনয়বাবুর জেগে-থাকা ঘুমিয়ে-থাকা সমান, কারণ মাস দেড়েক আগের একটা দুর্ঘটনায় তিনি আপাতত শয্যাশায়ী।
বিনয়বাবুর কথা মাথায় আসতেই বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে গেলো রঞ্জনার।
একটা লম্বা নিঃস্বাস নিয়ে স্বাভাবিক হলো সে। এখন অন্ধকার অনেকটাই পরিষ্কার – রাস্তার প্রতিফলিত আলোয় ঘড়িতে দেখা গেলো সাড়ে তিনটে বাজে। আগেরবার ঘড়ির ছোট কাঁটাটা কোথায় ছিল ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি রঞ্জনা। জল তেষ্টা পেয়েছে, এদিকে খাটের পায়ার পাশে একটা বোতল আছে – হাত বাড়াতে গিয়ে একবার থমকালো সে। কি জানি বাবা! খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে নেই তো?
“বাবা! টিকবুক।” সাত্যকি আবদার করে।
“উহু এখন না সোনাই!” কৃষ্ণেন্দুর এখন ঘোড়া ঘোড়া খেললে চলবে না, সকালবেলা এমনিতেই তার ব্যস্ততা থাকে, তার সাথে আজ তাকে কটা প্রশেনর উত্তর পেতে হবে।
মিতা পেশাদার আয়া, বিনয়কে দিনেরবেলা দেখভাল করার জন্যে তাকে রাখা হয়েছে। কৃষ্ণেন্দু বিনয়ের ঘরে ঢুকে দেখলো বিছানার পাশে একটা টুলে বসে একটা ফিল্ম ম্যাগাজিন পড়ছে। সাতসকালে কৃষ্ণেন্দুকে ঘরে ঢুকতে দেখেই চটজলদি ম্যাগাজিনটা গুছিয়ে নিয়ে সপ্রতিভ হয়ে ওঠবার চেষ্টা করলো সে।
“ঘুমোচ্ছে?”
“না – ঘোর ঘোর মতো। ওষুধ …”
“বিনুদা – শুনছো?” বিনয়ের বিছানার কাছে গিয়ে ডাকলো কৃষ্ণেন্দু।
বিনয় আলগোছে চোখ খুললো একবার। তার দৃষ্টির কোনো ভাষা নেই। দেখেই বোঝা যায় যে কৃষ্ণেন্দুকে ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারেনি সে এখনো।
“ঘুমুচ্ছ?” আবার প্রশ্ন করলো কৃষ্ণেন্দু।
এবার গলা দিয়ে একবার ঘড়ঘড় মতো একটা শব্দ করলো বিনয়। তারপরে ক্লান্তিতে আবার তার চোখ বুজে এলো।
একটা দীর্ঘ্যনিঃস্বাস ফেললো কৃষ্ণেন্দু, এ মানুষকে দিয়ে কিছুই করার নেই। এবার মিতার দিকে ফিরলো সে।
“সকাল থেকে কথাটথা বলেছে কিছু?”
“না তো – এমনিতেইতো কথা বলার মতো নয়। পেনকিলারের একশানে সবসময়েই – এই যেরকম দেখছেন।”
“হুম! আসলে কি হয়েছে … যাকগে, শোনো যদি ওনার ঘোর কাটে, বা একটু স্বাভাবিক মতো হয়, তো তুমি একটা জিনিষ একটু জিজ্ঞেস করতো – মনে করে।”
“হ্যা বলুন” – খাটের পাশে রাখা ছোট আলমারির মাথা থেকে একটা লেখবার প্যাড আর পেন নেয় মিতা।
কৃষ্ণেন্দু হেসে ফেলে – “আরে না না। লিখতে হবে না, ছোট ব্যাপার।”
মিতা অপ্রস্তুত হয়ে প্যাড পেন ফেরত পাঠায় আগের জায়গায় – “ভেবেছিলাম ওষুধ-টষুধের কোনো …”
“ওরকম কিছু না। আসলে, কি বলবো – কাল রাতে একটা আওয়াজ হচ্ছিলো এদিকে, তাই আর কি – মানে দাদা যদি কিছু শুনেটুনে থাকে।”
“আওয়াজ মানে?”
“মানে এই – মানুষ চলাচলের মতো – এইরকম।”
এবার মিতার মুখে আতঙ্ক দেখা যায় – “বলেন কি দাদা? হ্যাঁ? কি সাংঘাতিক! আপনাদের বাড়ির ভিতরে? ঘরের মধ্যে?”
“আরে না না – তোমার বৌদি শুনেছে, ঘুমের ভিতর – ভুলও হতে পারে হয়তো, তাও …”
“না না দাদা – সাবধানের মার নেই!” এবার গলা নামিয়ে আনে মিতা – “জানেন তো এখন চারদিকের পরিস্থিতি!” প্রায় ফিসফিস করে বলতে থাকে – “বর্ডারে স্মাগলিং বন্ধ হয়ে গেছে – যারা আগে ওসব করতো তাদের তো এখন কিছু করার নেই।” এবার শোনা যায় না এমন নিচুস্বরে বলে – “তারাই এবার সব চুরি ডাকাতি করতে নেমে পড়েছে!”
মিতার হাবভাব দেখে হেসে ফেলে কৃষ্ণেন্দু – “আরে ধুর – আমাদের বাড়ি আছেটা কি যে চোর ডাকাত হানা দেবে? হা হা।”
“হাসবেন না দাদা – তা ছাড়াও ছিঁচকে-চোর, পাতাখোর-নেশাখোরের উত্পাত খুব … দাদা, দিনকাল খুউব খারাপ।”
“নারে ভাই – বললাম তো ঘুমের ঘোরে … যাকগে আমি বেরুবো এবার, শোনো তাহলে, যদি দাদা স্বাভাবিক হয় তো একটু জানতে চেষ্টা করো তাহলে – কেমন?”
“হ্যাঁ দাদা – খাওয়ানোর সময়ে আমি জেনে নেবো’ক্ষণ, মনে থাকবে – ভাববেন না।”
“বেশ।”
কৃষ্ণেন্দু অফিসে বেরিয়ে গেলে বাড়িটা আগে ফাঁকা-ফাঁকা মনে হত, সাত্যকি হওয়ার পরে তাকে নিয়ে রঞ্জনার ব্যস্ততা সেই শুন্য ভাবটা ভরাট করে ফেলেছে। ভাসুর বিনয়ের উপর রঞ্জনার বিতৃষ্ণা থাকলেও একদিক থেকে তার উপর সে কৃতজ্ঞ – উনি এখানে না আসলে মিতারও এই বাড়িতে আসাটাও সম্ভব ছিল না।
“বৌদি – শুরু হয়েছে?”
“হ্যাঁ – এইবার, এড দিচ্ছে। এসো – তোমার কাজ মিটল?”
রঞ্জনা সাত্যকিকে নিয়ে তাদের শোয়ার ঘরে খাটে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলে মিতা রঞ্জনার কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে।
হেলথড্রিংক, শাড়ির দোকান, শ্যাম্পু-সাবানের হাবিজাবি নানা বিজ্ঞাপনের পরে একসময়ে তাদের প্রতীক্ষার অবসান হলো – টিভিতে শুরু হলো ‘সাতজনমের সাথী!’ গত তিনচারদিনে ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না ‘শ্যামা’ই ‘সিমরণ’ কিনা – যতক্ষণ না সে রহস্য উদ্ঘাটন হচ্ছে ততক্ষণ অব্দি রঞ্জনা, মিতা বা তাদের মতো সিরিয়াল ভক্ত গৃহবধুদের শান্তি নেই। তবে আজকেও যে রহস্যভেদ হবে তার আশা কম – চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকের প্যাঁচে নাটকের জটিলতা কতটা বাড়ে সেটাই দেখবার বিষয়। দুজনে বাহ্যজ্ঞান ভুলে ‘সাতজনমের সাথী’ দেখতে থাকলো। এটা তাদের বিগত দেড়মাসের রুটিন।
বিজ্ঞাপন বিরতির সময়ে রঞ্জনা শুনলো বাইরের ঘর থেকে সাত্যকির হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। সাত্যকি কখন খাট থেকে নেমে বাইরে চলে গেছে সিরিয়াল দেখতে দেখতে সে খেয়াল ছিল না রঞ্জনার। সাত্যকির খিল খিল হাসির আওয়াজ শুনতে পেয়ে এবার টিভি পরিবার থেকে নিজের পরিবারের হুস ফিরলো তার।
“সোনাই – এদিকে এসো।”
ঘরের বাইরে সাত্যকিকে দেখা গেলো এবার – তার মুখ এখনো হাসি হাসি।
“সোনাই! কোথায় গিয়েছিলে? বলেছি না চুপ করে শুয়ে থাকতে?” যতটা হয় মুখ গম্ভীর করে ধমকের সুরে বলে রঞ্জনা, যদিও মায়ের ধমকে ভয় পায় না সাত্যকি।
হাসতে হাসতেই খাটের পাশে এসে দুহাত উঁচু করে তুলে দাঁড়ায় সে – “টিকবুক?”
হাত বাড়িয়ে সাত্যকিকে বিছানার উপরে তুলে আনে রঞ্জনা। “বসো এখানে। সবসময় টিকবুক না? একদম নড়বে না।” ছদ্ম গাম্ভীর্যে বলে সে, তারপরে কোলের মধ্যে ছেলেকে টেনে নেয়। “দীঘায় ঘোড়ায় চড়ে কি যে আবদার হয়েছে এখন। সবসময়ে টগবগ – হা হা।”
মিতাও সাত্যকির হাবভাব দেখে হেসে ফেলে।
বিজ্ঞাপন শেষ হয়েছে – সিরিয়াল চালু হবে, সাত্যকিকে জড়িয়ে ধরেই টিভির দিকে রঞ্জনার চোখ চলে যায়। তার কোলের মধ্যে ছটফট করে সাত্যকি – “জেনাই।” সাত্যকি বিনয়কে জেনাই বলে ডাকে – জ্যেঠাই থেকে জেনাই।
“হুউম! জেনাইয়ের অসুখ! জেনাইকে বিরক্ত করে না ছি!”
যথারীতি আজকেও ‘শ্যামা’ ‘সিমরনে’র ধন্দ কাটলো না – উপরন্তু নতুন এক রহস্য যোগ হলো, এতদিন যাকে ‘ইন্দ্রনীলে’র ভাই বলে জানা গিয়েছিলো সেই ‘সায়নে’র আসল পরিচয় সে নাকি ‘ইন্দ্রনীলে’র ছেলে!
“যাব্বাবা!” সিরিয়াল শেষ হলেও মিতার চোখ এখনো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে!
“বোঝো! কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই টেনশন ভালো লাগে?”
“সত্যি বৌদি – মাঝে মাঝে মনে হয় যে এ ঘোড়ার ডিমের সিরিয়াল আর দেখবো না, কিন্তু হি হি।”
“নেশা মতো হয়ে গেছে – না? আমারও একই দশা।”
“বৌদি, সোনাই ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে।” রঞ্জনার কোলে সাত্যাকিকে দেখে মিতা।
“এমা তাইতো!” খেয়াল হয় রঞ্জনার।
তাদের সিরিয়াল দেখার মধ্যে সাত্যকি ঘুমিয়ে কাদা হয়ে তার কোলে লেপ্টে আছে। তাকে সাবধানে বালিশে শুইয়ে দেয় সে।
“বৌদি – কাল কি হয়েছিল গো? দাদার কাছে শুনছিলাম।” রঞ্জনার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞাস করে মিতা।
“আরে – কি জানি, বুঝতে পারিনি ঠিকঠাক – কাল রাত তিনটে নাগাদ, আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো …”
গলার স্বর নিচু করে জিজ্ঞাস করে মিতা, “কারা দৌড়াদৌড়ি করছিলো নাকি?”
“না না – দৌড়াদৌড়ি না! মনে হচ্ছিলো কে যেন কি টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের বসবার ঘরের দিকে – জানো তো! এত্তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
“দরজা জানালা ঠিকঠাক বন্ধ করা ছিল তো? দেখবেন – দিনকাল খুব খারাপ, একটু সাবধান না হলেই।”
“হ্যাঁ – ও আমার ভুল হয় না। বলাই চলে গেলেই সামনে ডবল-তালা।”
“দাদা আমায় জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন – ঐ দাদা কিছু শুনেছেন-টুনেছেন কিনা, কিন্তু কি বলবো, বেচারা দিনমানেই তাই হুঁশে থাকেন না, আর তার উপর তো রাতের বেলা। আমি খাওয়ানোর সময়ে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম।”
“কথা-টথাতো কিসু বলে না – বললো কিছু?”
“না-গো বৌদি। যেরকম যেরকম চামচে করে তুলে দিলাম সেরকম সেরকম খেয়ে গেলো – ব্যাস, তাছাড়া হ্যাঁ-হু-না – কিচ্ছু না।”
খানিক সময় চুপ করে থাকে রঞ্জনা – কৃষ্ণেন্দুর হাবভাব দেখলে কিছু আন্দাজ করা যায় না, কিন্তু রঞ্জনার কাছে বিনয়বাবু একটা অবাঞ্চিত দুর্যোগ ছাড়া আর কিছুই না।
“তা বৌদি – কিছু দেখতে টেখতে পেয়েছিলেন? কোথাও কোনো চিহ্নটিহ্ন?”
“উহু – কিরকম বলত, আমি ভেবেছিলাম যে মালভর্তি বস্তা-টস্তা যেরকম করে টেনে নিয়ে যায় না? তবে দরজার তালাটালা দিব্যি ঠিকঠাক আটকানো – যেমন ছিল তেমন।”
“তাহলে রাস্তায় হবে হয়তো – কি?”
“নাগো – অতো রাতে, কে জানে! তবে আমার মনে হচ্ছিলো কিন্তু বাড়ির ভেতরেই! বাব্বা – গলাটলা শুকিয়ে কাঠ! হাত বাড়িয়ে জলের বোতল নেবো – সে অব্দি সাহসে কুলোয় না!”
“দেখবেন বৌদি সাবধানে থাকবেন – দিনকাল খুউব খুউব খারাপ! স্মাগলিং বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে … ” মিতার গলা খাদে নেমে আসে।
বিনয়বাবু আপাতত কৃষ্ণেন্দুর আশ্রিত কিন্তু পুরোপুরি নিরবলম্বন নয়। হাসপাতাল থেকে ফোন পেয়ে কৃষ্ণেন্দু ছুটে গিয়েছিলো সেখানে। চেনা পরিচিত বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কৃষ্ণেন্দু কাছাকাছি মানুষ। কৃষ্ণেন্দুকে ডেকে তার দুটো এটিএম কার্ড ধরিয়ে দিয়ে কানে-কানে পিন নম্বরগুলো বলে দিয়েছিলো বিনয়।
“কি বিনুদা? কিছু চাই?” জিজ্ঞেস করেছিলো কৃষ্ণেন্দু।
“এগুলো রাখ – হাসপাতালের খরচা।” জড়ানো গলায় বলেছিলো বিনয়।
“আরে রাখো তো – আমি তো আছি।”
বিনয় কিছু না বলে হাত নেড়ে কার্ডগুলো রাখতে বলেছিলো তাকে।
বিনয়বাবু ডিভোর্সী, নিজের লোক বলতে কেউ নেই। কৃষ্ণেন্দুর মাসিমা-মেসোমশাই মারা গিয়েছেন অনেকদিন – নিজের এক ভাই বিদেশে থাকে, কোনো যোগাযোগ রাখতে চায় নি। কাজেই আত্মীয় বলতে এখন কৃষ্ণেন্দু একা। তাই হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেবার পরে নিজের ফ্ল্যাট নয়, বিনয়বাবুর বর্তমান ঠিকানা কৃষ্ণেন্দুর বাড়ি। বিনয় একটা বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরি করতো, মোটামুটি ভালো পদে – কাজেই মনে হয় না তার দেওয়া কার্ডগুলোর ওজন তেমন খারাপ হবে। হেলথ-ইন্সুরেন্সও থাকবার কথা। তবে আপাতত তো মানুষটা সুস্থ হোক! পরে সেসব দেখা যাবে। কৃষ্ণেন্দুর নিজের রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান, রমরমা না হোক তারও অবস্থা খারাপ নয়, কাজেই দুটো এ.টি.এম কার্ড সেইভাবেই তোলা আছে।
এখানেই আপত্তি রঞ্জনার। দুর্ঘটনার পরে বিনয় ভর্তি ছিল সরকারী হাসপাতালে – সেখানে চিকিত্সার জন্যে খরচ কিছু না হলেও, পরবর্তী ওষুধ, আয়া ফিজিওথেরাপিস্ট – সবমিলিয়ে মানুষটার পিছনে টাকা চলে যাচ্ছে ঝড়ের মতো। বিনয়ের সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণেন্দু কেন নিজের কাঁধে এইসব দায় নেবে? তাছাড়া বাড়িতে একজন অসুস্থ মানুষ থাকলে পরিস্থিতিটাই অন্যরকম হয়ে যায়। রঞ্জনা সব মিলিয়ে বেসামাল!
বাইরের ঘরের দিকে রঞ্জনা যেতে চায় না পারতপক্ষে। ওষুধ, ফিনাইল, ডেটলের গন্ধ, আর তার সাথে মাঝে মাঝে ঘড়ঘড় কাতরোক্তি – এদুটো সবসময়ে বাইরের ঘরের পরিবেশটাকে ভারী করে রেখেছে। মন না চাইলেও চোখ চলে যায় দরজার পিছনের ছোট ঘরটায় বিছানার উপরে চাদর-চাপা দেওয়া শরীরটার দিকে। ওদিকে গেলেই রঞ্জনার স্নায়ুর উপর চাপ পড়ে। তাই বিকেলবেলাটা ছাদে বা পিছনের বারান্দায় কাটায় সে।
সন্ধ্যার মুখে মুখে সামনের দরজায় কলিং-বেলের আওয়াজ। আজ ছাদে পায়চারি করছিলো রঞ্জনা, সামনের গিয়ে রেলিঙের উপর দিয়ে দেখলো ফিজিওথেরাপিস্ট ছেলেটি – বলাই এসেছে।
“চলো সোনাই – নিচে যেতে হবে।” সাত্যকি আপনমনে একটা গাড়ি নিয়ে খেলা করছিলো, তাকে ডাকলো রঞ্জনা।
“আলেত্তু” সাত্যকির আবদার।
“না সোনাই, চলো – সেই কাকুটা এসেছে। এইবার পড়তে বসতে হবে, তা না হলে কাকুটা বকবে!”
রাতে শুতে যাওয়ার আগে কৃষ্ণেন্দু আরেকবার ভালো করে সামনের গেটের তালা গুলো দেখে নিলো কৃষ্ণেন্দু। তারপরে রোজকার মতই বিনয়ের ঘরের দরজার সামনে একটু দাঁড়ালো সে। ঘরের ভিতরে একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। তার স্বল্প আলোয় খুব ধীরে ধীরে বিনয়ের বুকের ওঠাপড়া দেখে বোঝা যায় যে এখনো বেঁচে আছে মানুষটা।
অভ্যেস মতো জিজ্ঞাস করলো কৃষ্ণেন্দু – “বিনুদা ঘুমিয়েছো?”
উত্তর হিসাবে একটা ঘরঘরে আওয়াজ এলো ঘরের ভিতর থেকে। দীর্ঘ্যনিঃশ্বাস ফেললো কৃষ্ণেন্দু। কি হবে মানুষটার?
“বলাইকে কিছু জিজ্ঞাস করে লাভ নেই - মিতার কাছ থেকেও সেরকম তো কিছু বুঝি না, একই রকম।”
“দেখা যাক নেস্কট বার ডাক্তার বাবু দেখে কি বলেন।”
নিজেদের শোয়ার ঘরে বসে আলোচনা করছিলো কৃষ্ণেন্দু আর রঞ্জনা। সাত্যকি ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই গলার আওয়াজ নিচু।
“হ্যাঁগো – কি করে কি হবে বলত? যদি আর কখনো …” সাত্যকির মাথায় হালকা আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে কৃষ্ণেন্দুর দিকে তাকালো রঞ্জনা।
“ছিক!” মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক আওয়াজ করলো কৃষ্ণেন্দু, “ওরকম ভাবছো কেন? হাসপাতাল থেকেই তো বললো না, যে শিরদাঁড়ায় চোট – সারতে সময় লাগবেই।”
“না – সেই – কিন্তু তাহলেও, এতদিন তো হয়ে গেলো – কিছু তো …”
“ধৈর্য্য ধরতে হবে রুনু।”
অনেক কষ্টে বিরক্তি চাপলো রঞ্জনা।
“শুয়ে পড়ি – কাল বড়হাট আছে।” একটা হাই তুলে বালিশে মাথা রাখলো কৃষ্ণেন্দু।
নানা কথা চিন্তা করতে করতে একসময়ে চোখ জুড়িয়ে এলো রঞ্জনার। সাত্যকি ঘুমের ঘরে একটু নড়ে উঠতেই প্রতিবর্তে তার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিলো। তার পরে একসময়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো সে।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিলো রঞ্জনা। স্কুলে পড়ার সময়ে তার বান্ধবীদের ভিতর একজন – শ্যামলী, হায়ার সেকেন্ডারিতে রঞ্জনা কমার্স নিয়েছিলো আর শ্যামলী চলে গিয়েছিলো আর্টসে। হায়ার সেকেন্ডারির পরে তারা আলাদা কলেজে ভর্তি হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে আর সেরকম যোগাযোগ ছিল না।
অনেক কাল পরে শ্যামলীকে স্বপ্নে দেখছিলো সে, কোনো অচেনা জায়গায় শ্যামলীর সাথে দেখা হয়েছে তার। শ্যামলীর স্বামী আর ছেলে আছে, কোনো কারণে তারা সেখানে নেই। তাদের সাথে রঞ্জনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে তারা তাদের খুঁজে চলেছে কিন্তু কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শ্যামলী সেকারণে খুব উদ্বিগ্ন। একসময়ে একটা রাস্তার ওপারে তাদের দেখা গেল, দূর থেকে তাদের চেনা যাচ্ছে না।
শ্যামলীর ডাকে তারা যখন রাস্তা পেরোচ্ছে সেসময়ে আচমকা একটা ট্রাক এসে শ্যামলীর স্বামীকে ধাক্কা মেরেই পালিয়ে গেলো। ঘুমের ভিতরেই ‘ধপ’ করে একটা ভোঁতা শব্দ শুনতে পেলো রঞ্জনা। সে আর শ্যামলী চিত্কার করতে করতে এক্সিডেন্টএর জায়গায় যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেলো শ্যামলীর স্বামী হলো বিনয়বাবু আর ছেলেটি সাত্যকি!
স্বপ্ন দেখছে এটা বিশ্বাস করলেও ঘুমের ভিতর অসম্ভব চমকে উঠলো রঞ্জনা।
ট্রাকের ধাক্কায় বিনয়বাবুর চোয়াল ভেঙ্গে গেছে, গালের বাঁ-পাশ তোবড়ানো, আর সেদিকের চোখটা পাতা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ঘুমের মধ্যেও রঞ্জনা টের পেলো তার হৃদস্পন্দন অসম্ভব বেড়ে গেছে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও সে পারছে না। সাত্যকির কোনো ক্ষতি হয় নি।
ঘুমের মধ্যে স্বামীকে খুঁজতে চেষ্টা করলো সে, কিন্তু কৃষ্ণেন্দু কোথায়?
“এই! কোথায় তুমি?” গলা ফাটিয়ে চিত্কার করতে গিয়েও কোনো স্বর বেরুলো না। রঞ্জনা বুঝতে পারলো যে তার একটা ফ্যাসফেসে আওয়াজ ছাড়া আর কিছু বেরুচ্ছে না তার গলা থেকে।
প্রবল আতঙ্কের মধ্যে সে দেখলো যে বিনয় বাবু এবার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে – একটা বীভত্স হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“এই-ই-ই! শুনছো? এই দেখো না!” আবার একবার চিত্কার করতে গেলো সে।
“কে?”
“এই, এই যে! এদিকে! এখানে!” কৃষ্ণেন্দুর গলার আওয়াজে অনেকটা সাহস ফিরে পেলো রঞ্জনা।
“কে? এই! কে? কে ওখানে?”
এবার রঞ্জনা বুঝতে পারলো যে সে কৃষ্ণেন্দুর চিত্কার স্বপ্নের ভিতরে নয়, বাস্তবেই শুনছে। ঘুম ভেঙ্গে গেলো তার।
কৃষ্ণেন্দু বিছানায় বসে আছে। তাদের ঘর অন্যান্য দিনের মতই রাস্তার লাইটপোস্ট থেকে আসা আলোর প্রতিফলনে পুরো অন্ধকার নয়। আবছা আলোয় রঞ্জনা দেখতে পেলো তাদের ঘরের দরজার পর্দাটা এখনো একটু দুলছে।
“ক্কি? হ্যাঁ? কি হয়েছে?” আচমকা ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে পারছিলো না রঞ্জনা।
“শ-শ-শ!” ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করতে বারণ করলো কৃষ্ণেন্দু।
“কিগো? কি হয়েছে?” ফিস ফিস করে রঞ্জনা জিজ্ঞেস করলো। সাত্যকি ঘুমের ভিতর আবার একটু নড়ে উঠলো। কৃষ্ণেন্দুর চিত্কারে তার ঘুম ভাঙ্গেনি।
“দরজার কাছে কে একটা দাঁড়িয়ে ছিল মনে হলো!” সেরকমই ফিসফিস করে জবাব দিলো কৃষ্ণেন্দু।
“এখানে?” আতঙ্কে রঞ্জনার গলা কেঁপে গেলো।
“মনে হলো – খানিক আগে ঘুম ভেঙ্গে গেলো! ধপাস করে একটা আওয়াজ শুনলাম, ভারী কোনো জিনিষ পড়ে যাওয়ার মতো। তারপরে মনে হলো যেন …”
“আওয়াজ?” আরেকবার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেলো রঞ্জনার, হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় সদ্য দেখা স্বপ্নের স্মৃতি এখনো টাটকা! সেও তো ঘুমের মধ্যেই ওরকম একটা শব্দ শুনেছিলো।
“দাঁড়াও! দেখি তো!” বেড সুইচ রঞ্জনার পাশে, সেদিকে হাত বাড়ালো কৃষ্ণেন্দু।
“না না! যদি চোর ডাকাত হয়? ওগো – যদি ছুরি-ছোরা থাকে!” রঞ্জনা কৃষ্ণেন্দুকে বাধা দেয়।
“ধ্যার কসুটা!” প্রবল বিরক্তিতে রঞ্জনার হাত ছাড়িয়ে বেড সুইচ টেপে কৃষ্ণেন্দু। ঘর টিউবের আলোয় ভরে যায়।
দরজার পর্দাটা এখন স্থির।
“কিছু না সোনাই – ঘুমোও ঘুমোও।” আলোয় আর বাবা-মায়ের গলার আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিলো সাত্যকির, তাকে আদর করে আবার শুইয়ে দেয় রঞ্জনা।
“জানো তো – একদম যেন পর্দা ফাঁক করে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ওখানে! স্পষ্ট মনে হলো।” কৃষ্ণেন্দু গলা নামিয়ে বললো।
বাইরের করিডোরের আলোগুলো জ্বলছে এখন। খানিক আগে কৃষ্ণেন্দু সারা বাড়ির আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। সিঁড়ির তলা থেকে শুরু করে চিলেকোঠা কোনো জায়গায় বাদ রাখেনি সে আর রঞ্জনা – তবে কোথাও সন্দেহজনক কিছু দেখা যায়নি।
রঞ্জনা দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
“কি শুরু হলো বলত? আমার কিন্তু খুব ভয় করছে!” নিচুপর্দায় বলে রঞ্জনা।
“আরে ধুর – মনে হয় ঘুমের ঘরে কি দেখতে কি দেখেছি – আসলে কি বলত, বড় রাস্তার পাশে রাত্রে ট্রাক গুলো দাঁড়ায় না? মনে হয় ডালা-ফালা ফেলবার আওয়াজ – তারপর আচমকা ঘুম ভেঙ্গে …” কৃষ্ণেন্দুর বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস পাওয়া যায় না সেরকম।
রঞ্জনাও স্বপ্নের মধ্যে শব্দটা শুনেছে, তার সাথে তার আগের রাতের অভিজ্ঞতা তাকে এখনো আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছে।
“দাদা?” ইতস্তত করে বলে সে।
রঞ্জনার দিকে চায় কৃষ্ণেন্দু।
গলা একদম খাদে নামিয়ে বলে সে, “দাদা নয়ত?”
“কি বাজে বকছো? যে মানুষটার পাশ ফিরতে লোক লাগে …” নিচু গলায় ধমকে ওঠে কৃষ্ণেন্দু।
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে রঞ্জনা, তারপর বলে, “দাদার ঘরে ভালো করে দেখেছো?”
“হ্যা – খাটের তলাফলা কিছুইতো বাদ রাখলাম না। যাকগে … এ শালার রাস্তার আলোটা, জানলা বন্ধ করলেও ঘর গুমোট হয়ে যায় – ধুউর!” হাই তুলতে তুলতে ঘড়ির দিকে দেখে কৃষ্ণেন্দু, “পৌনে চারটে, চলো শুয়ে পড়া যাক – সকালে বড়হাট, ঘুম ভাঙ্গবে কিনা কে জানে!”
আলো নেভার পরে সহজে ঘুম এলোনা রঞ্জনার, জানালার বাইরে আকাশের রং হালকা হয়ে এসেছে। সারা বাড়িতেই হালকা ওষুধ ওষুধ গন্ধ।
মিত্র ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকের ছোট মেয়ে স্বর্ণালীর সাথে গোপন সম্পর্ক আছে সায়নের – ‘সাত জনমের সাথী’র আজকের পর্ব এইমতো শেষ হলো। মিতা বিজ্ঞাপনের সময়গুলো ছাড়া একটানা হাঁ করে টিভির দিকে তাকিয়েই বসে ছিল এতক্ষণ।
“বাব্বা! কার সাথে কার কি লটঘট হচ্ছে - বোঝো!”
“এর নাম সিরিয়াল!” রঞ্জনার চোখ টিভির পর্দায় থাকলেও মন চঞ্চল, শুকনো হাসে সে।
মিতা বিনয়ের ঘরে যাওয়ার উদ্যোগ করলে রঞ্জনা তাকে আটকায়, “শোনো মিতা, আরেকটু বসো, কথা আছে।” আজ সকাল থেকে কথা হয়নি মিতার সাথে।
“কি বৌদি?”
“বলছি – একটা কথা জিজ্ঞাস করি তোমায়, কথা দাও কা-উ-কে বলবে না?”
“না না! কি যে বলেন বৌদি – বলুন না কি কথা?”
“যেটা ঘটনা – মানে তুমি ওনাকে দেখছো বলে, আর তাছাড়া তুমি মেডিকেল লাইনের লোক, তুমিই বলতে পারবে, আসলে …” ঠিকঠাক কথা গুছিয়ে বলতে পারে না রঞ্জনা, ইতস্তত করতে থাকে।
“আরে বলুন না বৌদি! মা-কালির দিব্যি, কথা লিক-আউট হবে না – হি হি।”
রঞ্জনা একটা লম্বা শ্বাস নেয় – “বিনয়দাকে কেমন মনে হচ্ছে তোমার?”
“কেমন … মানে আপনি শরীরের কথা জিজ্ঞাস করছেন?”
“না, মানে বলতে চাইছি যে আমরা ওনাকে যেরকম দেখি, মানে শরীর স্বাস্থের দিক দিয়ে – এমন হতে পারে কি যে উনি … মানে …” রঞ্জনা একটা নিঃস্বাস নেয়, “… সুস্থ, কিন্তু এরকম ভান করছেন?”
কোনো কথা না বলে রঞ্জনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মিতা।
“আপনি কিছু সন্দেহ করছেন বৌদি?”
“না – এমনি কথার কথা – এরকম হতে পারে কি? এই, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছ যে আমাদের আলোচনা কাউকে বলবে না, এমনকি তোমার দাদাকেও না। ঠিক?”
“না না! সেতো ঠিক আছে। কিন্তু কেন বলুন তো?”
“এমনিই জিজ্ঞেস করছি – এরকম হতে পারে, না পারে না? তোমার মেডিকেল বিদ্যে কি বলে?”
“বৌদি – এক্সিডেন্ট যেরকম হয়েছিল, তাতে ওনার বাঁচার সম্ভাবনই অনেক কম ছিল। সে জায়গা থেকে এখন যেরকম – মানে যেরকম দেখছেন আর কি, সে জায়গা অব্দি আসতে অনেক হাঙ্গাম হয়েছে। তবে পুরো সুস্থ – না, সেটা হতে এখনো অনেক সময় লাগবে। তাছাড়া এক্সিডেন্টএ ওনার দুটো পাই যেরকম ভাবে ভেঙ্গে গিয়েছিলো, হাড় সেট হতে হতে … বলতে নেই, আমার মনে হয় না ওনার পক্ষে নিজের পায়ে দাঁড়ানো … ভগবান ভরসা বৌদি।”
খানিকক্ষণ নিজের মনে চিন্তা করে রঞ্জনা, “মানে বলছো যে এখন, এই মুহুর্তে উনি নিজে নিজে নড়াচড়া – মানে, বিছানা থেকে নামা-ওঠা – তাও বাদ দাও, উঠে বসা – কোনভাবেই সম্ভবই না?”
“কেন বৌদি? আমাকে ছাড়াতে চাইছেন?” মিচকে হাসে মিতা।
“আরে ধুর – হা হা!” রঞ্জনা খোলা মনে হেসে ফেলে এবার, “তুমিও না! ছি ছি!”
সাত্যকি একই জায়গায় চরকি কেটে ছুটছিল, প্রতিদিন বিকাল বেলায় এটা এখন টার প্রিয় খেলা হয়েছে| ‘ঘোর না লেগে যায়’ ভেবে ওকে একটা সময় পরে থামাতে যেতেই ছাদের রেলিঙে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো| স্ক্রিনে কৃষ্ণেন্দুর নম্বর|
“তুমি কোথায় এখন?”
“এই তো ছাদে পায়চারি করছি। বড়হাটে কাজ মিটেছে?” সাত্যকিকে কাছে টেনে নিলো রঞ্জনা|
“হ্যাঁ। শোনো – একটা কথা বলো, বলাইয়ের খোঁজ কে দিয়েছিলো মনে আছে?”
“কি জানি, তোমার চেনা পরিচিত, নাকি … কেন বলত?”
“না! হুমম, মন দিয়ে শোনো – বলাই আসে নি তো এখনো? যদি আসে তাহলে ওকে আর বাড়িতে ঢুকিও না আজকে।”
“ক-কেন? কি হয়েছে বলত?”
“কিছু না, সোনাই কি করছে?”
“এই তো আমার কাছে, ছুটোছুটি করছে – বলোনো প্লিজ কি হয়েছে? আমার কিন্তু খুব টেনশন হচ্ছে!”
“আরে টেনশন করার কিছু নেই – তবে যা বললাম, ও এলে উত্তর দিও না। আমি বাড়ি এসে বলছি।”
“আচ্ছা – তবে তাড়াতাড়ি চলে এসো প্লিজ। আর কি সব হচ্ছে – আমি কিন্তু দুশ্চিন্তায় মরে যাবো!”
“ঘাবড়িও না, আমি তাড়াতাড়ি আসছি। ভালো কথা, তোমার নম্বর নেই তো ওর কাছে?”
“না না! পাগল নাকি?”
“ঠিক আছে, চুপচাপ থেকো, ডাকাডাকি করলে কোনো সাড়া দিও না – কেমন?”
“প্লিজ প্লিজ প্লিজ - তাড়াতাড়ি এসো।”
“চলে এসেছি প্রায় – বাস থেকে নামবো এবার।”
“সাবধানে এসো।”
“হ্যাঁ, ঠিক আছে। রাখছি।”
রঞ্জনা ফোনটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকে খানিকক্ষণ, ঘড়ি অনুযায়ী বলাইয়ের আসতে এখনো কিছুটা সময় আছে। কিন্তু কৃষ্ণেন্দুর ফোন তাকে রীতিমতো অসস্তিতে ফেলে দিলো।
বলাইকে কে ঠিক করেছিলো স্পষ্ট কিছু মনে পড়ছে না। বিনয়বাবুকে হাসপাতাল থেকে এই বাড়িতে নিয়ে আসবার সময়ে অনেক কিছুই যেন আপনা-আপনিই হয়ে গিয়েছে। মিতাকে হাসপাতালের সাথে কাজ করা একটা এজেন্সি ঠিক করে দিয়েছিলো এটা জানে রঞ্জনা, কারণ মিতার সাথে তার মোটামুটি ভালই গল্পগুজব হয়। বাইরের সমস্ত দায়িত্ব কৃষ্ণেন্দুর, সেদিক দিয়ে রঞ্জনার এসব ব্যাপারে মাথা ঘামানোর দরকার পড়ে না। তবে বলাইয়ের ব্যাপারে কাউকে বলতে শোনা গিয়েছিলো যে মানুষ হিসাবে ঠিকঠাক, সেকারণেই কৃষ্ণেন্দুর অনুপস্থিতিতেও তার আসা-যাওয়া নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই।
নিচে বেলটা বেজে উঠলো। রঞ্জনা চমকে উঠে সাত্যকিকে জড়িয়ে ধরলো।
রাতে ঘুমোতে প্রচুর দেরি হলো আজ। কৃষ্ণেন্দু বড়হাটে গেলে ফিরতে দেরি হয়, কিন্তু আজ সে অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে। কিন্তু রঞ্জনার সাথে কথা বলে, বেশ কয়েক জায়গায় ফোন করে, সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে তারপরে খেয়েদেয়ে শুতে শুতে অনেক দেরি হয়ে গেলো। সাত্যকিকে যদিও আগে ভাগেই খাইয়ে দিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাদের বিছানায় যেতে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেলো।
সাত্যকি ঘুমোচ্ছে শুয়ে শুয়েও দুজনে চাপা স্বরে কথা বলছিলো, ঘটনা যে এদিকে মোড় নেবে সেটা তারা ভাবতেও পারেনি।
“তাহলে বলাইয়েরই কারসাজি … তাই না?”
“তা ছাড়া আর কি? দেখো, দাদাটা মরেছে, তাই বদলা নিতে বলো বা আর কিছু, সে জন্যেই হয়তো …রুনু, খুব রক্ষে হয়েছে যাহোক।”
“আমি এখনো ভাবতে পারছি না কিছু! সোনাইকে নিয়ে একা থাকি, মিতা চলে যাওয়ার পর … উফ! চিন্তা করলেই দম বন্ধ হয়ে আসছে!”
“ওর মনে হয় আরো বড় কোনো উদ্দেশ্য ছিল … ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছে, আরে আমিও তো কল্পনা করলেই হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে! যাকগে … আজ সাড়া দাওনি, মনে হয় বুঝতে পেরেছে, মনে হয় না আর এদিকে ঘেষবে কোনদিন।”
“থানায় তো খবর দিলে - ”
“হ্যাঁ, বললো তো, যদি সেরকম হয় তাহলে হয়তো আজকেই তুলে নিতে পারে।”
“ভাবা যায়?”
“চলো ঘুম পাচ্ছে, খুব জার্নি হয়েছে আজ।”
“ঘুম কি আসবে আর?”
কৃষ্ণেন্দু ঘুমিয়ে পড়ল হয়তো, কিন্তু রঞ্জনা অন্ধকারে চোখ চেয়ে শুয়ে রইলো। সব দিক নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাত্যকি ঘুমের ঘোরে দুয়েকবার নড়াচড়া করতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সে। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মস্তিস্ক পুরোপুরি সক্রিয়। গত কয়েকরাত ঘটে চলা রহস্যের উদ্ঘাটন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু স্বস্তির বদলে উদ্বেগে ঘুম এসেও আসছে না। তবে তারা দুজনেই নিশ্চিন্ত যে আজকে রাতে এ বাড়িতে আর কোনো উত্পাত হবে না।
“জেনাই।” চোখের পাতা দুটো জুড়ে আসবার আগে রঞ্জনা সাত্যকির ঘুমজড়ানো গলা শুনতে পেলো একবার। তার হাতের নিচে সাত্যকি একটু ছটফট করে উঠলো। কৃষ্ণেন্দুর নাক ডাকার মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো রঞ্জনা।
একটানা ছেঁচড়িয়ে যাওয়ার আওয়াজ, আর তারপরে কতগুলো তীক্ষ্ম ধাতব শব্দ শুনে ঘুম খানিকটা পাতলা হলো রঞ্জনার। কৃষ্ণেন্দুর হাতের স্পর্শে এরপর ধড়মড় করে উঠে বসলো সে। স্বপ্ন না সত্যি?
“শুনলে?” চাপা গলায় জিজ্ঞাস করে কৃষ্ণেন্দু।
“হ্যাঁ” রঞ্জনার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোতে চায় না।
“দাঁড়াও – দেখি! আজ একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে!”
অন্ধকারে হাত চালিয়ে দ্রুত মোবাইলটা খুঁজে বের করে কৃষ্ণেন্দু, চট পট কল-লিস্ট থেকে থানার নম্বরটা বের করে ডায়াল চাপে। রঞ্জনা স্বাভাবিক প্রতিবর্তে সাত্যকিকে আলগোছে বুকে চেপে ধরে।
“টর্চটা কোথায়?” মোবাইল কানে ধরেই জিজ্ঞাস করে কৃষ্ণেন্দু।
“টর্চ – এই, তুমি বেরিও না প্লিজ!”
“চুপ!” ঠোঁটে আঙ্গুল তুলে বিছানা থেকে নামে কৃষ্ণেন্দু। “আরে টর্চটা কোথায় রেখেছো ঘোড়ার ডিম? ইমার্জেন্সির সময়ে যদি কিসু …” যতটা নিস্তব্ধে সম্ভব তড়িঘড়ি শেলফের উপর, ড্রেসিং টেবিল খুঁজে দেখে সে, “আরে!” একটা গালাগালি করতে গিয়েও নিজেকে সামলায়, “রিং হচ্ছে, কেউ তুলছে না!”
“যেও না! যেও না!” কৃষ্ণেন্দুকে ঘরের বাইরে বেরোতে দেখে রঞ্জনা আঁতকে ওঠে।
“চুপ!” মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে দ্রুত হাতে লক করে পরনের পায়জামার পকেটে ঢুকিয়ে নেয় কৃষ্ণেন্দু। কয়েক সেকেন্ড কান খাঁড়া করে বাইরে কোনো শব্দ হচ্ছে কিনা বুঝে নিয়ে তারপরে খুব সাবধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে।
কৃষ্ণেন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রঞ্জনা স্তম্ভিতের মতো বিছানায় সাত্যকিকে আঁকড়ে বসে থাকে। ঘড়ির দিকে চোখ যায়, তিনটে পয়ত্রিশ। ভাগ্য ভালো সাত্যকির ঘুম ভাঙ্গেনি এই পরিস্থিতিতেও।
বাইরে থেকে কৃষ্ণেন্দুর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রঞ্জনা এইবার ধীর পায়ে বিছানা থেকে নামে। আলতো পায়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করে বাইরে কিছু দেখা যায় কিনা। তারপরে সাত্যকিকে কোলে নিয়ে সেইরকমই চুপিসাড়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরোয় সে।
ঘর থেকে বেরোতেই মনে পড়ে যায় পাশেই রান্নাঘরের তাকে টর্চটা রাখা আছে, অন্ধকারে মাপা পদক্ষেপে সেদিকে গিয়ে সামান্য হাত চালাতেই সেটাকে পেয়ে যায় রঞ্জনা। সাত্যকিকে বেশ ভারী লাগছে এখন, সে ওকে একটু কোলের উপরে তুলে নিয়ে সাবধানে করিডোরের দিকে পা বাড়ালো। ঘর থেকে বেরোতেই ওষুধের গন্ধটা পাওয়া যাচ্ছিলো, সামনের দিকে এগোতে গেলে সেটা তীব্রতর হয়ে উঠল।
পায়ে নরম কি একটা কাপড় মতো ঠেকলো। টর্চ জ্বললে অন্ধকারের মুখোস খুলে যেতে পারে, সেই ভয়ে সেদিকে নজর না দিয়েই সে ছাদে ওঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। কৃষ্ণেন্দু ওদিকেই গিয়েছে আশা করা যায়। ঘুমের ভিতরে শোনা ধাতব শব্দগুলো কি তাহলে ছাদের গেট খোলার আওয়াজ ছিল?
এক হাতে সাত্যকিকে ধরে রাখতে যথেষ্ঠ অসুবিধা হচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময়ে সে একবার অসস্তিতে নড়ে উঠলো, রঞ্জনা দাঁড়িয়ে টর্চ ধরা হাতেই তাকে একবার আদর করে চুপ করিয়ে দিলো। সিঁড়ির দরজাটা খোলা মনে হচ্ছে? পাশে প্রায় দেওয়ালের মিশে দাঁড়িয়ে আছে ওটা কে? চেহারা আর পোশাকের অবয়ব দেখে রঞ্জনা নিশ্চিন্ত হলো – কৃষ্ণেন্দু।
“আমি।” রঞ্জনা এতটাই নিচুস্বরে বললো যে নিজের কথা নিজের কাছেই অস্পষ্ট শোনালো।
“শ-শ-শ!” কৃষ্ণেন্দু ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে তাকে চুপ করতে বললো। তার নজর এখনো বাইরে, ছাদের দিকে।
বাইরের আলোআঁধারির বিপরীতে কৃষ্ণেন্দুর ছায়ার হাতে একটা ছুরি দেখা যাচ্ছে। আঁতকে উঠতে গিয়েও সে বুঝতে পারলো এটা তার রান্নাঘর থেকেই এসেছে। উত্তেজনা মিশ্রিত একটা নিশ্চিন্ততা অনুভব করলো রঞ্জনা।
“কি দেখছ?” কৃষ্ণেন্দুর শরীরের ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখতে চায় সে।
“একটা লোক! ছাদে রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে আছে!” নিঃস্বাস প্রশ্বাসের সাথে বলে কৃষ্ণেন্দু।
“বলাই?”
“না। অন্য কেউ!”
“একা?”
“মনে হচ্ছে।”
“চলে এসো! চলে এসো! চলো গেট লাগিয়ে নিচে নেমে যাই!”
“শ-শ-শ!”
ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে রঞ্জনাকে চুপ করতে বলে কয়েক মুহূর্ত কৃষ্ণেন্দু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। রঞ্জনা আর সাত্যকি সঙ্গে থাকার দরুন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। লোকটিরও হাবভাব বোঝা যাচ্ছে না। সেও একই ভাবে সিঁড়ির ঘরের দরজার দিকে পিছন ফিরে ছাদের রেলিঙের ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছে জানে না, হাতের চাপে দরজা আস্তে আস্তে অনেকটাই ফাঁক হয়ে গেছে আর রঞ্জনা এখন দরজার সামনে কৃষ্ণেন্দু দাঁড়িয়ে থাকা সত্বেও তার পাশ দিয়ে ছাদের সেই রহস্যময় মূর্তিটাকে দেখতে পাচ্ছে।
“জেনাই!” আচমকা সাত্যকির গলার আওয়াজে উদ্বেগপূর্ণ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে গেলো!
রঞ্জনা সাত্যকির মুখে হাত চাপা দিতে যাওয়ার আগেই সেই লোকটি ধীরে ধীরে তাদের দিকে ঘাড় ঘোরানো শুরু করলো।
কি হচ্ছে না হচ্ছে ভাবতে যাওয়ার আগেই কৃষ্ণেন্দু আকস্মিক লাফ দিয়ে ছাদের দিকে ছুটে গেলো।
“এই! কে?” ভয় দেখাতে নাকি নিজের ভেতরের ভয়কে চাপা দিতেই ভয়ঙ্কর চিত্কার করে উঠলো সে।
কৃষ্ণেন্দুর আচমকা তেড়ে যাওয়া দেখে ভয় পেলেও রঞ্জনা সব থেকে বেশি অবাক হলো, এই পরিস্থিতিতে লোকটির কোনো হেলদোল নেই। আগের মতই সে আস্তে আস্তে তাদের দিকে ঘাড় ঘোরাতে থাকলো। কৃষ্ণেন্দুর হাতের বাগিয়ে থাকা ছুরিটা তার মাথা থেকে প্রায় একফুট দুরে এসে থামলো।
লোকটির মুখের একপাশে এবার রাস্তার আলো এসে পড়লে রঞ্জনার বিস্ময় চরমে উঠলো - সে দেখলো লোকটি সাত্যকির ‘জেনাই’, তার ভাসুর বা কৃষ্ণেন্দুর মাসতুতো দাদা বিনয় বাবু ছাড়া আর কেউ নয়। যে মানুষ শয্যাশায়ী সে এখানে এলো কি করে? কেমন করেই বা সে তার ভেঙ্গে যাওয়া পা-দুটিতে ভর দিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে?
বিনয় বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে এখন প্রায় তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। যদিও কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে মাথা ঘুরিয়ে শরীরের প্রায় পিছন দিকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়!
এই দৃশ্য দেখে কৃষ্ণেন্দু পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো, রঞ্জনা অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো সে কেন এখনো অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে না!
“বিনু’দা?” ফিসফিস করে বললো কৃষ্ণেন্দু।
বিনয় বাবুর ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি অবশ্য কৃষ্ণেন্দুকে ফুঁড়ে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা রঞ্জনার কোলের সাত্যকির দিকে নিবদ্ধ ছিল বোধহয়।
“বি-ন-য় বা-বু …” নিচে রাস্তা থেকে একটা খ্যাসখেসে ডাক ভেসে এলো কৃষ্ণেন্দুর জিজ্ঞাসায় প্রতিধ্বনিত হয়ে।
ডাকটা শোনবার সঙ্গে সঙ্গেই বিনয়বাবুর চোখের মনি উল্টে গেলো, আর কৃষ্ণেন্দু ও রঞ্জনকে পুরোপুরি চমকে দিয়ে তার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে চেয়ে থাকা শরীরটা ছাদের রেলিং টপকে সশব্দে নিচের রাস্তায় পড়ে গেলো।
“ইসসসস!” সাত্যকির চোখ ঢাকবার ছলনায় রঞ্জনা নিজেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
পরের দিন। মিতাকে পুরো ব্যাপারটা বলতে হয়েছে, কিন্তু সে বিশ্বাস করতে চায়নি। পরে যদিও সে করিডোরে ব্যান্ডেজের টুকরো আর অল্প রক্তমাখা উল্টো পায়ের ছাপগুলো দেখে আতঙ্কিত হয়েছে।
আত্মহত্যার ঘটনা শুনে পুলিস অফিসার সরেজমিন ঘুরে গেলেন। লাস চলে গেলো পোস্ট মর্টেমের জন্যে।
তার কাছ থেকেই জানা গেলো বিনয় বাবুর দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী যে ট্যাক্সিটি, তার চালক-তথা-মালিক জগাই হালদার। দুর্ঘটনার সময় ট্যাক্সিটি চালাচ্ছিলো তার ভাই - জনগনের হাতে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়। ভাইয়ের নাম বলাই হালদার যে পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ছিল।
কৃষ্ণেন্দু ভুল খবর পেয়েছিলো।
প্রকাশিত : হরর পত্রিকা
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন