“স্যার! পিতল না – সোনাই মনে হচ্ছে!” আই. সি. রমেন মন্ডলের কানে ফিস ফিস করে বললো কনস্টেবল ঘনশ্যাম বাগদি|
সন্দেহ তো হচ্ছিলোই, কিন্তু মনস্থির করতে পারছিলেন না রমেনবাবু| রাতের ঘুম চটে গেছে, সে বিরক্তি তো ছিলই নিন্তু ঘনশ্যামের কথায় একটু ভরসা পেলেন তিনি – কেসটাকে অন্যভাবে সাজাতে হচ্ছে|
একটু দুরে নিতাই চক্রবর্তীকে বেদম ধমকাচ্ছে আরেকজন কনস্টেবল মদন সর্দার আর পঞ্চায়েত মেম্বার সনাতন ঘরামী|
“বোম বাঁধছ? হ্যাঁ? বোম?”
পঞ্চাননের কথায় কেঁপে কেঁপে উঠছে নিতাই, তার প্রায় হাতে পায়ে ধরবার অবস্থা! কাঁচুমাচু মুখে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছে সে|
“বি-শ্বা-স করুন, আমি কিছু জানি না! এ–এ কিভাবে কোত্থেকে এলো, সত্যি বলছি আমি জানিই না!”
“ন্যাকাষষ্ঠী! আমি জানি না!” ভেংচিয়ে উঠলো মদন, “পিঠে ডান্ডা পড়লে সব জেনে যাবে! আমি জানি না! বটে?”
“শোনো নিতাই,” মধ্যস্থতায় আসেন সনাতনবাবু “তুমি কিছু জানো না – মানলাম, কিন্তু গোলাটা যখন তোমার জমি থেকেই পাওয়া গেছে, তখন – কি আর বলি বলত? কি করে বিশ্বাস করি তোমায়?”
“সত্যি বলছি – আমি কিছুই জানি না – আপনি তো জানেন সনাতন’দা আমি কোনো সাতে-পাঁচে থাকি না, ঘুমুচ্ছিলাম| কি করে, কোত্থেকে যে এসব আপদ বালাই - বি-শ্বা-স করুন!”
“ওসব কল সব জানা আছে!” আবার ধরতাই দিলো মদন “নাকে তেল দিয়ে ঘুমুছিলে, সাতে-পাঁচে থাকো না!?”
“হ্যাঁ – সেই তো, মিটিং-ফিটিং, মিছিল-টিছিলে আসো না, কতবার তোমায় বলা হয়েছে| গ্রামের এক পাশে পড়ে থাকো, কিন্তু – আরে বাবা মানুষের সাথে না মিশলে, মানুষের পাশে না থাকলে, কি করে বলি বলত তোমার চরিত্র কেমন? তলে তলে বোমাবাজি করছ কিনা, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত আছ কিনা – এসব আমরা কি করে জানবো বলত?”
করুন চোখে সনাতনের দিকে তাকিয়ে থাকে নিতাই, মুখ দিয়ে কথা বেরুতে চায় না – ঘটনার আকস্মিকতায় আর পুলিশ-মেম্বারের সরকারী চাপে তার অবস্থা কাহিল|
“সনাতন’দা – আমি গরীব মানুষ, নিজের মতো চাষআবাদ নিয়ে থাকি, জানেনই তো?”
“ঐ তো বাবা! কলেজ পাশ করে চাষ করছ, ওটাই তো বেশি সন্দেহজনক, কেন আমাদের রাজ্যে এখন এতো উন্নয়ন, এখানে কি চাকরি-বাকরি নেই - হ্যাঁ?” সনাতনের সন্দেহ যায়না| “তোমাকে তো বলা হয়েছিল – হয়নি? ঐ কিছু ইয়ে টিয়ে হলে স্কুলের চাকরিটা – তা তো তোমার রুচলো না, তেজ দেখিয়ে এই বনবাদাড়ে জমি আঁকড়ে পড়লে! কি জানি বাবা যা দিনকাল – গোপনে গোপনে কি ধান্দা করছিলে ভগবান জানে|”
ঠিকরে ওঠে মদন - “কলেজ পাশ? বলেন কি সনাতন’দা? তাহলে তো মাল-মশলা সব জানে - হ্যাঁ! যা ধরেছি তাই! শিক্ষিত শয়তান – বোমের কারবার ফেঁদে বসেছে – কি সাংঘাতিক! এই এই - চল শালা, হুড়কো দিলে ঠিক স্বীকার করবে!” এবার একরকম টেনে হিঁচড়ে নিতাইকে আই.সি.র কাছে নিয়ে যায় সে|
রমেনবাবু আর ঘনশ্যামের শলাপরামর্শ প্রায় শেষ - একটা সিদ্ধান্তে আসা গেছে অবশেষে| এর মধ্যে ঘনশ্যাম তুবড়ে-মুচড়ে যাওয়া গোলাটা নেড়েচেড়ে দেখে নিয়েছে কিরকম ওজন হতে পারে – আয়তন অনুযায়ী ওজন সেরকম বেশি না| তবে এখনো গোলাটা বেশ গরম আর তা ছাড়া তার গায়ের দু-চারটে ফাটল থেকে কি একরকম চটচটে রস বেরিয়ে আসছে, তাই হাতে তুলে ওজন বোঝা গেলো না এখনো|
“যা আছে তাতে আর চাকরি করতে হবে না স্যার|” দাঁত বের করে হাসে ঘনশ্যাম|
“হ্যাঁ – ঐ আশায় থাকো, ওদিকে জানতে পারলে ভাগবাটোয়ারা কিরকম হবে বুঝতে পারছ?”
“কি দরকার জানানোর? এই তো আমরা তিনজন আর ওদিকে সনাতন মেম্বার – ব্যাস, চারজনের যা পড়বে তাই| কি বলেন? বেশি লোক জানাজানি হয় নি তো|”
“ঐ সনাতন ব্যাটাই পার্টির নাম করে আদ্দেক গাপ করবার তাল করবে – চিনিস না শালাকে?”
“একটু বুঝিয়ে বললে, মানে পার্টি-ফার্টি কি দরকার নিজের নিজের মতো একটু –“
“ছাড়ত! পার্টিকে কি দেবে সেতো জানিস ভালো মতো – চুপ কর, এদিকে আসছে|”
একরকম ঘসরাতে ঘসরাতে নিতাইকে নিয়ে আসছিলো মদন, পিছন পিছন সনাতন|
নিতাইকে দেখে হুঙ্কার দিলেন রমেনবাবু – “এসব কি? হ্যাঁ? কি হচ্ছে এসব?”
“আ-আমি কিছু জানি না, ঘুমোচ্ছিলাম! বোম পড়ার মতো আওয়াজ হলো, আর এসে দেখি –“
“চ্যাওপ!” রমেনবাবুর ধমকে সবাই চমকে উঠলো একসাথে| “বোম পড়ার মতো আওয়াজ হলো?”
“দেখলেন তো বোমের কথা স্বীকার করলো – আগে তো মানতেই চাচ্ছিলো না, শালা বহুত ঘাঘু!” মদন এবার ভরসা পেলো|
“না না – বলছিলাম যে ঘুমের মধ্যে বোমের মতো আওয়াজ পেয়ে -” নিতাই কথা শেষ করার আগেই তার গালে রমেনবাবুর চড় এসে পড়ল ফটাস করে|
“বোমের আওয়াজ চিনেছ খুব – তাই না?”
চড় খেয়ে নিতাই একটু টালুমালু মতো হয়ে গেলো, কিসের থেকে কি হচ্ছে বোঝবার ক্ষমতা হচ্ছে না এখন| সে ভ্যাবলার মতো সনাতনের দিকে তাকালো একবার|
“ভেরি ব্যাড! নিতাই – শিক্ষিত ছেলে, কথাবার্তা একটু ঠিক করে বলো| দিনকাল খুব বাজে, কে জানে বিরোধীপক্ষের সাথে যোগ দিয়ে তলে তলে সন্ত্রাসবাদ করছ কিনা! যদি ফেঁসে যাও আমারও কিন্তু কিছু করবার ক্ষমতা থাকবে না|” সনাতন ভরসা দিতে পারে না সেরকম|
“এই মদনা – তোল তো শালাকে! গাড়িতে তোল – থানায় নিয়ে গিয়ে একটু পালিশ করলেই সব বেরিয়ে পড়বে|” ব্যস্ত হয়ে পড়েন রমেন বাবু|
এবারে রমেনবাবুর পায়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিতাই| মুখে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায় না, রমেনবাবুর পায়ের উপর পড়ে ডুকরে কাঁদতে থাকে সে|
“এই এই এই – ছাড়! ছাড় ব্যাটা! ইকিরে! মেয়েছেলের মতো কাঁদতে লেগেছে শালা|”
নিতাইয়ের হাবভাব দেখে মজা পায় কনস্টেবল ঘনশ্যাম আর মদন| সনাতন মুখে একটু তেলতেলে মানবদরদী ভাব ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার নজর পাশে পড়ে থাকা গোলাটার দিকে|
“আহা! বেচারী বড্ড ভয় পেয়েছে|” গলা করুন হয়ে আসে সনাতনের “ও নিতাই – শোনো শোনো – ছাড়ো দিখি! ওঠো|”
নিতাইয়ের রমেনবাবুর পা ছাড়বার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না|
“ন্যাকাষষ্ঠী!” ভেঙচি কেটে বলে মদন|
“ওঠ হতভাগা!” আবার রমেনবাবুর গর্জন শোনা যায়|
একটু কেঁপে উঠে এবার মাটিতে কুজো হয়ে বসে নিতাই|
“শোনো নিতাই|” বুঝিয়ে বলে সনাতন, “বুঝতেই তো পারছ – বোমবাজির ঘটনা, কেস-কাবাডি থানা-পুলিশের ব্যাপার! একটু মাথা ঠান্ডা করো, আলাপ আলোচনা করে দেখা যাক কিছু করা যায় কি না – হাজার হোক তুমি আমাদের গ্রামের ছেলে বলে কথা| তোমার জমিতে বোম পাওয়া গেছে – এতো আমাদের পঞ্চায়েতের লজ্জা!” ঘনশ্যামের ডেকে ফেরে সনাতন “এই কনস্টেবল ভাই – শোনো তো, দেখো কিছু করা যায় কি না!”
ঘনশ্যাম এবার এক হ্যাঁচকায় নিতাইকে নিজের পায়ে দাঁড় করায়| “শোন – চল, পাশে চল|” নিতাই যন্ত্রের মতো ঘনশ্যামের সাথে একটু দুরে চলে যায়|
“জিনিসটা খাঁটি?” ঘনশ্যামেরা দুরে চলে যেতে নিচু গলায় রমেনবাবুকে জিজ্ঞাস করে সনাতন| পাশে মদন উত্কর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে|
“মনে তো হচ্ছে তাই!”
“মানে পিতল-টিতল নয় তো? মাধ্যমিকে পড়েছেন তো ‘চক চক করিলেই সোনা হয় না’ – হে হে|”
“কি করে বলি বলুন তো! আমি কি স্যাকরা? টেস্ট না করলে ঠিকঠাক বোঝা যাবে না|”
“লক্ষ্মন কর্মকার রাতবিরেত চোরাই সোনা গলায়, ওর ওখানে নিয়ে গেলে -” মদন বলে|
“এই না না! ও কম্মো একদম না! খবর ছড়িয়ে যাবে চারিদিকে| যা করবার সব গোপনে গোপনে করতে হবে!” হাঁ হা করে ওঠে সনাতন – “যদি বলেন তো আমার চেনা স্যাকরা আছে গঞ্জে – কাল-পরশু তার ওখানে নিয়ে যাবো’ক্ষণ, তদ্দিন থাক না আমার জিম্মায় – কি আছে? কাকপক্ষীতেও টের পাবে না|”
সনাতনের দিকে সরু চোখে তাকান রমেনবাবু| “হুম! কিন্তু হচ্ছে – সরকারী ব্যাপার তো – বুঝতে পারছেন, এটা থানার ভল্টে জমা রাখা উচিত|”
তাদের কথাবার্তার মাঝে ঘনশ্যাম আর নিতাই ফিরে আসে| নিতাইয়ের চেহারায় এবার একটু আত্মবিশ্বাস দেখা যায়|
“স্যার|” ঘনশ্যাম বলে, “নিতাইকে বুঝিয়ে বলেছি – শিক্ষিত ছেলে তো, ঠিক বুঝতে পেরেছে|”
“পেয়েছিস?”
“না – এখন কোথায়? বাড়ি থেকে এনে দিচ্ছে!” মদনের দিকে তাকায় ঘনশ্যাম, “মদনা, যাতো ওর সাথে|”
“হ্যাঁ - সেতো! ডিউটি আমার একার নাকি? আমি এসে অব্দি ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আর তুমি খালি দাড়িয়ে দাড়িয়ে –“
“আরে যা না হতচ্ছাড়া! তোদের জন্যে আর কত দেরি করবো, সনাতনবাবুও তখন থেকে – যা যা|” অধৈর্য্য হয়ে যান রমেন বাবু| সনাতন মদনের কথায় ভারী মজা পায়|
একটু বিরক্ত হয়েই নিতাইয়ের সাথে নিতাইয়ের বাড়ির দিকে এগোয় মদন| “এই চল|”
“আপনার দাবড়া খেয়েই ঘেঁটে গেছে শালা – হে হে, এক কথায় টাকা দিতে রাজি|” খোশামুদির গলায় বলে ঘনশ্যাম|
নিজের কৃতিত্ব নিয়ে মাথাব্যথা নেই রমেনবাবুর| তাই ঘনশ্যামের কথায় কোনো পাত্তা দেন না তিনি| তার এখন দুশ্চিন্তা গোলাটার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে| সনাতন এখনো পার্টির কথা তোলেনি দেখেও তেমন নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না তিনি|
“যাকগে – যে কথা হচ্ছিলো –“ সনাতনের দিকে তাকান রমেনবাবু|
“হ্যাঁ, এদিক ওদিক না করে চলুন পার্টি অফিসে বসে গোলাটা কেটে কুটে ভাগবাটোয়ারা করে নিই, তার পরে যার যার মতো এদিক ওদিক থেকে গলিয়ে দেখে নিলেই হবে – কিরকম?” ভালো বুদ্ধি দেয় সনাতন|
বুদ্ধিটা মনে ধরে সবাইয়ের, পার্টি অফিস রাতের বেলায় নিরিবিলি| “কিন্তু এখন করাত-ফরাত পাবেন কোত্থেকে?”
“সব ব্যবস্থা আছে আমাদের পার্টি অফিসে, ভাববেন না| গতবার ইলেকশনে বিরোধীপক্ষের সন্ত্রাসবাদী হামলার মোকাবিলা করতে আমাদের ছেলেরাও একটু – হে হে – জানেনই তো সব| তাদের যন্ত্রপাতি পিছনের ঘরে পড়ে আছে এখনো|”
“বেশ বেশ তাহলে তো চিন্তার কিছু নেই – সেই ভালো| ফালতু নিজেদের মধ্যে সন্দেহ না রেখে, ঐ করলেই হবে|” নিশ্চিন্ত হন রমেনবাবু|
“ঠিক – তাহলে পার্টি ফান্ডের জন্যে আদ্ধেকটা রেখে বাকিটা নিজেদের মতো করে – কি বলেন?” এইবার আসল কথায় এলো সনাতন|
“পার্টিকে এরমধ্যে জড়ানোর কি দরকার সনাতনবাবু? যা হচ্ছিলো, পুরোটা নিজেদের মধ্যেই রাখলে হত না?” তেতো গেলা গলায় বলেন রমেনবাবু|
“ছি ছি – পার্টি বাদ দিয়ে হয় কিছু? আমরা জনপ্রতিনিধি, আমাদের সব কিছুই তো পার্টির জন্যে| কেবল নিজেদের কথা ভাবলে চলে না আমাদের|”
“আচ্ছা – তাই যদি বলেন তবে আমাদেরও কিন্তু মাথার উপরে অনেকে আছেন| যা কিছু হয় সব এস.ডি.পি.ও., কমিশনার - রাজধানী অব্দি চারিয়ে দিতে হয়| একলা খেলে হয় বলুন?”
“আরে – ওদিক যাওয়ার কি দরকার? ওদিকে তো এমনিই সারা বছর নজরানা যাচ্ছে| আমাদের মহান নেতাই তো পুলিশমন্ত্রী|”
“তাহলে পার্টি ফান্ড নিয়ে ভেবেও কি লাভটা আছে? নিজেরটা বুঝে নিন না!”
প্রশাসনিক আলাপ আলোচনায় খুব মজা পাচ্ছিলো ঘনশ্যাম, মদন আর নিতাইয়ের পাত্তা নেই এখনো – কিন্তু মশাও কামড়াচ্ছে খুব| এর মাঝে একবার গিয়ে দেখে এলো গোলাটা এখনো বেশ ভালই গরম|
তিনভাগের একভাগ একভাগ আই.সি. আর মেম্বার, বাকিটার অর্ধেক অর্ধেক দুই কনস্টেবলের – এই জায়গায় আলোচনা শেষ হতেই হতেই মদন আর নিতাই চলে এলো| নিতাইয়ের হাতে একটা বস্তা দেখে খুব খুশি হলো ঘনশ্যাম| ব্যাটা এইট পাশ হলে কি হয়, বুদ্ধি খুব|
“পেয়েছিস?” মদনকে জিজ্ঞাস করলেন রমেনবাবু|
“পুরো হলো না – কুড়িয়ে-কাচিয়ে সাড়ে-চারশো-টারশো মতো হয়েছে|”
“কি আর করা যাবে! চল তাই হোক, ফালতু ঝামেলার জন্যে সরকারী গাড়ির তেল পুড়িয়ে - তেলের টাকাটাতো উঠুক| যত্তসব|” মদনের হাতে ধরা একশো, পঞ্চাশ আর দশ-কুড়ি টাকার নোটগুলোর দিকে তাকিয়ে বলেন রমেনবাবু|
সনাতন এবার নিতাইয়ের দিকে তাকায়, “শোনো এবারের মতো বড়বাবু তোমায় সামান্য কিছু ফাইন নিয়ে ছেড়ে দিলেন – বুঝলে? ফের যদি এরকম কিছু হয়, তবে কিন্তু আর কিছু করা যাবে না – ঠিক আছে?”
মাথা নাড়ায় নিতাই, খুব বুঝেছে সে|
“শোনো – এসব খুব জটিল ব্যাপার!” নিতাইয়ের উপর এবার খুব সদয় রমেনবাবু, “আমরা বোমটা নিয়ে যাচ্ছি, বোমস্কোয়াডের লোকজন ডাকতে হবে – তারা এসে পরীক্ষা-টরীক্ষা করে দেখবে’ক্ষণ| তুমি পুরো ব্যাপারটা চেপে যাবে – হ্যাঁ? নাহলে কিন্তু বহুত লাফড়া!”
আবার মাথা নাড়ে নিতাই|
“আর এই ছাই-টাই পড়ে আছে – এসব সব পরিষ্কার করে ফেলো এখন, গাছ-ফাছ যা আছে সমান সমান করে দাও| বলা যায় না কে কোত্থেকে কি দেখে ফেলে – আবার ঝামেলায় পড়ে যাবে|”
সে আর বলতে! নিতাইকে বোঝানোর দরকার ছিল না কোনো|
“আর যদি পড়ে লোকজন আসে – মানে, সরকারী লোকজন আরকি, ঐ সিআইডি, সিবিআই, এনআইএ – যেই হোক না কেন, একদম মুখ খুলবে না – কোনো কথার দরকার নেই, যদি আমি এসেও জিজ্ঞেস করি কিছু - তাহলেও না, বুঝলে?”
জোরে জোরে মাথা নাড়ায় নিতাই|
“বোমটোমের ব্যাপার! খুব ডেঞ্জারাস – খু-উ-ব ডেঞ্জারাস! একদুম মুখে তালা লাগিয়ে রাখবে|”
আর বোঝাতে হবে না নিতাইকে| ফাইন দিয়ে এখন খুব স্বস্তিবোধ হচ্ছে তার|
সনাতনকেও কিছু বোঝাতে হয়, “মন দিয়ে আমাদের পার্টিটা করো বুঝলে? বেকার বেকার বিরোধীদের সাথে মিশে সন্ত্রাসবাদ না করে - আমাদের পার্টি সব সময়ে মানুষের সাথে থাকে| মানুষকে নিয়ে না চললে, তুমি শিক্ষিত ছেলে – তোমাকে আর নতুন করে কি বোঝাবো! যা হওয়ার হয়ে গেছে – বড়বাবু মিটিয়ে নিয়েছেন| আর নতুন করে কোনো ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নেই – কেমন?”
এদিকেও মাথা নাড়তে হয় নিতাইকে|
বস্তা মুড়িয়ে চকচকে সোনালী রঙের গোলাটাকে নিতায়ের ক্ষেত থেকে উদ্ধার করলো ঘনশ্যাম আর মদন| খুবই বিপজ্জনক কাজ সন্দেহ নেই, তবে নিতাইয়ের মতো সাধারণ জনগনের স্বার্থেই হাসিমুখে এ বিপদ মেনে নিলো প্রশাসন আর সরকার| মাঠ আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরকারী গাড়ির পিছনের লাল আলোদুটো হারিয়ে গেলো খানিক পরে|
আন্দাজ রাত আড়াইটে হবে| যেখানে গোলাটা পড়েছিল, সেখান থেকে জ্বলা ছাই আর মাটি তুলে নিয়ে সারা ক্ষেতে ছড়িয়ে দিয়েছে নিতাই| দেবে যাওয়া জায়গাটা মাটি তুলে প্রায় সমান করে এনেছে| গোটা দুয়েক টমেটো, লঙ্কা আর বেগুনের চারাও পাশ থেকে তুলে এনে লাগানো হয়েছে – বোঝবার কোনো উপায় নেই যে এখানে খানিক আগে অব্দিও একটা বিপজ্জনক বস্তু অবস্থান করছিলো|
ডান কাতে শুতে হলো – বাঁ গালটা এখনো বেশ ব্যথা| ঘুম সেরকম ভালো হয় নি, ঘন্টাখানেক বাদে অনেক দূর থেকে ক্ষীন ‘ফট ফট’ কটা আওয়াজ শুনে কয়েকবার চমকে উঠেছিলো নিতাই, কিন্তু শব্দের উত্স কোনভাবে তার জমির ধারে-কাছে নয় বলে আবার চোখ বুঝে শুয়ে পড়েছিল সে|
গ্রামের জীবন পরের কটাদিন একটু চাঞ্চলকর, বিরোধীদের সন্ত্রাস দিনকে দিন মাত্রা ছাড়া হয়ে উঠেছে| সনাতন ঘরামীকে আর একজন পুলিশ কনস্টেবলকে কে বা কারা রাত্রিবেলায় পার্টি অফিসের পিছনের ঘরে গুলি করেছে, গ্রামের মানুষ তাদের জনদরদী প্রতিনিধিকে হারিয়েছে| থানায় হামলা হয়েছে, কে বা কারা যেন সারা থানা নিঃশব্দে আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে| রমেন মন্ডল আর এক কনস্টেবল সেই আগুনের লেলিহান শিখা থেকে রেহাই পায় নি, গ্রাম একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারকে হারিয়েছে| সবই বিরোধীদের চক্রান্ত|
এখন বাজারে নিতাইয়ের ক্ষেতের তরিতরকারির চাহিদা খুব, তাদের যেরকম আয়তন সেরকম স্বাদ| কে একজন পরীক্ষা করে দেখেছিলো তাতে সামান্য তেজস্ক্রিয়তা আছে, কিন্তু সেটা চমত্কার স্বাস্থ্যকর| বাতের ব্যথা থেকে ক্যান্সার সবকিছুতেই নাকি বেশ উপকারী|
নিতাই তার ফলনের গোপন রহস্য বলেনি কখনো|
সন্দেহ তো হচ্ছিলোই, কিন্তু মনস্থির করতে পারছিলেন না রমেনবাবু| রাতের ঘুম চটে গেছে, সে বিরক্তি তো ছিলই নিন্তু ঘনশ্যামের কথায় একটু ভরসা পেলেন তিনি – কেসটাকে অন্যভাবে সাজাতে হচ্ছে|
একটু দুরে নিতাই চক্রবর্তীকে বেদম ধমকাচ্ছে আরেকজন কনস্টেবল মদন সর্দার আর পঞ্চায়েত মেম্বার সনাতন ঘরামী|
“বোম বাঁধছ? হ্যাঁ? বোম?”
পঞ্চাননের কথায় কেঁপে কেঁপে উঠছে নিতাই, তার প্রায় হাতে পায়ে ধরবার অবস্থা! কাঁচুমাচু মুখে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছে সে|
“বি-শ্বা-স করুন, আমি কিছু জানি না! এ–এ কিভাবে কোত্থেকে এলো, সত্যি বলছি আমি জানিই না!”
“ন্যাকাষষ্ঠী! আমি জানি না!” ভেংচিয়ে উঠলো মদন, “পিঠে ডান্ডা পড়লে সব জেনে যাবে! আমি জানি না! বটে?”
“শোনো নিতাই,” মধ্যস্থতায় আসেন সনাতনবাবু “তুমি কিছু জানো না – মানলাম, কিন্তু গোলাটা যখন তোমার জমি থেকেই পাওয়া গেছে, তখন – কি আর বলি বলত? কি করে বিশ্বাস করি তোমায়?”
“সত্যি বলছি – আমি কিছুই জানি না – আপনি তো জানেন সনাতন’দা আমি কোনো সাতে-পাঁচে থাকি না, ঘুমুচ্ছিলাম| কি করে, কোত্থেকে যে এসব আপদ বালাই - বি-শ্বা-স করুন!”
“ওসব কল সব জানা আছে!” আবার ধরতাই দিলো মদন “নাকে তেল দিয়ে ঘুমুছিলে, সাতে-পাঁচে থাকো না!?”
“হ্যাঁ – সেই তো, মিটিং-ফিটিং, মিছিল-টিছিলে আসো না, কতবার তোমায় বলা হয়েছে| গ্রামের এক পাশে পড়ে থাকো, কিন্তু – আরে বাবা মানুষের সাথে না মিশলে, মানুষের পাশে না থাকলে, কি করে বলি বলত তোমার চরিত্র কেমন? তলে তলে বোমাবাজি করছ কিনা, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত আছ কিনা – এসব আমরা কি করে জানবো বলত?”
করুন চোখে সনাতনের দিকে তাকিয়ে থাকে নিতাই, মুখ দিয়ে কথা বেরুতে চায় না – ঘটনার আকস্মিকতায় আর পুলিশ-মেম্বারের সরকারী চাপে তার অবস্থা কাহিল|
“সনাতন’দা – আমি গরীব মানুষ, নিজের মতো চাষআবাদ নিয়ে থাকি, জানেনই তো?”
“ঐ তো বাবা! কলেজ পাশ করে চাষ করছ, ওটাই তো বেশি সন্দেহজনক, কেন আমাদের রাজ্যে এখন এতো উন্নয়ন, এখানে কি চাকরি-বাকরি নেই - হ্যাঁ?” সনাতনের সন্দেহ যায়না| “তোমাকে তো বলা হয়েছিল – হয়নি? ঐ কিছু ইয়ে টিয়ে হলে স্কুলের চাকরিটা – তা তো তোমার রুচলো না, তেজ দেখিয়ে এই বনবাদাড়ে জমি আঁকড়ে পড়লে! কি জানি বাবা যা দিনকাল – গোপনে গোপনে কি ধান্দা করছিলে ভগবান জানে|”
ঠিকরে ওঠে মদন - “কলেজ পাশ? বলেন কি সনাতন’দা? তাহলে তো মাল-মশলা সব জানে - হ্যাঁ! যা ধরেছি তাই! শিক্ষিত শয়তান – বোমের কারবার ফেঁদে বসেছে – কি সাংঘাতিক! এই এই - চল শালা, হুড়কো দিলে ঠিক স্বীকার করবে!” এবার একরকম টেনে হিঁচড়ে নিতাইকে আই.সি.র কাছে নিয়ে যায় সে|
রমেনবাবু আর ঘনশ্যামের শলাপরামর্শ প্রায় শেষ - একটা সিদ্ধান্তে আসা গেছে অবশেষে| এর মধ্যে ঘনশ্যাম তুবড়ে-মুচড়ে যাওয়া গোলাটা নেড়েচেড়ে দেখে নিয়েছে কিরকম ওজন হতে পারে – আয়তন অনুযায়ী ওজন সেরকম বেশি না| তবে এখনো গোলাটা বেশ গরম আর তা ছাড়া তার গায়ের দু-চারটে ফাটল থেকে কি একরকম চটচটে রস বেরিয়ে আসছে, তাই হাতে তুলে ওজন বোঝা গেলো না এখনো|
“যা আছে তাতে আর চাকরি করতে হবে না স্যার|” দাঁত বের করে হাসে ঘনশ্যাম|
“হ্যাঁ – ঐ আশায় থাকো, ওদিকে জানতে পারলে ভাগবাটোয়ারা কিরকম হবে বুঝতে পারছ?”
“কি দরকার জানানোর? এই তো আমরা তিনজন আর ওদিকে সনাতন মেম্বার – ব্যাস, চারজনের যা পড়বে তাই| কি বলেন? বেশি লোক জানাজানি হয় নি তো|”
“ঐ সনাতন ব্যাটাই পার্টির নাম করে আদ্দেক গাপ করবার তাল করবে – চিনিস না শালাকে?”
“একটু বুঝিয়ে বললে, মানে পার্টি-ফার্টি কি দরকার নিজের নিজের মতো একটু –“
“ছাড়ত! পার্টিকে কি দেবে সেতো জানিস ভালো মতো – চুপ কর, এদিকে আসছে|”
একরকম ঘসরাতে ঘসরাতে নিতাইকে নিয়ে আসছিলো মদন, পিছন পিছন সনাতন|
নিতাইকে দেখে হুঙ্কার দিলেন রমেনবাবু – “এসব কি? হ্যাঁ? কি হচ্ছে এসব?”
“আ-আমি কিছু জানি না, ঘুমোচ্ছিলাম! বোম পড়ার মতো আওয়াজ হলো, আর এসে দেখি –“
“চ্যাওপ!” রমেনবাবুর ধমকে সবাই চমকে উঠলো একসাথে| “বোম পড়ার মতো আওয়াজ হলো?”
“দেখলেন তো বোমের কথা স্বীকার করলো – আগে তো মানতেই চাচ্ছিলো না, শালা বহুত ঘাঘু!” মদন এবার ভরসা পেলো|
“না না – বলছিলাম যে ঘুমের মধ্যে বোমের মতো আওয়াজ পেয়ে -” নিতাই কথা শেষ করার আগেই তার গালে রমেনবাবুর চড় এসে পড়ল ফটাস করে|
“বোমের আওয়াজ চিনেছ খুব – তাই না?”
চড় খেয়ে নিতাই একটু টালুমালু মতো হয়ে গেলো, কিসের থেকে কি হচ্ছে বোঝবার ক্ষমতা হচ্ছে না এখন| সে ভ্যাবলার মতো সনাতনের দিকে তাকালো একবার|
“ভেরি ব্যাড! নিতাই – শিক্ষিত ছেলে, কথাবার্তা একটু ঠিক করে বলো| দিনকাল খুব বাজে, কে জানে বিরোধীপক্ষের সাথে যোগ দিয়ে তলে তলে সন্ত্রাসবাদ করছ কিনা! যদি ফেঁসে যাও আমারও কিন্তু কিছু করবার ক্ষমতা থাকবে না|” সনাতন ভরসা দিতে পারে না সেরকম|
“এই মদনা – তোল তো শালাকে! গাড়িতে তোল – থানায় নিয়ে গিয়ে একটু পালিশ করলেই সব বেরিয়ে পড়বে|” ব্যস্ত হয়ে পড়েন রমেন বাবু|
এবারে রমেনবাবুর পায়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিতাই| মুখে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায় না, রমেনবাবুর পায়ের উপর পড়ে ডুকরে কাঁদতে থাকে সে|
“এই এই এই – ছাড়! ছাড় ব্যাটা! ইকিরে! মেয়েছেলের মতো কাঁদতে লেগেছে শালা|”
নিতাইয়ের হাবভাব দেখে মজা পায় কনস্টেবল ঘনশ্যাম আর মদন| সনাতন মুখে একটু তেলতেলে মানবদরদী ভাব ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার নজর পাশে পড়ে থাকা গোলাটার দিকে|
“আহা! বেচারী বড্ড ভয় পেয়েছে|” গলা করুন হয়ে আসে সনাতনের “ও নিতাই – শোনো শোনো – ছাড়ো দিখি! ওঠো|”
নিতাইয়ের রমেনবাবুর পা ছাড়বার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না|
“ন্যাকাষষ্ঠী!” ভেঙচি কেটে বলে মদন|
“ওঠ হতভাগা!” আবার রমেনবাবুর গর্জন শোনা যায়|
একটু কেঁপে উঠে এবার মাটিতে কুজো হয়ে বসে নিতাই|
“শোনো নিতাই|” বুঝিয়ে বলে সনাতন, “বুঝতেই তো পারছ – বোমবাজির ঘটনা, কেস-কাবাডি থানা-পুলিশের ব্যাপার! একটু মাথা ঠান্ডা করো, আলাপ আলোচনা করে দেখা যাক কিছু করা যায় কি না – হাজার হোক তুমি আমাদের গ্রামের ছেলে বলে কথা| তোমার জমিতে বোম পাওয়া গেছে – এতো আমাদের পঞ্চায়েতের লজ্জা!” ঘনশ্যামের ডেকে ফেরে সনাতন “এই কনস্টেবল ভাই – শোনো তো, দেখো কিছু করা যায় কি না!”
ঘনশ্যাম এবার এক হ্যাঁচকায় নিতাইকে নিজের পায়ে দাঁড় করায়| “শোন – চল, পাশে চল|” নিতাই যন্ত্রের মতো ঘনশ্যামের সাথে একটু দুরে চলে যায়|
“জিনিসটা খাঁটি?” ঘনশ্যামেরা দুরে চলে যেতে নিচু গলায় রমেনবাবুকে জিজ্ঞাস করে সনাতন| পাশে মদন উত্কর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে|
“মনে তো হচ্ছে তাই!”
“মানে পিতল-টিতল নয় তো? মাধ্যমিকে পড়েছেন তো ‘চক চক করিলেই সোনা হয় না’ – হে হে|”
“কি করে বলি বলুন তো! আমি কি স্যাকরা? টেস্ট না করলে ঠিকঠাক বোঝা যাবে না|”
“লক্ষ্মন কর্মকার রাতবিরেত চোরাই সোনা গলায়, ওর ওখানে নিয়ে গেলে -” মদন বলে|
“এই না না! ও কম্মো একদম না! খবর ছড়িয়ে যাবে চারিদিকে| যা করবার সব গোপনে গোপনে করতে হবে!” হাঁ হা করে ওঠে সনাতন – “যদি বলেন তো আমার চেনা স্যাকরা আছে গঞ্জে – কাল-পরশু তার ওখানে নিয়ে যাবো’ক্ষণ, তদ্দিন থাক না আমার জিম্মায় – কি আছে? কাকপক্ষীতেও টের পাবে না|”
সনাতনের দিকে সরু চোখে তাকান রমেনবাবু| “হুম! কিন্তু হচ্ছে – সরকারী ব্যাপার তো – বুঝতে পারছেন, এটা থানার ভল্টে জমা রাখা উচিত|”
তাদের কথাবার্তার মাঝে ঘনশ্যাম আর নিতাই ফিরে আসে| নিতাইয়ের চেহারায় এবার একটু আত্মবিশ্বাস দেখা যায়|
“স্যার|” ঘনশ্যাম বলে, “নিতাইকে বুঝিয়ে বলেছি – শিক্ষিত ছেলে তো, ঠিক বুঝতে পেরেছে|”
“পেয়েছিস?”
“না – এখন কোথায়? বাড়ি থেকে এনে দিচ্ছে!” মদনের দিকে তাকায় ঘনশ্যাম, “মদনা, যাতো ওর সাথে|”
“হ্যাঁ - সেতো! ডিউটি আমার একার নাকি? আমি এসে অব্দি ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আর তুমি খালি দাড়িয়ে দাড়িয়ে –“
“আরে যা না হতচ্ছাড়া! তোদের জন্যে আর কত দেরি করবো, সনাতনবাবুও তখন থেকে – যা যা|” অধৈর্য্য হয়ে যান রমেন বাবু| সনাতন মদনের কথায় ভারী মজা পায়|
একটু বিরক্ত হয়েই নিতাইয়ের সাথে নিতাইয়ের বাড়ির দিকে এগোয় মদন| “এই চল|”
“আপনার দাবড়া খেয়েই ঘেঁটে গেছে শালা – হে হে, এক কথায় টাকা দিতে রাজি|” খোশামুদির গলায় বলে ঘনশ্যাম|
নিজের কৃতিত্ব নিয়ে মাথাব্যথা নেই রমেনবাবুর| তাই ঘনশ্যামের কথায় কোনো পাত্তা দেন না তিনি| তার এখন দুশ্চিন্তা গোলাটার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে| সনাতন এখনো পার্টির কথা তোলেনি দেখেও তেমন নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না তিনি|
“যাকগে – যে কথা হচ্ছিলো –“ সনাতনের দিকে তাকান রমেনবাবু|
“হ্যাঁ, এদিক ওদিক না করে চলুন পার্টি অফিসে বসে গোলাটা কেটে কুটে ভাগবাটোয়ারা করে নিই, তার পরে যার যার মতো এদিক ওদিক থেকে গলিয়ে দেখে নিলেই হবে – কিরকম?” ভালো বুদ্ধি দেয় সনাতন|
বুদ্ধিটা মনে ধরে সবাইয়ের, পার্টি অফিস রাতের বেলায় নিরিবিলি| “কিন্তু এখন করাত-ফরাত পাবেন কোত্থেকে?”
“সব ব্যবস্থা আছে আমাদের পার্টি অফিসে, ভাববেন না| গতবার ইলেকশনে বিরোধীপক্ষের সন্ত্রাসবাদী হামলার মোকাবিলা করতে আমাদের ছেলেরাও একটু – হে হে – জানেনই তো সব| তাদের যন্ত্রপাতি পিছনের ঘরে পড়ে আছে এখনো|”
“বেশ বেশ তাহলে তো চিন্তার কিছু নেই – সেই ভালো| ফালতু নিজেদের মধ্যে সন্দেহ না রেখে, ঐ করলেই হবে|” নিশ্চিন্ত হন রমেনবাবু|
“ঠিক – তাহলে পার্টি ফান্ডের জন্যে আদ্ধেকটা রেখে বাকিটা নিজেদের মতো করে – কি বলেন?” এইবার আসল কথায় এলো সনাতন|
“পার্টিকে এরমধ্যে জড়ানোর কি দরকার সনাতনবাবু? যা হচ্ছিলো, পুরোটা নিজেদের মধ্যেই রাখলে হত না?” তেতো গেলা গলায় বলেন রমেনবাবু|
“ছি ছি – পার্টি বাদ দিয়ে হয় কিছু? আমরা জনপ্রতিনিধি, আমাদের সব কিছুই তো পার্টির জন্যে| কেবল নিজেদের কথা ভাবলে চলে না আমাদের|”
“আচ্ছা – তাই যদি বলেন তবে আমাদেরও কিন্তু মাথার উপরে অনেকে আছেন| যা কিছু হয় সব এস.ডি.পি.ও., কমিশনার - রাজধানী অব্দি চারিয়ে দিতে হয়| একলা খেলে হয় বলুন?”
“আরে – ওদিক যাওয়ার কি দরকার? ওদিকে তো এমনিই সারা বছর নজরানা যাচ্ছে| আমাদের মহান নেতাই তো পুলিশমন্ত্রী|”
“তাহলে পার্টি ফান্ড নিয়ে ভেবেও কি লাভটা আছে? নিজেরটা বুঝে নিন না!”
প্রশাসনিক আলাপ আলোচনায় খুব মজা পাচ্ছিলো ঘনশ্যাম, মদন আর নিতাইয়ের পাত্তা নেই এখনো – কিন্তু মশাও কামড়াচ্ছে খুব| এর মাঝে একবার গিয়ে দেখে এলো গোলাটা এখনো বেশ ভালই গরম|
তিনভাগের একভাগ একভাগ আই.সি. আর মেম্বার, বাকিটার অর্ধেক অর্ধেক দুই কনস্টেবলের – এই জায়গায় আলোচনা শেষ হতেই হতেই মদন আর নিতাই চলে এলো| নিতাইয়ের হাতে একটা বস্তা দেখে খুব খুশি হলো ঘনশ্যাম| ব্যাটা এইট পাশ হলে কি হয়, বুদ্ধি খুব|
“পেয়েছিস?” মদনকে জিজ্ঞাস করলেন রমেনবাবু|
“পুরো হলো না – কুড়িয়ে-কাচিয়ে সাড়ে-চারশো-টারশো মতো হয়েছে|”
“কি আর করা যাবে! চল তাই হোক, ফালতু ঝামেলার জন্যে সরকারী গাড়ির তেল পুড়িয়ে - তেলের টাকাটাতো উঠুক| যত্তসব|” মদনের হাতে ধরা একশো, পঞ্চাশ আর দশ-কুড়ি টাকার নোটগুলোর দিকে তাকিয়ে বলেন রমেনবাবু|
সনাতন এবার নিতাইয়ের দিকে তাকায়, “শোনো এবারের মতো বড়বাবু তোমায় সামান্য কিছু ফাইন নিয়ে ছেড়ে দিলেন – বুঝলে? ফের যদি এরকম কিছু হয়, তবে কিন্তু আর কিছু করা যাবে না – ঠিক আছে?”
মাথা নাড়ায় নিতাই, খুব বুঝেছে সে|
“শোনো – এসব খুব জটিল ব্যাপার!” নিতাইয়ের উপর এবার খুব সদয় রমেনবাবু, “আমরা বোমটা নিয়ে যাচ্ছি, বোমস্কোয়াডের লোকজন ডাকতে হবে – তারা এসে পরীক্ষা-টরীক্ষা করে দেখবে’ক্ষণ| তুমি পুরো ব্যাপারটা চেপে যাবে – হ্যাঁ? নাহলে কিন্তু বহুত লাফড়া!”
আবার মাথা নাড়ে নিতাই|
“আর এই ছাই-টাই পড়ে আছে – এসব সব পরিষ্কার করে ফেলো এখন, গাছ-ফাছ যা আছে সমান সমান করে দাও| বলা যায় না কে কোত্থেকে কি দেখে ফেলে – আবার ঝামেলায় পড়ে যাবে|”
সে আর বলতে! নিতাইকে বোঝানোর দরকার ছিল না কোনো|
“আর যদি পড়ে লোকজন আসে – মানে, সরকারী লোকজন আরকি, ঐ সিআইডি, সিবিআই, এনআইএ – যেই হোক না কেন, একদম মুখ খুলবে না – কোনো কথার দরকার নেই, যদি আমি এসেও জিজ্ঞেস করি কিছু - তাহলেও না, বুঝলে?”
জোরে জোরে মাথা নাড়ায় নিতাই|
“বোমটোমের ব্যাপার! খুব ডেঞ্জারাস – খু-উ-ব ডেঞ্জারাস! একদুম মুখে তালা লাগিয়ে রাখবে|”
আর বোঝাতে হবে না নিতাইকে| ফাইন দিয়ে এখন খুব স্বস্তিবোধ হচ্ছে তার|
সনাতনকেও কিছু বোঝাতে হয়, “মন দিয়ে আমাদের পার্টিটা করো বুঝলে? বেকার বেকার বিরোধীদের সাথে মিশে সন্ত্রাসবাদ না করে - আমাদের পার্টি সব সময়ে মানুষের সাথে থাকে| মানুষকে নিয়ে না চললে, তুমি শিক্ষিত ছেলে – তোমাকে আর নতুন করে কি বোঝাবো! যা হওয়ার হয়ে গেছে – বড়বাবু মিটিয়ে নিয়েছেন| আর নতুন করে কোনো ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নেই – কেমন?”
এদিকেও মাথা নাড়তে হয় নিতাইকে|
বস্তা মুড়িয়ে চকচকে সোনালী রঙের গোলাটাকে নিতায়ের ক্ষেত থেকে উদ্ধার করলো ঘনশ্যাম আর মদন| খুবই বিপজ্জনক কাজ সন্দেহ নেই, তবে নিতাইয়ের মতো সাধারণ জনগনের স্বার্থেই হাসিমুখে এ বিপদ মেনে নিলো প্রশাসন আর সরকার| মাঠ আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরকারী গাড়ির পিছনের লাল আলোদুটো হারিয়ে গেলো খানিক পরে|
আন্দাজ রাত আড়াইটে হবে| যেখানে গোলাটা পড়েছিল, সেখান থেকে জ্বলা ছাই আর মাটি তুলে নিয়ে সারা ক্ষেতে ছড়িয়ে দিয়েছে নিতাই| দেবে যাওয়া জায়গাটা মাটি তুলে প্রায় সমান করে এনেছে| গোটা দুয়েক টমেটো, লঙ্কা আর বেগুনের চারাও পাশ থেকে তুলে এনে লাগানো হয়েছে – বোঝবার কোনো উপায় নেই যে এখানে খানিক আগে অব্দিও একটা বিপজ্জনক বস্তু অবস্থান করছিলো|
ডান কাতে শুতে হলো – বাঁ গালটা এখনো বেশ ব্যথা| ঘুম সেরকম ভালো হয় নি, ঘন্টাখানেক বাদে অনেক দূর থেকে ক্ষীন ‘ফট ফট’ কটা আওয়াজ শুনে কয়েকবার চমকে উঠেছিলো নিতাই, কিন্তু শব্দের উত্স কোনভাবে তার জমির ধারে-কাছে নয় বলে আবার চোখ বুঝে শুয়ে পড়েছিল সে|
গ্রামের জীবন পরের কটাদিন একটু চাঞ্চলকর, বিরোধীদের সন্ত্রাস দিনকে দিন মাত্রা ছাড়া হয়ে উঠেছে| সনাতন ঘরামীকে আর একজন পুলিশ কনস্টেবলকে কে বা কারা রাত্রিবেলায় পার্টি অফিসের পিছনের ঘরে গুলি করেছে, গ্রামের মানুষ তাদের জনদরদী প্রতিনিধিকে হারিয়েছে| থানায় হামলা হয়েছে, কে বা কারা যেন সারা থানা নিঃশব্দে আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে| রমেন মন্ডল আর এক কনস্টেবল সেই আগুনের লেলিহান শিখা থেকে রেহাই পায় নি, গ্রাম একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারকে হারিয়েছে| সবই বিরোধীদের চক্রান্ত|
এখন বাজারে নিতাইয়ের ক্ষেতের তরিতরকারির চাহিদা খুব, তাদের যেরকম আয়তন সেরকম স্বাদ| কে একজন পরীক্ষা করে দেখেছিলো তাতে সামান্য তেজস্ক্রিয়তা আছে, কিন্তু সেটা চমত্কার স্বাস্থ্যকর| বাতের ব্যথা থেকে ক্যান্সার সবকিছুতেই নাকি বেশ উপকারী|
নিতাই তার ফলনের গোপন রহস্য বলেনি কখনো|
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন