সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভৌত-দৈব-সামাজিক আখ্যান

'উরে ব্বাপরে' বলে বড় বউ দরজা ধাক্কিয়ে এক লাফে ঠাকুর ঘরের বাইরে ছিটকে চলে এলো!


---


বেশ কমাস আগে …


মেজবৌ বাপের বাড়ি থেকে ফেরবার পর যেমন যেনো চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। কারুর সাথে কথা বার্তা নেই, সংসারের কাজে মন নেই, এমনকি ভাদ্রবৌ বা দেওর বৌদের সাথেও কোনো ঝগড়া ঝাটি নেই!


তার বেশ কমাস পর …


সেজবৌ মেলা থেকে ফেরবার পর সেও কেমন চুপচাপ হয়ে গেলো। মেজবৌদির মতই


তার বেশ কদিন পর ছোটবৌ ও


সেও তার বন্ধু বান্ধবীদের সাথে দীঘা বেড়াতে গিয়েছিলো - সত্যি বলতে তাকে তার বন্ধুরা এতই ভালোবাসতো যে তাকে কোনো খরচই করতে হয় নি, বরং ফেরবার পর বন্ধুরা তাকে বরং কিছুটা হাতখরচ ও দিয়েছিল, কিন্তু …



দীঘা থেকে ফেরবার পর ছোট বউয়েরও কেমন পরিবর্তন হয়ে গেলো, সেও মেজ আর সেজো বউয়ের মত চুপচাপ হয়ে গেলো!


---


বড় বউ সব দেখে, কিন্তু তার বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। 


কিন্তু …


---


এক পূর্ণিমায় মেজ ছেলে আর তার বউ বাড়ির লাফ দিয়ে পাঁচিল টপকে পালালো! কি তাদের রূপ! কান দুটো খাঁড়া খাঁড়া হয়ে আছে, যতদূর দেখা যায় সারা গায়ে লোম আর চোখগুলো যেনো আগুনের গোলা!


ছোট বউয়ের কজন বন্ধু এলো। আগে ছোট ভাই এসব মেলামেশায় কিছুটা আপত্তি করতো, কিন্তু এবার সেও যেনো অনেক আগ্রহী! বউয়ের বন্ধুদের তাদের ঘরে সাদরে আমন্ত্রণ জানালো। তার কিছু বাদে কি হাসি কি চিৎকার, আর তারপর সব চুপ! তার কিছু বাদে ছোট বউ আর দেওরের চাপা হাসি - বন্ধুরা সব একে একে বেরিয়ে গেলো, সবাই কেমন শান্ত, কেবল তাদের গলার পাশে দুটো দুটো করে কামড়ানোর দাগ।


তাছাড়া আর কোনো কিছু নেই।


দেখলো বড়বৌ, কপালে হাত দিয়ে ঠাকুরকে ডাকতে থাকে সে।


আর দেখলো পাঁচিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেজ দেওর আর বউ - তাদের মুখে কোনো কথাটি নেই, চোখের দৃষ্টি শূন্য, সারা গায়ের চামড়া মাংস যেনো খসে খসে পড়ছে - বড়ো বউকে দেখে দুজনেই বাতাসে কিসের গন্ধ শুঁকে, গলার ভিতর কেমন জান্তব আওয়াজ করে উঠলো।


মনে মনে ঠাকুরকে ডেকে ঘরের ভিতর পালালো বড়ো বউ।


তার পর ঘরের জানালা দিয়ে দেখলো, ক্লান্ত বিদ্ধস্ত অবস্থায় মেজ দেওর আর তার বউ ফিরে এলো, স্বাভাবিক চেহারা, জামা কাপড় শতচ্ছিন্ন, ঠোঁটে রক্ত, কিন্তু মুখে তৃপ্তির হাসি।


---


সবার বড়ো দাদা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা আর প্রকাশনা নিয়েই থাকেন, সংসারের কোনো ব্যাপারেই মাথা ঘামান না, কাজেই পরিবারের সবার ভালো মন্দের বিবেচনা স্বাভাবিক ভাবে বড়বোয়ের ঘাড়েই।


এই পরিস্থিতিতে কি করবেন না করবেন কিছুই ভাবতে না পেরে তিনি ঠাকুর ঘরে এসে হত্যা দিয়ে পড়েন।


ঠাকুরের পায়ে মাথা ঠকবার মাঝেই তিনি দেখেন সেজো আর ছোটর পরিবার গুটি গুটি ঠাকুর ঘরের দরজার সামনে চলে এসে দুজন ভাবলেশহীন মুখে আর বাকি দুজন চকচকে চোখে তাকে দেখছে - কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে  তারা ঠাকুর ঘরের চৌকাঠ পের হতে ইতস্তত করছে।


তাদের কাঁধের উপর দিয়ে দেখা গেলো যে মেজ দেওর আর তার বউ দুজনে বারান্দায় টাঙানো ক্যালেন্ডার দেখে পরে কবে পূর্ণিমা সেই নিয়ে নিজেদের ভিতর গুনগুন করে আলোচনা করছে, বড়ো বউ বা সেজো এবং ছোট দেওর বা তাদের বৌদের অস্তিত্বে নিয়ে তাদের কোনোই আগ্রহ নেই যেনো!


ঠাকুরের পায়ে মাথা কোটবার আগে বড়ো বউ সাবধানে ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।


আর তার আধ ঘণ্টা পরেই …


---


সংসারের সমস্ত জটিলতা থেকে মুক্ত দুটি ফুটফুটে শিশু, মেজোর পাঁচ বছর বয়সি ছেলে আর সেজোর ন বছর বয়সী মেয়ে ঠাকুর ঘরের ছাদে তাদের বাপমায়ের মোবাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিল। ছেলেটি ইউটিউবে কার্টুন দেখছিল আর মেয়েটি ফ্লিপকার্ট।


বড়ো জেঠিমার চিৎকার শুনে তারা হকচকিয়ে  ছাদের কার্নিশ থেকে নিচে উঁকি মারলো, তাদের অন্য কাকা জ্যেঠাও হতচকিত!


"রক্কে করো রঘুবীর!" বড়ো বউ আবার চিক্কুর দিল, "এ আবার কোন আপদ এসে উপস্থিত হলো!"


শিশুরা বড়ই অবোধ, এ পঙ্কিল সমাজ, পারিবারিক প্যাঁচ পয়জার থেকে তারা মুক্ত, সুতরাং তারা শিশুসুলভ কৌতূহলে, মোবাইল ইত্যাদি বন্ধ করে, সরসর করে কার্নিশ বেয়ে না জানি কি নতুন আপদ - যেটি তাদের ঠাকুর ঘরে এসে উপদ্রব করছে, তাকে দেখতে চলে এলো।


এবং …


তাদের কাকা জ্যেঠারা সমস্ত কৌতহলের উর্ধে থাকলেও, দুটি শিশু, মেজর ছেলে আর সেজর মেয়ে, তাদের বউ জেঠিমার পিছন থেকে তাদের ঠাকুর ঘরের ভিতর যে নতুন মূর্ত্তি টিকে  দেখতে পেল, তাকে দেখে তারা যতটা আশ্চর্য হলো, আমোদ পেল তার থেকেও অনেক বেশি!


তাদের ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে একটি অদ্ভুত মূর্ত্তি জাজ্বল্যমান! তার শরীরের উপরের অংশ মেজর ছেলের মোবাইল সামান্য আগে দেখা নন্তে ফন্টে কার্টুনের কেলটুদার মতো, আর কোমরের নিচে থেকে সেজোর মেয়ের খানিক আগে দেখা ফ্লিপকার্ট এর মডেলের একটা প্রিন্সেস ড্রেস পরা। মূর্ত্তি এক পা বাঁকিয়ে ডান হাত বরাভয়ের মতো উঁচু করে আছে, আর তার বুকের কাছে ইউটিউবের বাফারিংয়ের চক্র ঘুরছে। মূর্তির মুখে বেশ সদানন্দ, কিন্তু যথেষ্ট বোকা বোকা একটা হাসি লেগে আছে।


বড়ো জ্যেঠি হতভম্ব, অন্যেরা হতচকিত, কিন্তু নিষ্পাপ ফুলের মতো শিশুদুটি এই নতুন মূর্তির আবির্ভাবে যথেষ্ট আহ্লাদিত হল। তাদের সংসারে বিনোদন বলতে মোবাইল বাদে বাকি কাকিমা জেঠিমার ঝোগ্রা ঝাটি - কিন্তু তারও অভাব বেশ কিছুদিন ধরে অনুভূত হচ্ছে - সুতরাং এই নতুন আপদের উপস্থিতিতে তারা উত্তেজিত হিয়ে উঠলো!


---


ইতস্তত করে নবাগত ঠাকুর ঘরের চৌকাঠ পেরোতেই সেজো আর ছোট দেওর এবং তাদের অর্ধাঙ্গিনী রা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে তার দিকে এক নিমেষে ধেয়ে এলো।


ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক,  ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক করে চারখানি কামড় পড়তেই ছেলেমেয়ে দুটিকে আশ্চর্য করে মূর্ত্তি টি "ইউল্লুস! ইয়াহুই!! ব্বাপস!!!" বলে কার্টুনের কেলটু দার মতই জব্বর কিন্তু মিহি একটা হাঁকার ছাড়লো, আর তারপর সর্বশক্তি বলে কিভাবে যেনো আকাশের দিকে উড়ে যেতে চাইলো।


মেজর ছেলে "কি মজা কি মজা!" বলে সোল্লাসে হাত তালি দিয়ে নাচতে লাগলেও সেজো র মেজ বুদ্ধিবকরে তার হাতের মোবাইলের ভিডিও ক্যামেরা অন করলো। এই অসাধারণ দৃশ্য পরে তার বন্ধুবান্ধবদের দেখিয়ে সাবাসি নেওয়ার কোনো সুযোগই সে ছাড়বে না।


পূর্ণিমা নয়, কিন্তু তাও আকাশে চাঁদ বেশ বড়সড়, তার আলোয় মোবাইলে ছবিও উঠছে বেশ ভালই, ক্যামেরায় দেখা গেলো সেজো ভাই আর তার বউও আবার বিকট মূর্ত্তি ধরে তাদের ভাই আর ভাই বউয়ের মতই লাফ ঝাঁপ দিয়ে আকাশে উদ্দীয়মান সেই অদ্ভুত মূর্তির প্রিন্সেস ড্রেস পরা দুই পা কামড়ে ধরলো শেষে।


যতক্ষণ দেখা যায় সেজো র মেয়ে ভিডিও রেকর্ড করতে থাকলো, যতক্ষণ না হাফ কেল্টু, হাফ প্রিন্সেস মূর্তির তাদের বাবা, মা, কাকা, কাকিমা, জ্যাঠা, জ্যেঠিমাদের তার কাঁধে, গায়ে, পায়ে কামড়িয়ে ঝুলতে থাকা অবস্থায় মহাশূন্যে বিলীন হতে যায়।


ভিডিওয় আসবে না, কিন্তু বেশ অনেক্ষণ যাবত কর্তুনোচিত হাহাকার শোনা গেলো আকাশ থেকে।


---


বড়ো বউ ঘটনার আকস্মিকতায় প্রায় অজ্ঞান, তিনি বারান্দায় পড়ে আছেন। শিশু দুটি এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে।


কেবল বরোজন তার ঘর থেকে সব কিছু দেখে শুনে একবার লম্বা নিশ্বাস ফেলে তার ডেস্কটপ টি চালু করলেন - বেনামে, স্বনামে আর ছদ্মনামে এইবার সমাজ সংসারের অনুকুলতা আর প্রতিকূলতা নিয়ে তার লিটল ম্যাগাজিনের আগামী সংখ্যাগুলোর জন্যে কুড়ি বাইশ পাতার খান পাঁচেক উপন্যাস লিখতে শুরু করবেন এবার।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমার পড়া প্রথম ইন্দ্রজাল কমিকস

আমি অনেক ছোটবেলায় লিখতে পড়তে শিখি - যখন আমার চার-পাঁচ বছর বয়স সে সময়ে আমি নিজের চেষ্টা আর ইচ্ছেতেই একাএকাই আমার পরিচিত শিশুপাঠ্য বইপত্তর পড়তে পারতাম এবং সবথেকে বড় কথা হলো ব্যাট-বলের বদলে সেই বই গুলিই আমার কাছে অনেক প্রিয় ছিল| বাবা'র বদলি'র চাকরি ছিল, কাজেই ছ'বছর বয়সে যখন আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই, থিতু হওয়ার প্রয়োজনে আমি আর আমার মা তখন আমাদের এই শহরেই পাকাপাকি ভাবে বাস করতে শুরু করি| বাবা থাকতেন দুরে - বিহারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাঁধ-বাঁধা'র দায়িত্বে| বাড়ি ফিরতেন পনেরো দিনে বা মাসে একবার করে| অন্যান্য শিশুদের মতন আমার বাবা ফেরার সময়ে কোনো উপহারের চাহিদা থাকতো না - বাবা নিজে যে সশরীরে আমাদের কাছে আসছেন - সেটারই গুরুত্ব ছিল সবথেকে বেশি|

উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্য পুরস্কার

একটু নয়, প্রচুর দেরি করেই – ইয়ে কি বলে আবার একটু ঢাক পেটাপিটি করি| তবে সেদিক থেকে ধরতে গেলে ভবিষ্যতে আমার ডিজে হওয়ার রাস্তাও খুলছে হয়তো পরোক্ষ ভাবে| আসল সাফাই হলো ‘আমার মতো’ যারা কাজ করেন, তারা হয়তো উপলব্ধি করেছেন যে এপ্রিল মে থেকে কাজের স্বাভাবিক চাপ শুরু হয় আর তা বাদে যেহেতু ব্যক্তিগত ভাবে আমার পুরস্কার-টুরস্কার পাওয়ার সেরকম অভ্যাস নেই, সেই দিক থেকে - তবে ঘটনা, একবছরে পরপর দুবার পুরস্কার প্রাপ্তি আর তার সাথে ইদানীন গপ্পো লেখারও ঝোঁক বেড়েছে খানিক, কাজেই সবে মিলে ... যাকগে! জ্ঞানীগুনী যারাই আছেন তাদের কাছে ব্যাখ্যা করার দরকার না হলেও, সাধারণ মানুষ হয়তো কৌতুহলী হবেন যে এই উত্তরাধিকার ওয়েব সাহিত্যের ব্যাপারটা কি! দেখুন, মানুষ একটি অদ্ভুত জন্তু – সেভাবে বলতে গেলে এদের রাম-টু-রম রেশিও অন্যান্য জন্তুর তুলনায় অনেক বেশি মানে একোয়ারড মেমরির থেকে প্রিন্টেড মেমরি অনেক কম| জীবন বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা খুবই কম, তাও আমার সেকেন্ডারি ব্রেন, মানে ইন্টারনেট থেকে যা জানা, মানব মস্তিষ্কের ডানদিক আমাদের সাথে বেজায় মজার মজার খেলা খেলে! কল্পনা, সৃজনশীলতা – এগুলি অন্য জন্তুদের ভিতর সেভাবে প্রকট কি? হয়ত...

জাতিস্বর

জাতিস্বর দেখলাম - আশ্চর্যের বিষয় যে স্কিপ করে করে না দেখে একটানা প্রথম থেকে শেষ অব্দি দেখলাম|