“ছাড় ছাড়! ছেড়ে দে বলছি! খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু – আমাকে চিনিস না তুই!”
“নাম বল – নাম কি তোর?”
“নাম জেনে কি করবি? পুলিশকে বলবি? ছাড় আগে।”
“নাম বল।”
“ছাড়বি কিনা বল – এবার কিন্তু …” গা মুচড়িয়ে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে কমবয়সী ছেলেটি, কিন্তু আগেরবারের মতই পিঠের পিছনে মুচড়ে থাকা বাঁ-হাতে চাপ আরও প্রবল হয়। কাঁধের পেশির ভিতর থেকে একটা কচকচে শব্দ হতে থাকে।
“আ-আ-আ” করুন স্বরে কাতরিয়ে ওঠে ছেলেটি। “ছেড়ে দাও – কিছু করবো না, মাইরি বলছি।”
“নাম বল” – ছেলেটাকে প্যাঁচে ফেলে দেওয়া লোকটির গলার স্বরে কোনো বিকার নেই।
কিছু না বলে ছেলেটি নিথর ভাবে পড়ে থাকে, নিশ্বাসের সাথে গালে ধুলো ঢুকছে। কাশি পেলেও সেটাকে সামলে নেয় সে। বাঁ-হাতটা আস্তে আস্তে অবশ হয়ে আসছে। আধ-অন্ধকারে তার থেকে একটু দুরে মাটিতে পড়ে থাকা আরেকটা শরীর দেখতে পায় সে। অদ্ভুত ভাবে নেতিয়ে পড়ে আছে – জগাই। পাশেই তার নজরের বাইরে কোথাও আরেক স্যাঙ্গাত মদন পড়ে আছে মনে হয়। জগাইয়ের পড়ে থাকার ভঙ্গিটা ভালো না। যন্ত্রনায় চোখ ফেটে জল বেরুচ্ছে। চোখের জলে নজর ঝাপসা হয়ে যেতে যেতেও জগাইকে দেখে তার মনে বাঁচবার তাগিদ চলে এলো।
শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে প্রবল ঝাঁকি দিয়ে পিঠের উপর থেকে লোকটাকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলো সে।
ঝাঁকিটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ খট করে একটা আওয়াজ হলো তার বাঁ-কাঁধে আর তার সাথে সাথেই প্রবল যন্ত্রণা তার কাঁধ বেয়ে বাঁ-হাত, ঘাড়, শিরদাঁড়া, কোমরে ছড়িয়ে পড়ল।
“আ-ই-ই-ই! ভেঙ্গে গেলো!” চিত্কার করে কেঁদে ফেললো ছেলেটি। তারপর গলা ছেড়ে অশ্রাব্য গালাগাল করতে শুরু করলো সে। যদিও তার চিত্কার ঘোষেদের বাগানের এই শুনশান জঙ্গল আর তার ভিতর দিয়ে চলে যাওয়া শুঁড়িপথের বাইরে বেরুনোর কোনো রাস্তা পেলো না।
খানিকটা সময় নিলো লোকটা। “নাম বল।” আগের মতই নির্বিকার স্বরে আওয়াজ এলো।
এবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো ছেলেটা। “ছেড়ে দিন – আর কখনো করবো না।”
এরপর সে টের পেলো যে তার ডান হাতের কব্জিতে লোকটার আঙ্গুলের চাপ বাড়ছে।
“মা কালির দিব্যি – ক্ষমা করে দিন, ভুল করে ফেলেছি।” প্রবল আতঙ্কের সঙ্গে বললো ছেলেটা।
“নামটাতো বলবি – নাকি? নিজের নাম বলতে এতো লজ্জা পাচ্ছিস কেন?” এমন হালকা স্বরে বললো লোকটা যেন কিছুই হয় নি।
“নিতাই” ইতস্তত করে বললো ছেলেটা।
“এ হাতটাও ভাঙ্গতে চাস নাকি?”
“না না না! নন্দ নন্দ!” ঠিক নাম বলবার সাথে সাথেই কব্জির মোচড় অনেকটা কমে এলো। “এবার ছেড়ে দিন। যে দিব্যি করতে বলেন – সত্যি বলছি আর কোনদিন এরকম করবো না।”
হঠাৎ তার মাথার পিছনে - বাঁদিক থেকে একটা খসখস শব্দ শোনা গেলো। মদন?
ভাবতে না ভাবতেই সে বুঝলো যে তার বাঁহাতের কব্জি থেকে আঙ্গুলের চাপটা চলে গেছে আর পিঠের উপর লোকটার ভার নেই আর!
‘এই সুযোগ! পালাতে হবে এবার!’ কিন্তু ডানদিকে গড়িয়ে সোজা হতে যেতেই ‘ধপাস’ করে একটা আওয়াজ আর তার সাথে সাথেই মদনের আর্তনাদ শোনা গেলো। লোকটার ক্ষিপ্রতা দেখে আরেকবার চমকে গেলো সে। পালানোর চেষ্টা করে লাভ নেই বুঝে চিত্ হয়ে শুয়ে হাঁফাতে লাগলো।
মদন একবার আর্তনাদ করে উঠেই থেমে গিয়েছিলো – বোঝা গেলো ও আগেরবার জ্ঞান হারানোর ভান করে সুযোগের অপেক্ষা করছিলো, কিন্তু এবারের অজ্ঞান হওয়াটা অভিনয় নয়। ডানহাতের কব্জিতে ব্যথা, কিন্তু বাঁহাতের উপর নন্দ’র এখন আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ডানহাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কোনরকমে দুচোখ মুছবার চেষ্টা করলো সে। আর সে সময়েই আবার তারদিকে সেই ছায়া মূর্তিটাকে এগিয়ে আসতে দেখলো নন্দ। লোকটা তার দিকে ঝুঁকে পড়তেই সে আতঙ্কে কুঁকড়ে গেলো।
“বাড়ি কোথায়?”
“ঐদিকে – ম-মানে গোবিন্দহাটি।” লোকটা তাকে আর ছুলো না দেখে খানিকটা স্বস্তি পেলো সে। যা বোঝা যাচ্ছে এর কাছ থেকে নিস্তার নেই। যা প্রশ্ন করে তার উত্তর দিয়ে যাওয়াই ভালো – তারপরে যা থাকে ভাগ্যে।
“পড়াশুনো করিস? না ওসব পাঠ নেই”
“এইট অব্দি পড়েছিলাম, তারপর … ”
“তারপর?”
“হয়ে ওঠেনি আর।” - একটু ইতস্তত করে বলে নন্দ।
“হয়নি না করিস নি?”
“ভালো লাগে নি।”
“বেশ – এ ধান্দা কতদিন?”
“বিশ্বাস করুন - এই প্রথম বার … ”
কথাটা শেষ করার আগেই বাঁ গালে একটা জোরালো চড় খেয়ে কাত হয়ে পড়ে গেলো নন্দ। কয়েক মুহুর্তের জন্যে চোখের সামনে সর্ষে ফুলের ঝড় বয়ে গেলো। একটু বাদে নিজেকে সামলে নিয়ে যখন আবার উঠে বসবার চেষ্টা করলো সে তখন বুঝলো যে মাথার মধ্যে এলোমেলো হয়ে গেছে।
লোকটা আধ অন্ধকারেই ধৈর্য্য ধরে বসে নন্দর চালচলন দেখছে। এ লোক মিথ্যে কথা কি করে টের পায় বুঝে উঠতে পারলো না নন্দ।
“তিন-চারবার, মাস দুয়েক।” শান্ত গলায় বললো নন্দ।
“তোর বন্ধুদের নিয়ে আর কিছু করার নেই – সবকটাই তো জন্ম শয়তান, কিন্তু তুই এদের সাথে ভিড়লি কি করে?”
খানিক চুপ করে থাকে নন্দ, “নেশা করতে … গাঁজা …” কিভাবে কথাটা গুছিয়ে বলবে বুঝতে পারে না সে।
“হুম” গম্ভীর গলায় বলে লোকটা। “ভালই তো তৈরী হয়ে গেছিস – নেশা করার পয়সা জোগাড় করতে ছিনতাই?”
“আপনি কি করবেন? পুলিশে দেবেন আমায়?”
“হ্যা: পুলিশ!” লোকটি তাচ্ছিল্য ভরে বলে – “তারা আর কি করবে? যতসব আলসে-ঘুষখোরের দল!”
কিছুটা ভরসা পায় নন্দ। “আ-আমি আর কোনদিন এসব করবো না – মায়ের দিব্যি!”
লোকটার হাত উঠতে দেখে আবার সিঁটিয়ে যায় নন্দ, কিন্তু এবার লোকটা নিজেকে সংযত করে নেয় – আরেকটা চড়ের হাত থেকে বেঁচে গেলো সে।
“মায়ের দিব্যি কাটছিস – তোর বাবা-মা জানে যে তুই নেশাভাং করিস? চুরি-ছিনতাই করিস?”
চুপ করে থাকে নন্দ। কি বলবে তার ভাষা খুঁজে পায় না সে।
“তোর মাও তো চেয়েছিলো যে তুই লেখাপড়া করিস? ভদ্রলোক হোস? নাকি?”
মাথা নাড়ে নন্দ – অন্ধকারে দেখা যায় না, কিন্তু লোকটা বুঝতে পারে যেন।
“ভাব – যদি তোর মা জানে যে তুই এসব করে বেড়াচ্ছিস আর তারপরে ধরা পড়ে তার দিব্যি কাটছিস – তার মনে কতটা দুঃখ হবে? হবে না।”
নন্দর মুখে কথা নেই – মনের ভিতরে একটা অন্যরকম ব্যথা অনুভব করে সে, যেটা তার বাঁ-কাঁধের ব্যথার মতই ভিতরে ভিতরে ছড়িয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
“মা নেই। মরে গেছে … ”
“ছি: – তুই সেই মরা মায়ের দিব্যি কাটছিস?” লোকটার গলার স্বরে ঘৃণার সুর শুনে আরো বিষাদে ছেয়ে যায় নন্দর মন।
“আমি আর কোনদিন নেশাভাং করবো না, চুরি-ছিনতাই কিচ্ছু করবো না – কথা দিচ্ছি আপনাকে – দরকার পড়লে ভিক্ষে করে খাবো, তাও ঠিক আছে। কথা দিলাম আপনাকে।”
“ভিক্ষে করবি কেন?” এবার লোকটার গলার সুর অন্যরকম, “নেশা করা ছাড়া আর কি করতে ভালো লাগে? সত্যি করে বল।” হালকা হাতে তার বাঁহাত আর কাঁধ চেপে ধরলো লোকটা। কিন্তু এবার আর ভয় পেলো না নন্দ।
“মানে সিনেমায় দেখেছি … আ-আ-আ-” আরেকবার প্রবল যন্ত্রনায় চিত্কার করে উঠলো নন্দ।
পনেরো বছর লম্বা সময় – একটা মফস্বল শহরের খোল নলচে বদলে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ঠ। ডিজেল ইঞ্জিন থেকে ইলেকট্রিক ট্রেন, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে বাল্বের বদলে সি.এফ.এল, চাঁচের বেড়ার দোকানগুলো পাকা হয়েছে। শহরের সাথে সাথে মানুষগুলোও পাল্টেছে – জামা কাপড়ে, মানসিকতায় – সব কিছুতেই। কিন্তু রামকৃষ্ণপুরের পুরনো মানুষেরা এখনো নিজেদেরকে পুরোপুরি ভুলে যেতে পারে নি।
তাই রাত আটটা বত্রিশের লোকাল ট্রেন থেকে যখন একটা নবদম্পতি নামলো, তখন স্টেশনের প্লাটফর্মের ছোট বইয়ের দোকানের মালিক তাদের ঠিক চিনতে পারলো। মেয়েটি চেনা – আর সঙ্গের ছেলেটি যে কে তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
“ভালো আছ? অনেকদিন পর দেখলাম।”
“হ্যাঁ – আপনি ভালো?”
“এই একরকম চলছে – জামাই তো?” ছেলেটির দিকে ইশারা করে বলেন ভদ্রলোক।
“হ্যাঁ” – সলজ্জে জবাব দেয় মেয়েটি, “আসি।”
“বাবা আসবে না?” তারা এগুতে গিয়েও বাধা পেলো ভদ্রলোকের কথায়।
“ন-না।” সামান্য বিরক্ত হলো মেয়েটি, ছেলেটি অধৈর্য্য, “এইটুকু রাস্তা।”
তাদের বিরক্তিকে আমল দেয় না দোকানদার ভদ্রলোক – “শোনো শোনো।”
ইতস্তত করে দোকানের দিকে এগিয়ে যায় তারা, কালে ভদ্রে দেখা হলেও ইনি স্নেহ করেন মেয়েটিকে।
“বলছি শোনো - অটো ধরে নিও, ঘোষবাগাণের দিকটা এভয়েড করো, কেমন?”
“এইটুকু রাস্তা, শর্টকাট …”
“যা বলছি শোনো, ওদিকের রাস্তায় যেও না যেন। দিনকাল খারাপ।” ভদ্রলোকের কথায় সস্নেহ আদেশ।
“আচ্ছা।” কি ভেবে জবাব দেয় মেয়েটি।
“সাবধানে যেও।” আশ্বস্ত হয় ভদ্রলোক, “পরে দেখা হবে – হ্যাঁ?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ – আসি তাহলে?” এবার পা চালায় তারা।
কিন্তু স্টেশন থেকে বেরিয়ে অটো স্ট্যান্ডের দিকে না গিয়ে পাশের সরু রাস্তার দিকে চলে যায় তারা।
“ঘোষবাগান আর আগের মতো নেই, ছেলেবেলায় জঙ্গল ছিল – এখন ঘরবাড়ি হয়ে গেছে। আগে বাবার সাথে হোস্টেল থেকে ফিরতে এই জায়গাটা খুব ভয় করতো, কিন্তু এখন … ”
“আরে বাবা নেই তো কি হয়েছে - আমি তো আছি।” ছেলেটি আশ্বস্ত করে।
“হুমম – সেটাই তো বড় ভরসা!” ঠাট্টার সুরে বলে মেয়েটি।
পনেরো বছরে ঘোষবাগানের জঙ্গল কেটে সাফ হয়ে জনবসতি গড়ে উঠেছে। প্রমোটার আর ডেভেলপারদের কল্যানে সামান্য যা গাছপালা অবশিষ্ট ছিল সেগুলোর জায়গায় এখন কংক্রিটের জঙ্গল মাথা উঁচু করে দাড়িয়েছে। শুঁড়িপথের জায়গায় বাঁধানো রাস্তা, স্ট্রীটলাইটের কারণে আকাশে তারাদের দেখা মেলা ভার।
ঘোষবাগান এলাকাটা পেরিয়ে সামান্য একটু রাস্তা গেলেই গন্ধবন – যেখানে মেয়েটির বাপের বাড়ি, তাদের গন্তব্য।
শেষ ল্যাম্পপোস্টটায় আলো জ্বলছে না, খানিকটা জায়গা জুড়ে রাস্তাটা অন্ধকার হয়ে আছে। দুপাশের নির্মীয়মান বাড়ির কংক্রিটের খাঁচা আলোয়-অন্ধকারে একটা ভয়ঙ্কর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
“ওদিকের রাস্তা ধরে আসলেই ভালো হ্ত, নাকি?” মেয়েটি সামান্য ভীত গলায় বললো।
“এই তো, এসেই গেলাম প্রায়।” ছেলেটি আশ্বাস দেয়।
“লোকজন দেখছি না কাউকে।”
জঙ্গলের ভয় আলাদা, শহরের ভয় অন্যরকম। মেয়েটির জন্ম রামকৃষ্ণপুরে হলেও তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বলাকায়। বলাকা মহকুমা শহর – রামকৃষ্ণপুরের মতো মফস্বল নয়। স্কুল, কলেজ হোস্টেলে থেকে পড়েছে সে। ছুটির সময় ছাড়া এই শহরের তার সেরকম যাওয়া আসা নেই। রাত মাত্র পৌনে-নটা হলেও এরকম গা-ছমছমে পরিবেশে সেই অন্যরকম ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক।
আলোর সীমানা পেরিয়ে অন্ধকারে ঢোকবার আগে মেয়েটি ছেলেটির হাত জোরে চেপে ধরলো। ছেলেটিও একটা অজানা ভয়ে হঠাৎ শিহরিত হয়ে গেলো। কেউ কি পিছনে আসছে? অন্ধকার শেষ হতে এখনো কুড়ি-পঁচিশ পা।
অন্ধকারের গন্ডিতে ঢুকতেই তাদের একসাথে দুটো অনুভুতি হলো। প্রথমত মনে হলো যেন তাদের পিছনে আরেকজন কেউ যেন আসছে। ছেলেটি আড়চোখে পিছনে তাকিয়ে দেখলো সেখানে কেউ নেই – অন্তত দৃষ্টিগোচর কেউ। দ্বিতীয়ত মনে হলো যেন দুপাশের কংক্রিটের জঙ্গলের আড়ালে কে যেন তাদের লক্ষ্য করছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই অন্ধকারে কাউকেই দেখা গেলো না।
ছেলেটি অনুভব করলো তার স্ত্রী যথেষ্ট ভয় পেয়েছে – তার হাতে চেপে ধরা মেয়েটির আঙ্গুল রীতিমতো কাঁপছে। তারা দুজনেই যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব পা চালিয়ে অন্ধকারে সীমানা পেরুনোর চেষ্টা করলো।
দশ-বারো পা এগোতেই পিছনে একটা ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দ শোনা গেলো। চকিতে পিছন ফিরতেই ছেলেটি দেখলো একটা হেডলাইট নেভা মোটরবাইক অসম্ভব দ্রুতগতিতে তাদের দিকে ছুটে আসছে। অন্ধকার রাস্তায় বাইকের পিছনের টেললাইটের প্রতিফলিত আলোয় ধাবমান বাইক ও তার চালকের ছায়া মূর্তি দেখা যাচ্ছে কেবল। কিছু একটা হওয়ার আশঙ্কায় ঝটিতি তারা দুজনে রাস্তার একপাশে সরে গেলো।
এর পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেলো। মোটরবাইকটি তাদের দিকে ছুটে আসতে, চালকটি ছেলেটির হাত থেকে তার ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যেতে, আর পালানোর সময় তাদের পিছনে একটা দমকা বাতাসের বয়ে যাওয়া আর সেই বাতাসের ঝটকায় বাইকটির উল্টে যাওয়া – এই ঘটনাগুলো ঘটতে খুব বেশি হলে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগলো না।
তাদের দুজনের স্থির হতে এরপর একটু সময় লাগলো। কিন্তু তারপরে আতঙ্ক গ্রাস করলো তাদের। বাইকটা উল্টে যাওয়ার সময়ে কি করে হোক ছিনতাই হয়ে যাওয়া ব্যাগটা আবার তাদের দিকে ফিরে এসেছিলো, মাত্র কয়েক পা দুরে সেটা পড়ে আছে এখন। উল্টে যাওয়া বাইক ও তার চালকের দিকে তাকিয়ে তারা দুজনে বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।
বাইক আরোহী আহত হয়েছিল সম্ভবত। খানিক সময় পরে সে বাইকের নিচে চাপা পড়া পা ঘষটে ঘষটে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু এরপরে যা ঘটলো সেটা সম্পূর্ণ অভাবনীয়!
ঘটনাস্থলে তারা কেবল তিনজন – কিন্তু কিভাবে যেন ব্যাগটা এবার ছেলেটির একেবারে কাছাকাছি – পায়ের কাছে সরে এলো। কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতেই ছেলেটি যখন ব্যাগটা তুলতে নিচু হয়েছে, সেসময়ে হঠাৎ বাইকের আহত আরোহী ভাঙ্গা গলায় চেঁচিয়ে উঠলো। মেয়েটি একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি দেখলো যে কেউ যেন বাইকের তলা থেকে সেই ছেলেটিকে ছেঁচড়ে বের করে আনলো – ছেলেটির শরীর ধনুকের মতো বেঁকে আছে – আর অন্ধকারেও বোঝা যায় যে তার বাইকের তলায় চাপা পড়ে যাওয়া পাটা স্বাভাবিক অবস্থানে নেই।
“যাও!” ঘাড়ের পিছন থেকে একটু বাতাস বয়ে যাওয়ার সময়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো কেউ।
ভারী হয়ে যাওয়া হাত পায়ে সাড় এলো এবার। স্তম্ভিত ভাব কেটে গেলো দুজনের। যতটা দূর থেকে কাটানো সম্ভব – বাইক আর চালককে এড়িয়ে দ্রুতপায়ে একরকম ছুটতে ছুটতেই সামনের দিকে এগিয়ে গেলো তারা। আলোর কাছাকাছি আসতেই এবার মস্তিস্ক কাজ করা শুরু করলো।
“চলো চলো চলো” মেয়েটি প্রায় দৌড়তে থাকে - কিন্তু ছেলেটি পিছন ফিরে একবার দেখবার চেষ্টা করে পিছনের পরিস্থিতি কি।
আলো-অন্ধকারে পরিষ্কার দেখা যায় না, কিন্তু ওদিক থেকে বাইক চালকের কাতর আর্তনাদ শোনা যায় - “নাম জেনে কি করবি?”
কার সাথে কথা বলছে সে?
গন্ধবনে বড় রাস্তা থেকে গলিপথে ঢুকে দুটো বাড়ির পরে একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে থামলো তারা। দরজার বাইরে নেমপ্লেটে লেখা ড: সদাশিব রায়, বি.এইচ.এম.এস। কাঁপাকাঁপা হাতে কলিং বেল টিপলো সদাশিব বাবুর মেয়ে জয়িতা।
“কে?” দরজা খুলে তাদের দেখে প্রথমে চমকে গিয়ে তারপরে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন ডাক্তার বাবু।
ঋক প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, সারা বছর তার কাজের চাপ থাকে, তাই বিয়ের পরে রামকৃষ্ণপুরে সেরকম আসা সম্ভব হয়নি। হঠাৎ পরপর চারদিনের ছুটি পেয়ে তারা সদাশিববাবুকে চমকে দিতে এসেছে, সুযোগ থাকলে এবার ওনাকে কয়েকদিনের জন্যে ধরে নিয়ে যাবে তারা। জানতো এই সময়ে হঠাৎ এসে উপস্থিত হলে সদাশিববাবু ব্যস্ত হবেন, তাই তাকে আর বিব্রত করতে চায় নি তারা - জয়িতা আর ঋক বলাকা থেকেই খাবার নিয়ে এসেছিলো।
খাবার টেবিলে বসে নানা কথা হলেও রাস্তার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা তোলেনি জয়িতা বা ঋক, সদাশিববাবু একা থাকেন – যেহেতু শেষমেষ খারাপ কিছুই ঘটেনি তাই তাকে অযথা উদ্বিগ্ন করতে চায়না তারা। এটা সেটা নানা গল্প-গাছার ভিতর দিয়ে সময় কেটে গেলো। ভালো খবর, সদাশিব বাবুও কয়েকদিনের জন্যে তাদের সাথে যেতে রাজি হয়েছেন। কালকের দিনটা থেকে পরশু রওনা দেবে তারা সবাই। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল সকলে।
ভোর বেলা কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো জয়িতার। দরজায় কেউ এসেছে – “কে?” জিজ্ঞাস করলো সে। উত্তরের বদলে আরেকবার কলিং বেল বেজে উঠলো। নাইটির উপর একটা ওড়না জড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো জয়িতা।
দরজা খুলতে দেখা গেলো একটা অচেনা ছেলে দাড়িয়ে আছে। গায়ে হুডি – কপাল, চোখ ও মুখের উপরের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে না। তবে হুডের আড়ালে চিবুক ও থুতনির পাশে বেশ অনেকটা জায়গায় ছড়ে যাওয়া ক্ষতের উপর লাল মারকিউরিক্রমমের পোঁচ। ছেলেটাকে এইভাবে দেখে হঠাৎ গা ছ্যাঁত করে উঠলো তার।
“কে? কাকে চাই?”
কোনো উত্তর না দিয়ে জিন্সের প্যান্টের পকেট থেকে একটা আংটি বের করে জয়িতার দিকে এগিয়ে দিলো ছেলেটি। আংটিটা দেখে চমকে গেলো সে – ঋকের আংটি। কাল ঘটনার আকস্মিকতায় খেয়াল হয় নি, ব্যাগ ছিনতাই হওয়ার সময়ে হয়তো আঙ্গুল থেকে ছিটকে পড়ে গেছে। রূপো দিয়ে বাঁধানো মুক্তো, দাম সেরকম নয় - কিন্তু এই ছেলেটি এটা পেলো কোথায়? ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় সে ।
“এটা পেলে কোত্থেকে?”
“রাস্তায়, কুড়িয়ে পেয়েছি – আপনার হাজব্যান্ডের।” ভাঙ্গা খ্যাসখ্যাসে গলায় কোনরকমে কথা কটা বলেই ছেলেটি ঘুরে চলে যাওয়ার উপক্রম করে।
“এই এই - দাঁড়াও দাঁড়াও!” ছেলেটি পা ডান-পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে, দেখে বোঝা যায় হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছে তার। ছেলেটিকে থামানোর চেষ্টা করে জয়িতা।
বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে আর জয়িতার গলার আওয়াজ শুনে সদাশিববাবুও দরজায় চলে এসেছেন ততক্ষণে।
“কে রে?” তিনি জিজ্ঞাস করলেন। কিন্তু ততক্ষণে ছেলেটি খোঁড়াতে খোঁড়াতে অনেকটা দুরে চলে গিয়েছে আর দরজায় হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে দেখছে জয়িতা।
“কি রে? কে?” জয়িতাকে আবার জিজ্ঞাস করলেন সদাশিব বাবু।
“কি জানি - ” আনমনে জবাব দেয় সে, “ওর আংটি – দিয়ে গেলো।”
ছেলেটার জন্যে দিনটা অনেক আগেভাগেই শুরু হয়ে গেলো। চায়ের টেবিলে বসে কাল রাতের পুরো ঘটনাটা – যেটা ওরা দুজনেই সদাশিববাবুর কাছ থেকে চেপে যেতে চাইছিলো সেটাকে সামনে আনতেই হলো।
“ছেলেটাকে পিছন থেকে দেখে ছোটন-ফোটন ওরকম কেউ হবে বলে মনে হলো। কিন্তু … ”
“কে সে?”
“ঐ গোবিন্দহাটির দিকে বাড়ি, কলে যেতে আসতে দেখেছি। পাঁচ নম্বর কলোনির সামনের মোড়ে বসে আড্ডা মারে সব। বেকার বখাটে ছেলে।”
“তা ও আংটিটা পেলো কি করে? আর পেলেও … ”
“আমিও তাই ভাবছি, কারণ ওখানকার সবকটা বদমাস – মানে হেরোইন-টেরোইন খায়!”
“বলেন কি! এখানেও ওসব চালু হয়ে গেছে?” অবাক হয়ে যায় ঋক।
“আর বলো না – নেশার বিষ কোথায় না নেই? আমি তাই ভাবছি যে, আংটিটা পেয়ে খুঁজে পেতে আমাদের বাড়ি বয়ে এসে দিয়ে গেলো, তোমার আংটি তাই বা জানলো কি করে? দিব্যি বেচেবুচে নেশা করে নিতেও তো পারতো – নাকি? আশ্চর্য্যের ব্যাপার!”
“স্যার – মনে হচ্ছে এই ছেলেটাই কাল রাতে … ”
ঋকের কথা শেষ করতে দেয় না জয়িতা – “আমারও তাই মনে হচ্ছিলো।”
“কি দরকার ছিল শর্টকাট করার - হ্যাঁ?” ঝাঁঝিয়ে ওঠেন সদাশিব বাবু, “স্টেশনে গোপালও তো তোমাদের বার বার বারণ করেছিলো বললে – নাকি? দিনকাল খারাপ – তুমি না হয় বলাকায় থাকো, এখানকার হাবভাব জানো না – কিন্তু তুই? এরকম বোকামি করলি কি করে?” মেয়ে আর জামাইয়ের দিকে রাগান্বিত চোখে চেয়ে থাকেন তিনি, “যদি একটা কিছু ভালো মন্দ হয়ে যেত – তখন?”
ধমক খেয়ে চুপ করে যায় দুজনেই। একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর মানে হয় না, কারণ তারা দুজনেই চেয়েছিলো যত তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌছুনো যায়।
“তবে স্যার - আমি শিওর ঐ রাস্তায় আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ ছিলাম না! মানে – অন্ধকারে যা বোঝা যায়, তাতে করে … মানে আমি বলছি এটলিস্ট ‘মানুষ’ কেউ ছিল না!” শান্ত স্বরে বললো ঋক।
জয়িতার মেরুদন্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো, “গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে আমার – ঐ যখন ‘যাও’ বললো না – আমি তখন ভাবছিলাম, আমারও মনে হচ্ছিলো … ” কথা শেষ করতে পারে না জয়িতা।
“তবে যেই বা যাই থাকুক না কেন – মনে হয় ছেলেটাকে কিছু জিজ্ঞাস করছিল।”
এবার চমকে ওঠেন সদাশিব বাবু – “জিজ্ঞাস করছিলো? মানে?”
“খেয়াল করিনি - ওখান থেকে পালিয়ে আসতে আসতে শুনছিলাম ছেলেটা বলছে ‘নাম শুনে কি করবি?’ এই রকম আর কি!”
শুনেই স্তম্ভিত হয়ে যান ডা: সদাশিব রায়! কটা পুরনো কথা মনে পড়ে যায়, কিছু পুরনো ছবি ভেসে উঠতে থাকে চোখের সামনে।
সদাশিব বাবুর ভাবান্তর চোখে পড়ে দুজনেরই – “কি হলো বাবা?”
“নন্দ!” নিশ্বাসের সাথে বললেন সদাশিব বাবু।
অবাক হয়ে যায় জয়িতা “নন্দ - মানে ঐ উকিল ভদ্রলোক?” ঋক কিছু বুঝতে না পেরে চেয়ে থাকে বাবা-মেয়ের দিকে।
হঠাৎ ঋকের মনে পড়ে যায় জয়িতা কিছুদিন আগে টিভিতে তাকে দেখিয়েছিলো কোনো এক নন্দকুমার সরকারের খুনের খবর, জলাজমি ভরাট করার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে অনেক চেষ্টা করছিলেন তিনি – খুনের পিছনে সম্ভবত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা জগবন্ধু দাস আর প্রমোটার মদনগোপাল চক্রবর্তীর হাত আছে। মদনগোপাল ফেরার। কিন্তু নন্দবাবুর সাথে এই ঘটনার যোগাযোগ কোথায়?
“হ্যাঁ – ওই।” ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন সদাশিব বাবু।
পনেরো বছর আগে ঘোষবাগানের জঙ্গলের অন্ধকারে ডা: সদাশিব রায় যখন টান মেরে কিশোর নন্দর বাঁ-কাঁধের সরে যাওয়া হাড় ঠিক করছিলেন তখন সে অসম্ভব চিত্কার করেছিলো। কিন্তু তার পরে যখন সে স্বাভাবিক হয়, তখন বলেছিলো ‘সিনেমায় কোর্টের উকিলদের দেখলে ওরকম হতে ইচ্ছা করে।’
চার বছর পরের কথা। বয়স হচ্ছে, রামকৃষ্ণপুরে দেখবার কেউ নেই তাই জোরজার করে পাকাপাকি ভাবে সদাশিববাবুকে বলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। অবশ্য কতটা জয়িতা ঋকের অনুরোধ-উপরোধ আর কতটা নাতনির টান সেটা এখনো বোঝা যায় না। এক বছরের মেয়েকে নিয়ে জয়িতা তেমন ব্যস্ত নয়, কারণ নাতনি দাদুর কোলছাড়া হতে চায় না সেরকম।
ঋক প্রমোশন পেয়ে এখন কোম্পানীর প্রোডাকশন ম্যানেজার। তাদের প্লান্টে একটা নতুন ছেলে জয়েন করেছে - সনাতন দত্ত। সদ্য পাশ করা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, গোবিন্দহাটি বাড়ি। স্বভাবে আলাপে খুবই ভালো ছেলে, তার ডাকনাম ছোটকু।
প্রকাশিত : ছায়াময় ভুতুড়ে
“নাম বল – নাম কি তোর?”
“নাম জেনে কি করবি? পুলিশকে বলবি? ছাড় আগে।”
“নাম বল।”
“ছাড়বি কিনা বল – এবার কিন্তু …” গা মুচড়িয়ে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে কমবয়সী ছেলেটি, কিন্তু আগেরবারের মতই পিঠের পিছনে মুচড়ে থাকা বাঁ-হাতে চাপ আরও প্রবল হয়। কাঁধের পেশির ভিতর থেকে একটা কচকচে শব্দ হতে থাকে।
“আ-আ-আ” করুন স্বরে কাতরিয়ে ওঠে ছেলেটি। “ছেড়ে দাও – কিছু করবো না, মাইরি বলছি।”
“নাম বল” – ছেলেটাকে প্যাঁচে ফেলে দেওয়া লোকটির গলার স্বরে কোনো বিকার নেই।
কিছু না বলে ছেলেটি নিথর ভাবে পড়ে থাকে, নিশ্বাসের সাথে গালে ধুলো ঢুকছে। কাশি পেলেও সেটাকে সামলে নেয় সে। বাঁ-হাতটা আস্তে আস্তে অবশ হয়ে আসছে। আধ-অন্ধকারে তার থেকে একটু দুরে মাটিতে পড়ে থাকা আরেকটা শরীর দেখতে পায় সে। অদ্ভুত ভাবে নেতিয়ে পড়ে আছে – জগাই। পাশেই তার নজরের বাইরে কোথাও আরেক স্যাঙ্গাত মদন পড়ে আছে মনে হয়। জগাইয়ের পড়ে থাকার ভঙ্গিটা ভালো না। যন্ত্রনায় চোখ ফেটে জল বেরুচ্ছে। চোখের জলে নজর ঝাপসা হয়ে যেতে যেতেও জগাইকে দেখে তার মনে বাঁচবার তাগিদ চলে এলো।
শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে প্রবল ঝাঁকি দিয়ে পিঠের উপর থেকে লোকটাকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলো সে।
ঝাঁকিটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ খট করে একটা আওয়াজ হলো তার বাঁ-কাঁধে আর তার সাথে সাথেই প্রবল যন্ত্রণা তার কাঁধ বেয়ে বাঁ-হাত, ঘাড়, শিরদাঁড়া, কোমরে ছড়িয়ে পড়ল।
“আ-ই-ই-ই! ভেঙ্গে গেলো!” চিত্কার করে কেঁদে ফেললো ছেলেটি। তারপর গলা ছেড়ে অশ্রাব্য গালাগাল করতে শুরু করলো সে। যদিও তার চিত্কার ঘোষেদের বাগানের এই শুনশান জঙ্গল আর তার ভিতর দিয়ে চলে যাওয়া শুঁড়িপথের বাইরে বেরুনোর কোনো রাস্তা পেলো না।
খানিকটা সময় নিলো লোকটা। “নাম বল।” আগের মতই নির্বিকার স্বরে আওয়াজ এলো।
এবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো ছেলেটা। “ছেড়ে দিন – আর কখনো করবো না।”
এরপর সে টের পেলো যে তার ডান হাতের কব্জিতে লোকটার আঙ্গুলের চাপ বাড়ছে।
“মা কালির দিব্যি – ক্ষমা করে দিন, ভুল করে ফেলেছি।” প্রবল আতঙ্কের সঙ্গে বললো ছেলেটা।
“নামটাতো বলবি – নাকি? নিজের নাম বলতে এতো লজ্জা পাচ্ছিস কেন?” এমন হালকা স্বরে বললো লোকটা যেন কিছুই হয় নি।
“নিতাই” ইতস্তত করে বললো ছেলেটা।
“এ হাতটাও ভাঙ্গতে চাস নাকি?”
“না না না! নন্দ নন্দ!” ঠিক নাম বলবার সাথে সাথেই কব্জির মোচড় অনেকটা কমে এলো। “এবার ছেড়ে দিন। যে দিব্যি করতে বলেন – সত্যি বলছি আর কোনদিন এরকম করবো না।”
হঠাৎ তার মাথার পিছনে - বাঁদিক থেকে একটা খসখস শব্দ শোনা গেলো। মদন?
ভাবতে না ভাবতেই সে বুঝলো যে তার বাঁহাতের কব্জি থেকে আঙ্গুলের চাপটা চলে গেছে আর পিঠের উপর লোকটার ভার নেই আর!
‘এই সুযোগ! পালাতে হবে এবার!’ কিন্তু ডানদিকে গড়িয়ে সোজা হতে যেতেই ‘ধপাস’ করে একটা আওয়াজ আর তার সাথে সাথেই মদনের আর্তনাদ শোনা গেলো। লোকটার ক্ষিপ্রতা দেখে আরেকবার চমকে গেলো সে। পালানোর চেষ্টা করে লাভ নেই বুঝে চিত্ হয়ে শুয়ে হাঁফাতে লাগলো।
মদন একবার আর্তনাদ করে উঠেই থেমে গিয়েছিলো – বোঝা গেলো ও আগেরবার জ্ঞান হারানোর ভান করে সুযোগের অপেক্ষা করছিলো, কিন্তু এবারের অজ্ঞান হওয়াটা অভিনয় নয়। ডানহাতের কব্জিতে ব্যথা, কিন্তু বাঁহাতের উপর নন্দ’র এখন আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ডানহাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কোনরকমে দুচোখ মুছবার চেষ্টা করলো সে। আর সে সময়েই আবার তারদিকে সেই ছায়া মূর্তিটাকে এগিয়ে আসতে দেখলো নন্দ। লোকটা তার দিকে ঝুঁকে পড়তেই সে আতঙ্কে কুঁকড়ে গেলো।
“বাড়ি কোথায়?”
“ঐদিকে – ম-মানে গোবিন্দহাটি।” লোকটা তাকে আর ছুলো না দেখে খানিকটা স্বস্তি পেলো সে। যা বোঝা যাচ্ছে এর কাছ থেকে নিস্তার নেই। যা প্রশ্ন করে তার উত্তর দিয়ে যাওয়াই ভালো – তারপরে যা থাকে ভাগ্যে।
“পড়াশুনো করিস? না ওসব পাঠ নেই”
“এইট অব্দি পড়েছিলাম, তারপর … ”
“তারপর?”
“হয়ে ওঠেনি আর।” - একটু ইতস্তত করে বলে নন্দ।
“হয়নি না করিস নি?”
“ভালো লাগে নি।”
“বেশ – এ ধান্দা কতদিন?”
“বিশ্বাস করুন - এই প্রথম বার … ”
কথাটা শেষ করার আগেই বাঁ গালে একটা জোরালো চড় খেয়ে কাত হয়ে পড়ে গেলো নন্দ। কয়েক মুহুর্তের জন্যে চোখের সামনে সর্ষে ফুলের ঝড় বয়ে গেলো। একটু বাদে নিজেকে সামলে নিয়ে যখন আবার উঠে বসবার চেষ্টা করলো সে তখন বুঝলো যে মাথার মধ্যে এলোমেলো হয়ে গেছে।
লোকটা আধ অন্ধকারেই ধৈর্য্য ধরে বসে নন্দর চালচলন দেখছে। এ লোক মিথ্যে কথা কি করে টের পায় বুঝে উঠতে পারলো না নন্দ।
“তিন-চারবার, মাস দুয়েক।” শান্ত গলায় বললো নন্দ।
“তোর বন্ধুদের নিয়ে আর কিছু করার নেই – সবকটাই তো জন্ম শয়তান, কিন্তু তুই এদের সাথে ভিড়লি কি করে?”
খানিক চুপ করে থাকে নন্দ, “নেশা করতে … গাঁজা …” কিভাবে কথাটা গুছিয়ে বলবে বুঝতে পারে না সে।
“হুম” গম্ভীর গলায় বলে লোকটা। “ভালই তো তৈরী হয়ে গেছিস – নেশা করার পয়সা জোগাড় করতে ছিনতাই?”
“আপনি কি করবেন? পুলিশে দেবেন আমায়?”
“হ্যা: পুলিশ!” লোকটি তাচ্ছিল্য ভরে বলে – “তারা আর কি করবে? যতসব আলসে-ঘুষখোরের দল!”
কিছুটা ভরসা পায় নন্দ। “আ-আমি আর কোনদিন এসব করবো না – মায়ের দিব্যি!”
লোকটার হাত উঠতে দেখে আবার সিঁটিয়ে যায় নন্দ, কিন্তু এবার লোকটা নিজেকে সংযত করে নেয় – আরেকটা চড়ের হাত থেকে বেঁচে গেলো সে।
“মায়ের দিব্যি কাটছিস – তোর বাবা-মা জানে যে তুই নেশাভাং করিস? চুরি-ছিনতাই করিস?”
চুপ করে থাকে নন্দ। কি বলবে তার ভাষা খুঁজে পায় না সে।
“তোর মাও তো চেয়েছিলো যে তুই লেখাপড়া করিস? ভদ্রলোক হোস? নাকি?”
মাথা নাড়ে নন্দ – অন্ধকারে দেখা যায় না, কিন্তু লোকটা বুঝতে পারে যেন।
“ভাব – যদি তোর মা জানে যে তুই এসব করে বেড়াচ্ছিস আর তারপরে ধরা পড়ে তার দিব্যি কাটছিস – তার মনে কতটা দুঃখ হবে? হবে না।”
নন্দর মুখে কথা নেই – মনের ভিতরে একটা অন্যরকম ব্যথা অনুভব করে সে, যেটা তার বাঁ-কাঁধের ব্যথার মতই ভিতরে ভিতরে ছড়িয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
“মা নেই। মরে গেছে … ”
“ছি: – তুই সেই মরা মায়ের দিব্যি কাটছিস?” লোকটার গলার স্বরে ঘৃণার সুর শুনে আরো বিষাদে ছেয়ে যায় নন্দর মন।
“আমি আর কোনদিন নেশাভাং করবো না, চুরি-ছিনতাই কিচ্ছু করবো না – কথা দিচ্ছি আপনাকে – দরকার পড়লে ভিক্ষে করে খাবো, তাও ঠিক আছে। কথা দিলাম আপনাকে।”
“ভিক্ষে করবি কেন?” এবার লোকটার গলার সুর অন্যরকম, “নেশা করা ছাড়া আর কি করতে ভালো লাগে? সত্যি করে বল।” হালকা হাতে তার বাঁহাত আর কাঁধ চেপে ধরলো লোকটা। কিন্তু এবার আর ভয় পেলো না নন্দ।
“মানে সিনেমায় দেখেছি … আ-আ-আ-” আরেকবার প্রবল যন্ত্রনায় চিত্কার করে উঠলো নন্দ।
পনেরো বছর লম্বা সময় – একটা মফস্বল শহরের খোল নলচে বদলে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ঠ। ডিজেল ইঞ্জিন থেকে ইলেকট্রিক ট্রেন, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে বাল্বের বদলে সি.এফ.এল, চাঁচের বেড়ার দোকানগুলো পাকা হয়েছে। শহরের সাথে সাথে মানুষগুলোও পাল্টেছে – জামা কাপড়ে, মানসিকতায় – সব কিছুতেই। কিন্তু রামকৃষ্ণপুরের পুরনো মানুষেরা এখনো নিজেদেরকে পুরোপুরি ভুলে যেতে পারে নি।
তাই রাত আটটা বত্রিশের লোকাল ট্রেন থেকে যখন একটা নবদম্পতি নামলো, তখন স্টেশনের প্লাটফর্মের ছোট বইয়ের দোকানের মালিক তাদের ঠিক চিনতে পারলো। মেয়েটি চেনা – আর সঙ্গের ছেলেটি যে কে তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
“ভালো আছ? অনেকদিন পর দেখলাম।”
“হ্যাঁ – আপনি ভালো?”
“এই একরকম চলছে – জামাই তো?” ছেলেটির দিকে ইশারা করে বলেন ভদ্রলোক।
“হ্যাঁ” – সলজ্জে জবাব দেয় মেয়েটি, “আসি।”
“বাবা আসবে না?” তারা এগুতে গিয়েও বাধা পেলো ভদ্রলোকের কথায়।
“ন-না।” সামান্য বিরক্ত হলো মেয়েটি, ছেলেটি অধৈর্য্য, “এইটুকু রাস্তা।”
তাদের বিরক্তিকে আমল দেয় না দোকানদার ভদ্রলোক – “শোনো শোনো।”
ইতস্তত করে দোকানের দিকে এগিয়ে যায় তারা, কালে ভদ্রে দেখা হলেও ইনি স্নেহ করেন মেয়েটিকে।
“বলছি শোনো - অটো ধরে নিও, ঘোষবাগাণের দিকটা এভয়েড করো, কেমন?”
“এইটুকু রাস্তা, শর্টকাট …”
“যা বলছি শোনো, ওদিকের রাস্তায় যেও না যেন। দিনকাল খারাপ।” ভদ্রলোকের কথায় সস্নেহ আদেশ।
“আচ্ছা।” কি ভেবে জবাব দেয় মেয়েটি।
“সাবধানে যেও।” আশ্বস্ত হয় ভদ্রলোক, “পরে দেখা হবে – হ্যাঁ?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ – আসি তাহলে?” এবার পা চালায় তারা।
কিন্তু স্টেশন থেকে বেরিয়ে অটো স্ট্যান্ডের দিকে না গিয়ে পাশের সরু রাস্তার দিকে চলে যায় তারা।
“ঘোষবাগান আর আগের মতো নেই, ছেলেবেলায় জঙ্গল ছিল – এখন ঘরবাড়ি হয়ে গেছে। আগে বাবার সাথে হোস্টেল থেকে ফিরতে এই জায়গাটা খুব ভয় করতো, কিন্তু এখন … ”
“আরে বাবা নেই তো কি হয়েছে - আমি তো আছি।” ছেলেটি আশ্বস্ত করে।
“হুমম – সেটাই তো বড় ভরসা!” ঠাট্টার সুরে বলে মেয়েটি।
পনেরো বছরে ঘোষবাগানের জঙ্গল কেটে সাফ হয়ে জনবসতি গড়ে উঠেছে। প্রমোটার আর ডেভেলপারদের কল্যানে সামান্য যা গাছপালা অবশিষ্ট ছিল সেগুলোর জায়গায় এখন কংক্রিটের জঙ্গল মাথা উঁচু করে দাড়িয়েছে। শুঁড়িপথের জায়গায় বাঁধানো রাস্তা, স্ট্রীটলাইটের কারণে আকাশে তারাদের দেখা মেলা ভার।
ঘোষবাগান এলাকাটা পেরিয়ে সামান্য একটু রাস্তা গেলেই গন্ধবন – যেখানে মেয়েটির বাপের বাড়ি, তাদের গন্তব্য।
শেষ ল্যাম্পপোস্টটায় আলো জ্বলছে না, খানিকটা জায়গা জুড়ে রাস্তাটা অন্ধকার হয়ে আছে। দুপাশের নির্মীয়মান বাড়ির কংক্রিটের খাঁচা আলোয়-অন্ধকারে একটা ভয়ঙ্কর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
“ওদিকের রাস্তা ধরে আসলেই ভালো হ্ত, নাকি?” মেয়েটি সামান্য ভীত গলায় বললো।
“এই তো, এসেই গেলাম প্রায়।” ছেলেটি আশ্বাস দেয়।
“লোকজন দেখছি না কাউকে।”
জঙ্গলের ভয় আলাদা, শহরের ভয় অন্যরকম। মেয়েটির জন্ম রামকৃষ্ণপুরে হলেও তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বলাকায়। বলাকা মহকুমা শহর – রামকৃষ্ণপুরের মতো মফস্বল নয়। স্কুল, কলেজ হোস্টেলে থেকে পড়েছে সে। ছুটির সময় ছাড়া এই শহরের তার সেরকম যাওয়া আসা নেই। রাত মাত্র পৌনে-নটা হলেও এরকম গা-ছমছমে পরিবেশে সেই অন্যরকম ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক।
আলোর সীমানা পেরিয়ে অন্ধকারে ঢোকবার আগে মেয়েটি ছেলেটির হাত জোরে চেপে ধরলো। ছেলেটিও একটা অজানা ভয়ে হঠাৎ শিহরিত হয়ে গেলো। কেউ কি পিছনে আসছে? অন্ধকার শেষ হতে এখনো কুড়ি-পঁচিশ পা।
অন্ধকারের গন্ডিতে ঢুকতেই তাদের একসাথে দুটো অনুভুতি হলো। প্রথমত মনে হলো যেন তাদের পিছনে আরেকজন কেউ যেন আসছে। ছেলেটি আড়চোখে পিছনে তাকিয়ে দেখলো সেখানে কেউ নেই – অন্তত দৃষ্টিগোচর কেউ। দ্বিতীয়ত মনে হলো যেন দুপাশের কংক্রিটের জঙ্গলের আড়ালে কে যেন তাদের লক্ষ্য করছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই অন্ধকারে কাউকেই দেখা গেলো না।
ছেলেটি অনুভব করলো তার স্ত্রী যথেষ্ট ভয় পেয়েছে – তার হাতে চেপে ধরা মেয়েটির আঙ্গুল রীতিমতো কাঁপছে। তারা দুজনেই যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব পা চালিয়ে অন্ধকারে সীমানা পেরুনোর চেষ্টা করলো।
দশ-বারো পা এগোতেই পিছনে একটা ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দ শোনা গেলো। চকিতে পিছন ফিরতেই ছেলেটি দেখলো একটা হেডলাইট নেভা মোটরবাইক অসম্ভব দ্রুতগতিতে তাদের দিকে ছুটে আসছে। অন্ধকার রাস্তায় বাইকের পিছনের টেললাইটের প্রতিফলিত আলোয় ধাবমান বাইক ও তার চালকের ছায়া মূর্তি দেখা যাচ্ছে কেবল। কিছু একটা হওয়ার আশঙ্কায় ঝটিতি তারা দুজনে রাস্তার একপাশে সরে গেলো।
এর পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেলো। মোটরবাইকটি তাদের দিকে ছুটে আসতে, চালকটি ছেলেটির হাত থেকে তার ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যেতে, আর পালানোর সময় তাদের পিছনে একটা দমকা বাতাসের বয়ে যাওয়া আর সেই বাতাসের ঝটকায় বাইকটির উল্টে যাওয়া – এই ঘটনাগুলো ঘটতে খুব বেশি হলে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগলো না।
তাদের দুজনের স্থির হতে এরপর একটু সময় লাগলো। কিন্তু তারপরে আতঙ্ক গ্রাস করলো তাদের। বাইকটা উল্টে যাওয়ার সময়ে কি করে হোক ছিনতাই হয়ে যাওয়া ব্যাগটা আবার তাদের দিকে ফিরে এসেছিলো, মাত্র কয়েক পা দুরে সেটা পড়ে আছে এখন। উল্টে যাওয়া বাইক ও তার চালকের দিকে তাকিয়ে তারা দুজনে বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।
বাইক আরোহী আহত হয়েছিল সম্ভবত। খানিক সময় পরে সে বাইকের নিচে চাপা পড়া পা ঘষটে ঘষটে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু এরপরে যা ঘটলো সেটা সম্পূর্ণ অভাবনীয়!
ঘটনাস্থলে তারা কেবল তিনজন – কিন্তু কিভাবে যেন ব্যাগটা এবার ছেলেটির একেবারে কাছাকাছি – পায়ের কাছে সরে এলো। কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতেই ছেলেটি যখন ব্যাগটা তুলতে নিচু হয়েছে, সেসময়ে হঠাৎ বাইকের আহত আরোহী ভাঙ্গা গলায় চেঁচিয়ে উঠলো। মেয়েটি একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি দেখলো যে কেউ যেন বাইকের তলা থেকে সেই ছেলেটিকে ছেঁচড়ে বের করে আনলো – ছেলেটির শরীর ধনুকের মতো বেঁকে আছে – আর অন্ধকারেও বোঝা যায় যে তার বাইকের তলায় চাপা পড়ে যাওয়া পাটা স্বাভাবিক অবস্থানে নেই।
“যাও!” ঘাড়ের পিছন থেকে একটু বাতাস বয়ে যাওয়ার সময়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো কেউ।
ভারী হয়ে যাওয়া হাত পায়ে সাড় এলো এবার। স্তম্ভিত ভাব কেটে গেলো দুজনের। যতটা দূর থেকে কাটানো সম্ভব – বাইক আর চালককে এড়িয়ে দ্রুতপায়ে একরকম ছুটতে ছুটতেই সামনের দিকে এগিয়ে গেলো তারা। আলোর কাছাকাছি আসতেই এবার মস্তিস্ক কাজ করা শুরু করলো।
“চলো চলো চলো” মেয়েটি প্রায় দৌড়তে থাকে - কিন্তু ছেলেটি পিছন ফিরে একবার দেখবার চেষ্টা করে পিছনের পরিস্থিতি কি।
আলো-অন্ধকারে পরিষ্কার দেখা যায় না, কিন্তু ওদিক থেকে বাইক চালকের কাতর আর্তনাদ শোনা যায় - “নাম জেনে কি করবি?”
কার সাথে কথা বলছে সে?
গন্ধবনে বড় রাস্তা থেকে গলিপথে ঢুকে দুটো বাড়ির পরে একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে থামলো তারা। দরজার বাইরে নেমপ্লেটে লেখা ড: সদাশিব রায়, বি.এইচ.এম.এস। কাঁপাকাঁপা হাতে কলিং বেল টিপলো সদাশিব বাবুর মেয়ে জয়িতা।
“কে?” দরজা খুলে তাদের দেখে প্রথমে চমকে গিয়ে তারপরে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন ডাক্তার বাবু।
ঋক প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, সারা বছর তার কাজের চাপ থাকে, তাই বিয়ের পরে রামকৃষ্ণপুরে সেরকম আসা সম্ভব হয়নি। হঠাৎ পরপর চারদিনের ছুটি পেয়ে তারা সদাশিববাবুকে চমকে দিতে এসেছে, সুযোগ থাকলে এবার ওনাকে কয়েকদিনের জন্যে ধরে নিয়ে যাবে তারা। জানতো এই সময়ে হঠাৎ এসে উপস্থিত হলে সদাশিববাবু ব্যস্ত হবেন, তাই তাকে আর বিব্রত করতে চায় নি তারা - জয়িতা আর ঋক বলাকা থেকেই খাবার নিয়ে এসেছিলো।
খাবার টেবিলে বসে নানা কথা হলেও রাস্তার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা তোলেনি জয়িতা বা ঋক, সদাশিববাবু একা থাকেন – যেহেতু শেষমেষ খারাপ কিছুই ঘটেনি তাই তাকে অযথা উদ্বিগ্ন করতে চায়না তারা। এটা সেটা নানা গল্প-গাছার ভিতর দিয়ে সময় কেটে গেলো। ভালো খবর, সদাশিব বাবুও কয়েকদিনের জন্যে তাদের সাথে যেতে রাজি হয়েছেন। কালকের দিনটা থেকে পরশু রওনা দেবে তারা সবাই। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল সকলে।
ভোর বেলা কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো জয়িতার। দরজায় কেউ এসেছে – “কে?” জিজ্ঞাস করলো সে। উত্তরের বদলে আরেকবার কলিং বেল বেজে উঠলো। নাইটির উপর একটা ওড়না জড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো জয়িতা।
দরজা খুলতে দেখা গেলো একটা অচেনা ছেলে দাড়িয়ে আছে। গায়ে হুডি – কপাল, চোখ ও মুখের উপরের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে না। তবে হুডের আড়ালে চিবুক ও থুতনির পাশে বেশ অনেকটা জায়গায় ছড়ে যাওয়া ক্ষতের উপর লাল মারকিউরিক্রমমের পোঁচ। ছেলেটাকে এইভাবে দেখে হঠাৎ গা ছ্যাঁত করে উঠলো তার।
“কে? কাকে চাই?”
কোনো উত্তর না দিয়ে জিন্সের প্যান্টের পকেট থেকে একটা আংটি বের করে জয়িতার দিকে এগিয়ে দিলো ছেলেটি। আংটিটা দেখে চমকে গেলো সে – ঋকের আংটি। কাল ঘটনার আকস্মিকতায় খেয়াল হয় নি, ব্যাগ ছিনতাই হওয়ার সময়ে হয়তো আঙ্গুল থেকে ছিটকে পড়ে গেছে। রূপো দিয়ে বাঁধানো মুক্তো, দাম সেরকম নয় - কিন্তু এই ছেলেটি এটা পেলো কোথায়? ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় সে ।
“এটা পেলে কোত্থেকে?”
“রাস্তায়, কুড়িয়ে পেয়েছি – আপনার হাজব্যান্ডের।” ভাঙ্গা খ্যাসখ্যাসে গলায় কোনরকমে কথা কটা বলেই ছেলেটি ঘুরে চলে যাওয়ার উপক্রম করে।
“এই এই - দাঁড়াও দাঁড়াও!” ছেলেটি পা ডান-পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে, দেখে বোঝা যায় হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছে তার। ছেলেটিকে থামানোর চেষ্টা করে জয়িতা।
বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে আর জয়িতার গলার আওয়াজ শুনে সদাশিববাবুও দরজায় চলে এসেছেন ততক্ষণে।
“কে রে?” তিনি জিজ্ঞাস করলেন। কিন্তু ততক্ষণে ছেলেটি খোঁড়াতে খোঁড়াতে অনেকটা দুরে চলে গিয়েছে আর দরজায় হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে দেখছে জয়িতা।
“কি রে? কে?” জয়িতাকে আবার জিজ্ঞাস করলেন সদাশিব বাবু।
“কি জানি - ” আনমনে জবাব দেয় সে, “ওর আংটি – দিয়ে গেলো।”
ছেলেটার জন্যে দিনটা অনেক আগেভাগেই শুরু হয়ে গেলো। চায়ের টেবিলে বসে কাল রাতের পুরো ঘটনাটা – যেটা ওরা দুজনেই সদাশিববাবুর কাছ থেকে চেপে যেতে চাইছিলো সেটাকে সামনে আনতেই হলো।
“ছেলেটাকে পিছন থেকে দেখে ছোটন-ফোটন ওরকম কেউ হবে বলে মনে হলো। কিন্তু … ”
“কে সে?”
“ঐ গোবিন্দহাটির দিকে বাড়ি, কলে যেতে আসতে দেখেছি। পাঁচ নম্বর কলোনির সামনের মোড়ে বসে আড্ডা মারে সব। বেকার বখাটে ছেলে।”
“তা ও আংটিটা পেলো কি করে? আর পেলেও … ”
“আমিও তাই ভাবছি, কারণ ওখানকার সবকটা বদমাস – মানে হেরোইন-টেরোইন খায়!”
“বলেন কি! এখানেও ওসব চালু হয়ে গেছে?” অবাক হয়ে যায় ঋক।
“আর বলো না – নেশার বিষ কোথায় না নেই? আমি তাই ভাবছি যে, আংটিটা পেয়ে খুঁজে পেতে আমাদের বাড়ি বয়ে এসে দিয়ে গেলো, তোমার আংটি তাই বা জানলো কি করে? দিব্যি বেচেবুচে নেশা করে নিতেও তো পারতো – নাকি? আশ্চর্য্যের ব্যাপার!”
“স্যার – মনে হচ্ছে এই ছেলেটাই কাল রাতে … ”
ঋকের কথা শেষ করতে দেয় না জয়িতা – “আমারও তাই মনে হচ্ছিলো।”
“কি দরকার ছিল শর্টকাট করার - হ্যাঁ?” ঝাঁঝিয়ে ওঠেন সদাশিব বাবু, “স্টেশনে গোপালও তো তোমাদের বার বার বারণ করেছিলো বললে – নাকি? দিনকাল খারাপ – তুমি না হয় বলাকায় থাকো, এখানকার হাবভাব জানো না – কিন্তু তুই? এরকম বোকামি করলি কি করে?” মেয়ে আর জামাইয়ের দিকে রাগান্বিত চোখে চেয়ে থাকেন তিনি, “যদি একটা কিছু ভালো মন্দ হয়ে যেত – তখন?”
ধমক খেয়ে চুপ করে যায় দুজনেই। একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর মানে হয় না, কারণ তারা দুজনেই চেয়েছিলো যত তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌছুনো যায়।
“তবে স্যার - আমি শিওর ঐ রাস্তায় আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ ছিলাম না! মানে – অন্ধকারে যা বোঝা যায়, তাতে করে … মানে আমি বলছি এটলিস্ট ‘মানুষ’ কেউ ছিল না!” শান্ত স্বরে বললো ঋক।
জয়িতার মেরুদন্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো, “গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে আমার – ঐ যখন ‘যাও’ বললো না – আমি তখন ভাবছিলাম, আমারও মনে হচ্ছিলো … ” কথা শেষ করতে পারে না জয়িতা।
“তবে যেই বা যাই থাকুক না কেন – মনে হয় ছেলেটাকে কিছু জিজ্ঞাস করছিল।”
এবার চমকে ওঠেন সদাশিব বাবু – “জিজ্ঞাস করছিলো? মানে?”
“খেয়াল করিনি - ওখান থেকে পালিয়ে আসতে আসতে শুনছিলাম ছেলেটা বলছে ‘নাম শুনে কি করবি?’ এই রকম আর কি!”
শুনেই স্তম্ভিত হয়ে যান ডা: সদাশিব রায়! কটা পুরনো কথা মনে পড়ে যায়, কিছু পুরনো ছবি ভেসে উঠতে থাকে চোখের সামনে।
সদাশিব বাবুর ভাবান্তর চোখে পড়ে দুজনেরই – “কি হলো বাবা?”
“নন্দ!” নিশ্বাসের সাথে বললেন সদাশিব বাবু।
অবাক হয়ে যায় জয়িতা “নন্দ - মানে ঐ উকিল ভদ্রলোক?” ঋক কিছু বুঝতে না পেরে চেয়ে থাকে বাবা-মেয়ের দিকে।
হঠাৎ ঋকের মনে পড়ে যায় জয়িতা কিছুদিন আগে টিভিতে তাকে দেখিয়েছিলো কোনো এক নন্দকুমার সরকারের খুনের খবর, জলাজমি ভরাট করার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে অনেক চেষ্টা করছিলেন তিনি – খুনের পিছনে সম্ভবত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা জগবন্ধু দাস আর প্রমোটার মদনগোপাল চক্রবর্তীর হাত আছে। মদনগোপাল ফেরার। কিন্তু নন্দবাবুর সাথে এই ঘটনার যোগাযোগ কোথায়?
“হ্যাঁ – ওই।” ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন সদাশিব বাবু।
পনেরো বছর আগে ঘোষবাগানের জঙ্গলের অন্ধকারে ডা: সদাশিব রায় যখন টান মেরে কিশোর নন্দর বাঁ-কাঁধের সরে যাওয়া হাড় ঠিক করছিলেন তখন সে অসম্ভব চিত্কার করেছিলো। কিন্তু তার পরে যখন সে স্বাভাবিক হয়, তখন বলেছিলো ‘সিনেমায় কোর্টের উকিলদের দেখলে ওরকম হতে ইচ্ছা করে।’
চার বছর পরের কথা। বয়স হচ্ছে, রামকৃষ্ণপুরে দেখবার কেউ নেই তাই জোরজার করে পাকাপাকি ভাবে সদাশিববাবুকে বলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। অবশ্য কতটা জয়িতা ঋকের অনুরোধ-উপরোধ আর কতটা নাতনির টান সেটা এখনো বোঝা যায় না। এক বছরের মেয়েকে নিয়ে জয়িতা তেমন ব্যস্ত নয়, কারণ নাতনি দাদুর কোলছাড়া হতে চায় না সেরকম।
ঋক প্রমোশন পেয়ে এখন কোম্পানীর প্রোডাকশন ম্যানেজার। তাদের প্লান্টে একটা নতুন ছেলে জয়েন করেছে - সনাতন দত্ত। সদ্য পাশ করা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, গোবিন্দহাটি বাড়ি। স্বভাবে আলাপে খুবই ভালো ছেলে, তার ডাকনাম ছোটকু।
প্রকাশিত : ছায়াময় ভুতুড়ে
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন