স্টেশন থেকে বেরিয়ে অটো স্ট্যান্ডের দিকে এগোতে এগোতে দেখা গেলো যে একটা অটো সবে ছেড়ে চলে যাচ্ছে আর একটা সেই শুন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে এলো| স্ট্যান্ডে কেবল একটাই অটো আর দেখা-চোখে যাত্রী বলতে সেই সম্ভবত একা| বিশ্রী বিরক্তি ভর করলো সৌমাভের উপর – পাঁচজন না হলে অটো ছাড়বে না আর তার মানে দাঁড়ালো যে এই সাংঘাতিক গরমে তাকে আর অটোচালককে আরও চারজনের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে| তেতোগেলা মুখ করে কাঁধের ব্যাগটাকে একটু হেঁচকিয়ে উপরে তুলে সেই একমাত্র অটোটার দিকে এগুলো সে|
“স্কুলমোড়?”
অটোওয়ালা মুখে কোনো জবাব না দিয়ে ইশারায় পিছনে বসতে বললো তাকে|
সৌমাভ পিঠ থেকে ব্যাগটা খুলে অটো’র পিছনে সাবধানে শুইয়ে রেখে তারপর নিজে ধীরেসুস্থে গুছিয়ে বসলো| বেড়িয়ে ফেরবার এই সময়টা, মানে স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার এই পথটুকু বরাবরই বিরক্তিকর লাগে সৌমাভের| প্রতিবারই মনে হয় যে আর নয়, এই শেষ - কিন্তু গায়ের ব্যথা মরতে না মরতেই আবার নতুন করে উত্সাহ জেগে ওঠে|
সে জানে এটা কেবল তার একার নয়, যে গ্রুপটার সাথে সে বেরোয়, তাদের পাঁচজনেরই এই একই মনোভাব| তাদের বেড়ানোর নেশা এমনই যে ছমাস যদি কোথাও না বেরুনো যায় তবে তাদের সবারই দমবন্ধ হয়ে আসে| এবারের টুরে যদিও দেবাঞ্জন আসতে পারে নি, প্রমোশনের জন্যে তার ছুটি ম্যানেজ হয় নি - তাই সৌমাভ, সুবর্ণ, মনোতোষ আর পারিজাত চারবন্ধু বেরিয়ে পড়েছিল ভুঁইবাংলার জঙ্গলে|
“দাদা – চেপে বসুন|”
অটোওয়ালার গলায় সম্বিত ফেরে সৌমাভের – দেখে আর তিনজন যাত্রী চলে এসেছে ইতিমধ্যে| যাক – তাহলে আরেকজন হলেই হয়| একটু নিশ্চিন্ত হয়ে সিটের একদম ডানদিকে সরে বসে সে| আশা করা যায় এই রুটে তার পরে আর কেউ নামবার নেই|
সরে বসতে গিয়ে বাঁ পায়ের আঙ্গুলে একটা কিনকিনে ব্যথা অনুভব করল সৌমাভ| জুতোর ভিতরে আঙ্গুল গুলো নাড়াচাড়া করতে সে ভাবলো যে এই কদিনে পা-দুটোর উপরে যে অত্যাচার হয়েছে এবার তারা তার প্রতিশোধ নিতে চলেছে| অটোর স্বল্প পরিসরে পা টান করে যতটা সম্ভব ছড়িয়ে বসলে ব্যথাটা মিলিয়ে গেলো|
গরমে অটোওয়ালারও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেছে বোঝা যাচ্ছে – পঞ্চম যাত্রীর জন্যে অপেক্ষা না করেই সে অটো স্টার্ট দিয়ে ফেললো| অন্যসময় হলে হাজার অনুরোধ-উপরোধেও এই রুটের অটো অন্তত পাঁচজনের কমে যেতেই চায় না| অটো চলতে শুরু করতেই হালকা হাওয়ায় পথশ্রমের ক্লান্তি ও বিরক্তি অনেকটাই কমে গেলো| তার স্টপেজ আসতে অনেক সময় আছে, এইবার সৌমাভ তাদের এবারের টুরের বাকি হিসাবটা মনে মনে মেলাতে বসলো|
স্কুলমোড় থেকে তাদের বাড়ি পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটাপথ| অটো থেকে নেমে ভাড়া চুকিয়ে প্রথমেই সে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করলো| পকেটের ভিতরে থেকে প্যাকেটটা দুমড়ে গেছে – ভিতরের অবশিষ্ট তিনটি সিগারেটেরও একই দশা| সিগারেট ধরিয়ে ব্যাগটাকে কাঁধের উপর চাপিয়ে নিয়ে হাঁটবার উদ্যোগ করতেই আবার বাঁ পায়ের আঙ্গুলের ব্যথাটা জানান দিলো|
বেল বাজানোর প্রায় সাথে সাথেই সৌমীলি দরজা খুলে দিলো|
“কিরে? কেমন আছিস?”
“ভালো – মা কই? ঘুমুচ্ছে?”
“না, এই গরমে ঘুম আসে তাই? টিভি দেখছে|”
হাঁটতে হাঁটতে ব্যথাটার কথা সে ভুলেই গিয়েছিলো, ব্যাগ নামিয়ে জুতো খুলতে গিয়ে সেটার কথা মনে পড়ল আবার – কিন্তু এখন আর তার কোনো অস্তিত্ব নেই| খানিকটা নিশ্চিন্ত হলো সৌমাভ, কাল থেকেই আবার অফিস – কাজেই এখন এইসব ব্যথা-বেদনা নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না| জুতো মোজা খুলে ফেলতে পা-দুটো অনেক হালকা হয়ে গেলো|
“খাবি তো?”
“হ্যা – লাগা|”
“তুই এসে হাতমুখ ধুয়ে বস, আমি খাবার লাগাচ্ছি| চান করবি নাকি?”
“না না, আগে খাবো, বড্ড খিদে পেয়েছে – এই শোন, তার আগে একটু লেবু জল বানিয়ে দিবি? ঠান্ডা?”
“হ্যা আয়|”
সৌমীলি দ্রুতপায়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো| সৌমাভো ক্লান্তভাবে ব্যাগটা তুলে খাওয়ার ঘরের একপাশে রেখে বেসিনে চোখে-মুখে ঝাপটা দিতে দিতেই তার মা এসে হাজির হলেন|
“কেমন আছিস? ইস! কত কালো হয়ে গেছিস!”
“ভালো আছি মা, তোমার শরীর কেমন?”
“ঠিকই আছে! নে - হাত মুখ ধুয়ে খেতে বোস| সুমি …”
সৌমীলি কাঁচের গ্লাসে করে ঠান্ডা লেবুজল নিয়ে আসে|
“... তবে সব থেকে ভালো লেগেছে দানোদক, অদ্ভুত সুন্দর জায়গা! ওরকম জায়গা যে এদিকে কোথাও আছে কেউই জানে না বোধহয়| ছবি তুলেছি - পরে দেখিস সুমি! বুঝলে মা – জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোট পাহাড়, টিলার মতো আর কি! বিধুগা থেকে হেঁটে প্রায় আধ-ঘন্টা চল্লিশ মিনিট মতো হবে – গাড়ি ঘোড়া কিচ্ছু নেই, রাস্তা-ঘাট না, জঙ্গলের মধ্যে পায়ে চলা পথ যেরকম থাকে সেইরকম|”
“সুবর্ণ পারলো?”
“হ্যাঁ – ব্যাটার ভুঁড়ি থাকলে কি হয় – দারুন এনার্জি!”
“কি আছে সেখানে দাদা?”
“আ:! ওকে খেতে দে না সুমি, বকাচ্ছিস কেন? সবে ঘেমেনেয়ে ফিরেছে, আরেকটু ডাল নিবি সমু?”
“না মা – চাটনি আছে?”
“হ্যাঁ – দেতো সুমি, ভাত নিবি আর?”
“নাঃ! দানোদকে টিলার উপরে একটা ছোট্ট মন্দির আছে, মন্দির বলতে একটা ছোট্ট ঘরের মতো! তা বাদে আর কিছু নেই! তবে বিউটি কি জানিসতো সুমি? টিলার শেপ আর গাছপালা| সাঁচিস্তুপ দেখেছিস তো? ঠিক সেইরকম একটা গম্বুজ|”
“বানানো?”
“না – ন্যাচারাল, গ্রানাইট পাথরের নিখুত অর্ধগোলক| দেখলে অবাক হয়ে যাবি! পাশে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত গাছপালা আছে, আর তা বাদে টিলার গায়েও শিকড়-বাকড় বেরিয়েছে, তাই বেয়ে বেয়ে ওঠা যায়| তবে বিধুগার লোকজন আমাদের যেতে বারণ করছিলো অনেকবার – দেও-ফেওর গল্প আর কি – হা হা, ওদিককার লোকজনের বিশ্বাস জানো তো মা! টিলার গোড়ায় পাথরে-টাথরে সিঁদুর-ফুল-বেলপাতার ছড়াছড়ি, যা শুনলাম টিলার কাছাকাছি মানুষ যায় না নাকি! ভাবতো! তবে একথা ঠিক যে কুসংস্কার বা সংস্কার, যাই বলো না কেন এর কারণেই এরকম একটা সুন্দর জায়গা এখনো পিকনিক-স্পট হয়ে যায় নি|”
“নে চল – খালি থালায় বসে আর বকবক করতে হবে না, হাত ধুয়ে নে সমু, তারপর রেস্ট কর| সুমি থালা তোল – পরে ধীরে সুস্থে গল্প করিস|”
মায়ের তাড়ায় টেবিল থেকে ওঠে সৌমাভ, কিন্তু উঠতে গিয়েই যন্ত্রনায় আবার বসে পড়ে সে| মুখ থেকে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে আসে| আগের সেই ব্যথাটা ফিরে এসেছে, তবে এবার সেটা দুপায়েই! তার অবস্থা দেখে মা আর বোন দুজনেই আঁতকে ওঠে|
“কি হলো রে?”
“পায়ে ব্যথা|” যন্ত্রণা চেপে বলে সৌমাভ, “এতো হাঁটাহাঁটি হয়েছে!”
ভেবেছিলো একটু গড়িয়ে নেবে, তারপরে বিকেল নাগাদ পার্কে যাওয়া যাবে আড্ডা দিতে, কিন্তু ক্লান্তির ঘুম এতো গাড় হলো যে সে যখন উঠলো তখন প্রায় সন্ধ্যা| ঘরের ছোট আলোটা জ্বলছে - মা বা সৌমীলি কেউ একজন এসে মশা তাড়ানোর মেশিনটাও চালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো আশাকরি, নয়তো অনেক আগেই মশার দাপটে তার ঘুম ভেঙ্গে যেত| অবেলায় ঘুম থেকে উঠে প্রচন্ড বিরক্ত হলো সৌমাভ| দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে সাতটা, যাক – খুব একটা দেরি হয়নি| পার্কে বন্ধুরা সবাই চলে এসেছে আশা করি - এখনো বেরুলে অন্তত এক-দেড় ঘন্টা আড্ডা দেওয়া যেতেই পারে|
ঘুমের ঘোর এবং বিরক্তি একসাথে কেটে যেতেই সৌমাভের ব্যথার বোধ ফিরে এলো| এখন কেবল আর পায়ে নয়, তার দু হাত আর দু পায়েই এক সাথে একই রকম কিনকিনে ব্যথা করে চলছে| শোয়ার সময়ে সে মনে করেছিলো যে একটু বিশ্রাম নিলেই পায়ের ব্যথা বিদেয় নেবে| কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে সেই ব্যথা এবারে একইসাথে দুই হাতে পায়েই সংক্রমিত হয়েছে| ভালো জ্বালা!
“উঠেছিস?”
মায়ের গলার আওয়াজে চমকে উঠলো সৌমাভ| এবারে তার ঘুমের রেশটা কেটে গেলো পুরোপুরি|
“হ্যাঁ, ডাকনি কেন? এতো দেরি করে ঘুমুলাম!”
“বেড়িয়ে-চেরিয়ে এলি, ক্লান্ত ছিলি – তাই আর ডাকিনি, চা খাবি? বানাবো?”
“হ্যা দাও|”
তার ঘর থেকে হেঁটে খাওয়ার ঘরে আসতে রীতিমতো কষ্ট হলো সৌমাভের| সেরকম যন্ত্রণা নয়, কিন্তু দুই হাতপায়ে চাপা ব্যথাটা সমানে জানান দিয়ে যাচ্ছে| কি হলটা কি? এতদিনের অভিজ্ঞতায় এরকম তো কখনো হয় নি! ইউরিক এসিড বা ওরকম কোনো অসুখ-বিসুখ বাধলো নাকি? খেয়াল করে দেখলো যে ব্যথাটা কেবল তার হাত আর পায়ের কড়ে আঙ্গুলের হাড়েই বোধ হচ্ছে কেবল, অন্য কোনো আঙ্গুলে, পায়ের পাতায় বা হাতের চেটোয় কিন্তু কোনো ব্যথা-যন্ত্রণা নেই| ব্যাগ খোলা হয়নি এখনো, তার ভিতরেই আশা করা যায় অব্যবহৃত পেনকিলার পাওয়া যেতে পারে, আর রাতে একটা ভালো লম্বা ঘুম দিয়ে নিলেই হয়তো যন্ত্রণার উপশম হতে পারে|
খাওয়ার ঘরেই টিভিটা থাকে, সৌমাভ দেখলো তার ক্যামেরাটা কেবল দিয়ে টিভির সাথে লাগানো আছে আর টিভির পর্দায় তাদের ফেরার পথের একটা ছবি স্থির হয়ে আছে| রান্না ঘর থেকে চায়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে – সৌমীলি তার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করে এবারের টুরের ছবিগুলো দেখছিলো মনে হয়, আর তারপরে মায়ের কথায় তার জন্যে চা বানাতে গেছে|
খাওয়ার টেবিলে বসে সৌমাভ তার দুহাত মন দিয়ে দেখছিলো, কড়ে আঙ্গুলের গোড়ায় খানিকটা জায়গা অস্বাভাবিক লালচে হয়ে আছে| গরমের জন্যে হতে পারে? হতেও পারে, কারণ কোনকিছু ইনফেকশন হলে তার এফেক্ট হতে এতটা সময় লাগতো না আশা করি| হাতের আঙ্গুল খোলা-বন্ধ করতে করতে মনে হলো কড়ে আঙ্গুলের গোড়ায় যেন কিছু একটা আটকানো আটকানো মতো লাগছে|
“নে|” সৌমীলি চায়ের কাপ তার সামনে এনে রাখলো, “খাবি কিছু?”
“না – বেলা করে খেলাম, এখন আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না|”
“ছবিগুলো দেখছিলাম – নাইস জায়গা রে! আমি একটা ছবি বেছে রেখেছি - আমার ফেসবুকে কভার ফটো লাগাবো – হি হি|”
“হ্যাঁ – পিসিতে আমায় মেনশন করিস|”
“কিন্তু তোর দানোদকের ছবি কোথায়? গম্বুজ-টম্বুজ তুলিসনি কিছু?”
“হ্যা তুলেছি তো! সবগুলো দেখিসনি?”
“না – বুঝতে পারলাম না, পরপর দেখছিলাম, কটা গ্রামের ছবি, তারপরে জঙ্গল, গাছপালা, তারপরে … তারপরে একটা মূর্তি, ভালো কথা এর ভিতরে অনেক ছবি কিন্তু করাপ্ট আছে|”
চমকে ওঠে সৌমাভ, “করাপ্ট মানে!এতো ভালো ভালো ছবি তুললাম!”
“হিজিবিজি, কিছুকিছু ছবি আবার টেরচা হয়ে আছে, দাঁড়া দেখাচ্ছি|”
সৌমীলি কেবলটা সাবধানে সোজা করে ক্যামেরাটা টেবিলে নিয়ে আসে, তারপরে নেভিগেশন করে আগের ছবিগুলোতে ফেরত যেতে থাকে|
“দাঁড়া দাঁড়া,” সৌমিলির কাছ থেকে ক্যামেরা নিয়ে সৌমাভ থাম্বনেল ভিউতে যায়, তারিখ অনুযায়ী ছবি সাজানো আছে| গতকালের তারিখ বেছে নিয়ে এক এক করে ছবিগুলো দেখতে থাকে সে|
গতকাল সকালে তারা ছিল দেনাপো, সেখান থেকে দুপুরে বিধুগা, বিধুগা থেকে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে পলিদী ফেরার কথা, কিন্তু মাঝপথে দানোদকের কথা শুনলো একটা আদিবাসী ছেলের কাছে, কাজেই সোজা পথে না গিয়ে … এই তো সেই আদিবাসী ছেলেটার ছবি| তারা দানোদক যাবে শুনে হাত নেড়ে তাদের বারণ করছে, চোখে মুখে আতঙ্ক, মোশন ব্লারে দুই হাত প্রায় ঝাপসা|
তারপরে দানোদকের জঙ্গলের রাস্তা, মনোতোষ সুবর্ণর সাথে ইয়ার্কি করছে, গাছের ডালে পাখি, পারিজাতের ম্যাক্রো ফটোগ্রাফি – ছেলেটার হাত ভালো বেশ, মনোতোষ মডেলিংএর পোজে, সৌমাভ সিগারেট খাচ্ছে – তাড়াতাড়ি সেটা স্কিপ করেই একবার রান্নাঘরের দিকে দেখে নিলো সে, এর পরেই দূর থেকে একটা আবছা গম্বুজের ছবি – এইবার এসে গেছে তারা| পরের ছবিটায় যেতেই বুক ধড়াস করে উঠলো সৌমাভের|
পিওর রেড-গ্রীন-ব্লু জাঙ্কের ভিতর দিয়ে একগাদা সাদা আর কালো ছিটছিটে দাগ! যাহ!
“কার্ড খারাপ হয়ে গেছেরে নাকি?”
“আমি কিছু জানিনা দাদা – আমিও এই দেখেছি|”
পরের ছবির প্রায় একই অবস্থা!
“ইশ! এখান থেকেই গম্বুজটার ভিউ গুলো ছিল রে – যাহ!”
পর পর ছবিগুলো দেখতে থাকে তারা|
“যাকগে – মনোতোষদের থেকে পাওয়া যাবে আবার, ওরাও অনেক ছবি তুলেছে|”
একটা ছবি মন্দের ভালো, কিছু ডিজিটাল জাঙ্কের মধ্যেও একটা মূর্তির ছবি খানিকটা হলেও স্পষ্ট|
“এই দেখ এই দেখ, এটা সেই দেওয়ের মূর্তি| ইস এটাও গেছে – মন্দিরের ভিতর অন্ধকার, তাও ফ্ল্যাশ মেরে বেশ একটা ছবি হয়েছিল|”
“কি বিশ্রী দেখতেরে দাদা|”
“যাহ! লোকশিল্প – এরকমই ফর্ম হয় - দেখিসনি!”
“না তা বলছিনা – দেখ কিরকম বীভত্স দেখতে! ভগবান মাথায় থাকুক, কিন্তু দেওর থেকে দানোর সাথে মিল বেশি – হি হি|”
বোনের কথায় রাগতে গিয়েও রাগতে পারলো না সৌমাভ, ঠিকই লোকায়ত শিল্পে একই সাথে সারল্য আর কুটিলতা দেখতে দেখতে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে| তবে পার্থক্য এখানে যে এই দেওটির সাথে দেবতা বা দানব নয় – যেন কোনো হাজার বছরের প্রাচীন মমির মিল সব থেকে বেশি পাওয়া যায়|
“দেখেছিস – চারটে করে আঙ্গুল! মিকি মাউসের মতো মনে হচ্ছে, নারে দাদা? হি হি|”
“সিম্প্লিফিকেশন বুঝলি? পাঁচটা আঙ্গুল বানাতে হলে শিল্পীকে খাটতে হবে বেশি, তাই আর কি!”
মজাদার নয়, আসল সাইজে দেখতে থাকলে হিজিবিজির মধ্যেও মূর্তিটাকে যেন অনেক বেশি জীবন্ত মনে হয় – আর তার সঙ্গে আরো বেশি কদাকার|
ভাগ্য ভালো গম্বুজের ছবিগুলো ছাড়া বাদবাকি সব ছবিই ঠিকঠাক আছে| গম্বুজের চারিদিক ঘিরে অদ্ভুত গাছপালার ছবিও স্পষ্ট নেই, ওগুলো ঠিকঠাক দেখলে সৌমীলি নির্ঘাত অন্য গ্রহের গাছ বলে চিত্কার করতো| চমকে না দিতে পেরে সৌমাভ মনক্ষুন্ন হলো| দানোদক থেকে পলিদীর রাস্তাও খুব সুন্দর – সেখানকার ছবি দেখে সৌমীলি মুগ্ধ হয়ে গেলো|
“এইটা এইটা – কি সুন্দর নারে দাদা? এটা আমি আমার কভার ফটো লাগাবো|”
একটানা ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে কোথায়| চাপা অসস্তি নিয়ে ঘুম ভাঙ্গলো সৌমাভের| ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে তার মনে হলো - এখন ভোর নাকি সন্ধ্যে? দুপুর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা অবধি ঘুমুনোর কারণে এমনিতেই রাত্রে সহজে ঘুম আসতে চায় নি, আর এখন এই আধ-অন্ধকারে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে সময়ের খেই হারিয়ে ফেললো সে| দ্বিতীয়ত সে বুঝতে পারলো না সে এখন কোথায়? কোনো হোটেলে, ট্রেনের বাঙ্কে নাকি নিজের বাড়িতে?
আস্তে আস্তে সম্বিত ফিরতে থাকলে ঘড়ি না দেখেই এবার সে বুঝতে পারলো সময়টা রাত একটা থেকে চারটের মধ্যে কিছু একটা হবে, আর সে তার নিজের ঘরেই নিজের বিছানায় শুয়ে আছে|
ঝিঁঝিঁ পোকাটা তারস্বরে ডেকেই চলেছে! কোথায় সেটা? ঘুমের মধ্যে যেরকম সে শুনছিলো এখনো তার তীব্রতা সেরকমই, কাজেই ঘুম ভাঙ্গবার পর সে বুঝে উঠতে পারছিলো না যে সে জেগে আছে নাকি এখনো ঘুমের ভিতর| একটু খেয়াল হতে বুঝতে পারলো ঝিঁঝিঁটা আসলে তার মাথার মধ্যেই বসে আছে| কোনো অজানা অসস্তিকর কারণে তার মস্তিষ্কে ঝিঁঝিঁর ডাক অনুরনিত হচ্ছে| ঘুমের ঘোর কেটে যেতে থাকলে ঝিঁঝিঁর ডাকও ক্রমশ অস্পষ্ট হতে লাগলো – এইবার একটা বিষাদের অনুভুতি প্রবল হতে থাকলো| ‘কি যেন একটা হারিয়ে গেছে’ এইরকম একটা অবসাদ অনুভব করতে থাকলো সৌমাভ|
‘নেই নেই’ ভাবটা আসতে থাকলে সৌমাভ এবার নিজের কথা ভাবতে শুরু করলো| কেন এমন হচ্ছে? ভাবতে ভাবতে প্রথমেই যেটা তার মনে হলো হাত-পায়ের সেই ব্যথাটা এখন একদম নেই| ব্যথা না থাকলে তো স্বস্তি, কিন্তু এরকম অবসাদ কেন? ব্যথা নেই, নাকি তার দুই হাত-পায়ের কড়ে আঙ্গুলগুলো অবশ হয়ে আছে?
শরীরে সাড় আসতে শুরু করলে সৌমাভ খেয়াল করলো তার দেহ যেন অনেক হালকা হয়ে গেছে – এবং তার সাথে হঠাৎ অনুভব করলো যে তার বাঁ হাতের তলায় ঠান্ডা সরু লম্বাটে গোছের কি একটা জিনিষ যেন নড়ে উঠে পালানোর চেষ্টা করছে|
প্রবল আতঙ্কে চিত্কার করতে যাওয়ার আগের মুহুর্তে তার মনে পড়ল বিধুগার আদিবাসী ছেলেটার কথা – একসাথে দুহাত নেড়ে সে তাদের দানোদক যেতে বারণ করেছিলো| সামনাসামনি হয়তো খেয়াল করেনি, কিন্তু সন্ধ্যাবেলা খাওয়ার ঘরে বসে তার তোলা ছবিতে সেই ছেলেটিরও দুই ঝাপসা হাতেই যেন চারটে করে আঙ্গুল দেখেছিল|
প্রকাশিত : হরর পত্রিকা : জুলাই ২০১৫
“স্কুলমোড়?”
অটোওয়ালা মুখে কোনো জবাব না দিয়ে ইশারায় পিছনে বসতে বললো তাকে|
সৌমাভ পিঠ থেকে ব্যাগটা খুলে অটো’র পিছনে সাবধানে শুইয়ে রেখে তারপর নিজে ধীরেসুস্থে গুছিয়ে বসলো| বেড়িয়ে ফেরবার এই সময়টা, মানে স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার এই পথটুকু বরাবরই বিরক্তিকর লাগে সৌমাভের| প্রতিবারই মনে হয় যে আর নয়, এই শেষ - কিন্তু গায়ের ব্যথা মরতে না মরতেই আবার নতুন করে উত্সাহ জেগে ওঠে|
সে জানে এটা কেবল তার একার নয়, যে গ্রুপটার সাথে সে বেরোয়, তাদের পাঁচজনেরই এই একই মনোভাব| তাদের বেড়ানোর নেশা এমনই যে ছমাস যদি কোথাও না বেরুনো যায় তবে তাদের সবারই দমবন্ধ হয়ে আসে| এবারের টুরে যদিও দেবাঞ্জন আসতে পারে নি, প্রমোশনের জন্যে তার ছুটি ম্যানেজ হয় নি - তাই সৌমাভ, সুবর্ণ, মনোতোষ আর পারিজাত চারবন্ধু বেরিয়ে পড়েছিল ভুঁইবাংলার জঙ্গলে|
“দাদা – চেপে বসুন|”
অটোওয়ালার গলায় সম্বিত ফেরে সৌমাভের – দেখে আর তিনজন যাত্রী চলে এসেছে ইতিমধ্যে| যাক – তাহলে আরেকজন হলেই হয়| একটু নিশ্চিন্ত হয়ে সিটের একদম ডানদিকে সরে বসে সে| আশা করা যায় এই রুটে তার পরে আর কেউ নামবার নেই|
সরে বসতে গিয়ে বাঁ পায়ের আঙ্গুলে একটা কিনকিনে ব্যথা অনুভব করল সৌমাভ| জুতোর ভিতরে আঙ্গুল গুলো নাড়াচাড়া করতে সে ভাবলো যে এই কদিনে পা-দুটোর উপরে যে অত্যাচার হয়েছে এবার তারা তার প্রতিশোধ নিতে চলেছে| অটোর স্বল্প পরিসরে পা টান করে যতটা সম্ভব ছড়িয়ে বসলে ব্যথাটা মিলিয়ে গেলো|
গরমে অটোওয়ালারও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেছে বোঝা যাচ্ছে – পঞ্চম যাত্রীর জন্যে অপেক্ষা না করেই সে অটো স্টার্ট দিয়ে ফেললো| অন্যসময় হলে হাজার অনুরোধ-উপরোধেও এই রুটের অটো অন্তত পাঁচজনের কমে যেতেই চায় না| অটো চলতে শুরু করতেই হালকা হাওয়ায় পথশ্রমের ক্লান্তি ও বিরক্তি অনেকটাই কমে গেলো| তার স্টপেজ আসতে অনেক সময় আছে, এইবার সৌমাভ তাদের এবারের টুরের বাকি হিসাবটা মনে মনে মেলাতে বসলো|
স্কুলমোড় থেকে তাদের বাড়ি পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটাপথ| অটো থেকে নেমে ভাড়া চুকিয়ে প্রথমেই সে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করলো| পকেটের ভিতরে থেকে প্যাকেটটা দুমড়ে গেছে – ভিতরের অবশিষ্ট তিনটি সিগারেটেরও একই দশা| সিগারেট ধরিয়ে ব্যাগটাকে কাঁধের উপর চাপিয়ে নিয়ে হাঁটবার উদ্যোগ করতেই আবার বাঁ পায়ের আঙ্গুলের ব্যথাটা জানান দিলো|
বেল বাজানোর প্রায় সাথে সাথেই সৌমীলি দরজা খুলে দিলো|
“কিরে? কেমন আছিস?”
“ভালো – মা কই? ঘুমুচ্ছে?”
“না, এই গরমে ঘুম আসে তাই? টিভি দেখছে|”
হাঁটতে হাঁটতে ব্যথাটার কথা সে ভুলেই গিয়েছিলো, ব্যাগ নামিয়ে জুতো খুলতে গিয়ে সেটার কথা মনে পড়ল আবার – কিন্তু এখন আর তার কোনো অস্তিত্ব নেই| খানিকটা নিশ্চিন্ত হলো সৌমাভ, কাল থেকেই আবার অফিস – কাজেই এখন এইসব ব্যথা-বেদনা নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না| জুতো মোজা খুলে ফেলতে পা-দুটো অনেক হালকা হয়ে গেলো|
“খাবি তো?”
“হ্যা – লাগা|”
“তুই এসে হাতমুখ ধুয়ে বস, আমি খাবার লাগাচ্ছি| চান করবি নাকি?”
“না না, আগে খাবো, বড্ড খিদে পেয়েছে – এই শোন, তার আগে একটু লেবু জল বানিয়ে দিবি? ঠান্ডা?”
“হ্যা আয়|”
সৌমীলি দ্রুতপায়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো| সৌমাভো ক্লান্তভাবে ব্যাগটা তুলে খাওয়ার ঘরের একপাশে রেখে বেসিনে চোখে-মুখে ঝাপটা দিতে দিতেই তার মা এসে হাজির হলেন|
“কেমন আছিস? ইস! কত কালো হয়ে গেছিস!”
“ভালো আছি মা, তোমার শরীর কেমন?”
“ঠিকই আছে! নে - হাত মুখ ধুয়ে খেতে বোস| সুমি …”
সৌমীলি কাঁচের গ্লাসে করে ঠান্ডা লেবুজল নিয়ে আসে|
“... তবে সব থেকে ভালো লেগেছে দানোদক, অদ্ভুত সুন্দর জায়গা! ওরকম জায়গা যে এদিকে কোথাও আছে কেউই জানে না বোধহয়| ছবি তুলেছি - পরে দেখিস সুমি! বুঝলে মা – জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোট পাহাড়, টিলার মতো আর কি! বিধুগা থেকে হেঁটে প্রায় আধ-ঘন্টা চল্লিশ মিনিট মতো হবে – গাড়ি ঘোড়া কিচ্ছু নেই, রাস্তা-ঘাট না, জঙ্গলের মধ্যে পায়ে চলা পথ যেরকম থাকে সেইরকম|”
“সুবর্ণ পারলো?”
“হ্যাঁ – ব্যাটার ভুঁড়ি থাকলে কি হয় – দারুন এনার্জি!”
“কি আছে সেখানে দাদা?”
“আ:! ওকে খেতে দে না সুমি, বকাচ্ছিস কেন? সবে ঘেমেনেয়ে ফিরেছে, আরেকটু ডাল নিবি সমু?”
“না মা – চাটনি আছে?”
“হ্যাঁ – দেতো সুমি, ভাত নিবি আর?”
“নাঃ! দানোদকে টিলার উপরে একটা ছোট্ট মন্দির আছে, মন্দির বলতে একটা ছোট্ট ঘরের মতো! তা বাদে আর কিছু নেই! তবে বিউটি কি জানিসতো সুমি? টিলার শেপ আর গাছপালা| সাঁচিস্তুপ দেখেছিস তো? ঠিক সেইরকম একটা গম্বুজ|”
“বানানো?”
“না – ন্যাচারাল, গ্রানাইট পাথরের নিখুত অর্ধগোলক| দেখলে অবাক হয়ে যাবি! পাশে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত গাছপালা আছে, আর তা বাদে টিলার গায়েও শিকড়-বাকড় বেরিয়েছে, তাই বেয়ে বেয়ে ওঠা যায়| তবে বিধুগার লোকজন আমাদের যেতে বারণ করছিলো অনেকবার – দেও-ফেওর গল্প আর কি – হা হা, ওদিককার লোকজনের বিশ্বাস জানো তো মা! টিলার গোড়ায় পাথরে-টাথরে সিঁদুর-ফুল-বেলপাতার ছড়াছড়ি, যা শুনলাম টিলার কাছাকাছি মানুষ যায় না নাকি! ভাবতো! তবে একথা ঠিক যে কুসংস্কার বা সংস্কার, যাই বলো না কেন এর কারণেই এরকম একটা সুন্দর জায়গা এখনো পিকনিক-স্পট হয়ে যায় নি|”
“নে চল – খালি থালায় বসে আর বকবক করতে হবে না, হাত ধুয়ে নে সমু, তারপর রেস্ট কর| সুমি থালা তোল – পরে ধীরে সুস্থে গল্প করিস|”
মায়ের তাড়ায় টেবিল থেকে ওঠে সৌমাভ, কিন্তু উঠতে গিয়েই যন্ত্রনায় আবার বসে পড়ে সে| মুখ থেকে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে আসে| আগের সেই ব্যথাটা ফিরে এসেছে, তবে এবার সেটা দুপায়েই! তার অবস্থা দেখে মা আর বোন দুজনেই আঁতকে ওঠে|
“কি হলো রে?”
“পায়ে ব্যথা|” যন্ত্রণা চেপে বলে সৌমাভ, “এতো হাঁটাহাঁটি হয়েছে!”
ভেবেছিলো একটু গড়িয়ে নেবে, তারপরে বিকেল নাগাদ পার্কে যাওয়া যাবে আড্ডা দিতে, কিন্তু ক্লান্তির ঘুম এতো গাড় হলো যে সে যখন উঠলো তখন প্রায় সন্ধ্যা| ঘরের ছোট আলোটা জ্বলছে - মা বা সৌমীলি কেউ একজন এসে মশা তাড়ানোর মেশিনটাও চালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো আশাকরি, নয়তো অনেক আগেই মশার দাপটে তার ঘুম ভেঙ্গে যেত| অবেলায় ঘুম থেকে উঠে প্রচন্ড বিরক্ত হলো সৌমাভ| দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে সাতটা, যাক – খুব একটা দেরি হয়নি| পার্কে বন্ধুরা সবাই চলে এসেছে আশা করি - এখনো বেরুলে অন্তত এক-দেড় ঘন্টা আড্ডা দেওয়া যেতেই পারে|
ঘুমের ঘোর এবং বিরক্তি একসাথে কেটে যেতেই সৌমাভের ব্যথার বোধ ফিরে এলো| এখন কেবল আর পায়ে নয়, তার দু হাত আর দু পায়েই এক সাথে একই রকম কিনকিনে ব্যথা করে চলছে| শোয়ার সময়ে সে মনে করেছিলো যে একটু বিশ্রাম নিলেই পায়ের ব্যথা বিদেয় নেবে| কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে সেই ব্যথা এবারে একইসাথে দুই হাতে পায়েই সংক্রমিত হয়েছে| ভালো জ্বালা!
“উঠেছিস?”
মায়ের গলার আওয়াজে চমকে উঠলো সৌমাভ| এবারে তার ঘুমের রেশটা কেটে গেলো পুরোপুরি|
“হ্যাঁ, ডাকনি কেন? এতো দেরি করে ঘুমুলাম!”
“বেড়িয়ে-চেরিয়ে এলি, ক্লান্ত ছিলি – তাই আর ডাকিনি, চা খাবি? বানাবো?”
“হ্যা দাও|”
তার ঘর থেকে হেঁটে খাওয়ার ঘরে আসতে রীতিমতো কষ্ট হলো সৌমাভের| সেরকম যন্ত্রণা নয়, কিন্তু দুই হাতপায়ে চাপা ব্যথাটা সমানে জানান দিয়ে যাচ্ছে| কি হলটা কি? এতদিনের অভিজ্ঞতায় এরকম তো কখনো হয় নি! ইউরিক এসিড বা ওরকম কোনো অসুখ-বিসুখ বাধলো নাকি? খেয়াল করে দেখলো যে ব্যথাটা কেবল তার হাত আর পায়ের কড়ে আঙ্গুলের হাড়েই বোধ হচ্ছে কেবল, অন্য কোনো আঙ্গুলে, পায়ের পাতায় বা হাতের চেটোয় কিন্তু কোনো ব্যথা-যন্ত্রণা নেই| ব্যাগ খোলা হয়নি এখনো, তার ভিতরেই আশা করা যায় অব্যবহৃত পেনকিলার পাওয়া যেতে পারে, আর রাতে একটা ভালো লম্বা ঘুম দিয়ে নিলেই হয়তো যন্ত্রণার উপশম হতে পারে|
খাওয়ার ঘরেই টিভিটা থাকে, সৌমাভ দেখলো তার ক্যামেরাটা কেবল দিয়ে টিভির সাথে লাগানো আছে আর টিভির পর্দায় তাদের ফেরার পথের একটা ছবি স্থির হয়ে আছে| রান্না ঘর থেকে চায়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে – সৌমীলি তার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করে এবারের টুরের ছবিগুলো দেখছিলো মনে হয়, আর তারপরে মায়ের কথায় তার জন্যে চা বানাতে গেছে|
খাওয়ার টেবিলে বসে সৌমাভ তার দুহাত মন দিয়ে দেখছিলো, কড়ে আঙ্গুলের গোড়ায় খানিকটা জায়গা অস্বাভাবিক লালচে হয়ে আছে| গরমের জন্যে হতে পারে? হতেও পারে, কারণ কোনকিছু ইনফেকশন হলে তার এফেক্ট হতে এতটা সময় লাগতো না আশা করি| হাতের আঙ্গুল খোলা-বন্ধ করতে করতে মনে হলো কড়ে আঙ্গুলের গোড়ায় যেন কিছু একটা আটকানো আটকানো মতো লাগছে|
“নে|” সৌমীলি চায়ের কাপ তার সামনে এনে রাখলো, “খাবি কিছু?”
“না – বেলা করে খেলাম, এখন আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না|”
“ছবিগুলো দেখছিলাম – নাইস জায়গা রে! আমি একটা ছবি বেছে রেখেছি - আমার ফেসবুকে কভার ফটো লাগাবো – হি হি|”
“হ্যাঁ – পিসিতে আমায় মেনশন করিস|”
“কিন্তু তোর দানোদকের ছবি কোথায়? গম্বুজ-টম্বুজ তুলিসনি কিছু?”
“হ্যা তুলেছি তো! সবগুলো দেখিসনি?”
“না – বুঝতে পারলাম না, পরপর দেখছিলাম, কটা গ্রামের ছবি, তারপরে জঙ্গল, গাছপালা, তারপরে … তারপরে একটা মূর্তি, ভালো কথা এর ভিতরে অনেক ছবি কিন্তু করাপ্ট আছে|”
চমকে ওঠে সৌমাভ, “করাপ্ট মানে!এতো ভালো ভালো ছবি তুললাম!”
“হিজিবিজি, কিছুকিছু ছবি আবার টেরচা হয়ে আছে, দাঁড়া দেখাচ্ছি|”
সৌমীলি কেবলটা সাবধানে সোজা করে ক্যামেরাটা টেবিলে নিয়ে আসে, তারপরে নেভিগেশন করে আগের ছবিগুলোতে ফেরত যেতে থাকে|
“দাঁড়া দাঁড়া,” সৌমিলির কাছ থেকে ক্যামেরা নিয়ে সৌমাভ থাম্বনেল ভিউতে যায়, তারিখ অনুযায়ী ছবি সাজানো আছে| গতকালের তারিখ বেছে নিয়ে এক এক করে ছবিগুলো দেখতে থাকে সে|
গতকাল সকালে তারা ছিল দেনাপো, সেখান থেকে দুপুরে বিধুগা, বিধুগা থেকে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে পলিদী ফেরার কথা, কিন্তু মাঝপথে দানোদকের কথা শুনলো একটা আদিবাসী ছেলের কাছে, কাজেই সোজা পথে না গিয়ে … এই তো সেই আদিবাসী ছেলেটার ছবি| তারা দানোদক যাবে শুনে হাত নেড়ে তাদের বারণ করছে, চোখে মুখে আতঙ্ক, মোশন ব্লারে দুই হাত প্রায় ঝাপসা|
তারপরে দানোদকের জঙ্গলের রাস্তা, মনোতোষ সুবর্ণর সাথে ইয়ার্কি করছে, গাছের ডালে পাখি, পারিজাতের ম্যাক্রো ফটোগ্রাফি – ছেলেটার হাত ভালো বেশ, মনোতোষ মডেলিংএর পোজে, সৌমাভ সিগারেট খাচ্ছে – তাড়াতাড়ি সেটা স্কিপ করেই একবার রান্নাঘরের দিকে দেখে নিলো সে, এর পরেই দূর থেকে একটা আবছা গম্বুজের ছবি – এইবার এসে গেছে তারা| পরের ছবিটায় যেতেই বুক ধড়াস করে উঠলো সৌমাভের|
পিওর রেড-গ্রীন-ব্লু জাঙ্কের ভিতর দিয়ে একগাদা সাদা আর কালো ছিটছিটে দাগ! যাহ!
“কার্ড খারাপ হয়ে গেছেরে নাকি?”
“আমি কিছু জানিনা দাদা – আমিও এই দেখেছি|”
পরের ছবির প্রায় একই অবস্থা!
“ইশ! এখান থেকেই গম্বুজটার ভিউ গুলো ছিল রে – যাহ!”
পর পর ছবিগুলো দেখতে থাকে তারা|
“যাকগে – মনোতোষদের থেকে পাওয়া যাবে আবার, ওরাও অনেক ছবি তুলেছে|”
একটা ছবি মন্দের ভালো, কিছু ডিজিটাল জাঙ্কের মধ্যেও একটা মূর্তির ছবি খানিকটা হলেও স্পষ্ট|
“এই দেখ এই দেখ, এটা সেই দেওয়ের মূর্তি| ইস এটাও গেছে – মন্দিরের ভিতর অন্ধকার, তাও ফ্ল্যাশ মেরে বেশ একটা ছবি হয়েছিল|”
“কি বিশ্রী দেখতেরে দাদা|”
“যাহ! লোকশিল্প – এরকমই ফর্ম হয় - দেখিসনি!”
“না তা বলছিনা – দেখ কিরকম বীভত্স দেখতে! ভগবান মাথায় থাকুক, কিন্তু দেওর থেকে দানোর সাথে মিল বেশি – হি হি|”
বোনের কথায় রাগতে গিয়েও রাগতে পারলো না সৌমাভ, ঠিকই লোকায়ত শিল্পে একই সাথে সারল্য আর কুটিলতা দেখতে দেখতে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে| তবে পার্থক্য এখানে যে এই দেওটির সাথে দেবতা বা দানব নয় – যেন কোনো হাজার বছরের প্রাচীন মমির মিল সব থেকে বেশি পাওয়া যায়|
“দেখেছিস – চারটে করে আঙ্গুল! মিকি মাউসের মতো মনে হচ্ছে, নারে দাদা? হি হি|”
“সিম্প্লিফিকেশন বুঝলি? পাঁচটা আঙ্গুল বানাতে হলে শিল্পীকে খাটতে হবে বেশি, তাই আর কি!”
মজাদার নয়, আসল সাইজে দেখতে থাকলে হিজিবিজির মধ্যেও মূর্তিটাকে যেন অনেক বেশি জীবন্ত মনে হয় – আর তার সঙ্গে আরো বেশি কদাকার|
ভাগ্য ভালো গম্বুজের ছবিগুলো ছাড়া বাদবাকি সব ছবিই ঠিকঠাক আছে| গম্বুজের চারিদিক ঘিরে অদ্ভুত গাছপালার ছবিও স্পষ্ট নেই, ওগুলো ঠিকঠাক দেখলে সৌমীলি নির্ঘাত অন্য গ্রহের গাছ বলে চিত্কার করতো| চমকে না দিতে পেরে সৌমাভ মনক্ষুন্ন হলো| দানোদক থেকে পলিদীর রাস্তাও খুব সুন্দর – সেখানকার ছবি দেখে সৌমীলি মুগ্ধ হয়ে গেলো|
“এইটা এইটা – কি সুন্দর নারে দাদা? এটা আমি আমার কভার ফটো লাগাবো|”
একটানা ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে কোথায়| চাপা অসস্তি নিয়ে ঘুম ভাঙ্গলো সৌমাভের| ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে তার মনে হলো - এখন ভোর নাকি সন্ধ্যে? দুপুর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা অবধি ঘুমুনোর কারণে এমনিতেই রাত্রে সহজে ঘুম আসতে চায় নি, আর এখন এই আধ-অন্ধকারে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে সময়ের খেই হারিয়ে ফেললো সে| দ্বিতীয়ত সে বুঝতে পারলো না সে এখন কোথায়? কোনো হোটেলে, ট্রেনের বাঙ্কে নাকি নিজের বাড়িতে?
আস্তে আস্তে সম্বিত ফিরতে থাকলে ঘড়ি না দেখেই এবার সে বুঝতে পারলো সময়টা রাত একটা থেকে চারটের মধ্যে কিছু একটা হবে, আর সে তার নিজের ঘরেই নিজের বিছানায় শুয়ে আছে|
ঝিঁঝিঁ পোকাটা তারস্বরে ডেকেই চলেছে! কোথায় সেটা? ঘুমের মধ্যে যেরকম সে শুনছিলো এখনো তার তীব্রতা সেরকমই, কাজেই ঘুম ভাঙ্গবার পর সে বুঝে উঠতে পারছিলো না যে সে জেগে আছে নাকি এখনো ঘুমের ভিতর| একটু খেয়াল হতে বুঝতে পারলো ঝিঁঝিঁটা আসলে তার মাথার মধ্যেই বসে আছে| কোনো অজানা অসস্তিকর কারণে তার মস্তিষ্কে ঝিঁঝিঁর ডাক অনুরনিত হচ্ছে| ঘুমের ঘোর কেটে যেতে থাকলে ঝিঁঝিঁর ডাকও ক্রমশ অস্পষ্ট হতে লাগলো – এইবার একটা বিষাদের অনুভুতি প্রবল হতে থাকলো| ‘কি যেন একটা হারিয়ে গেছে’ এইরকম একটা অবসাদ অনুভব করতে থাকলো সৌমাভ|
‘নেই নেই’ ভাবটা আসতে থাকলে সৌমাভ এবার নিজের কথা ভাবতে শুরু করলো| কেন এমন হচ্ছে? ভাবতে ভাবতে প্রথমেই যেটা তার মনে হলো হাত-পায়ের সেই ব্যথাটা এখন একদম নেই| ব্যথা না থাকলে তো স্বস্তি, কিন্তু এরকম অবসাদ কেন? ব্যথা নেই, নাকি তার দুই হাত-পায়ের কড়ে আঙ্গুলগুলো অবশ হয়ে আছে?
শরীরে সাড় আসতে শুরু করলে সৌমাভ খেয়াল করলো তার দেহ যেন অনেক হালকা হয়ে গেছে – এবং তার সাথে হঠাৎ অনুভব করলো যে তার বাঁ হাতের তলায় ঠান্ডা সরু লম্বাটে গোছের কি একটা জিনিষ যেন নড়ে উঠে পালানোর চেষ্টা করছে|
প্রবল আতঙ্কে চিত্কার করতে যাওয়ার আগের মুহুর্তে তার মনে পড়ল বিধুগার আদিবাসী ছেলেটার কথা – একসাথে দুহাত নেড়ে সে তাদের দানোদক যেতে বারণ করেছিলো| সামনাসামনি হয়তো খেয়াল করেনি, কিন্তু সন্ধ্যাবেলা খাওয়ার ঘরে বসে তার তোলা ছবিতে সেই ছেলেটিরও দুই ঝাপসা হাতেই যেন চারটে করে আঙ্গুল দেখেছিল|
প্রকাশিত : হরর পত্রিকা : জুলাই ২০১৫
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন